ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
Khaborer Kagoj

হাওরের জলস্রোত

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৪১ পিএম
হাওরের জলস্রোত

রেজাউল নিজেকে শাসন করে নিশ্চুপ হয়ে যায়। হাওরের চারদিকে তাকিয়ে থাকলে দেখতে পায় কী সুন্দর এলাকা।

এখানে বাস করলে সুন্দর চিন্তা করা উচিত। শীতকালে যখন শত শত পাখি এসে হাওরে নামে, তখন হাওরের ছবি ভিন্ন মাত্রার হয়। হাওরের সৌন্দর্য এমনই। নানাভাবে হাওরবাসীকে সুখী রাখে। রেজাউল নিজের ভাবনার মাঝে ডুবে যায়। রেজাউলের দুই চোখজুড়ে পানি জমে। তারপর টুপটাপ পড়তে থাকে। একসময় হাওরের জলস্রোতের মতো পানি গড়ায় চোখ দিয়ে। ও হাত উঠিয়ে মোছে না। ভাবে, আমার দুই চোখ হাওরের জলস্রোত। হাওরে বাঁধ নির্মাণ হয়। কিন্তু চোখের পানির জন্য হাত বাঁধের কাজ করে। আজ ও হাত কাজে লাগায় না। ভাবে, পানি গড়ালে ওর ভালো লাগছে। সে জন্য দুই গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের পানি ওর কাছে হাওরের জলস্রোত হয়ে যায়। ও পানিভরা দুই চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে। প্রতিদিনের দেখা এলাকা আজ চোখের পানিতে দেখা ভিন্নরকম এলাকা হয়। ও চুপচাপ বসে থাকে। ওর মনে হাওরের চারদিকে তাকালে প্রতিদিন এক রকম দেখা হয় না। নানা রকমভাবে উল্টেপাল্টে যায় হাওর। পরক্ষণে নিজেকে বকা দিয়ে বলে, সব সময় এভাবে ভাবা উচিত না। হাওরের দিকে তাকালে কখনো অন্য রকম হয়ে যায়। এটা ওর নিজের ভাবনার জগৎ। এই ভাবনা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চিন্তায় রেজাউল পায়ের আঙুল দিয়ে হাওরের মাটি খুঁটতে থাকে। গানের সুরে বলে, বেঁচে থাকি মাটি নিয়ে, ভাত খাই মাটিতে। শুয়ে থাকি মাটিতে। হাওরের ভালোবাসায়। ওহ্, বাবা-মায়ের গ্রামের থাকার চেয়ে এখানে থাকতে বেশি ভালো লাগছে। বাবা আমাকে বকাবকি করে। কেন আমি এখানে থাকতে ভালোবাসি? 

আমি বাবার পক্ষে সায় দিই। বলি, বাবা আমি আপনার হাওরের জমি দেখাশোনা করি। আপনি তো প্রচুর ধান পান। 

- হ্যাঁ রে বাবা, পাই। তাহলে তুই থাক। কিন্তু তুই বাড়িতে না থাকলে আমার মন খারাপ থাকে। চারদিকে তোর জন্য তাকাই। দেখি না কোথাও। 
- আচ্ছা, ঠিক আছে বাবা। আমি কিছুদিন গ্রামে থাকব। কিছুদিন হাওরে থাকব। 

- হ্যাঁ, থাকবি। এখন থেকে আমি নিজেকে শাসন করব। তোকে কষ্টের কথা বলব না। তাহলে ধান পাওয়া কমে যাবে। 
- কমবে না বাবা। আমি বেশি ধান পাওয়ার চেষ্টা করব নানাভাবে। 

- ওরে আমার বাবা সোনা রে, তোকে কষ্ট করতে হবে না। কম ধান পেলে ক্ষতি নেই। আমি নিজেকে শাসন করব, যেন তুই হাওরে থাকতে পারিস। আমার ভুতুড়ে কথা তোকে আর শোনাব না। 

রেজাউল হাসতে হাসতে বলে আমি ভুতুড়ে কথা শুনতে ভালোবাসি, বাবা। ছোটবেলায় অনেক ভ‚তের গল্প শুনেছি আপনার কাছ থেকে। সে সব গল্প এখনো আমার মনজুড়ে আছে। বিয়ের পর ছেলেমেয়েদের এসব গল্প শোনাব। 
- মনে রাখতে পারবি? 

পারব, বাবা। খুব ভালোভাবে পারব। মোস্তফা হাসতে হাসতে বলে, তুই একজন ধন্য বাবা হবি। ছেলেমেয়েদের হাসিখুশি রাখবি। রেজাউল বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। বাবা ওর মাথায় হাত রাখে। ও উঠে দাঁড়ায় না। বাবার দুই পা জড়িয়ে ধরে হাঁটুর ওপর মাথা ঠেকায়। বাবা ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে জড়িয়ে ধরে। বলে, তুই আমার সোনার ছেলে। আমার বুকে থাকবি। পায়ে থাকবি না। 

রেজাউল বাবার ঘাড় ধরে লাফালাফি করে। আমার সোনার বাবা, সোনার মা। গানের মতো সুর টেনে বলতে থাকে। ওর বাবা কান পেতে শোনে। সোনার ছেলের কণ্ঠস্বরে মধু আছে, বাবার বুক ভরিয়ে দিচ্ছে। একসময় রেজাউল থেমে যায়। বলে, আমি ঠিক করেছি হাওরে একটা বাড়ি বানাব। 
- কেন এখানে বাড়ি বানাবি? গ্রামে আমাদের বাড়ি আছে না? 

- আছে তো আব্বা। তবে আমি বিয়ে করে এখানে একটা বাড়ি বানাব। আমি এখানে থাকব। 
- এখানে কেন থাকবি? হাওরে তোর এত নেশা কেন? 

- আব্বা, আমার এখানে থাকতে বেশি ভালোলাগে। চারদিকে তাকালে মন ভরে যায়। শীতকালে বিদেশি পাখিগুলো এলে আমার মনে হয় আমাদের হাওর বিদেশ হয়েছে। 
- তুই তো পাগল হয়ে যাবি দেখছি।
- আব্বা, আপনি রাগ করবেন না। 
- তুই এখানে থাকলে আমি রাগ করব। 

আচ্ছা, তাহলে আমি এখানে থাকব না। আমি তো আপনার সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে থাকব। আপনি রাগ করবেন না,  আব্বা মোস্তফা ছেলের কথার উত্তর দেয় না। চারদিকে চোখ ঘোরায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য দেখে মন ভরে যায়। ছেলের ইচ্ছা নিজের বুকের ভেতর গুমগুম করে। বুঝতে পারে ছেলের ইচ্ছার সঙ্গে নিজের ইচ্ছা মিশে গেছে, কিন্তু এখানে এসে বাস করা হবে না। ওকে বাধা দিতে হবে। পরক্ষণে নিজেকে ধমকায়- কেন এখানে বাস করা হবে না? এক শ বার হবে। ছেলে ঘর তুলুক, আমি এসে থাকব। মোস্তফা নিজেকে ছেলের বুকে মাথা ঠেকে রাখে। ছেলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, বাবা, বাবা আপনি আমার প্রাণের মানুষ। তারপর গুনগুন করে গাইতে থাকে, বাবা, আমার বাবা। 

- ওরে আমার সোনার ছেলে। তোর গান শুনে আমি ধন্য। তোর সঙ্গে আমিও এখানে ঘর তুলব। তুই বউ নিয়ে থাকবি। আমি মাঝেমধ্যে তোর মাকে নিয়ে এসে এক দিন থেকে যাব। 
- এক দিন না আব্বা, সাত দিন থাকবেন। 
মোস্তফা হা-হা করে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, তুই আমার হাওর ছেলে।
- আব্বা, আপনি ঠিক বলেছেন। আমি আপনাকে ভালোবাসার মতো হাওরকে ভালোবাসি। 
মোস্তফা ছেলের কথা শুনে হাসতে হাসতে তালি বাজায়। রেজাউল বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে বলে, বাবা আমার টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওর আমার বাবা। 
- না, তোর বাবা বলবি না। তুই এখানের কোনো মেয়েকে ভালোবাসবি না? 
- হ্যাঁ, বাসব। তারপর বিয়ে করে ঘর করব। 
- তাহলে হাওর বাবা হবে কেন? বলবি হাওর ভালোবাসার মাটি আর পানি। 

নতুন প্রজন্মের দুরবিন আনিসুল হক

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০২:০৬ পিএম
নতুন প্রজন্মের দুরবিন আনিসুল হক
আনিসুল হক

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘মা’ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন, ‘অনেক পরিশ্রমের সঙ্গে আনিসুল হকের ভালোবাসাটুকু যুক্ত হয়েছিল বলে এটি সুন্দর একটা বই হয়েছে। বইটি পড়তে পড়তে আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের স্মৃতি বারবার ফিরে আসছিল; এ দেশের লাখ লাখ মায়ের দীর্ঘশ্বাস আমি আবার শুনতে পেয়েছিলাম।’... 

আনিসুল হক-এর জন্ম ১৯৬৫ সালের ৪ মার্চ নীলফামারীতে। তিনি একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, চিত্রনাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। পিতা মো. মোফাজ্জল হক ও মাতা মোসা. আনোয়ারা বেগম। আনিসুল হক যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক লেখক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন সুইডেনের আন্তর্জাতিক লেখক কংগ্রেস, কলকাতা আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। উপন্যাস ‘মা’ ও ‌‘ফাঁদ’ একাধিক ভাষায় অনূদিত। তিনি কিশোর আলো পত্রিকার সম্পাদক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক। স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০১২), সিটি ব্যাংক আনন্দ আলো সেরা বই পুরস্কার (২০১৯)-সহ অসংখ্য পুরস্কার।

শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১২:৪২ পিএম
শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

গত সংখ্যার পর

-অবশ্যই গুনাহ হবে। কবিরা গুনাহ হবে। তবে আপনি চাইলে গুনাহর বদল সওয়াব কামাতে পারেন।
-সে কীভাবে? 
-আপনি সমাজকে জানাবেন, পরিবারকে জানাবেন, বরাবরের মতো এবারও আপনি কুরবানি দিতে অপারগ। এতে তাদের কাছে আপনি আবারও লজ্জিত আর ছোট হয়ে যাবেন, কিন্তু গুনাহ থেকে বাঁচবেন। 
-তবে! 
-তবে কী? 
-তবে জানি না, যে সমাজ, শরিয়তের যে কুশীলবগণ আপনার মতো লাখো মানুষের ইজ্জত এবং সম্ভ্রমকে প্রতি ঈদে ধর্ষণ করে তাদের জন্য আল্লাহ কী শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন? 
বলতে বলতে প্রশ্নকর্তার গলার রগ ফুলে ওঠে- কুরবানির পশুর যে তিনটি রগ কেটে রক্ত প্রবাহিত করতে হয়- সমাজের লোভাতুর চোখে সেই রকমভাবে তার গলার রগগুলো বলির পশুর গলার রগের মতো প্রকটিত হয়ে ওঠে। 
এবার ভাগ্যহীন ভদ্রলোক নিজেই ভয় পেয়ে যান। বলেন, ওভাবে বলবেন না ভাই। এ সমাজ বড় ভয়ংকর। শেষে পশুর পরিবর্তে আপনাকেই জবাই করে দেবে। আপনার গলার তিনটি মূল শিরা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে হালাল রক্ত প্রবাহিত করবে কুরবানির মাঠে। বলবে, আমাদের সমাজের সবচেয়ে আলোকিত যে সেই লোককেই হে আল্লাহ, পশুর পরিবর্তে আমরা কুরবানি দিলাম। আমাদের কুরবানি কবুল করো, মালিক। তা শুনে সবাই সমস্বরে বলবে, আমিন। 
পিনপতন নীরবতা নেমে এলো হলে। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। অবশেষে অনুষ্ঠান সম্পাদকই মুখ খুললেন।
-আপনি জানেন, আপনার মতো আমরাও জানি, কত নির্মম সত্য আপনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু তা যে আমরা প্রচার করতে পারব না, তাও আপনি জানেন। 
সম্পাদক বললেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমাদের মোকাম্মেল ইমামগণ, পিরগণ যুগ যুগ ধরে ইসলামের পতাকা বুলন্দ রেখেছেন বাংলার জমিনে। কিন্তু অল্প কিছু কাঠমোল্লার বাড়াবাড়ির কারণে কোথাও কোথাও ইসলামের অপব্যাখ্যা হচ্ছে। আমাদের উচিত ইসলামের সঠিক মানহাজের মাধ্যমে দিনের ঝান্ডা উড্ডীন রাখা।
এরপর কথা আর বিশেষ এগোয়নি। সবাইকে ধানমন্ডির পৌষী রেস্তোরাঁর পানতুয়া আর পালান বাবুর্চির পাটিসাপটা পিঠা পরিবেশন করা হলো।
পিঠা খেতে খেতেই মৃদুল অনেকটা গল্পচ্ছলে তার ধারণাটি পেশ করল। ঈদের দিন কুরবানিদাতা নির্বিশেষে সবার বাড়িতেই মাংস রান্না হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিচার বাইরে রেখে সবাইকে
একসঙ্গে আনন্দ দেওয়ার একটা উপায় হতে পারে দেশব্যাপী একটি লাইভ রন্ধন প্রতিযোগিতা করে। 
অনুষ্ঠান সম্পাদক বললেন- কীভাবে করতে চান?
মৃদুল: আমাদের স্টুডিওতে এক্সপার্টরা লাইভ নির্দেশনা দেবেন আর তা দেখে সারা দেশে রাঁধুনিরা একটা বিশেষ রান্না করবেন। লটারির মাধ্যমে ধনী-গরিব নির্বিচারে নির্বাচিত হবে কয়েকজন ভাগ্যবতী রাঁধুনি যাদের কাছে মেন্টররা উপস্থিত থেকে তাদের রান্না দেখবেন- আর সন্ধ্যায় হবে সারা দেশ থেকে বাছাই করে আনা সেই রান্নার জমজমাট প্রতিযোগিতা- ঘোষিত হবে শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার! 
অনুষ্ঠান সম্পাদক প্রথমে কোনো আগ্রহ দেখাননি। পরে তিনি উপলব্ধি করলেন, আপাত সাধারণ মনে হলেও এটি অন্য সব কটি চ্যানেলের সব দর্শক অন্তত সেদিনের প্রতিযোগিতার সময়ের জন্য হলেও ‘বাংলা টিভি’র দিকে টেনে নিয়ে আসবে। অভিনন্দন জানালেন তিনি মৃদুলকে। অন্যরাও মেনে নিল, আপাত এই সহজ প্রোগ্রাম আসলে ‘বাংলা টিভি’র জন্য এক স্থায়ী সম্পদ হতে যাচ্ছে।
মৃদুল নিজেও ভেবে উঠতে পারেনি, তার এই সাদামাঠা প্রস্তাবনা দিনের শেষে শ্রেষ্ঠ ভাবনার স্বীকৃতি পাবে। মিটিংয়ের মধ্যেই ঢাকার নামকরা কয়েকজন রাঁধুনিকে বিচারক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলো। সিদ্ধান্ত হলো মৃদুলসহ পাঁচজন মেন্টর ঢাকায় এবং সারা দেশে আরও ১৫ জন ঈদের দিন নির্বাচিত রাঁধুনির রান্না প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান করবেন। 
এত উত্তেজনার মাঝেও সব ভাবনার মেঘ সরিয়ে সকালে দেখা সেই মুখ বারবার ভেসে উঠল তার চেতনার আকাশে। আজ সন্ধ্যায় আবার কি সে মুখ মনে পড়বে? সে কি কোনো ভুল করছে? 
সুগন্ধা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন নামেই অতিথি ভবন, বাস্তবে এখানে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসারদের প্রশিক্ষণ চলে, বাকি সময় শহরের মাঝখানে নিভৃতির নিরালা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তার নিস্তদ্ধ অঙ্গন। মৃদুলের এক মামা এখানকার তত্ত্বাবধায়ক হওয়ায় সে প্রায়ই এখানে, এই নিভৃতির নির্জনে ছুটে আসে। তার ভালো লাগে। আর সে ভালো লাগা থেকেই সে আজ সন্ধ্যায় সানিয়াকে এখানে আসতে বলেছে। 
এমনিতে বন্ধ ক্যাফেটেরিয়া। কিন্তু মৃদুলের অনুরোধে সন্ধ্যারাতের খাবার রাঁধবে বাবুর্চি রহমত- কাচকি মাছের কাবাব, পুঁই ডাঁটা দিয়ে পুঁটি মাছের চচ্চড়ি আর সোনাইমুখী কচু দিয়ে দেশি মুরগির লুকোচুরি। সবগুলো রান্না হবে হাটহাজারীর মরিচ দিয়ে- রান্না হবে সূর্যাস্তের রঙে রঙিন, কিন্তু কোনো ঝাল থাকবে না। আর সবশেষে থাকবে মধুভাত। 
মৃদুল চট্টগ্রামের এই খাবারটির ভক্ত অনুরক্ত। তার একান্ত ইচ্ছা এ খাবারটি একদিন বাংলাদেশের জাতীয় মিষ্টি পানীয় হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। কোনো মাদকতা নেই, কিন্তু খেলে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসে জিহ্বায়, মনে, মননে। ল্যাটিন আমেরিকায় যেমন মার্গারিটা, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যেমন উজো, রাশিয়ায় যেমন কম্পোট অথবা ভারতে যেমন মসলা চা সেরকম জাতীয় পরিচয় নিয়ে একদিন মধুভাত বিশ্বব্যাপী পরিচিত হবে বাংলাদেশের জাতীয় পানীয় হিসেবে। 
সে যাক, আজ এত আয়োজন করে যাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, তার আসার দিনের সকালে এ কাকে দেখল মৃদুল! কেনই-বা তার সেই বেদনাবিধুর মুখ ভেসে উঠছে বারবার। কী করবে সে এখন? 
সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের হাজারো কিচিরমিচিরের মধ্যে একখণ্ড অখণ্ড নীরবতা নিয়ে সুগন্ধা অতিথি ভবন জেগে আছে অথবা, মৃদুলের মনে হলো, নির্বাক শুয়ে আছে। পূর্বের খোলা বারান্দায় প্রাচীন কড়ই গাছের ছায়ায় বসেছিল সে। রাজ্যের হাজারো বকপক্ষী দিনমান উড়াল শেষে পাশের অশ্বত্থগাছে এসে বসেছে। তাদের সাদা রঙে গাছের সবুজ মিলে অস্তায়মান সূর্যের আলোয় এক অবর্ণনীয় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। দিনের বিচিত্র রং ডালিয়া ফুলগুলো সন্ধ্যাগমে ঝিমিয়ে পড়েছে। কাকগুলো একদম চুপ। যেন-বা কোনো অলৌকিক মুহূর্তের আসন্ন লগ্নে সমস্ত প্রকৃতি মোরাকাবার কোনো উচ্চ মোকামে গিয়ে থির হয়ে গেছে। 
এমন সময় সে এলো। সানিয়া চৌধুরী। যেন-বা ডুবে যাওয়া সূর্য কোনো এক অলৌকিক জাদুমন্ত্রবলে আবার দিগন্তের ওপর উঠে এসেছে। উঠে এসে ছড়িয়েছে তার বর্ণনাহীন রূপের বর্ণালি। 
মৃদুল তাকে ডাকে চৌধুরী; কখনো-বা চৌধুরী সাহেব। সে এলে মনে হয় তার চারপাশ, চারপাশের প্রকৃতি কোনো এক অজানিত আনন্দে দুলে ওঠে। আজও একই রকম অনুভব হলো মৃদুলের। 
অতি ধনীর দুলালি সে, কিন্তু কোনোদিন আচার-আচরণে এতটুকু অহমিকা প্রচার পায় না। বরং তার অমন করুণ কোমল চোখে সুন্দরের প্রতি, সহজাত সরলতার প্রতি এক অনিঃশেষ প্রীতির দ্যুতি বাঙ্ময় থাকে অনুক্ষণ। 
চলবে...

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব

পঞ্চম পর্ব

ষষ্ঠ পর্ব

সপ্তম পর্ব

অষ্টম পর্ব

বদলে যাওয়া কলকাতা নিয়ে লিখছি

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১২:৩১ পিএম
বদলে যাওয়া কলকাতা নিয়ে লিখছি
ড. সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি ছোটগল্পও লিখি। করোনার সময় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন আমি পুরো সময়টা লেখালেখিতে ব্যয় করেছি। আমি স্কুল-কলেজে সব সময় লেখালেখি করতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অনেক লিখেছি। এবারের বইমেলায় আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থের বই ‘অবগাহন’ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে দুটি বই বের হয়েছে। এর মধ্যে ‘লকডাউন মেমরি লেন’ অন্যতম। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি গ্রন্থটিতে ১৫ জন অধ্যাপকের লেখার সঙ্গে আমার লেখাও প্রকাশিত হয়েছে।…

১৯৬৩ সালের ১ এপ্রিল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গভাষা ও সাহিত্য-সাধনার লেখক ড. সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা উমাপদ ব্যানার্জি ও মাতা মীনাক্ষী ব্যানার্জি। তার শৈশব, লেখাপড়া লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠা সাহিত্য-সাধনার উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা সবই পেয়েছেন কলকাতার আলো-বাতাস-মাটি থেকে। ছাত্রছাত্রী ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে দুই বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয়। তিনি ১৯৮৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) সম্পন্ন করেন। ১৯৮৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল সম্পন্ন করেন। ২০০০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত আছেন কুড়ি বছরের অধিক কাল। বাংলা ভাষার সাহিত্যসম্ভারে তিনি এক ফুটন্ত গোলাপ। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে রোল মডেল। কারণ তিনি ভীষণ সময়ানুবর্তী ও নিয়মানুবর্তী একজন শিক্ষক। গবেষকদের সঙ্গে তার রয়েছে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। তিনি একটা কথা তার ছাত্রছাত্রীদের বলেন, ‘তোমাকে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠতে হবে, যা ভালোবাসার মাধ্যমে 
অর্জন করতে হয়। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অদ্ভুত দেওয়া-নেওয়ার বিষয় আছে, যেটা খুব কম শিক্ষকের মধ্যে আছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা ও মমত্ববোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বোঝাপড়া সহজ করতে হয়। তাহলেই আদর্শবান শিক্ষক হয়ে ওঠা যায়।’

আপনি এখন কী লিখছেন?
আমি এখন কলকাতার উনিশ থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত কলকাতা যে বদলে যাচ্ছে, এটা নিয়ে লিখছি। আধুনিক কবিতার ওপরও কাজ করছি। ইউজিসির প্রকল্প নিয়েও কাজ চলছে। এগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- নামটা উচ্চারণ করলেই আমার মনে পড়ে যায় তারই ‌‘অচলায়তন’ নাটকের একটি কথা- শোনপাংশুদের দল যে কথা বলেছিল দাদাঠাকুর সম্পর্কে‌ ‌‘একলা মোদের হাজার মানুষ’ চরিত্র সম্পর্কে বলা কথাগুলো কী আশ্চর্যভাবে মিলে যায় স্বয়ং স্রষ্টা সম্পর্কেও। তার নামেই যে আছে সূর্য-সংকেত, তাই তার প্রতিভার সৌরকরে আমরা রূপময় পৃথিবীকে যেমন প্রত্যক্ষ করি, তেমনি তার কবিতার ভাবময়তায় আমাদের অনুভূতিজগৎ জেগে ওঠে। মেঘের মতোই তাঁর মনন ও শিল্পের সত্যস্বরূপ দেশের সীমানা পেরোনো আন্তর্দেশিক এক বিষয়। আর সত্যিই তো ‘গীতাঞ্জলি’ বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী সেই গ্রন্থ, যার সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তি ও বিশ্বজয়। আমি তাই লেখার মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলেছি। রবীন্দ্র উপন্যাস নিয়ে ইতোমধ্যে আমার সম্পাদিত একটি বই প্রকাশিত হয়েছে ‘সৃষ্টির অন্দরে স্রষ্টার অন্তরে’।

আমি ছোটগল্পও লিখি। করোনার সময় যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন আমি পুরো সময়টা লেখালেখিতে ব্যয় করেছি। আমি স্কুল-কলেজে সব সময় লেখালেখি করতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও অনেক লিখেছি। এবারের বইমেলায় আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থের বই ‘অবগাহন’ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে দুটি বই বের হয়েছে। এর মধ্যে ‘লকডাউন মেমরি লেন’ অন্যতম। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি গ্রন্থটিতে ১৫ জন অধ্যাপকের লেখার সঙ্গে আমার লেখাও প্রকাশিত হয়েছে।

আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা হলো আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের ওপর। সেটিও সম্পাদিত গ্রন্থ। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষকদের নিয়ে প্রায় ১০০টির ওপর গল্প নেওয়া হয়েছে। লেখার কাজ শেষ হয়েছে, আগামী বৈশাখে প্রকাশ পাবে।

আপনি এখন কী পড়ছেন?
আমি সব ধরনের বই পড়তে ভালোবাসি। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার কারণে বাংলা বেশি পড়তে ভালো লাগে। এ জন্য এ বিষয়ে পড়াশোনাটা এখন বেশি। কলেজে অধ্যাপনা করেছি প্রায় সাড়ে ৯ বছর। আজ প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি হয়ে গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছি। অনার্স থেকে পিএইচডি সব জায়গায় আমার যোগসূত্র রয়েছে, সে জন্য আমাকে প্রচুর পড়তে হয়। সেটি একাডেমিক পড়াশোনা। তবে এর বাইরে আজকাল একটু হালকা বই পড়তে ভালো লাগে। কারণ পড়াশোনার জন্য অনেক রেফারেন্স ও ভারী বই পড়তে হয়। তা ছাড়া আমার থ্রিলার বই পড়তে ভালো লাগে। সাম্প্রতিক সময় নিয়ে যারা লিখছেন, তাদের লেখা পড়তে আমার আগ্রহ। বদলে যাওয়া কলকাতা, করপোরেট কলকাতা নিয়ে পড়ছি। বিশেষত ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে লেখা সামনে পেলেই পড়ে ফেলি। যে জায়গাগুলোতে আমার অপূর্ণতা রয়েছে, অজানা রয়েছে, সেই বিষয়গুলো জানার আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। ইদানীং কল্পবিজ্ঞানের বইও পড়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

খবরের কাগজ সাহিত্যপাতা ‘সুবর্ণরেখা’ এগিয়ে যাক আপন ভুবনে- লেখক হয়ে এই প্রত্যাশা রাখছি।

সাক্ষাৎকার: ড. সারিয়া সুলতানা, সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ

যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১২:২৬ পিএম
যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গ ভরা’, ‘রাতে মশা দিনে মাছি/এই তাড়িয়ে কলকেতায় আছি’, ‘কতরূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি,/বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া’- এসব প্রবাদপ্রতিম উক্তির রচয়িতা কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, তা আমাদের অনেক সময় মনেই থাকে না। ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’- এই বলেই সাহিত্যের ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে চিহ্নিত হয়ে আছেন তিনি; ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত- যে তার কালের নায়ক ছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবির্ভাবের আগে বাংলাসাহিত্যের তিনিই যে গোষ্ঠীপতি ছিলেন, একথা আমরা বিস্মৃত হয়েছি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত- ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত’ নামক কবিতায় (চতুর্দশপদী কবিতাবলী, ১৮৬৬) আক্ষেপ করে লিখেছিলেন: ‌‘আছিলে রাখালরাজ কাব্য-ব্রজধামে/ জীবে তুমি; নানা খেলা খেলিলে হরষে;/ যমুনা হয়েছে পার, তেঁই গোপগ্রামে/ সবে কি ভুলিল তোমা?’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতাসংগ্রহ-এর প্রবেশকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: ‘...তাঁহার কবিতার অপেক্ষা তিনি বড় ছিলেন। তাঁহার প্রকৃত পরিচয় তাঁহার কবিতায় নাই। যাঁহারা বিশেষ প্রতিভাশালী তাঁহারা প্রায় আপন সময়ের অগ্রবর্তী। ঈশ্বর গুপ্ত আপন সময়ের অগ্রবর্তী ছিলেন।’ বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই খাঁটি বাঙালি কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জন্মদিনে।...  

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জন্ম ১৮২২ সালের ৬ মার্চ উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চনপল্লী (বর্তমান কাঁচড়াপাড়ায়), যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। মাতা শ্রীমতী দেবী ও পিতা হরিনারায়ণ গুপ্ত। অসচ্ছল ঘরের সন্তান, লেখাপড়া বিশেষ করেননি। কিন্তু স্বশিক্ষিত ও প্রতিভাশালী, কৈশোরকাল থেকেই কবি ও হাফ-আখড়াইয়ের দলে গান বাঁধতেন- পরবর্তী সাহিত্যকর্মে সেই প্রভাব অনুস্যূত। পাথুরিয়াঘাটার গোপীমোহন ঠাকুরের পৌত্র যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহায়তায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ‘সংবাদ-প্রভাকর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে। ‘সংবাদ-প্রভাকর’ বাংলাভাষার প্রথম দৈনিক পত্রিকা। ‘সংবাদ-প্রভাকর’ সাপ্তাহিক রূপে প্রথমে আত্মপ্রকাশ করে, পরে বারত্রয়িক (সপ্তাহে তিনবার), মাসিক হিসেবেও বেরিয়েছিল কিছুদিন। ১৮৩৯ সালে দৈনিক রূপে প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকতাই ছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বৃত্তি ও ব্যসন একই সঙ্গে। ‘সংবাদ-প্রভাকর’ ছাড়াও তিনি ‘সংবাদ-রত্নাবলী’, ‘পাষণ্ডপীড়ন’, ‘সংবাদ-সাধুরঞ্জন’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনদ্দশায় তার তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল: ‘কালীকীর্তন’ (রামপ্রসাদ সেন-কৃত গানের সংকলন, ১৮৩৩), ‘কবিবর ভারতচন্দ্র রায় গুণাকারের জীবনবৃত্তান্ত’ (১৮৫৫) আর ‘প্রবোধপ্রভাকর’ (১৮৫৮)।

আধুনিক বাংলার সমাজ গঠনে সংবাদ প্রভাকরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রথমে নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের পক্ষভুক্ত ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষাপদ্ধতিরও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নবপর্যায়ে সংবাদ প্রভাকর সম্পাদনার সময় থেকে তার মনোভাবের পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি দেশের প্রগতিশীল ভাবধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। প্রথম দিকে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের বিরোধিতা করে এ বিষয়ে নানা ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করলেও পরে স্ত্রীশিক্ষার সমর্থন, ধর্মসভার বিরোধিতা, দেশের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে উদার মনোভাবের পরিচয় দেন।

ঈশ্বরচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ভারতচন্দ্র রায়, রামপ্রসাদ সেন, নিধুগুপ্ত, হরু ঠাকুর ও কয়েকজন কবিয়ালের লুপ্তপ্রায় জীবনী উদ্ধার করে প্রকাশ করা। পরবর্তীকালের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করার কৃতিত্বও তার। যদিও ঈশ্বরচন্দ্রের কাব্যরীতি পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে আর অনুসৃত হয়নি। তথাপি এ কথা স্বীকার্য যে, ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের জন্য তার গঠনমূলক চিন্তাভাবনা ও আদর্শ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগসন্ধির কবি হিসেবে পরিচিত, কারণ তিনি সমকালের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করলেও তার ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার ছিল মধ্যযুগীয়। মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্রের সাহিত্যদর্শন যখন লুপ্ত হয়ে আসছিল, তখন তিনি বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে খণ্ডকবিতা রচনার আদর্শ প্রবর্তন করেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপই ছিল তার রচনার বিশেষত্ব। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের এ ভঙ্গি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন কবিয়ালদের নিকট থেকে। ব্যঙ্গের মাধ্যমে অনেক গুরু বিষয়ও তিনি সহজভাবে প্রকাশ করতেন। স্বদেশ ও স্বসমাজের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের অনুরাগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তিনি বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য যে আন্দোলন করেছেন তা আজ স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি সবসময় ইংরেজি প্রভাব বর্জিত খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন। ভাষা ও ছন্দের ওপর তার বিস্ময়কর অধিকারের প্রমাণ পাওয়া যায় ‘বোধেন্দুবিকাশ’ (১৮৬৩) নাটকে। 

প্রাক্তন কবিদের সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের আহরণগুলো একত্রীকৃত হয়েছে ভাবতোষ দত্ত-সম্পাদিত ঈশ্বরগুপ্ত-রচিত কবিজীবনী (আকামেদি সংস্করণ, ১৯৯৮) গ্রন্থে। এখানে আমরা দেখতে পাই, কবি ভারতচন্দ্র রায় (১৭১২-৬০), রামপ্রসাদ সেন (১৭২০-৮১), রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু, ১৭৪১-১৮৩৯), রাম বসু (১৭৮৬-১৮২৮), নিত্যানন্দদাস বৈরাগী (১৭৫১-১৮২১) লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস প্রমুখ কবি ও কবিওয়ালাদের জীবনী ও রচনা সংকলন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। ১৮৫৩-৫৫ এই তিন বছরে ‘সংবাদ-প্রভাকর’ পত্রিকায় কবি ও কবিওয়ালাদের জীবনী প্রকাশের মধ্য দিয়ে যে দায়িত্ব উদযাপন করেন ঈশ্বরগুপ্ত, তা সাহিত্য-ঐতিহাসিকের। আধুনিক যুগের অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম কবি মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়ের জীবনী সংকলন করে ঐতিহ্যের প্রতি যে-সকর্মক শ্রদ্ধা জ্ঞান করেছিলেন, তা তাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তেমনি আবার ঈশ্বরগুপ্ত পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কয়েকজন লেখককে সাহিত্যজগতে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ‘সংবাদ-প্রভাকর’-এর পৃষ্ঠায় লিখে হাত-পাকিয়ে উত্তরকালে খ্যাতিমান হয়েছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-৮৬), রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-৮৭), দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-৭৩), মনোমোহন বসু (১৮৩১-১৯২২), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪), দ্বারকানাথ অধিকারী প্রমুখ। এদিক থেকে বলা যেতে পারে, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্থে বাংলা সাহিত্যের যে-সমুন্নতি, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্রের কবিতায় উঠে আসে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ঘটনাবলির চিত্ররূপ তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। তৎকালীন কবিওয়ালাদের জিম্মা থেকে বাংলা কবিতাকে তিনি নাগরিক বৈদগ্ধ ও মার্জিত রুচির আলোয় নিয়ে আসেন। সাংবাদিক রূপেও ঊনবিংশ শতকের এই আধুনিক মানুষটি যথাযোগ্য কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন। সাহিত্য অঙ্গনে তার আবির্ভাব মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক যুগের শুরুর পর্যায়ে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাকে ‘খাঁটি বাঙালি কবি’ বলে অবহিত করেন। এই মহাকবির মৃত্যুঘটে ১৮৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি।

সুবর্ণরেখা

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ১২:২২ পিএম
সুবর্ণরেখা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য ভাবনায় বলেছেন, ‘অবসরের মধ্যেই সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ সাহিত্যের বিকাশ, কিন্তু তাই বলিয়া আলস্যের মধ্যে নহে। মানবের সহস্র কার্যের মধ্যে সাহিত্যও একটি কার্য। সুকুমার বিকশিত পুষ্প যেমন সমগ্র কঠিন ও বৃহৎ বৃক্ষের নিয়ত শ্রমশীল জীবনের লক্ষণ তেমনি সাহিত্যও মানবসমাজের জীবন স্বাস্থ্য ও উদ্যমেরই পরিচয় দেয়, সেখানে সকল জীবনের অভাব সেখানে যে সাহিত্য জন্মিবে ইহা আশা করা দুরাশা। বৃহৎ বটবৃক্ষ জন্মিতে ফাঁকা জমির আবশ্যক, কিন্তু মরুভূমির আবশ্যক এমন কথা কেহই বলিবে না।… জলন্ত প্রদীপের স্পর্শে যে আবার জ্বলিয়া উঠিবে এবং সে আলোক তাহার নিজেরই আলোক হইবে। এই বৃহৎ বিক্ষুব্ধ মানবজীবনের মধ্যে আপন জীবনের স্পন্দন অনুভব করিবে, আপনা নাভিপদ্মের উপর হইতে স্তিমিত দৃষ্টি উঠাইয়া লইয়া মুক্ত আকাশের মধ্যে বিকশিত আন্দোলিত জ্যোতির্মগ্ন সংসারের প্রতি দৃষ্টিপাত করিব, তখনই আমরা আমাদের যথার্থ মহত্ত্ব উপলব্ধি করিতে পারিব- তখন জানিতে পারিব, সহস্র মানবের জন্য আমার জীবন এবং আমার জন্য সহস্র মানবের জীবন। তখন যে সাহিত্য জন্মিবে তাহা সমস্ত মানবের সাহিত্য হইবে এবং সে সাহিত্য উপভোগ করিবার জন্য ব্যক্তিবিশেষের ক্ষুদ্র মত ও বুদ্ধিমানের ব্যাখ্যাকৌশলের প্রয়োজন থাকিবে না।’…