ঢাকা ২ বৈশাখ ১৪৩১, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৯ পিএম
শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি পুরস্কার

গত সংখ্যার পর

প্রশ্নটি প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন কবি জানেন না। তবে এটি অনেক পুরোনো দিনের প্রশ্ন। তবে নতুন প্রশ্নকর্তা এখানে বানরের আগে কেন দুষ্ট শব্দ বসালেন আর বিশেষ বাহিনীর তাড়া খাওয়ার প্রসঙ্গই-বা কেন আনলেন বুঝতে পারছেন না তিনি। প্রশ্নকর্তা কি কোনো কারণে বিশেষ বাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ? তিনি কি অপরাধ জগতের কেউ? না না না, তিনি নিশ্চয়ই অঙ্কের শিক্ষক হবেন- কোনো অপরাধী হতে যাবেন কেন? সমাধান বাদ দিয়ে ইত্যাকার হাজারো প্রশ্ন কবি হাসান আলীর মাথায় জট পাকাতে লাগল। 

এদিকে জটলার কেন্দ্রে যিনি বসে আছেন তিনি ততক্ষণে অঙ্কের সমাধানে নেমে পড়েছেন। প্রথম মিনিটে তিন ফুট ওঠে দ্বিতীয় মিনিটে দুই ফুট নেমে গেলে গড়ে দুই মিনিটে এক ফুট মাত্র উঠতে পারে। কিন্তু শেষ তিন ফুট এক লাফে উঠে চূড়ার ওপর উঠে গেলে বানরটির আর নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। অতএব, শেষ তিন ফুটের জন্য এক মিনিট আর বাকি ১২ ফুটের জন্য ১২ মিনিট- একুনে ১৩ মিনিট লাগবে তার, এটিই উত্তর।

তবে উত্তরদাতার মাথায় বোধ করি একটু সমস্যা ছিল। কারণ উত্তর শেষ করার পর তিনি বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে লিখলেন, বাঁশের উচ্চতা ১৫ না হয়ে সাড়ে ১৪ ফুট হলেও চূড়ায় উঠতে একই সময় অর্থাৎ ১৩ মিনিট লাগত। তিনি যুক্তি দিলেন, প্রচলিত অঙ্কের পদ্ধতি অনুযায়ী শেষের তিন ফুটের জন্য এক মিনিট হিসেবে আর বাকি ১১.৫ ফুটের জন্য ১১.৫ মিনিট- একুনে ১২.৫ মিনিট লাগার কথা সাড়ে ১৪ ফুট বাঁশের মাথায় উঠতে। কিন্তু বানরটির ১১.৫ ফুট উচ্চতায় উঠে থামাটা বাস্তবসম্মত নয়। সে তো পরীক্ষার অঙ্কের জন্য বাঁশ বাইছে না। বিশেষ বাহিনীর ভয়ে জান নিয়ে পালাচ্ছে সে। কাজেই নিচের দিক থেকে তার গতি অনুযায়ী সে হয়তো ১১ ফুট অথবা ১২ ফুটের মার্কে অবস্থান করতে পারবে, ১১.৫ ফুট উচ্চতায় কখনো নয়। পরবর্তী দূরত্ব আড়াই ফুট, তিন ফুট, যা-ই হোক না কেন তার জন্য একটি লাফ অথবা এক মিনিটই যথেষ্ট। সবাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, আপনি বলতে চাচ্ছেন, বাঁশের উচ্চতা ১৫ ফুট হোক, সাড়ে ১৪ ফুট হোক- একই সময় লাগবে? 
-গণিতের বর্তমান প্রচলিত হিসাবে তো তা-ই মনে হয়।

তবে আড়াই ফুট অতিক্রমণের জন্য তিন ফুটের চেয়ে, গড়ের হিসেবে সময় একটু কম লাগবে তবে তা কোনোমতেই ১২.৫ মিনিট নয়। একইভাবে কম সময় লাগতে পারে, যদি বাঁশের উচ্চতা ১৪.৬ ফুট, ১৪.৪ ফুট ইত্যাদি হয়। এখানে গণিতের এক নতুন ফর্মুলা লুকিয়ে আছে। তবে তা এখনই প্রকাশ করতে চাই নে। তাহলে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়ে যাবে, যাদবের পাটিগণিত থেকে সব পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লিখতে হবে।

আমি জানি এ ফর্মুলা, এর নাম দিলাম ফয়েজ ফর্মুলা। গণিতের অমীমাংসিত ফার্মির সূত্রের মতো এটিও গোপনীয় থাক।

অভিভাবকের দল এসময় হইচই করে উঠলেন। তাঁরা সমস্বরে বললেন, আপনি এসব বিশেষ দ্রষ্টব্য বাদ দেন। দশজন যেভাবে অঙ্ক করে সেভাবেই থাক। এত পণ্ডিত হলে আপনি এই আদর্শ স্কুলের মাঠে নকলের উত্তর দিতে এসেছেন কেন, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গণিতের অধ্যাপক হন, তারপর গণিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করুন। এখন আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার গবেষণার অংশ কেটে আসলটুকু দেন, আমরা হলে সাপ্লায়ারের হাতে তুলে দিই। হলের গার্ডরা অস্থির হয়ে পড়েছে।

কিন্তু পরীক্ষার হলের গার্ডদের নকলের অস্থিরতার চেয়েও বড় অস্থিরতা এ সময় দেখা দিল স্কুলের মাঠে। পুলিশ আর বিশেষ বাহিনী নকলের দায়ে যাকে যেখানে পেল গ্রেফতার করতে লাগল। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ আগের জমজমাট স্কুলের মাঠ জনশূন্য মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হলো। 

কবি হাসান আলী বায়তুল ফালাহ মসজিদে জোহরের নামাজ শেষে মাদুরের ওপর গা এলিয়ে দিয়েছিলেন। বেশ কিছু মুসল্লি কাজা নামাজ পড়ছেন ইতস্তত। আজ পরীক্ষা উপলক্ষে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে গেছে। দুজন মহিলাও বোরকা গায়ে মসজিদের একপাশে নামাজে দাঁড়িয়ে গেছেন। কবি হাসান আলী অবাক হলেন। এ মসজিদে মহিলাদের নামাজ আদায় এই প্রথম কি না। 

আবার তিনি কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। গঞ্জের পাঞ্জেগানা মসজিদ থেকে ইমাম সাহেব এসে দেখলে বিষয়টা কীভাবে নেবেন। ইত্যাকার হাজারো দ্বন্দ্বে যখন তিনি অবশ বিবশ হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মহিলারা এগিয়ে এসে তাঁকে উঠে মসজিদের বাইরে যেতে বললেন। বললেন, আল্লাহর ঘর ধুলোবালিতে ভরপুর কেন? 

কবি এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবেন। তিনি আর হালিম শাহ কখনো কখনো মসজিদ ঝাড় দেন বটে, তবে তা যে সত্যিকারের সাফসুতরো করা বোঝায়, সে দাবি তিনি করেন না; এখনো করলেন না। বাকি আধঘণ্টা সময়ে দুই মহিলা মুসল্লি মসজিদ ঝকঝকে তকতকে করে তুললেন। কবি একবার শুনেছিলেন, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্য অনেক দেশে মসজিদের মোতোয়াল্লি হন মহিলারা। ফলে আল্লাহর ঘর থাকে সর্বদা পরিচ্ছন্ন। দেশে বিশেষত গ্রামে মসজিদগুলোর সাফ সুতরো রাখার জিম্মাদারি সব মা-বোনদের হাতে তুলে দেওয়া যায় কি না একবার মনে মনে ভাবলেন তিনি, আবার তৎক্ষণাৎ কী এক অজানিত শঙ্কা কি আশঙ্কায় নিজের ভেতর সেঁটিয়ে গেলেন তিনি। আরও আধাঘণ্টা পর, বহুদিনের অবসানে পবিত্রতার এক অনুভবে পরিচ্ছন্ন বায়তুল ফালাহ মসজিদে তার চোখে ঘুম নেমে আসছিল। এ সময়ে হন্তদন্ত হয়ে হালিম শাহ মসজিদে এসে কবি হাসান আলীর আরামের ঘুম হারাম করে দিলেন। 

-গণক হারাধনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। থানায় যেতে হবে চলুন।

কবি হাসান আলী কোনোদিন থানায় আসেননি। তার ধারণা, থানায় শুধু খারাপ লোকেরাই আসে। তার মতো এক নিরীহ কবিকে কোনোদিন থানায় আসতে হবে- এ ছিল তার কল্পনারও বাইরে। 

থানার বারান্দায় দুই বন্ধু পাশাপাশি বসেছিলেন। থানা চত্বরে বাতিল গাড়ির স্তূপ, বিভিন্ন সময়ে পুলিশ কর্তৃক সিজ করা গাড়িগুলো সময়ের গ্রাসে মাটির খোরাকে পরিণত হচ্ছে। দু-একজন মানুষ ভগ্ন গাড়ির চাকায় বসে গোপন পরামর্শ করছে। দুটি চড়ুইপাখি কিছুক্ষণ পরপর উড়ে এসে গাড়ির অবশিষ্টাংশের ওপর বসছে আবার চলে যাচ্ছে। কবির ধারণা, এখানে তারা বাসা বানিয়েছে আর সে বাসায় মনুষ্য সমাজের সদস্যরা কেন বসতে এসেছে তা তারা বুঝে উঠতে পারছে না। যেহেতু কবি, আরও এক ধাপ গিয়ে তার চিন্তারা কথা বলছে, যে পুলিশ স্বয়ং থানার মধ্যে সামান্য চড়ুই পাখির বাসার নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা বাইরে মানুষের কী নিরাপত্তা দেবে। 

চলবে...

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

চতুর্থ পর্ব

মধুপিঠা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:২৮ পিএম
মধুপিঠা

সুতরাং মাসাকিসি দুই থাবা ভরে মধু নিয়ে নিল। এত বেশি মধু সে নিজে খেতে পারবে না। সে জন্য সে একটা বালতিতে রাখল তার মধু। এরপর সোজা পর্বত থেকে নেমে সারা রাস্তা বালতিটা বয়ে নিয়ে চলল শহরের দিকে। তার উদ্দেশ্য হলো, শহরে মধু বিক্রি করবে।

ভালুকদের আবার বালতি থাকে নাকি? সালা জিজ্ঞেস করল।
জুনিপেই ব্যাখ্যা করে বলল, ঘটনাক্রমে মাসাকিসি একটা পেয়েছিল। রাস্তার পাশে একটা বালতি পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে নিয়েছিল যাতে কখনো কাজে লাগে।

তারপর সত্যিই সেদিন কাজে লেগে গেল, তাই না?
ঠিক বলেছ। তারপর মাসাকিসি শহরের একটা মোড়ে একটা বসার জায়গাও পেয়ে গেল। সেখানে একটা সাইনবোর্ড খাঁড়া করে দিল: সুস্বাদু মধু!

একদম প্রাকৃতিক। দাম: এক কাপ ২০০ ইয়েন।
ভালুকরা কি টাকা গুনতে পারে?

অবশ্যই পারে। মাসাকিসি বাচ্চা বয়সে তো মানুষের সঙ্গেই থাকত। তারাই ওকে কথা বলা এবং টাকা গোনা শিখিয়েছিল। মাসাকিসি ছিল একটা বিশেষ ধরনের ভালুক। সে কারণে যে ভালুকরা তার মতো বিশেষ ছিল না, তারা মাসাকিসিকে এড়িয়ে চলতে থাকে।

এড়িয়ে চলতে থাকল?
হ্যাঁ, এড়িয়েই তো চলল তারা। বড়জোর ভাব দেখানো একটা-দুটো কথা বলল: আরে, আমাদের বিশেষ ভালুক মশাইয়ের কেমন চলছে দিনকাল? এই ধরনের কথা বলে তারা শুধু এড়িয়েই চলল তাকে। ওদের মধ্যে খুব কঠিন স্বভাবের একজন ছিল। তার নাম টনকিসি। সে মাসাকিসিকে আসলেই খুব ঘৃণা করত।

বেচারা মাসাকিসি!
ঠিক বলেছ। মাঝখান থেকে মানুষজন বলা শুরু করল, ও আচ্ছা, সে তো দেখি গোনাগুনি করতে পারে, মানুষের সঙ্গে কথাও বলতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে বোঝা যায়, সে আসলে একটা ভালুকই। সুতরাং মানুষের এসব কথা থেকে বোঝা গেল, সে আসলে মানুষের জগতের কেউ নয়, ভালুকদের জগতেরও কেউ নয়।
তার কোনো বন্ধু ছিল না?

একজনও ছিল না। জানো তো, ভালুকরা স্কুলে যায় না। কাজেই বন্ধু তৈরি করার মতো কোনো জায়গা তাদের নেই। 
তোমার বন্ধু আছে না, জুন? ‘অঙ্কল জুনপেই’ কথাটা সালার কাছে বেশ দীর্ঘ মনে হয়। এ জন্য সে শুধু জুন বলে ডাকে জুনপেইকে।
বহু বহু দিন আগে থেকে তোমার বাবা আমার সবচেয়ে সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সেই সূত্রে তোমার মাও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
ভালো। বন্ধু থাকা ভালো।

জুনপেই বলল, ঠিক বলেছ। বন্ধু থাকা ভালো। 
ঘুমাতে যাওয়ার আগে সালা গল্প শোনে। তার জন্য জুনপেই নতুন নতুন গল্প বানায়। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে সালা তার কাছে জিজ্ঞেস করে। তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় ভেবেচিন্তে দিতে হয়। সালার প্রশ্নগুলো বেশির ভাগই তীক্ষ্ণ এবং কৌতূহলে ভরা। তার প্রশ্নের প্রসঙ্গে ভাবতে ভাবতে বলতে থাকা গল্পের মধ্যে নতুন বাঁক জুড়ে দেয় জুনপেই।

সালা বলল, জুনপেই আমাকে ভালুক মাসাকিসির গল্প বলছে। মাসাকিসি হলো সার্বক্ষণিকভাবেই মধু পাওয়া ভালুক। কিন্তু তার কোনো বন্ধু নেই। 
সেওকো জিজ্ঞেস করল, তাই না কি? মাসাকিসি কি খুব বড় ভালুক?
সালা জুনপেইয়ের দিকে অধৈর্য চাহনিতে তাকাল, মাসাকিসি কি খুব বড়?

জুনপেই বলল, খুব বেশি বড় নয়। ছোটর দিকেই হবে তার আকার। অনেকটা তোমার সমান। খুব মিষ্টি মেজাজের অধিকারী সে। গান শুনতে চাইলে সে রক, পাঙ্ক কিংবা ওই রকমের কোনো গান শোনে না। সে একা একা সুবার্ট শোনে।’
সালা জিজ্ঞেস করল, সে গানও শোনে? তার কি সিডি প্লেয়ার জাতীয় কিছু আছে?
সে এক দিন একটা বুমবক্স পেয়েছিল। কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে বক্সটা।
খানিকটা সন্দেহের চোখে সালা জিজ্ঞেস করল, এত কিছু সে রাস্তায় পড়ে পায় কীভাবে?

ঠিক আছে, তাহলে শোনো। ওই পর্বতটা খুব খাঁড়া। যারা ওখানে ওঠে তাদের অনেকের মাথা ঘুরে যায়। কেউ কেউ দুর্বল হয়ে পড়ে। খুব বেশি প্রয়োজন না থাকলে অনেক কিছুই তারা ফেলে দেয়। ক্লান্ত হয়ে তারা বলতে থাকে, আরে ভাই, এটা আমার দরকার নেই! এই বালতিটা টানতে টানতে আমার জান শেষ! এই বুম বক্সটা আমার আর দরকার নেই! ইত্যাদি বলে তারা।

সেওকো বলল, ‘আমি জানি, তাদের কেমন লাগে। মাঝে মাঝে তুমিও এমন করে সবকিছু ফলে দিতে চাও।
সালা বলল, আমি এ রকম করি না। 
জুনপেই বলল, তুমি তো অনেক ছোটো। তোমার অনেক শক্তি। এবার তাড়াতাড়ি দুধটুকু খেয়ে ফেল। তাহলে গল্পের বাকিটা বলি।
উষ্ণ গ্লাসের চারপাশটা আঙুল দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে সাবধানতার সঙ্গে দুধ পান করে জিজ্ঞেস করল, ঠিক আছে। মাসাকিসি মধুপিঠা বানিয়ে বিক্রি করে না কেন? আমার মনে হয়, শুধু মধুর চেয়ে মধুপিঠা বেশি পছন্দ করবে শহরের লোকেরা। 
মিষ্টি হেসে সেওকো বলল, চমৎকার বুদ্ধি! মধুপিঠা বানিয়ে বেচলে মাসাকিসির মুনাফা অনেক বেশি হবে। 
জুনিপেই বলল, নতুন নতুন বাজার দেখতে দেখতে একসময় এই মেয়েটা সত্যিকারের উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে।

রাত তখন প্রায় ২টা বাজে। সালা বিছানায় ফিরে গেল। জুনিপেই এবং সেওকো তার ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল। তারপর তারা রান্নাঘরের টেবিলে একটা বিয়ারের ক্যান খুলে বসল। সেওকোর পানীয়ের প্রতি তেমন টান নেই। জুনিপেইকেও গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। 
সেওকো বলল, তোমাকে মাঝরাতে এত দূর টেনে আনার জন্য দুঃখিত। বিকল্প কিছু আমার মাথায় আসেওনি। আমি ওকে নিয়ে একদম শ্রান্ত-ক্লান্ত। শুধু তুমিই ওকে শান্ত করতে পার। কোনো উপায় না দেখে আমি তাকাতসুকিকে ডাকতে যাচ্ছিলাম। 

মাথা ঝাঁকিয়ে জুনিপেই আরেক চুমুক বিয়ার পান করে বলল, আমাকে নিয়ে ভেব না। সূর্য না ওঠা পর্যন্ত আমি জেগেই থাকব। রাতের এই প্রহরে রাস্তাও একেবারে ফাঁকা। জরুরি আসতে হলে আসব। ব্যাপার না।

নতুন গল্প নিয়ে কাজ করছিলে?
জুনিপেই মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল।
লেখালেখি কেমন চলছে? 
অন্য সময়ের মতোই। আমি লিখে যাচ্ছি। প্রকাশকরা প্রকাশ করছেন। কেউ পড়ছে না।
আমি তোমার লেখা পড়ি। তোমার সব লেখাই পড়ি।

ধন্যবাদ। তুমি চমৎকার মানুষ। তবে ছোটগল্প গ্লাইড রুলের মতো নিজস্ব গতিতে চলে। আমরা বরং সালার কথা বলি: আগেও এ রকম করেছে নাকি সালা? 

সেওকো মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়। 
খুব বেশি?

অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর

মহানগরগাথা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:২০ পিএম
মহানগরগাথা

দুঃখ-কষ্ট এক রিকশায় ঘুরছে অলিগলি,  
এই শহরে বেদনারা সিএনজিরই যাত্রী।
লোকাল বাসে পাশাপাশি ঝিমোয় হতাশা,
হরহামেশাই ছুটছে ট্রেনে রঙিন দীর্ঘশ্বাস।

রাতবিছানায় অনিদ্রাদের ধূসর হাহাকার,
বিরহেরা পার্কে বসে চীনাবাদাম খায়।
কান্নারা সব পার্লারে যায় সাঁঝে-
সেজেগুজে নিত্যনতুন অশ্রুকে লুকায়।

সমুদ্র যখন কাঁদে

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৯ পিএম
সমুদ্র যখন কাঁদে

সমুদ্রটা আজ আর উপভোগ করি না 
সে বড় কাঁদায়, ঢেউগুলো বড় হতে হতে যখন 
আছড়ে পড়ে আমার পায়ের কাছে 
মনে হয় সে বড় অসহায় 
কেন যে লুটিয়ে পড়ে আমার পায়ে 

সমুদ্র যখন ফিরে যায়, ঢেউগুলো নিজ কোলে তুলে নিয়ে গভীরে, কী যে অসহায় লাগে আমার 
ফিরে যায় কেমন বিষণ্ন নাচের মুদ্রায় 
যেন ভেঙে যাওয়া প্রেমের 
বিরহটুকু সব নিংড়ে নিয়ে কোথায় চলে যায় 
সেখানে রেখে আবার ফিরে আসে, আবার চলে যায় 
কী যে অসহায় লাগে 
মনে হয় সমুদ্র তার সমস্ত কান্নার জল পায়ে ঢেলে 
ধুয়ে দিয়ে যায় বিষণ্নতাকে

কী যে বিপণ্ন লাগে পৃথিবীর সব 
ভালো লাগা যেন ডুবে ডুবে দূরে চলে যায়
শুধুই দূরে; বুকের গহিন থেকে সব 
নির্যাস শুষে নেয় নিজের ভেতর 

সমুদ্র যখন কাঁদে, আর কী বাকি থাকে!

স্বর্ণমুদ্রা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৬ পিএম
স্বর্ণমুদ্রা

আমার উপকূলজুড়ে এত শত্রুর ঘাঁটি,
দীপপুঞ্জ দখল নেওয়ার জন্য, কয়েক হাজার
কিলোমিটার থেকে আসছে ডেঁয়োপিঁপড়েরা,
আমার বিরোধীরা জাদুচক্র খুলে ভেলকি
ও মিথ্যে ছড়িয়ে দাঁড়াতে চাচ্ছে, কামানও
হাঁকাচ্ছে, যখন এসবে কাজ হচ্ছে না,
ভাড়াটে সৈনিকদেরও কাজে লাগাচ্ছে।
আমাকে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে- সেখানে
পচে মারবার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ায়- তারা
এখন আমার বিরুদ্ধে স্বর্ণমুদ্রা ছিটাচ্ছে!

জইনব বেওয়ার ঈদ

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৩ পিএম
জইনব বেওয়ার ঈদ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

পাকুড় গাছের ছায়াটা যেখানে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে তার মাথায় বাঁধের শেষ বাঁকে মাচানের গালাগা বাড়িটা জইনবের। বাড়ি নয়, বাঁশের ঠেকনা আর ডাপের বাঁধনে বাঁধা খড়ের ঝুপড়ি। বাঁধের ঝুটও বলা যায়। ‘অইই ঢের। এ দুনিয়ায় একখানা এরকম মাথা গোঁজার ঠাই আছে সেটাই বড় কথা। কবরের চেয়ে তো বড়?’ তার ঝুপড়ি বাড়িখানা নিয়ে কেউ খোঁটা দিলে, কবরের তুলনা করে জইনব। জইনব বলে, ‘পাকা বাড়ির পাকা হিসেব কাঁচা বাড়ির কাঁচা হিসেব।’ জইনব হাশরের ময়দানে আল্লাহর শেষ বিচারের হিসাবের কথা বলে। আবার জইনব তিন বেলা আল্লাহকে দোষে। বলে, ‘সবই যখন নিয়ে নিলে এই অভাগী মেয়েটিকে নিলে না কেন? আমার ইবাদতের কি এতই ক্ষমতা, তোমার জান কবজের ফেরেশতাকে আটকে রেখেছ!’ জইনব বেওয়া একসময় মরতে চেয়েছিল। মরার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করত। রাত-দিন ডহন পিটে কাঁদত। কিন্তু এখন মরতে চায় না সে। জ্বরে একটুখানি গা গরম হয়ে খকখক করলেই হাতে ঝাঁটা নিয়ে শুইয়ে থাকে। জান কবজের ফেরেশতা আজরাইলকে খেঁকিয়ে বলে, ‘আয়, আয়, আমার কাছে এসচিস তো ঝাঁটা পিটিয়ে তাড়াব।’ মুখে এক খিলি পান পুরে বলে, ‘যদ্দিন না স্বামীর ভিটেটারে দেকচি তদ্দিন আমার তিন সীমনায় আসবি নে।’ বাঁধের লোকে মাঝেমধ্যে জইনব বেওয়ার মুখ থেকে সে কথা শুনতে পায়। তখন বাঁধের লোকে বলে, একা একা থেকে বুড়িটার মাথাটা এবার গেছে! তিন কূলে যার কেউ নেই সে কি এই বিভ্রম আর ভুলভুলাইয়ার দুনিয়ায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? রাজা-বাদশাদের মাথাই শূন্য হয়ে যেত, তো সেখানে জইনব বেওয়ার মতো কোন বিধবা দুঃখিনী থুত্থুরে বুড়ি! তবুও সে এই দুনিয়ার হাওয়া থেকে শ্বাস নেয়, আল্লাহর জমিনে তিন পায়ে হাঁটে। হেঁটে হেঁটে যখন বাঁধের ওপারে পদ্মার জলে তলিয়ে যাওয়া তার ভিটেটাকে দেখে তখন দড়ির মতো পাকানো শরীরখানার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা জানটা টাটিয়ে ওঠে। ডুকরে ডুকরে কাঁদে। কান্নার সে শব্দ জলের নিচে ডুবে থাকা ভিটেটাও শুনতে পায়। কিন্তু খাড়া হয়ে উঠতে পারে না। ওঠার সে মুরোদ নেই তার। নদীর জলের ওপরে না উঠে এলেও জইনব বেওয়ার চোখে উঠে আসে। জড়ানো ঘুলঘুলে চোখে স্পষ্ট দেখা যায়, শেখালিপুর গ্রামটাকে। কুতকুত করে ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে পদ্মা। পাড়ে শামুকের খোলের মতো শেখালিপুর গ্রাম। পুবে মস্ত বট গাছ। ঝুরি নেমে গেছে নদীর বুকে। পশ্চিমে প্রাইমারি স্কুল। উত্তরে উজান আর দক্ষিণে নাবাল জমি। নাবালের তিন মাথায় আসমত আলির বাড়ি। পাকা ইটের দালান। বাড়ির দুই মুখে দু-দুটো মস্ত মস্ত ধানের গোলা। কান্টায় বড় পুকুর। আধখানা চাঁদের মতো দিঘল উঠোন। জইনব যখন প্রথম এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছিল তখন তার শ্বশুর আজান আলি নতুন বউ কেমন হিসেবি হবে তা পরীক্ষা করার জন্য উঠোনে কয়েকটি লঙ্কা ফেলে রেখেছিলেন। তারপর জইনব যখন ঘোমটা মাথায় দিয়ে ঝাঁটা হাতে উঠোনটা ঝাড় দেওয়ার সময় লঙ্কাগুলো ঝাড় দিয়ে না ফেলে কুড়িয়ে ঘরে রেখেছিল তখন আজান আলি বলেছিলেন, ‘এ বউ হিসেবি বউ হবে। আসমতের সংসার সুখের হবে।’ সংসার সুখেরই হয়েছিল। স্বামী-শ্বশুর, বেটাবেটি, গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধান-গম-পাট নিয়ে সংসারটা সুখেরই ছিল জইনবের। সে সুখ সহ্য হলো না নদীটার। দুহাজারের ভাসানে সব ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল! থাকা বলতে গেলে এই বিত্তি-খিলের মতো হাড়ের মাচায় আটকানো তিরিশ কেজি সাত শ গ্রাম ওজনের শরীরখানা, একখানা তাঁতের শাড়ি আর তিনখানা অসুখ। একখানা হাড়ের গিঁটের বাত, একখানা বুকের খাঁচার ফুসফুসের ধুকানি আর রাত হলেই ঘুটঘুট করে চোখের ওপর নেমে আসা অন্ধকার! ভাগ্যিস সে রাতে জইনব বাড়িতে ছিল না। থাকলে সেও ওই রাক্ষুসে বানে নদীর জলে তলিয়ে যেত! সেদিন সে লালগোলা হাসপাতালে বোনঝির ছেলে দেখতে গেছিল। কেউ বাঁচেনি। পুরো দুনিয়াখানায় তার জলের তলে তলিয়ে গেছিল সে রাতে। ঢং দেখা আর ঢং দেখানো রঙাচঙা দুনিয়াখানা সেদিন থেকেই বেরঙা হয়ে গেছিল জইনবের কাছে। বিবি থেকে হয়ে গেছিল বেওয়া। নামেই একখানা শরীর আছে, সে শরীরে জান নেই। অনেক কটা বছর তো জইনব বাঁধের ওপরে দুই হাঁটুর মধ্যে মাথাখানা ঢুকিয়ে তিনমাথা হয়ে বসে থাকত, কখন জান কবজের ফেরেশতা আজরাইল এসে খপ করে তার জানটা নিয়ে যায়! জইনব বলত, সে নদীর পাড়ে গেলেই আসমত নাকি তাকে ডাকে, ‘একা একা কী করছ জইনব, চলে এসো। আমার আর একা একা ভালো লাগে না।’ সে ডাক শুনে জইনব মাঝেমধ্যে নদীর জলে নেমে পড়ে। হাঁটু জল থেকে কোমর জল তারপর গ গ করে ডাকা পদ্মার জল তার কাঁধ ছুঁলে ভুশ করে একবার ডুব মারে জইনব। জলের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে আসমতকে ডাকে, ‘কই গ তুমি? কুণ্ঠে? আমি এসচি।’ তার সে ডাক কেউ শুনতে পায় না। জলে ভুড়ভুড়ি কেটে ওপরে উঠে আসে। সে ভুড়ভুড়িতে রোদ পড়ে ঝিলমিল করে ওঠে। যেন জইনবের কিত্তি দেখে নদীখানা হাসে। দাঁত কেলায়। তারপর ভেজা গায়ে যখন নদী থেকে উঠে আসে জইনব তখন মনে হয় মানুষ নয় কাপড়ের একখানা সাদা থান লাঠিতে জড়িয়ে লাঠিখানা হেঁটে আসছে! নদীটা জইনবের সে চামটি হাড়জিরজিরে শরীরখানা দেখে কাঁদে। তার বুকের সমস্ত ঢেউ তখন থেমে যায়। নদীর সে ঝুপ মেরে থাকা রূপ দেখে জইনব বলে, ‘ঢং! ঢং কচ্ছে ঢং! অতগুলেন জান খেয়ি এখন কালা-বুবা সাজচে!’ তারপর গাল পাড়ে ‘খাইকুন্নি নদী! এত খেয়িও তোর প্যাট ভরে না! এই এক খামচা বুড়ি মেয়েটিকে খাতে আসিস? আমি আরও তেঁতো হব, আরও কশটে হব, কাঁটাওয়ালা মানুষ হব, দেখি কী করি আমাকে খাস?’ নদীটা ভ্যালভ্যাল করে তাকায়। তখন জইনব পাড়ের জমি থেকে একটা ঢিল তুলে নদীটার বুকে ছুঁড়ে মারে।

দুই.
ভুলু শেখের মটকার ওপরে যেখানে পাকুড় গাছটার মগডালটা খাড়া হয়ে আকাশে উঠে গেছে সেখানেই ফিনফিন করে ঝুলছে চাঁদটা! যেন কেউ রুপোর একখানা চিকন ফালিকে বাঁকিয়ে আকাশে ঝুলিয়ে দিয়েছে! চাঁদরাতের এই চাঁদখানা দেখলেই জইনবের আসমতের কথা মনে পড়ে যায়। আসমত তার লম্বা লাঙলে-কোদালের হাতটাকে আকাশের দিকে বাড়িয়ে চিকন চাঁদটাকে ধরার ভঙ্গি করে সে হাত জইনবের কপালে ঠেকিয়ে বলত, ‘এই নাও, আজ থেকে চাঁদখানা তোমার কপালে টিপ বানিয়ে লাগিয়ে দিলাম।’ তারপর বিভোর হয়ে জইনবের কপালের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘খুব সুন্দর মানিয়েছে গ টিপটা!’ তখন জইনব মুখ ভার করে বলত, ‘এইটুকুনে আমি ভুগব না। আমাকে গোটা চাঁদ লাগবে।’ সে কথা শুনে আসমত হো হো করে হেসে উঠত। আর বলত, ‘গোটা চাঁদ তো বছরে অনেকগুলোয় পাওয়া যায় কিন্তু চাঁদরাতের চাঁদ এই একবারই। তাহলে কোনটা বেশি সুন্দর?’

সেদিনও চাঁদরাত ছিল। প্রত্যেক বছরের মতো সে বছরও আসমত লালগোলার হাট থেকে জইনবের জন্য তাঁতের শাড়ি কিনে এনেছিল। ঈদের জন্য চাঁদরাতে স্বামী আসমতের দেওয়া এই শাড়িখানা জইনবের কাছে ছিল জানের চেয়েও প্রিয়। জইনব ঈদের দিন সকালে গোসল করে সে শাড়ি পরত। আসমত ঈদগাহ থেকে ফিরে প্রথমেই সে নতুন শাড়ি পরা বউকে দেখতে চাইত। দেখেই তার শুকনো গালে একটা মিষ্টি টোল ফেলে ফিক করে হাসত। ইশারা-ইঙ্গিতে বলত, শাড়িটা খুব মানিয়েছে তোমাকে জইনব। 

সেদিন অত রাত হয়েছিল না। গাঁয়ের লোকে এশার নামাজ পড়ে কেবলই ঘুমোতে গেছিল। রাত পোহালেই ঈদ! এদিকে ওদিকে পটকা ফাটার আওয়াজ ভেসে আসছিল কানে। সে আওয়াজের ভিড়ে বাঁধ ভাঙনের আওয়াজ কেউ ঘুণাক্ষরেও শুনতে পায়নি। আচানক একেবারে মেঘ ভেঙে পড়ার মতো হুড়হুড় করে জল ঢুকে পড়েছিল গ্রামে! যেন কোনো নদীর ঢেউ নয়, কোনো নদী উপচে পড়ার ঢেউও নয়, একেবারে কেয়ামতের দিনের জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ! এক-একখানা ঢেউ যেন জান কবজের ফেরেশতা আজরাইলের এক একটা থাবা! যেন দলবল নিয়ে এ গ্রামে নেমে পড়েছিলেন আজরাইল! পালিয়ে যাওয়ার কোনো ফুরসত পায়নি কেউ। গ্রামের সিকিভাগ লোকের সলিল সমাধি ঘটেছিল সে রাতে। পরের দিন যখন সমুদ্র হয়ে যাওয়া ভিটেটায় ছুটে গেছিল জইনব, তখন চারদিকে ধু ধু জল আর জল দেখেছিল! গ্রাম খেয়ে নদীখানা অনেকখানি চওড়া হয়ে গেছিল। আরও পশ্চিমে এগিয়ে এসেছিল কিছুটা। পুরো শেখালিপুর গ্রামটা তখন নদীর গর্ভে! জল কিছুটা নেমে গেলে স্বামীর ভিটেটায় গিয়ে বোবা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জইনব। যদিও সব ভিটে জলের স্রোতে এক হয়ে গেছিল। কার কোনটা চেনার উপায় ছিল না। মনের আন্দাজে দাঁড়িয়েছিল জইনব। আর সেখানেই জলের তলে খুঁজে পেয়েছিল একটা তালাবন্দি বাক্স! আলতার চিহ্ন দেখে জইনব চিনতে পেরেছিল, বাক্সটা তারই। এই বাক্সের ভেতরেই রাখা ছিল চাঁদরাতের বিকেলে জইনবের হাতে আসমতের দেওয়া ঈদের উপহার তাঁতের শাড়িটা। শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে টানা সাত দিন কেঁদেছিল জইনব। পাগলির মতো হয়ে গেছিল। শাড়িখানা বুকে জড়িয়ে ধরে নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াত। সেদিন থেকেই জইনব প্রতিজ্ঞা করেছিল, নদীতে ভিটেখানা চর হয়ে না ওঠা পর্যন্ত সে ঈদের নামাজ পড়বে না। লোকে এত করে বললেও সেই থেকে আর একবারও ঈদের নামাজ পড়েনি জইনব!

জইনবের বয়স যখন দাঁতে ঘা মারল, চুলে মাখাল চুনের রং তখন অর্থাৎ ভাসানের সতেরোখানা রমজান মাস পেরোনোর পর নদী পুবে বাঁক নিল। যেন কেউ নদীর কোমরে ঠেকনার ঠুকো দিয়ে নদীটাকে আরও পুবে ঠেলে দিল! আর পশ্চিমে চিকচিক করে উঠল সাদা বালি! গাঁয়ের লোকে আনন্দে ধেই করে উঠল। কেউ কেউ বাড়িতে ফকির-মিশকিন খাওয়াল। কেউ মিলাদ দিল। কেউ হোসেনপুরের পিরের দরগায় শিন্নি দিল। কেউ বাড়িতে দিল একদিল পিরের গান। কেউ অতিরিক্ত রোজা পালনের নিয়ত করল। কেউ আবার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মেয়ের বিয়ে দিল। গ্রামখানায় বসত থাকতে লোকে যা করেনি শুধু চিকচিক বালি দেখেই তাই সব করল।  জইনব সেসব কিছুই করল না। সে শুধু ইফতারের পর নদীর ধারে গেল। ঘোলা চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল, চিকচিক করা বালি। তার চোখগুলো চিকচিক করে উঠল। গাল বেয়ে নামল অশ্রু। জইনব খুশিতে কাঁদল। এ অশ্রু খুশির অশ্রু। জইনবের চোখে যে আর দুঃখের অশ্রু অবশিষ্ট নেই! এতগুলো বছর একটা সাড়ে তিন হাত লম্বা বেঁটে মানুষ কাঁদলে আর অশ্রু কি চোখে জমা থাকে? জইনব নদীর বুক চিরে উঠে যাওয়া আকাশের দিকে তাকাল। দেখল, আকাশে সেই ফালি চিকন চাঁদ। যে চাঁদখানা আসমত তার কপালে টিপ বানিয়ে পরিয়ে দিত। রাত পোহালেই ঈদ। আবারও আকাশের দিকে তাকাল জইনব। মিহি গলায় আসমতকে ডাকল, ‘আগামীকাল ঈদ। তুমি নামাজ পড়তে ঈদগাহে যাবা না?

ভোরেই শাড়িখানার ভাঁজ খুলল জইনব। কত বছরের পুরনো শাড়ি, তবুও নতুনের ঘ্রাণ পেল জইনব! যেন গতকালই লালগোলার হাট থেকে আসমত কিনে এনেছে। গায়ে পরার আগে বুকে জড়িয়ে ধরল একবার। ফুঁপিয়ে কাঁদল। তিনবার চুমু খেল। তারপর সুন্দর করে পরল। গ্রামের সব লোক তখন নতুন ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ছে। ‘নতুন ঈদগাহ’ কথাটা শুনে জইনব খ্যাঁক করে উঠেছিল, ‘কীসের লতুন? ওটেই তো এ গাঁয়ের আসল ঈদগাহ।’ আগে যেখানে শেখালিপুর গ্রামটা ছিল, নদী পুবে বাঁক নেওয়ায় সেখানেই আবার নতুন চর গজিয়ে উঠেছে। গ্রামের লোক ঠিক করেছে, এ বছর থেকে ঈদের নামাজ আবার আমাদের আগের গ্রামের মাটিতে পড়ব। অর্থাৎ নতুন চরে। গ্রামের লোক নামাজ পড়ে চলে আসার পর জইনব আসমতের মরার বছর কিনে দেওয়া তাঁতের শাড়িখানা পরে নতুন চরে গেল। পুবে বেঁকে যাওয়া পদ্মা নদী ছুকছুক করে দেখল, সতেরো বছর পর জইনব বেওয়া ঈদের নামাজ পড়ছে! নামাজ শেষে জইনব পুরনো ভিটের কাছে দাঁড়াল। আসমতকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞেস করল, ‘শাড়িটায় আমাকে ক্যামুন মানাচ্চে গ?’ আর তখনই উত্তরে হাওয়ায় নদীর জল উছাল মেরে উঠল। যেন নদী নয়, আসমত বলল, ‘খুব সুন্দর মানিয়েচে জইনব।’