অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাবেক পিএস সামছুদ্দিন মাসুমের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটের একটি অংশ মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক।
সরকার পরিবর্তনের পর আইন উপদেষ্টা ক্ষমতা ছাড়ার পর বদলির মাধ্যমে সামছুদ্দিন মাসুম বিদায় নিলেও একজন সিনিয়র সহকারী সচিব এই সিন্ডিকেটের হাল ধরে রেখেছেন। এই সিন্ডিকেটের আরেকটি অংশ জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিআরএসএ)-এর মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে রয়েছেন আরও কয়েকজন। বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, এই চক্রের অন্য সদস্যরাও বেশ সক্রিয়।
যদিও বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর এখনো কোনো প্রকার বদলি বা পদোন্নতির আদেশ হয়নি। তবে চক্রের সদস্যরা আগের মতোই তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার জেলা রেজিস্ট্রার থেকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতির একটি ফাইল প্রস্তুত করে রেখে গেছে। সেটি পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে। এ ছাড়া চলতি মাসে কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারের বদলির আদেশ হতে পারে।
তবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদোন্নতিতে ভবিষ্যতে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি না হয়, সেটি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এর দুই সপ্তাহের মাথায় ২৩ আগস্ট তিনি এক নোটিশে নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অর্থাৎ জেলা রেজিস্ট্রার, সাব-রেজিস্ট্রারসহ সব কর্মকর্তার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের (স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও বাবা-মা) সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেন। সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য ১০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
নোটিশের চার দিনের মাথায় ২৭ আগস্ট ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেন জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের কয়েকজন। সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে সক্ষম হয়ে আলোচনায় উঠে আসেন মুন্সীগঞ্জ সদরের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদোন্নতির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ঘুষ বাণিজ্যের মূল দর-কষাকষি অনুষ্ঠিত হতো রাজধানীর গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ কয়েকটি নামিদামি হোটেলে। সিন্ডিকেটের শক্তিশালী সদস্য হওয়ায় সাব-রেজিস্ট্রারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন মাইকেল মহিউদ্দিন। এরপর গত বছরের ১১ জানুয়ারি তিনি নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) মহাসচিব মনোনীত হন। বিআরএসের নেতৃত্বে আসা মাইকেল মহিউদ্দিনের মাধ্যমে ওই কমিটির অনেকেই তাদের পছন্দের অফিসে বদলি হতে পেরেছেন।
রাষ্ট্রপতির জারি করা নীতিমালা বিদ্যমান থাকলেও এসব বদলিতে মানা হয়নি কোনো ধরনের নিয়মনীতি। এসব বিষয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিন্ডিকেটের বিষয়টিই অস্বীকার করেন।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা সবাই জানেন যে ওই সময়টায় কারা মব সৃষ্টি করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ভয়ে সে সময় বদলি-পদোন্নতিসহ অনেক কিছু হয়েছে। সেখানে উপদেষ্টার কিছুই করার ছিল না। বিআরএসএর সভাপতি-সেক্রেটারিরও কিছু করার ছিল না।’
জানা গেছে, বিআরএসের যুগ্ম মহাসচিব নিযুক্ত হয়েই সাব-রেজিস্ট্রার গোলাম মোস্তফা চুয়াডাঙ্গা থেকে বদলি হয়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। নবনিযুক্ত যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম শেরপুরে বদলি হয়ে ছয় মাস না যেতেই আনডিউ (বদলির অনুপযুক্ততা) বদলির মাধ্যমে লোভনীয় পোস্টিং নিয়ে গত বছরের ১৭ মার্চ রাজধানীর বাড্ডায় আসেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল বাতেন আনডিউ বদলির মাধ্যমে ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার হন। যুগ্ম সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. সাজ্জাদ হোসেন সি গ্রেডের কর্মকর্তা হলেও সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে সরাসরি এ গ্রেডের অফিস নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বদলি হন।
ক্রীড়া সম্পাদক খায়রুল বাসারকে তিন মাসে তিন বার বদলি করা হলেও পছন্দের অফিস ঢাকায় আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার হন। তাকে প্রথমে টাঙ্গাইলের কালিহাতী, পরে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বদলি করা হয়েছিল। এসব বদলি তার পছন্দ হয়নি।
যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুর রহমান সি গ্রেডের কর্মকর্তা হলেও তাকে এ গ্রেডের অফিস কক্সবাজার সদরে বদলি করা হয়। কমিটির আরও কয়েকজন সদস্যও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেয়েছেন লোভনীয় পদায়ন।
এ ছাড়া বিআরএসের কমিটিতে না থাকলেও জোর তদবিরের মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে লোভনীয় ঢাকার জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলি হন মুনশি মোকলেছুর রহমান। তাকে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে ঢাকায় বদলি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৮ মাসে ২৮৬ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ঘুষের বিনিময় বদলি করা হয় অন্তত ২০০ জনকে। এতে অন্তত শতকোটি টাকার লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।