কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে জেলা সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সরকারি বনভূমিতে হয়েছে ব্যাপক বৃক্ষ নিধন। বনের লাখ লাখ গাছ কাটার অভিযোগের ঘটনার কমতি ছিল না। একই সঙ্গে বিনষ্ট করা হয়েছে সরকারি শত শত পাহাড়। বন বিভাগ মামলা দিয়েও ভূমিদস্যুদের কাছে এক রকম নিরুপায় ছিল। কারণ মামলা দিয়েও তাদের দমিয়ে রাখা যায়নি। এমন বিপর্যয়ে গঠন হয় আলাদা বন আদালত। বন মামলার কার্যক্রম শুরু করলেন বিচারক। প্রথমে আসামিদের মনে হলো, এ যেন বন মামলার বিচার হচ্ছে হত্যা মামলার মতো। আসতে থাকে বনভূমি দখলমুক্ত, জামিন শর্তে গাছ রোপণ, সামাজিকতা রক্ষার মতো ব্যতিক্রমী আদেশ। থমকে গেল ভূমিদস্যুদের কার্যক্রম। সচেতন মহলে প্রশংসিত হলেন বিচারক। তিনি হলেন বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ।
আদালতপাড়ায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন ও বন মামলা নিষ্পত্তির রেকর্ড গড়ে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। দেশের বেশির ভাগ আদালতে মামলার যেখানে জট রয়েছে, সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে অধিকসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করে রেকর্ডে গড়েছেন তিনি। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা বাড়ছে সাধারণ মানুষের। বিচারক কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও কর্তব্য-নিষ্ঠার মাধ্যমে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করেছেন বলে জানিয়ে ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী। ইতোমধ্য আদালত সূত্রে এমন সফলতার তথ্য উঠে এসেছে। জেলায় এই প্রথম বন আইনে বহু মামলা নিষ্পত্তির রেকর্ড করলেন বিচার বিভাগ। এ ছাড়া প্রশংসা কুড়াচ্ছেন বৃক্ষরোপণের শর্তে আসামিকে জামিন দেওয়ার ঘটনা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৫ নং বন আদালতের বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ যোগদান করেন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। পরে ১ বছর ৯ মাসে ৯ দিনে ১ হাজার ১২৩টি বন মামলা নিষ্পত্তি করেন তিনি। এতে ৭১১টি রায় ঘোষণা, ৪১১টি মামলা খালাস, ১২৮টি মামলার সাজা। একই সঙ্গে ১৩১টি বন মামলায় জামিন শর্তে ২০ হাজার ৮৫০টি বৃক্ষরোপণ ও বিস্তীর্ণ ঝাউবীথি এলাকায় ২৭টি মামলায় জামিন শর্তে ২ হাজার ৮২৫টি বৃক্ষরোপণ করে রেকর্ড করেছেন তিনি। এ ছাড়া জামিন শর্তে ১৫টি প্রবেশন মামলায়ও বৃক্ষরোপণসহ মসজিদ-মন্দিরের এতিম শিশুদের খাবার খাওয়ানোর আদেশ দেন। এ সময়ে বিচারকের প্রায় ১ হাজার ৩১৯ জনের সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতে হয়েছে।
আদালতের প্রবেশন মামলা ও জামিন শর্তে চারাগাছ রোপণের কয়েকটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিজ্ঞ আদালত বন মামলার ক্ষেত্রে বন বিভাগের নির্ধারিত জমিতে ৫০, ১০০, ২০০ এমন বিভিন্ন সংখ্যায় ফলদ, ঔষধি ধরনের চারাগাছ রোপণ করেছেন কি না, সেই বিষয়ে স্থিরচিত্র ও ভিডিওসহ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একইভাবে সমাজসেবা কর্মকর্তার বরাবরে মসজিদ-মন্দিরের এতিম শিশুদের খাবার খাওয়ানো বা দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করা হচ্ছে কি না, সেগুলো প্রমাণসহ দাখিল করতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৫ নং আদালতের সে সময়ের বেঞ্চ সহকারী মো. শফিউল ইসলাম জানান, ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে ৫টি উপজেলা নিয়ে বন আদালত গঠনের পর বন ও বন্য প্রাণীর বিচারকাজ শুরু করেন বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ। ১ বছর ৯ মাসে ৯ দিনে তিনি ১ হাজার ১২৩টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। এ ছাড়া জামিন ও প্রবেশন শর্তে পৃথক ১৫৮ মামলায় ২৩ হাজার ৬৭৫টি বৃক্ষরোপণ করিয়েছেন।
কক্সবাজার পরিবেশবাদী সংগঠন ‘এনভায়রমেন্ট পিপল’-এর প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘জেলার বনভূমি দখল-বেদখল, বন্য প্রাণী রক্ষায় বহু বন মামলা নিষ্পত্তিতে বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় এমন বিচারক অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সরোয়ার আলম বলেন, ‘বনভূমি দখল-বেদখল বন নিধনের অভিযোগে মামলা করা হয়। আদালত এবারে অধিকসংখ্যক মামলায় বনভূমিতে চারাগাছ রোপণের প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের তথ্যে পাঠানো হয়। এর কারণে এখন বনভূমি দখল বা গাছ কাটা অনেক কমে গেছে।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট শফিউল্লাহ মঞ্জুর ও অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের বলেন, ‘বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ পরিবেশ রক্ষায় একজন আন্তরিক বিচারক। মামলাজট নিরসনে তিনি বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত অধিক মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। কক্সবাজারে এর আগে আলাদা বন আদালত গঠন করা হয়নি। তিনি কক্সবাজারে আসার পর মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার পাচ্ছেন। আশা করছি, এ ধারাবাহিকতা পরবর্তী বিচারকরা অব্যাহত রাখবেন।’
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তারেক বলেন, ‘আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। এতে একদিকে যেমন বিচার প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি হয়েছে, অন্যদিকে মামলার চাপ থাকার সত্ত্বেও দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে বিচার প্রার্থীদের আস্থা বড়ছে। এমনকি বৃক্ষরোপণের আদেশ দিয়ে পরিবেশ রক্ষা করেছেন।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (এফসিসিও) আলী নেওয়াজ বলেন, ‘বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ আন্তরিকতা ও কর্তব্য-নিষ্ঠার মাধ্যমে বন ও বন্য প্রাণী, বনভূমি রক্ষায় কাজ করেছেন। বনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করেছেন। তিনি আদালতে পাহাড় কাটার মাটিসহ জব্দ করা ডাম্পার জামিন দেননি। আসামিরাও বন দখল ও বনের পাহাড় কাটা থেকে অনেকটা বিরত রয়েছে। এটি বাদী, বিবাদী, আইনজীবী ও রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক।’