আজ রাতেই আত্মহত্যা করবে প্রিতম। এর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। সিদ্ধান্তটা হঠকারী কি না, এ ব্যাপারে ওর নিজেরই একটু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে। তাছাড়া পৃথিবীতে কোনো সিদ্ধান্তই নিখুঁত নয়। অথচ এক বছর আগেও এরকম ভাবনা ও ভাবতেও পারত না।
ও কি ভাবতে পারত যে, করোনার সময় বাবার চাকরিটা হঠাৎ এভাবে চলে যাবে, অনার্সে ভালো রেজাল্ট করেও চাকরি পাবে কি না কিংবা নীলিমার ব্যাপারটা হঠাৎ এভাবে মোড় নেবে, ওর জীবনটাকে ওলট-পালট করে দেবে?
বড় অভিমান নীলিমার ওপর। রাগ করাই উচিত ছিল কিন্তু রাগ যে ও করতে পারে না। কেন পারে না, নিজেও বুঝে উঠতে পারে না। খুব বেশি ভালোবাসে বলেই কি? এই মুহূর্তে তার সব অনুভূতি খুব তীক্ষ্ণ ও তীব্র হয়ে উঠছে। সেটা কি এই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে? কিছুদিন ধরেই একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল প্রিতম। কারও সঙ্গে মিশতেও ভালো লাগত না।
মাঝে মাঝে স্যারের ওখানে যেত। তার এই মানসিক অবস্থার দিকটা সবার চোখে ফাঁকি দিলেও স্যারের চোখে ঠিকই ধরা পড়েছিল। স্যারের ওখানে প্রাইভেট পড়তে গিয়েই তো নীলিমার সঙ্গে ব্যাপারটি শুরু। তার পর থেকে চড়াই-উতরাই, মান-অভিমানের মধ্যদিয়ে গভীরতর উপলব্ধিতে পৌঁছা- অন্তত ওর নিজের দিক থেকে। এক সময় ভাবত। শুধু ভাবত না, গভীরভাবে বিশ্বাসও করত- দুজন একই উপলব্ধিতে পৌঁছেছে। কিন্তু আজ কি এই বিশ্বাস ধরে রাখতে পারছে?
মায়ের ঘর থেকে নানান কাজের টুকটাক শব্দ ভেসে আসছে। তার মানে মা এখনো ঘুমাননি। মা না ঘুমালে কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ যেকোনো মুহূর্তে মা আসতে পারেন। তাহলে পুরো পরিকল্পনাটা বানচাল হয়ে যেতে পারে। বাবার চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকেই মার ঘুম অনেক কমে গেছে। কমবেই না বা কেন? উবারে গাড়ি চালিয়ে বাবার সামান্য যে ক’টা টাকা রোজগার হয় তা দিয়ে কীভাবে সংসার চালান, তা মা-ই জানেন। শিক্ষিত, শক্ত-সামর্থ্য ছেলে হয়েও মাকে কোনো সাহায্য করতে পারছে না, এই হীনম্মন্যতাবোধ ওকে সব সময় কুরে কুরে খাচ্ছে। আত্মহত্যা পরিকল্পনার পেছনে এটাও একটা বড় কারণ।
নীলিমার ব্যাপারটা ‘মেনে’ নিতে পারলেও ‘মনে’ নিতে সে কিছুতেই পারছে না। ওর চোখের মধ্যে প্রিতম পেয়েছিল সমুদ্রের গভীরতার সন্ধান। ওই সমুদ্রেই সম্পূর্ণ-আত্মসমর্পণ করে সারা জীবন ভাসতে চেয়েছিল। আজ প্রিতমের জীবনবোধ ওকে বুঝতে শিখিয়েছে- যেসব স্বপ্নের পরিপূর্ণতার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেসব স্বপ্ন না দেখাই ভালো। কোনো ব্যাপারেই নিজেকে গভীরভাবে নিয়োজিত করা ঠিক নয়। নীলিমার ব্যাপারটা গভীরভাবে নেওয়ার ফলে ও কী পেয়েছে? শুধু স্মৃতির ভারে জর্জরিত একটা জীবন। আর অন্যদিকে নীলিমা প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ীর স্ত্রী হয়ে সুখেই আছে।
তাহলে কি প্রিতমের সঙ্গে নীলিমার ব্যাপারটা ছিল সাময়িক সময় কাটানোর নিছক অভিনয়। সবটাই ছিল মুখোশের আড়ালে একটা নাটক। ওর কাছে অগ্রাধিকার ছিল নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠা, প্রাচুর্য। এরকম অনেক প্রশ্নের সামনে প্রিতম আজ দাঁড়িয়ে।
একটা চাকরি কিংবা কিছু রোজগার করতেও কম চেষ্টা করেনি প্রিতম। কিছুতেই কিছু হয়নি। ছোটখাটো পুঁজি দিয়ে হয়তো একটা ব্যবসা করা যেত, কিন্তু বাবার ভুল সিদ্ধান্তের বলির পাঁঠা হয়েছে সে। দুবাইয়ে পাঠানোর নামে এক আদম ব্যাপারীর হাতে আট লাখ টাকা দিয়েছিলেন বাবা। দেড় বছর ঘুরিয়েও দুবাইয়ে নেয়নি প্রিতমকে। টাকাটাও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে ছোট দুই বোন বিবাহযোগ্যা। হুট করে বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে টাকা কোথায় পাবে। এসব চিন্তায় কিছুতেই সময় কাটছে না আর। সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয়েই গেছে, তখন আত্মহত্যার ব্যাপারটা ঘটিয়ে ফেললেই সব হিসাব চুকে যায়। আর কোনো যন্ত্রণা ওকে স্পর্শ করতে পারবে না। একটা অস্থিরতা ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অনুভূতিগুলো খুব তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে।
কী করা যায়? কবিতা পড়লে কেমন হয়? একটা কবিতার বই নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করল। কিন্তু কিছুতেই মন বসানো যাচ্ছে না। হঠাৎ একটা কবিতায় ওর চোখ আটকে গেল। কবি সুবোধ রায়ের এই লাইনগুলো তার খুব প্রিয়-
‘সরাইখানার অতিথির মতো এসে
কিছুটা সময় কাটিয়ে তো যাওয়া সোজা
তবুও মনে হয় জীবনকে ভালোবেসে
সার্থক হতো উৎসবিন্দু খোঁজা।’
সত্যিই তো, ভালোবাসার কেন্দ্রীকরণ থেকে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে যাওয়াটাই তো জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর এভাবেই তো বেঁচে থাকা যায়। সবাইকে ভালোবেসে, সবার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে ভাগ করে নিয়ে বেঁচে থাকাটাই তো জীবন। স্যার একদিন বলেছিলেন, ‘জানিস, যারা জেতে তারা পালায় না, আর যারা পালায় তারা জেতে না।’ তাহলে এই পৃথিবী থেকে, এই জীবন থেকে সে পালাবে কেন? কেন কাপুরুষের মতো হার মেনে নেবে? প্রিতমের ভেতরে এক নতুন উপলব্ধির উদয় হলো। জীবনযুদ্ধে সে হার মানবে না। কখনই না। সেদিন থেকেই শুরু হলো তার নতুন করে পথ চলা।
সোলমাইদ, ভাটারা, ঢাকা
তারেক
.jpg)