ঢাকা ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বুধবার, ২৯ মে ২০২৪

শনিবার রাতে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৩২ পিএম
শনিবার রাতে
অলংকার: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আগের চাইতে এখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে ফাতেমার। আগের মতো আর অন্ধকারাচ্ছন্ন বস্তিতে থাকতে হচ্ছে না। এখন দুই রুমের আধাপাকা টিনশেডের ঘর, নিচটা সিমেন্টের। ঘরলাগোয়া একটা টিনের ঘের দেওয়া জায়গা আছে গোসলটোসল করার জন্য। কিছুটা দূরে বারোয়ারি একটা জলের কল আর পায়খানা আছে। আশপাশের পনেরো-বিশটা ঘরের মানুষের জন্য চলে যায়। তেমন অসুবিধা হয় না। তাছাড়া সামনের গলির মাথায়ও একটা জলের কল আছে, সেখানেও যায় অনেকে।

আগে যেখানে থাকত ফাতেমা, সেটা ছিল ছোটলোকদের বস্তি। নানা কিসিমের চোর-ছ্যাচ্চোর, নেশাখোর আর হারামিদের আস্তানা। ফাতেমা তাদের ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে সারাক্ষণ ভয়ে তটস্থ থাকত। স্বামী শহীদকেও দু-একবার বলেছে সে তার ভয়ের কথা। কিন্তু অটোচালক শহীদ সারা দিন আর বেশ রাত পর্যন্ত অটো চালানোর ধকল শেষ করে ফাতেমার কথার অত গুরুত্ব দিতে পারত না। দু-একদিন কিছু ঝগড়াঝাটি করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিল ফাতেমাও। ক্লান্ত স্বামীকে আর বিরক্ত করতে চায়নি।

কিন্তু হঠাৎ একদিন শহীদ রাতে ফিরে নিজেই বস্তির এই ঘর ছেড়ে অন্য এক জায়গায় যাওয়ার কথা বলে। আর চার-পাঁচ দিন পরেই ভাসানটেকের এই আধাবস্তির একেবারে শেষ দিকের একটা ঘরে এসে ওঠে।

এখানে আসার পরে একদিন রাতে ফাতেমাকে কাছে টেনে নিয়ে শহীদ বলে, অহন ঠিক আছে তো। অহন কি আর ভয় লাগে? দু’বার প্রশ্ন করার পর ফাতেমা মৃদুস্বরে উত্তর দেয়: না।

এ ব্যবস্থায় ফাতেমা যে খুশি হয়েছে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারে শহীদ। ফাতেমাও খুশিমনে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকে। ইতোমধ্যে মাসখানেক যেতে না যেতেই পাশের ঘরের রোকেয়ার সঙ্গেও আলাপ পরিচয় করে ফেলেছে। রোকেয়ার বছর পাঁচেকের ছেলে জামাল, সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। ফাতেমা তাকেও বেশ বশ করে ফেলেছে। এখন সে প্রায় সময়ই ঘুরঘুর করে ফাতেমার চারপাশে। সারা দিন শহীদকে কাছে পায় না ফাতেমা। পায় শুধু রাতে। কিন্তু তখনো খুব বেশি কথা হয় না, শহীদ এত ক্লান্ত থাকে যে শুয়েই প্রায় রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে দু-একদিন যদিও শহীদ তার শরীরের চাহিদা মেটাতে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু ফাতেমার প্রস্তুতির আগেই যেন দ্রুত কাজ শেষ করে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। এতে ফাতেমা আনন্দের চাইতে কষ্ট পায় বেশি। কিছুদিন থেকে ফাতেমা লক্ষ্য করছে শহীদের মধ্যে কিছুটা যেন পরিবর্তন এসেছে। মেজাজটাও একটু চড়েছে। ধীরস্থির ভাবটাও অনেকটা কমে গেছে।

গতরাতে বিছানায় শুতে এসেই শহীদের মুখ থেকে মদের নাকি অন্য কিছুর একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়ে চমকে ওঠে ফাতেমা। পরে মুখ ফিরিয়ে বলে, তুমি আইজ কী খাইয়া আইছো, কও দেহি-

ফাতেমার কথাটা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে অনেকটা জোর করেই ফাতেমার শরীরটাকে কাছে টেনে নিতে চায় শহীদ। দুই হাতে জোর খাটায়।

উঁহু, আগে কও, কী খাইছ- ফাতেমা শহীদের হাতটাকে তার বুকের ওপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। শহীদ একটু থমকায়। তারপর কিছুটা রাগের সঙ্গেই বলে ওঠে, এসব ফাও কথা কওয়ার আর সময় পাও না!

না, আগে কও- ফাতেমার কণ্ঠেও কিছুটা জেদের আভাস ফোটে। এরকম তো আগে ছিল না-
এই তো গ্যাঞ্জাম কর- শহীদ এবার রীতিমতো রেগে যায়, মাইয়ামানুষ চুপচাপ থাকবা। বেশি জানোনের দরকার নাই-

ফাতোমা অবাক হয়। কিছুটা লেখাপড়া জানা ফাতেমা ভালোমন্দটা মোটামুটি বুঝতে পারে। কেন যেন তার মনে হতে থাকে শহীদ খারাপ লাইনে ঢুকেছে, খারাপ মানুষের সঙ্গে মিশে নেশা ধরেছে। তাছাড়া কিছুদিন ধরে সে দেখছে শহীদের হাতে বেশ টাকা আসছে যেন কোথা থেকে। আগে এমন ছিল না। ফাতেমা কষ্ট বুঝতে পারে, এসব টাকাই ওর মাথাটা গরম করে তুলছে। ফাতেমা অস্ফুটস্বরে বলতে থাকে- বুঝতে পারছি, হঠাৎ অ্যাতো ক্ষ্যাপছ ক্যান-

মানে, কী কইতে চাও তুমি, শহীদের ভ্রু কুঁচকে তাকানোটা ফাতেমা অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারে না।
কওয়ার আর কী আছে, সত্য কতা কইলেই তো দোষ-
সত্য কতাটা কী? শহীদ পাশ ফিরে সরাসরি তাকায় ফাতেমার দিকে। একটু থামে, তারপর বলে, হোন, একটা কতা কই, বেশি চালাকি আমার সহ্য অয় না।...
সোজা কতা, মাইয়া মানুষ মাইয়া মানুষের মতো থাকবা, বেশি বাড়বা না- তাইলে খবর আছে- রাগে অন্য পাশে ফেরে শহীদ। একটু পরে ঘুমিয়ে পড়ে।

স্বভাবতই একটু রগচটা শহীদ, এটা জানে ফাতেমা। কিন্তু আজকের রাতের ব্যবহারটা এবং কথা বলার ধরন দেখে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে ওঠে। পারতপক্ষে ওর সঙ্গে এমন ব্যবহারের কোনো কারণই খুঁজে পায় না ফাতেমা। যদিও মনের মধ্যে একটা দুর্বলতা বাসা বেঁধেই আছে। বিয়ের পর প্রায় পাঁচ বছর হয়ে এল, এখনো কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি ফাতেমার। চেষ্টার ক্রুটি নেই, তারপরও হয়নি। কেন হয়নি সেটা বোঝার ক্ষমতা ফাতেমার নেই, বলতে পারে কোনো ডাক্তার। কিন্তু তার কাছে কখনো যাওয়া হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছে ফাতেমার কোনো শারীরিক সমস্যার কারণেই এটা ঘটেছে। এ ব্যাপারটা নিয়ে শহীদ যে খুব কিছু বলেছে, তেমনটা না হলেও ফাতেমার মনের মধ্যে যখন তখন কাঁটার মতো খচ খচ করে বিধতে থাকে এই অক্ষমতার বিষয়টা।

সময়টা আসলে ভালো যাচ্ছে না ফাতেমার। এসব ঝামেলার মধ্যে আরেকটা উৎপাত জুটেছে। এই ঘরের মালিকের কে এক আত্মীয় মনির মিয়া এখানে সাত-আটটা ঘরের ভাড়া নিতে আসে। একদিন দেখেই ফাতেমার দিকে সে অন্য রকমভাবে তাকাতে শুরু করেছে। একদিন এসে সে জেনে গেছে সপ্তাহের শুধু শুক্রবার ছাড়া শহীদ অন্য দিনগুলোতে দিনের বেলা ঘরে থাকে না। সেজন্য তাকে শুক্রবার আসতে বলেছিল ফাতেমা। কিন্তু সে অহেতুকভাবে এলো বুধবার। তারপর ভাবী ডেকে নানা ধানাইপানাই গল্পজুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফাতেমা অন্য কাজের কথা বলে তাকে কিছুক্ষণ পরেই বিদায় করে দেয়। তবে ফাতেমা বুঝতে পারে এবারেই শেষ হলো না। আবার আসবে এই উৎপাত। গায়ের রংটা একটু চাপা হলেও আটসাঁট বাঁধনে টানটান লম্বাটে শরীর ফাতেমার। চোখেও একটু টানা ভাব আছে। একটু ভালো করে দেখলেই ঘোর লাগে। বাচ্চাটাচ্চা না হওয়ার জন্য এতদিনেও বুক আর শরীরের ভাঁজ ঢিলে হয়নি কোথাও।

এই শরীরটাই এখন তার শত্রু হয়ে উঠেছে। ফাতেমা ভেবেছিল রাতে মনির মিয়ার কথাটা বলবে শহীদকে। কিন্তু তা আর হলো না। শুরু করার আগেই ঝামেলা বেঁধে গেল। এরপর আর সহজে ঘুম এল না ফাতেমার। শুয়ে শুয়ে ঘরের পেছনে বেশ কিছুটা দূরের ঝিলের পাড়ের ব্যাঙের ডাক শুনতে লাগল। সন্ধ্যার পরে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টিতে চারদিক থেকে মজে যাওয়া ঝিলটার পাড়ের ঝোপঝাড় আর ছোট ছোট গাছপালার ভেতরে ব্যাঙ আর নানারকম পোকামাকড়ের বসতি গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে হচ্ছে মশার বংশবিস্তার। আশপাশে এখনো কিছু খোলা জমি পড়ে আছে, তাতে আবর্জনার স্তূপ। পুব আর দক্ষিণ দিকে বেশ কতগুলো বড় বড় বিল্ডিং উঠেছে। এদিকটা তার পেছনে বলে ও দিকের মানুষের এটা চোখে পড়ে না। ঝিলটা এখন একটা বড় নালার অবয়ব নিয়ে এঁকেবেঁকে কিছু দূর দিয়ে ফাতেমাদের সামনের রাস্তাটা ঘেঁষে পশ্চিম দিকে চলে গেছে। রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে তারপর আর কিছু দেখা যায় না। বাঁকের পরেই বিশাল বিল্ডিং উঠছে একটা। দিনরাত কাজ চলছে সেখানে। নানা রকম শব্দ পাওয়া যায় সর্বক্ষণ। পাঁচতলা পর্যন্ত ওঠা বিল্ডিংটার ইটকাঠের ফাঁকে ফাঁকে সারা দিন মানুষের চলমান চেহারা দেখা যায় দূর থেকে। সন্ধ্যার দিকে কাজ বন্ধ হলেই সব অন্ধকারে ডুবে থাকে।

এর মধ্যে মাত্র দুই দিন গেছে, তিন দিনের দিন শেষ বিকেলের আলো ফুরাতেই মনির এসে হাজির। এই ভয়টাই করছিল ফাতেমা। তার শরীরের নেশায় পেয়েছে মনিরকে, এটা বুঝতে আর সময় লাগেনি ফাতেমার। ভাবী ভাবী ডাকতে ডাকতে সে আজও একেবারে ঘরের ভেতরে ঢোকার মুখেই পাশের বাসার রোকেয়া ভাবীর কাছে জরুরি কাজ আছে বলে একরকম জোর করেই পালিয়ে বাঁচে ফাতেমা। কিন্তু সে বুঝতে পারে কাল পরশু আবার আসবে মনির। বুকের ভেতরের ভয়টা যেন বিপর্যস্ত করে দেয় ফাতেমাকে।

বেশ রাত করে ফেরে আজকাল শহীদ। এত কী কাজ কে জানে! আগে এত রাত হতো না। মেজাজও বেশ ঠান্ডা থাকত, এখন প্রায় সময়ই মেজাজ গরম থাকে, আর চুপচাপ কী যেন ভাবনাচিন্তায় ডুবে থাকে। ডাকলেও তেমনভাবে সাড়া পাওয়া যায় না। তবু আজ রাতে শোয়ার আগেই ফাতেমা শহীদের কাছে মনিরের ব্যাপারটা বলে ফেলল। চুপচাপ সবটা শুনে শহীদ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর তাকাল ফাতেমার দিকে, মনির কখন আহে?
ঠিক নাই, ফাতেমা বলে, আমার খুব ডর লাগে-

মনিররে চিনি আমি, এহানেই দেখছি দুই দিন, রাস্তার মোড়ের রশিদ সাইবের লগে গোলমাল করছিল একেবারেই হারে হারামজাদা, হেই দিন কিছু কই নাই-
একটু থামে শহীদ। তারপর আস্তে করে বলে, তোর আবার সায় নাই তো, ফাতু-
ফাতেমা অবাক চোখে তাকায় শহীদের দিকে। বলে, এই চিনছ তুমি আমারে! হায় আল্লাহ-
শহীদ ফাতেমাকে কাছে টেনে নেয়। শুয়ে পাশ ফিরতে ফিরতে বলে, চিন্তা করিস না, দাওয়াই আছে, সুতার মতো সোজা অইয়া যাইব-

শহীদের কথা শুনে বুকের ভেতরের ভয়টা একটু যেন চাপা পড়ে। নিজেকে বিনা বাধায় সপে দেয় শহীদের বুকের নিচে।
সকালে শহীদ কাজে বেরোবার আগে শুধু বলে, এরপর যেদিন আইবে, বলবা, দুই দিন পরে যেন রাইত ১১টার পরে আহে, বুঝছ?
কী কও তুমি! ভয় পেয়ে যায় ফাতেমা, তারপর আমি কী করুম!

তোমার কিছু করন লাগব না, দ্যাখবা আহে কি না, দরজা আটকাইয়া ঘরের মধ্যে থাকবা। দরজা খোলবা না। ফাতেমা শহীদের কথাবার্তার কোনো আগামাথা পায় না। তার ভয়টা অন্য জায়গায়, যদি একবার তাকে বাগে পায় মনির মিয়া তাহলে কী হবে সেটা ভাবতেও বারবার শিউরে ওঠে ফাতেমা। মনির ওকে হাতে পেলে তো ছিঁড়েখুড়ে খেয়ে ফেলবে রাক্ষসের মতো। তবু মৃদু প্রতিবাদ করেও শেষাবধি রাজি হয় সে-

দেখা যাক, কী হয় শেষ পর্যন্ত। এই উৎপাত শেষ হওয়া দরকার। এক দিন দুই দিন যায়, তিন দিনের দিন সেই শেষ বিকেলেই আবার যথারীতি হাজির হয় মনির। আজ পালায় না ফাতেমা। দুরুদুরু বুক নিয়ে সে দরজা খোলে। দরজার ওপাশে মনির দাঁড়ায়। মুখে হাসি ঝুলিয়ে ফাতেমাকে দেখেই বলে ওঠে, ভালো আছ নি ভাবি?

দুই হাতে খোলা দরজাজুড়ে দাঁড়ানো ফাতেমা মৃদু স্বরে বলে, কী ব্যাপার, বলেন-
এট্টু বইস্যাই না হয় কতা কই, মনির ঘরে ঢুকতে চায়, খাড়াইয়া কি সব কতা কওন যায়-
আইজ না, আরেকদিন আইয়েন, আস্তে করে বলে ফাতেমা। আইজ কাম আছে অহন, বওয়ার সোমায় নাই- আরেক দিন না হয় কতা হইব-

এট্টু সময় দেও ভাবি, তোমার লগে তো কতাই হইল না, খালি আই আর যাই-। মনির হাল ছাড়ে না। তুমি না- 
না, ভাইজান, আইজ না, আপনে, আইজ তো বুধবার, একটু থেমে ফাতেমা তারপর আস্তে করে বলে, আপনে শনিবার রাইতে আইয়েন, মনির তাকিয়ে থাকে ফাতেমার দিকে। একটু পরে বলে, আপনে কইছেন?
ফাতেমা মাথা নাড়ে।
কখন আমু?
রাইতে, ১১টার পর-

থমকে দাঁড়ায় মনির। কী ভেবে কিছুক্ষণ পরে বলে, ঠিকাছে, তুমি যহন কইছ। মনির চলে যায়।
মনির চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে খাটের ওপর বসে পড়ে, দম ছাড়ে ফাতেমা। এতক্ষণ যেন দম বন্ধ করে ছিল। বুকের ভেতরের দুপদুপ শব্দ পরিষ্কার শুনতে পায় কানের ভেতরে। রাতে শহীদ ফিরলে তাকে বিস্তারিত জানায় ফাতেমা। শহীদ খুব মনোযোগসহকারে শোনে ফাতেমার কথা। শেষে একসময় অস্ফুটস্বরে শুধু বলে, শনিবার রাইত ১১টা!
গভীর রাতে শহীদের স্বগতোক্তির মতো কথাটা ভীতিকর হয়ে কানে বাজে ফাতেমার। বুকের ভেতরের দুপদুপ শব্দটা আবার যেন পরিষ্কার শুনতে পায়।

পরের দিন সারাটা সকাল কোনো কাজে মন বসাতে পারে না ফাতেমা। শহীদ কাজে চলে যাওয়ার পরে একটা ভয়ের আবহ এসে ঘিরে ধরে তাকে। কাউকে কিছু বলতেও পারে না। কমবেশি ভয়ের মধ্যেই সময় চলে যায়। আসে শনিবার। ভেতরে ভেতরে আরও অস্থির হয়ে ওঠে ফাতেমা।
শহীদ সকালে কাজে যাওয়ার আগে ফাতেমা সামনে এসে দাঁড়ায়।
কি ভয় পাইলানি? শহীদের কথা শুনে যেন চমকে ওঠে ফাতেমা, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সব ঠিক অইয়া যাইব- চিন্তা কইর না-
শহীদের কথা শুনে কিছুই বোঝে না ফাতেমা। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

সন্ধ্যার পরে রাত যত বাড়তে থাকে ফাতেমার উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে। যত ভয়ংকর সব ঘটনা কল্পনায় ভর করে মনের মধ্যে এসে ধাক্কা দেয়। এর মধ্যে আবার সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়েছে টিপ টিপ বৃষ্টি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বৃষ্টিও বাড়তে থাকে, ঝিলের ওদিক থেকে ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে শুধু। ঘরের মধ্যে একা ফাতেমা। শুধু ভাবছে কখন আসবে শহীদ। শহীদ না এলে কী করবে ফাতেমা! মনির এসে পড়লে কোথায় যাবে, কীভাবে পালাবে!

এসব ভাবতেই উত্তেজনা আর ভয়ে একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে। এক সময় ঘরের আলোটা নিভিয়ে দেয়। জানালাটা বন্ধ বিকেল থেকে। দরজাটা তো আগে থেকেই বন্ধ আছে। তবু আবার গিয়ে দেখে ঠিকভাবে বন্ধ আছে কি না সব। ফাতেমাকে যেন বাতিকে পেয়েছে।

বেশ জোরে বাতাস বইছে। বৃষ্টিও চলছে। সামনের গলিটায় এতক্ষণে পানি জমে গেছে। শহীদের তো এতক্ষণে চলে আসার কথা। ফাতেমা জানে, মনির ঠিকই আসবে। বৃষ্টি বাদলে শয়তানদের আরও সুবিধা হয়। 

এর মধ্যে হঠাৎ মনে হলো, আসলে বোকা সে, তার উচিত ছিল সন্ধ্যার পরপরই রোকেয়া ভাবীর কাছে চলে যাওয়া। শহীদ ফিরলে পরে সে ঘরে ফিরতে পারত। কেন যে সে শহীদের কথার ওপর ভরসা করে ঘরেই বসে রইল! কিন্তু এখন তো কোনো পথই নেই। বুকের ভেতর থেকে ভয়ের আবহ যেন কান্না হয়ে ফিরে এল এবার ফাতেমার চোখ ছাপিয়ে।

বাতাসের চাপে দরজা জানালায় একটু শব্দ উঠলেই বারবার চমকে উঠতে লাগল ফাতেমা। খাটের এক কোনোয় অন্ধকারে ভয়ের কাঁথা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিশ্চল বসে থাকে সে।

মাথা ঝুঁকে একটা বালিশ খামচে ধরে ওইভাবে চোখবন্ধ করে কতক্ষণ বসেছিল ফাতেমা বলতে পারবে না। 
হঠাৎ ঘোর কাটল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। বাইরে এখন আর বৃষ্টি নেই। ধরমড়িয়ে উঠে বসে ফাতেমা। বুকের ভেতরে শ্বাসটা যেন আটকে আছে। ঠিক শুনল তো শব্দটা! ভ্রু কুঁচকে খাট থেকে পা নামিয়ে সোজা তাকিয়ে থাকে সে দরজার দিকে। রাত ক’টা বাজে, কে জানে! ১১টা কি বেজে গেছে! 

এবারে শব্দটা আরেকটু জোরে হয়। কেউ কি ডাকছে তার নাম ধরে! কেউ এসেছে দরজার সামনে! শহীদ না কি মনির! শহীদের কথা মনে হতেই একটু যেন সাহস বাড়ে। মাটিতে পা রেখে উঠে দাঁড়ায়, তারপর আস্তে আস্তে যায় দরজার কাছে। অন্ধকারের মধ্যে ভয়ে আলো জ্বালার কথা মনেই আসে না।

দরজায় আবার শব্দ হয়। এবার কান পাতে ফাতেমা। চারদিকে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়াও হঠাৎ শহীদের চাপা কণ্ঠ শুনতে পায়- ফাতেমা, ফাতু কপাট খোল-
কেডা! ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে ফাতেমা।
আরে আমি, কপাট খোল- ফাতু-
অন্ধকারের মধ্যেই দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়ায় ফাতেমা। তুই কই? বলতে বলতে শহীদ অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়ায় ফাতেমার দিকে, লাইট নাই! থাউক, লাইটের দরকার নাই। ছায়ামূর্তির মতো ভেতরে ঢুকলে শহীদকে ধরে ফাতেমা কেঁদে ফ্যালে। অ্যাতো দেরি করলা ক্যান-
ভয় নাই। এই তো আমি- শহীদ জড়িয়ে ধরে ফাতেমাকে।
কয়ডা বাজে? ভয়ে ভয়ে জানতে চায় ফাতেমা।
আড়াইটার বেশি। এট্টু দেরি হইল কাজকাম সাইরা... মনির আইছিল?
না।
আর আইব না, ওপারে চইল্যা গ্যাছে-

শহীদের এই ভাষাটার অর্থ জানে ফাতেমা। অন্ধকারের মধ্যে ফাতেমার শিরদাড়া বেয়ে ভয়ের একটা শীতল অনুভূতি নিচের দিকে নেমে যেতে থাকে।

নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০১:০৭ পিএম
নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক

নজরুলকে আমরা দেখি এক অসাধারণ কবি হিসেবে, যার কবিতার ভেতর আমাদের স্বপ্ন, আমাদের দুঃখ, আমাদের বেদনা, আমাদের অনুভূতির অসাধারণ দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব একেবারেই দুঃখের আকাশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের মতো। তিনি আবির্ভূত হয়ে সমস্ত আকাশকে কীভাবে রাঙিয়ে গেলেন অথবা উজ্জ্বল করে দিয়ে গেলেন তা নিয়ে এখনো গবেষণা হচ্ছে দেশ-বিদেশে। সংগীত বিশিষ্টজনদের মতে, রবীন্দ্র-পরবর্তী নজরুলের গান অনেকটাই ভিন্ন ধরনের নির্মাণ। তার অধিকাংশ গান সুরপ্রধান। বৈচিত্র্যপূর্ণ সুরের লহরী কাব্যকথাকে তরঙ্গায়িত করে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রেরণাদায়ী, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অভাবী পরিবারে বেড়ে ওঠা এ প্রতিভা জীবিকার তাগিদে সম্পৃক্ত হয়েছেন নানা পেশায়। লেটো দলের বাদক, রেল গার্ডের খানসামা, রুটির দোকানের শ্রমিক- নানারকম পেশা বেছে নিয়েছিলেন শৈশব ও কৈশোরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পথে নেমেছেন। শাসকের কোপানলে পড়েছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন। এই সময়গুলোতেই কালি ও কলমে স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়েছেন তিনি।...


বাংলাসাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গায়ক ও অভিনেতা। তার কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। তার কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস। তিনি নিজেই নিজেকে বলেছেন, ‘বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির’। তাই তার উপাধি বিদ্রোহী কবি। আবার বলেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য।’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রেমময় নজরুলও হিমালয়সম শুভ্র। আজ সেই দ্রোহ ও প্রেমের কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী। কাজী নজরুল বাংলা সাহিত্যের গতিপথ পাল্টে বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধারা তৈরি করেন। উন্নত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন সাম্য আর মানবতা। ধ্যান-জ্ঞান, নিঃশ্বাস-বিশ্বাস, চিন্তাচেতনায় তিনি সম্প্রীতির কবি, অসাম্প্রদায়িক মেরুদণ্ড।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ছোটবেলায় পিতৃহারা হন। এর পর বাধার দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত পাড়ি দিতে হয় তাকে। তবে বাংলার সাহিত্যাকাশে দোর্দণ্ডপ্রতাপে আত্মপ্রকাশ করেন কবি নজরুল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন- ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, 
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

কাজী নজরুলের রচিত ‘চল চল চল’ বাংলাদেশের রণসংগীত। তার কিছু গান জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে গানের মালা, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, বুলবুল ইত্যাদি। পরে আরও গান গ্রন্থিত হয়েছে। তবে তিনি প্রায়ই তাৎক্ষণিক লিখতেন। এ কারণে অনুমান করা হয়, প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে বহু গান হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া কাজী নজরুল গান রচনাকালে ১৯টি রাগের সৃষ্টি করেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

নজরুলের সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি ও বিদ্রোহ। ধর্মীয় ভেদাভেদের প্রাচীর ভাঙার ঘোষণা দেন তিনি। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন- ইসলামি সংগীত তথা গজল। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন, যা নজরুলসংগীত হিসেবে পরিচিত। মধ্যবয়সে তিনি পিকস ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এক সময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ওই বছরই কবির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে শুরু করে। বাঙালির চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি তার একটি গানে লিখেছেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায়, কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই’। কবির এই ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। আজ এই মহান কবি তথা লেখকের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী। কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি

মানবসুন্দরের কবি নজরুল

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০১:০০ পিএম
মানবসুন্দরের কবি নজরুল

আমরা হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য বলে যাকে শনাক্ত করেছি, সেটি সাধারণত চর্যাপদ থেকে ধরা হয়। চর্যাপদ থেকে ১ হাজার বছরের কম বা বেশি বলে ধারণা করা হয়। তার একটি প্রমিত রূপ হচ্ছে হাজার বছরের বাংলা ভাষার ইতিহাস। তারপর মধ্যযুগ- যাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ। মধ্যযুগে যখন আমরা বৈষ্ণব সাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হই তখন সেখানে হিন্দু-মুসলিম- এই দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের যৌগিক প্রবাহ দেখি। এই দুই সম্প্রদায়ই বাংলা ভাষা চর্চা করেছে। সেখানে দেখতে পাই মুসলমানদের উত্তরাধিকার। ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। লিখেছেন এমন একজন কবি, যিনি বাংলা ভাষার প্রমিত কবিদের মধ্যে একজন। 

তারপর বাংলা সাহিত্যকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক হিসেবে বাংলা ভাষার আবির্ভাব ঘটে মাইকেল মধুসূদনের মাধ্যমে। বাংলা ভাষা যে তার জন্য অনিবার্য, সে কথা তিনি বলেছিলেন। বিশ্বের অন্যান্য ভাষা চর্চা করেও বাংলা ভাষাই যে তার  মূল ভাষা, সে কথাও বলেছিলেন। তারপর থেকেই বাংলা ভাষা হয়ে গেছে হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাহিত্যের ভাষা। ঈশ্বরগুপ্ত, বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ি, বাংলা ভাষা যে প্রমাণিত ভাষা তা বোঝা যায়। বাংলা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা ও সাহিত্য হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। 

তারপর ’২০, ’৩০ ও ’৪০-এর দশকে যারা বাংলা সাহিত্যের প্রধান তারকা হিসেবে আবির্ভূত  হয়েছিলেন- রবীন্দ্রনাথের পর কাজী নজরুল ইসলাম তাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা ভাষার যে বৈশ্বিক স্বীকৃতি প্রমিতায়ন, তাকে যারা লালন করেছেন নজরুল তাদের মধ্যে একজন। নিজস্ব নান্দনিকতা বোধের কারণেই নজরুল সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে গেছেন। 

সৌন্দর্যই নজরুলের মূল বিষয়। আপনার, আমার- সবার কাছে যেটা সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য সেটাই সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য কি শুধু দেখতে? ভালো হলেই সুন্দর হবে এমন নয়। কুৎসিতের মধ্যেও সৌন্দর্য নির্মাণ থাকতে পারে, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় সেটাই সৌন্দর্য। ফরাসি সাহিত্যিক ভলতেয়ারকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসা হয়েছে। রাতে দেখা গেছে কেডরিনে যে কুসুম ফোটে তারও একটি অন্যরকম সৌন্দর্য আছে। 

নজরুল সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে আরও অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন সৃষ্টি সুন্দর, ধ্বংস সুন্দর, হত্যা সুন্দর, যুদ্ধ সুন্দর, ক্ষমতা সুন্দর। অর্থাৎ একজন মানুষের মধ্যে যত বোধ আছে, ভাবনা আছে তার সবটাকে যদি তার নিজের মতো করে গ্রহণযোগ্য করে মানুষ ব্যবহার করতে পারে এবং সাহিত্যের যে পরিভাষা সে ভাষায় যদি সর্বময় ধারণ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে সেটাই কিন্তু সৌন্দর্য। নন্দনতত্ত্ব সম্বন্ধে যে বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা-  এটা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্যের জন্য প্রযোজ্য। নন্দনতত্ত্ব সম্বন্ধে শাস্ত্রীয় পাঠ গ্রহণ না করেও শুধুমাত্র যাপিত জীবনের লেখক হিসেবে অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ হয়ে তিনি যা বলেছেন সেটি ছিল তার মৌলিক একক। নজরুল এভাবেই বাংলা সাহিত্যের এক মৌলিক সুন্দর লেখক ও কবি। আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাকে নবায়নের ক্ষেত্রে আরও বড় বলে মনে হয়।

বাংলা ভাষায় যে শব্দগুলো দেশীয় প্রাকৃত ও সংস্কৃত থেকে এসেছে, সেগুলো তৎসম নয়। শব্দগুলো পরবর্তীকালে বাংলা ও বাঙালি জাতির সঙ্গে যারা মিলিত হয়েছে, শব্দগুলো তাদের। মুসলমানরা সিনেটিক ঐতিহ্য থেকে এসে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষাগুলো বাংলা ভাষায় ধারণ করে। আবার তার সঙ্গে পর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসি দেশের লোকের যে ভাষা, সেই ভাষাকেও আমরা গ্রহণ করেছি। নজরুল এসব ভাষাকে গ্রহণ করেছেন। তিনি এসব ভাষা গ্রহণ করে একটি বিপ্লব তৈরি করেছেন। বাঙালিকে জাতিসত্তা হিসেবে শনাক্ত করা ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন তার বিদ্রোহী কবিতায়। তার আগেও তিনি ভাষাবিপ্লবের কাজ করেছেন। মানুষ মূলত স্বাধীন। মানুষের স্বাধীনতা প্রধানত ব্যক্তিক স্বাধীনতা। তারপর পারিবারিক স্বাধীনতা। তারপর গোত্র পার হয়ে জাতীয় স্বাধীনতা। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির মধ্য থেকে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি তা জাতির মধ্যে মানবিক স্বাধীনতা। নজরুল তার ২০-২১ বছরের সচেতন কাব্যজীবনের সৃষ্টি জীবনে সবগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন। এটা একটা বিস্ময়। কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ রচনা রচিত হলো তার তরুণ বয়সে। তার রচনাগুলোতে যৌগিক বন্ধন আছে। বিদ্রোহীর পূর্ববর্তী বাংলা ভাষা এবং পরবর্তী বাংলা ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। এই আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে নজরুল দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই আমাদের জন্য বিস্ময়। নজরুল যে বিদ্রোহের কথা বলেছিলেন, বীরের কথা, এর মধ্যে এক ধরনের জনপ্রিয় স্লোগান আছে। এই স্লোগানের পাশাপাশি একটি গ্রহণযোগ্য যুক্তিও আছে। তুমি যদি তোমার নিজেকে স্বীকার করতে চাও তোমাকে বীরসত্তায় দাঁড়াতে হবে। নজরুল তার বিদ্রোহী কবিতায় তার বীরসত্তার কথাই বলেছেন। এই বীরসত্তার কথা বলতে গিয়ে তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। যে গণতন্ত্রের কথা তিনি সমকালীন পৃথিবীর বিভিন্ন আদর্শ থেকে পেয়েছেন। আবার পেয়েছেন কবি ওয়াল্ট উইটম্যানের কাছ থেকে। তিনি ‘Songs of myself’ লিখেছিলেন। বহমান গদ্যে একেবারে বক্তৃতার মতো করে যে বক্তৃতা। আবার কবিতাসম্মত বক্তৃতা করে তিনি ব্যক্তি মানুষের জয়গান করেছেন। তিনি গুরু বলে মানতেন মোহিতলাল মজুমদারকে। তার ‘আমি’ নামক প্রবন্ধটি অনেক প্রিয়। নজরুল যেভাবে এটাকে বিশ্লেষণ করেছেন, মোহিতলাল মজুমদার ওইভাবে বিশ্লেষণ করেননি। নজরুল অত্যন্ত সুন্দর করে বাংলা ভাষায় এটাকে খুব সহজ-সরলভাবে উপস্থাপন করেছেন। রচনাগুলো পড়লেই অসম্ভব সুন্দর মনে হয়। না গদ্য না পদ্য বলে মনে হয়। এ রচনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে অবিসাংবাদিত রচনা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। নজরুল তার ভাবসম্পদ গ্রহণ করে যুগোপযোগী কাজটা করেছেন। বাঙালির স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বাঙালিকে বীরসত্তায় আসীন হতে হবে। আমি বলব, এটা সমস্ত উত্তরাধিকারকে বহন করে। কারও সঙ্গে বৈরিতায় না গিয়ে এখন আমরা সাহিত্যের পরিভাষায় যেটাকে বলি ‘ইন্টারটেকচুয়ালিটি’। আগে যারা যা লিখেছেন তার মধ্যে যতটুকু বুঝেছ, গ্রহণ করেছ তা নিয়ে তোমার কথা বলবে। কাজী নজরুল এভাবেই উপস্থাপন করেছেন। ওই সময়ে যারা তাকে বুঝতে পারেনি তারা তাকে বলেছিল যে, নজরুলের সাহিত্য টিকবে না। নজরুল তার কৈফিয়ত দিয়েছিলেন। বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী। এই কথার মধ্যেও একটি অলংকারিক যুক্তি আছে। ১০০ বছর আগেও তিনি যেভাবে বেঁচে ছিলেন ১০০ বছর পরও তাকে আরও বড় বলে মনে হচ্ছে।

সব মানুষের মৌলিক বন্ধনের জন্য, চিত্তের নান্দনিক বন্ধনের জন্য আমাদের জাতীয় কবি নজরুলকে ধারণ করা অপরিহার্য। বাঙালি যেদিন এক হয়ে বলতে পারবে বাঙালির বাংলা, বাঙালি সেদিন অসাধ্য সাধন করবে। উপমহাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমরা দেখেছি যে, বাঙালির শক্তি সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, যিনি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেছিল সেই তিতুমীর, সবার সম্মিলিত  শক্তি ও  উদ্যোগেই সেটা সম্ভব । সেজন্য জাতিসত্তা নির্মাণে নজরুলের অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা যখন বের হলো, ৩০ হাজারের মতো সংখ্যা পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে গেল। তখন অনলাইন যুগ ছিল না। নজরুল সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রতিনিধিত্বশীল কবি হয়ে উঠেছিলেন। নিঃসন্দেহে নজরুল অভাবনীয় সৃষ্টি সুন্দর তথা মানবসুন্দর কবি। তার যে মূল্যবোধ, নিঃসন্দেহে মানবিক মূল্যবোধ। তিনি সাম্যের কথা, মানবতার কথা, মানুষের কথা নির্দ্বিধায় বলে গেছেন। আগামীর বাঙালি সত্তা একই সঙ্গে বিশ্ব-অঙ্গনে বৈচিত্র্যমণ্ডিত ধারণার সম্মেলনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে পারবে, সে স্বপ্নের কথাই নজরুল বলে গেছেন। নজরুলের লেখাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। এমনকি আমেরিকার কয়েকজন সমালোচক থেকে শুরু করে সবাই নজরুলকে অভিবাদন জানাচ্ছেন মানব রঙের, মানববন্ধনের, সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। ফলে নজরুলকে পাঠ করা বাঙালির জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি যারা সুন্দর পৃথিবী চান, অশান্তিমুক্ত পৃথিবী চান, সে ক্ষেত্রে নজরুল গবেষণা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তার রচনা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ভাষায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে নিজের উদয়ের তুলনা করেছিলেন। সকাল বেলার পাখি হতে চেয়েছিলেন নজরুল। পাখির মতো তার মুক্ত-উন্মোচিত কবিতা, গান ইত্যাদির মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি মানবসুন্দর হয়ে উঠবেন। রচনার মাধ্যমে মানব ঐক্যের যে স্বপ্ন তার একটা ইতিবাচক সমাধান পেয়ে যাব। জন্মজয়ন্তীতে কবি নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং আমি মনে করি সর্বকালেই নজরুল পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

লেখক: মহাপরিচালক বাংলা একাডেমি

নজরুলের কবিতায় ছন্দ ও শব্দের কারুকর্ম

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
নজরুলের কবিতায় ছন্দ ও শব্দের কারুকর্ম

নজরুলের দিকে তাকিয়েও আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। ভাবী, সামান্য স্কুলশিক্ষার সীমানা অতিক্রম করে কখন আর কীভাবে তিনি অর্জন করলেন এত শব্দজ্ঞান, ছন্দজ্ঞান, বিশ্বের নানা সংস্কৃতির (ইসলাম, হিন্দু, গ্রিক) শাস্ত্রজ্ঞান, আরও নানা মানবিক জ্ঞান- যা বাঙালিকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে। এ নিবন্ধে আমি তার কবিতার বাক্‌শিল্পের মহিমার কথাই সাধ্যমতো বলার চেষ্টা করছি।...

ছন্দশিল্প
তিনি এমনই একজন বিরল প্রজাতির কবি, যার বলার বিষয় তো তাকে আলাদা করে আনেই, কিন্তু আমাদের মতো কারও কারও কাছে তার বলার ‘ধরন’- তিনি কেমন করে বলেন, তার কবিতার প্রতিটি ছত্র, স্তবক সাজান- তাও বিশেষ চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়- এ ক্ষেত্রেও অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে তার অনন্যতা চোখের সামনে চলে আসে। তার মধ্যে যে একটি বিপুল ও অবাধ জীবনোল্লাস ছিল তার প্রবল নৃত্যভঙ্গিটিই যেন তার বহু কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে। আমাদের অনেক সময় মনে হয়েছে, কত্থক নাচের সওয়াল-জবাবের মধ্যে যেমন নানা অপ্রত্যাশিত পদপাতের উদ্দাম লীলা তৈরি হয়, তারই যেন চলচ্ছবি ফুটে ওঠে নজরুলের নানা কবিতার শরীর নির্মাণে। যেমন-
বল    বীর-                                                                              
বল উন্নত মম   শির,

শির   নেহারি আমার নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির।

বল    বীর-

কিংবা ‘ফাতেহা-ই দোয়াজ্‌-দহম্‌’ কবিতায়-
জঞ্‌ জাল

কঙ্‌ কাল

ভেদি, --ঘন জাল মেকি গণ্ডির পঞ্জার                                                                            

ছেদি, --মরুভূতে এ কী শক্তির সঞ্চার।                                                                            

বেদি, পঞ্জরে রণে সত্যের ডঙ্কার                                                                            

ওংকার।

কীভাবে তিনি ‘মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেইদিন হব শান্ত’তে যথাক্রমে ‘মহা’, ‘রণ’, ‘আমি’ আর ‘হব’-র পরে বিরাম রচনা করেন তা আমাদের বিস্মিত করে।  

এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত তোলা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের কথাটা এই যে, সংগীতে অসাধারণ প্রবেশ ছিল বলেই নজরুল সংগীত এবং নৃত্যের তালের এত সূক্ষ্ম ফাঁক ও সম্‌কে কবিতার ছন্দে নিয়ে আসতে পেরেছেন, তার মতো করে আর কেউ পারেননি। আবার বলি, আগে যেমন বলেছি (‘ছন্দতত্ত্ব ছন্দরূপ’ বইয়ে) কবিতার ছন্দ হলো ধ্বনি ও নৈঃশব্দ্যের পুনরাবর্তনময় এক নির্মাণ। নজরুলে লক্ষ করি শুধু ধ্বনি নয়, নৈঃশব্দ্যের ওপরেও অবিশ্বাস্য দখল। কোথায় কোন ধ্বনি প্রয়োগ করতে হবে তার সঙ্গে কোথায় কতখানি নৈঃশব্দ্যকে তিনি ব্যবহার করবেন, সে বিষয়েও তার অভাবিত সচেতনতা। আমাদের মতে, এই নৈঃশব্দ্যের ব্যবহার, ছন্দের এই ব্যত্যয়বিন্যাস বা variation, নজরুলের কবিতার মধ্যে এমন একটি নাটকীয়তার সঞ্চার করে যা অন্যত্র দুর্লভ। বাংলাভাষার উত্তরাধিকারগত তিনটি ছন্দের- দলবৃত্ত (ছড়ার ছন্দ), কলাবৃত্ত (মাত্রাবৃত্ত) এবং মিশ্রবৃত্ত (পয়ার)- এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেও নজরুল এগুলোর শরীরকে নানাভাবে ভেঙে বিচিত্র তরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। অবশ্যই বাংলার বাইরে আরবি ছন্দের কাছেও তিনি হাত পেতেছেন। সব ক্ষেত্রেই তার এক ধরনের দুঃসাহস ও অ্যাডভেঞ্চারের ইচ্ছা প্রকাশ পায়। যেমন ‘নতুন চাঁদ’-এর ‘অপরূপ রাস’ কবিতাটিতে-

এ কি   পরম বিলাস                                                                                                      

এ কি   অপরূপ রাস                                                                                                    

এ কি   অপ্রাকৃত কাম-ঘন যৌবন                                                                                          

রস-উন্মাদ উল্লাস                                                                            

এ কি   পরম বিলাস,                                                                                                                

এ কি   অপরূপ রাস।

ওপরের ‘এ কি অপ্রাকৃত’ ছত্রটি যদি পরের ‘রস-উন্মাদ উল্লাস’-এর সঙ্গে একটানা পড়া না যায় তবে মনে হতে পারে বুঝি ছন্দ হোঁচট খেল। একটানা পড়লেই বোঝা যাবে নজরুল কোথায় নৈঃশব্দ্য বা যতি চাইছেন, কোথায় চাইছেন না। আসলে এই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নজরুল পাঠকের কাছে অনেক সময় যেন একটু বেশি দাবি করেন, চ্যালেঞ্জ দেন- ‘আমি যেভাবে কবিতায় ধ্বনি ও নৈঃশব্দ্যরে নর্তন সৃষ্টি করেছি, ছন্দের সূক্ষ্ম সম্ভাবনার প্রত্যন্তসীমায় গিয়ে, পাঠক তুমি তা আবিষ্কার করে আমার সঙ্গী হও, তবেই তুমি আমার খেলায় যোগ দিতে পারবে।’ এ জন্য তিনি বাংলা ছন্দের সীমানার বাইরে নিজের বিচরণক্ষেত্র বেছে নিয়েছেন সংস্কৃত ও আরবি (হজয্‌, রবজ্‌, রমল্‌, মোতাকারেব্‌, খফিফ্‌ ইত্যাদি) ছন্দ।  আবার নিজেও সংস্কৃত নীতি (হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরের এবং রুদ্ধদলের মাত্রাভেদ) রক্ষা করে কিছু ছন্দ উদ্ভাবন করেছিলেন। আমরা একে একে তার নমুনা উপস্থিত করব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধু ছন্দ জানা এবং ব্যবহার করাই তো শেষ কথা নয়। সে ছন্দের ফ্রেমে যথাযোগ্য শব্দ বসাতে পারলে তবেই সে ছন্দ জীবন্ত হয়ে কথা বলে উঠবে। ছন্দকুশলতার সঙ্গে শব্দকুশলতার যোগ না হলে কবিতা প্রাণ পায় না।

এই কবি ছিলেন শব্দ-মন্ত্রে সিদ্ধ। অর্থাৎ ছন্দের চাহিদা অনুযায়ী কোন শব্দ, সংস্কৃত, বাংলা, আরবি, ফারসি, ইংরেজি- কোথায় কাকে ব্যবহার করতে হবে, তা হলে ছন্দ এবং রস- দুয়েরই পূর্ণ সুঠাম মূর্তি তৈরি হবে- এ বিষয়ে সচেতনতা ছিল তার নখাগ্রে। যেমন- ‘প্রলয়-শিখা’র ‘বহ্নি-শিখা’ কবিতায় তার সংস্কৃত তোটক ছন্দের ব্যবহারে লক্ষ করি-
‘হর    হর হর শংকর হর হর ব্যোম’-

এ কি   ঘন রণ-রোল ছায় চরাচর ব্যোম।

হানে   ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক,                                                                                    

ঘন     প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব-হাঁক।

হজম্‌ ছন্দ অনুসরণে লেখা নিচের এই ছত্রগুলোতে নজরুল ওপরে গুণচিহ্ন দিয়ে দল বা সিলেবলের ‘দীর্ঘতা’র ইঙ্গিত করেছেন। আমাদের মনে হয় দীর্ঘতার বদলে এই দলগুলোতে ‘জোর’ বা stress দিলে এই ছন্দের চরিত্রটি স্পষ্ট হয়। আমরা নিচে দাগ দিয়ে কোথায় জোর বা বল দিতে হবে তা বোঝাচ্ছি, যা থেকে বোঝা যাবে যে এগুলোর  সবই রুদ্ধদল-


কটির কিঙ্‌কিণ,                                                                                                              

চুড়ির শিন্‌জিন                                                                                                

বাজায় রিনঝিন                                                                                                  

ঝিনিক রিনরিন

তেমনই ‘ফাঊলুন ফাঊলুন’ ঢঙের মোতাকারেব ছন্দের ‘ঊ’ অংশের আবৃত্তিতে বাংলায় দীর্ঘতা না এনে বল বা ঝোঁক আনলেই পাঠ যথার্থ শক্তি পায়, যেমন-

কলস জল                                                                                                        

আবার বল্‌---                                                                                                    

ছলাৎ ছল্‌,                                                                                                          

ছলাৎ ছল্‌

কিন্তু যখন নজরুল নিজের মতো করে সংস্কৃত ছন্দের উদ্ভাবন করেন- এই সাহস আর কোনো বাঙালি কবি দেখাননি- যেমন ‘স্বাগতা’ কিংবা ‘প্রিয়া’- সেগুলোতেও নজরুল পাঠকদের সুবিধার জন্য উচ্চারণের মূল ছকটি দিয়ে দেন। স্বাগতা হলো ষোলো মাত্রার ছন্দ: তা-নাতা নাবাবা-, তা-নানা তা-তা-। এর শিল্পিত রূপ হলো: স্বাগতা কনক চম্পক-বর্ণা ছন্দিতা চপল নৃত্যের ঝর্না’। প্রিয়া ছন্দ হলো সাত মাত্রার, তার ছক: নাবাতা-নাতা-। উদাহরণ- মহুয়া বনে বনপাপিয়া এখনো ঝুরে নিশি জাগিয়া।

শব্দ ও অভিধান
কবির সৃষ্টির মধ্যেই তার অভিধানের একটা পরিচয় ফুটে ওঠে। অর্থাৎ তিনি কত ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন, শুধু নিজের ভাষার শব্দের মধ্যে (তার বৈচিত্র্যও কম নয়) সীমাবদ্ধ থাকেন, না বহুভাষীর দক্ষতা নিয়ে অন্য ভাষার শব্দের দিকে হাত বাড়ান- তাতেই রচিত হয় তার সৃষ্টির অভিধান।  
সেদিক থেকে মনে হয়, নজরুলের মতো বিস্তারিত অভিধান আর কোনো বাঙালি কবির নেই। আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি এবং বাংলার সংস্কৃত, তদ্‌ভব, দেশি- সব ধরনের শব্দেই তার স্বচ্ছন্দ অধিকার। সংস্কৃত শব্দের প্রয়োগ দেখি ‘বিষের বাঁশী’র ‘জাগৃহী’-তে-

ঘোর   নির্ঘোষে “মার্‌ মার্‌” দৈত্য-অসুর,                                                                                  

প্রেত  রক্ত-পিশাচ, রণ-দুর্মদ সুর।                                                                                        

করে ক্রন্দসী-ক্রন্দন অম্বর-রোধ-                                                          

ত্রাহি  ত্রাহি মহেশ হে, সম্বর ক্রোধ।

আবার ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌-দহম্‌’ কবিতায় আরবি শব্দের (ইসলাম ধর্মের অনুষঙ্গে তা অবধারিত) ব্যাপক ব্যবহার-
‘সাবে ঈন্‌’                                                                                                          

তাবে ঈন্‌’                                                                                                              

হয়ে   চিল্লায় জোর “ওই ওই নাবে দীন্‌’!”                                                                        

ভয়ে   ভূমি চুমে “লাত্‌ মালাত’-এর ওয়ারে শিন।                                                            

রোয়ে  ওয্‌যা হোবল্‌ ইবলিস্‌ খারে জিন্‌-                                                          

কাঁপে জিন্‌।

আবার কখনো কোনো কবিতায় ব্যঙ্গের সুর আনতে ইংরেজি শব্দও ব্যবহার করেছেন “খাইয়া ফাউল-কারি নারাজীরা কেবল ফাউল করে, রেফারিকে দেয় কাফেরি ফতোয়া যদি সে ফাউল ধরে।”

সমালোচনা-তাত্ত্বিক বাখতিন যাকে বলেন ‘পলিফোনি’ (polyphony), নজরুলের কবিতা তারই এক চমকপ্রদ নিদর্শন তুলে ধরে। তিনি শুধু বহুবিস্তৃত উৎস থেকে শব্দ সংগ্রহ করেননি, সেই শব্দগুলোকে ছন্দের তরঙ্গে সমর্পণ করেছেন এবং অন্য শব্দের সংযোগে তাদের প্রয়োগকে যথাযথতা দিয়েছেন।  

তাই মনে হয়, এই প্রতিভা পূর্ণাঙ্গ পরিণতির সুযোগ পেলে বাংলা সাহিত্যে আরও কত না সমৃদ্ধ হতো। তার ১২৫ বছরের সমাপনে তাঁর স্মৃতিকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।  

লেখক: ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও গবেষক এবং সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:৩৮ পিএম
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

‘আমি চির বিদ্রোহী বীর- 
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!’

বিংশ শতাব্দীর প্রধান বাঙালি কবি ও সংগীতকার কাজী নজরুল ইসলাম (জন্ম: ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬)। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি ‘কবি’, আমাদের ‘জাতীয় কবি’। তার কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তা বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে তুঙ্গস্পর্শী। তার মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধতা বোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় এক শ বছর ধরে বাঙালির মানসপীঠ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে। ধূমকেতু পত্রিকাকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’...

ত্রিপুরা উপাখ্যান ও সাবিনার কথা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:৩৫ পিএম
ত্রিপুরা উপাখ্যান ও সাবিনার কথা
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

গত সংখ্যার পর

২.
জীবনসায়ান্নে এসে জীবনটাকে মাঝেমধ্যে বেশ ছোট মনে হয় শ্রী দত্তের কাছে। সবকিছু করার বা বলার সুযোগ মেলে না। আবার মনে হয় নব্বইয়ের মতো বয়েস হলো- জীবন আর ছোট থাকল কই! স্ত্রী চলে গেলেন, ছেলেমেয়েরাও দেখতে দেখতে বড় হলো, যার যার কাজ- যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ততার শেষ নেই! রথীন বাবু ভাবতেই পারেননি শেষ বয়েসে এসে এতটাই নিঃসঙ্গ হবেন! তবে এটিও ভাবেন ইতিহাসের এতসব ঘটন-অঘটনের মাঝ দিয়ে পথ হেঁটেছেন- যা তাঁকে নিঃসঙ্গ হওয়ার সুযোগ দেবে কেন। 

দেয়ালে টানানো সূর্য সেনের ছবিটার দিকে তাকালেন দত্ত বাবু। এই মাস্টারদা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন তার ছাত্রজীবনে। গড্ডালিকায় না ভেসে সত্যিকারের স্বাধীন হওয়ার মন্ত্রণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সূর্য সেন। কিন্তু প্রবল ইচ্ছে সত্ত্বেও রথীন দত্ত বিপ্লবী হতে পারেননি। কলেজের সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতেই ১৯৪৭ সাল এসে গেল। সুদীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি ঘটল। ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হলো। বাংলা ভাগ হলো। সি আর দাস, শরৎ বসু আর আবুল হাসিমরা হেরে গেলেন। একবার ভাবেন- যদি তারা সফল হতেন? 

রথীন দত্ত সবটা দেখেছেন তা নয়, তবে ইতিহাসের অনেককিছুই তার জানা, মনেও পড়ে আগে-পরের সেই ইতিহাস। নিপীড়ক ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গান্ধীজি তার অহিংস আন্দোলন শুরু করলেন। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে স্বদেশিরা শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের টার্গেট করতে থাকল। অনুশীলন ও যুগান্তর দলের সদস্যরা বোমা ও পিস্তল হাতে ইংরেজ বিতাড়নে জোর লড়াই চালাল। ঠিক তখনই, অনেকটা অভাবিতভাবেই, চট্টগ্রামের মাটিতে এক বড় প্রলয়ের জন্ম দিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। ঘটনাটা ঘটে রথীন দত্তের জন্মের বছরখানেক আগে। আসামের মঙ্গলদৈ-এ জন্ম তার, খানিকটা বড় হতেই স্কুলে পড়তে পাড়ি দিলেন শিলং শহরে। এরপর ভর্তি হলেন ডিব্রুগড়ের আসাম মেডিকেল কলেজে। ডাক্তারও হলেন ভালো রেজাল্ট করে, এরপর ইন্টার্ন করার সুযোগ ঘটল কলকাতায়, তাও প্রবাদপ্রতীম চিকিৎসা গুরু ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের অধীনে। কয়েক বছর কাটিয়ে এরপর পাড়ি দিলেন লন্ডনে এফআরসিএস পড়তে। দেশে ফিরে চিকিৎসা গবেষণায় আবারও গেলেন বিদেশে- এবার বার্লিনে।

নিঃশব্দে নানা কিছু ভেবে চলছিলেন সার্জন দত্ত। এবার মুখ ঘুরিয়ে রিপোর্টারের দিকে তাকিয়ে বললেন : শোন, যে স্বাধীন ভারতবর্ষ তোমরা হাতে পেয়েছ জন্মের পর থেকে, তাকে স্বাধীন করার, রাহুমুক্ত করার সংগ্রাম বহু যুগের, বহু মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগ মিশে আছে এই স্বাধীনতায়। 

এটুকুন বলেই রথীন বাবু চেয়ার থেকে উঠলেন, পাশের সেলফ থেকে একটা পুরনো বই হাতে তুলে আবারও আসন নিলেন, নিজের মনে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। টিভি রিপোর্টার আগ্রহী হয়ে বিরবির করে বইটার নাম আওড়াল- ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’, রচয়িতা পূর্ণেন্দু দস্তিদার। 

রথীন দত্ত এককালে নবীন ডাক্তারদের শল্যচিকিৎসা পড়িয়েছেন, সার্জারির টেবিলে বাস্তব জ্ঞান দিয়েছেন। টিভি রিপোর্টারের সামনে তিনি এমনভাবে কথা বলে চললেন যে তিনি যেন ইতিহাস পড়াচ্ছেন ছাত্রকে! সত্যি বলতে কী, ওকে খানিকটা উৎফুল্লও মনে হতে থাকল সে সময়। 

-মাস্টারদা, হ্যাঁ, মাস্টারদা সূর্য কুমার সেন। একবার ভাব তো- কী বিস্ময়কর জীবনযাপন করেছেন বাঙালির এই স্বাধীনতা সংগ্রামী! উমাতারা উচ্চবিদ্যালয়ের অঙ্কের শিক্ষক, গোপনে বিপ্লবী দলের নেতা। কম কথা বলার মানুষ, শান্তশিষ্ট, দেখে বুঝবার উপায় নেই মাতৃভূমিকে উপনিবেশমুক্ত করতে জীবন উৎস্বর্গ করতে পারেন! একেবারেই বিয়ে করবেন না ঠিক করেছিলেন কিন্তু বাবা-মা’র চাপে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন। কিন্তু সংসারধর্ম পাছে তাকে কর্তব্যভ্রষ্ট করে- এই বিশ্বাসে একটিবারের জন্যও নববধূর সঙ্গে কথা পর্যন্ত বললেন না তিনি! দেশের ডাকে ফুলশয্যার প্রথাটিও অস্বীকার করলেন সূর্য সেন অবলিলায়! বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। 

১৯২৬ সাল। কলকাতায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন সূর্য সেন। মুম্বাইয়ের রত্নগিড়ি জেলে থাকলেন। সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন উদ্যমে গোপন বিপ্লবী দলের কার্যক্রম চালাতে থাকলেন। সঙ্গে পেলেন বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তী, চারুবিকাশ দত্ত, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, নির্মল সেনকে। 

সার্জন দত্ত বলে চললেন- নিশ্চয়ই জান, ১৯২০ সালে গান্ধীজি ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সে আন্দোলনে যোগ দিলেন বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। যুক্ত হলেন সূর্য সেনও। কিন্তু বছর দুই পর আন্দোলন পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেন গান্ধীজি। কষ্ট পেলেন বাংলার বিপ্লবীরা। বাধ্য হয়ে আবারও তারা আবারও গোপন পথে সক্রিয় হলেন। এরই মধ্যে ঘটল চট্টগ্রামের নাগরখানা পাহাড়ের যুদ্ধ। গ্রেফতার হলেন সূর্য সেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী। ছাড়া পেয়ে আবারও শুরু করলেন গোপন তৎপরতা। আবারও গ্রেফতার হলেন। এবার থাকলেন মেদেনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। মুক্তি পেলেন ১৯২৮ সালে। এরই মধ্যে তারই নেতৃত্বে এবং নতুন উদ্যমে চট্টগ্রামের মাটিতে গঠিত হলো একটি শক্তিশালী বিপ্লবী দল। এতে যোগ দিলেন প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার, কল্পনা দত্তসহ কয়েকজন নারী বিপ্লবীও। 

এবার দেয়ালের দিকে নিজের ডান হাতটা উঁচিয়ে ধরলেন সার্জন দত্ত, বললেন: ওই যে নেতাজীকে দেখছ, জান, তারও সঙ্গে সখ্যতা হয়েছিল মাস্টারদার। ঔপনিবেসিক ইংরেজ শাসনে পিষ্ট ভারতকে মুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে তারা শলাপরামর্শ করেছিলেন। এগিয়েও ছিলেন অনেকটা। কিন্তু শেষটা শেষ হয়নি। 

১৯২৮ সাল। কলকাতার পার্ক সার্কাসের কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে গেলেন সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং, নির্মল সেন, লোকনাথ বল, তারকেশ্বর দস্তিদার প্রমুখ চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হয়ে। সেখানেই নেতাজী ও মাস্টারদার মধ্যে ঘটল প্রথম বৈঠক। পরের বছর চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন সূর্য সেন। কিন্তু সশস্ত্র পথে ইংরেজ তাড়াবার পথ থেকে তিনি সরে এলেন না। ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির’ আদলে গড়ে তুলতে থাকলেন ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’। চলল অস্ত্র প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ সংগ্রহ- সব প্রস্তুতি। 

এরপর এল ১৯৩০ সাল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সঙ্ঘবদ্ধ ও প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘটল চট্টগ্রামের মাটিতে। এরই ফলে দখলে এল ব্রিটিশের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার, ইউরোপিয়ান ক্লাব, ঘটল জালালাবাদ পাহাড়ের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। 

রিপোর্টার মল্লিকার ইন্টারভিউ নিতে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা বা ত্রিপুরার অবদান নিয়ে কিন্তু রথীন দত্ত যে বাংলার বিপ্লবীর ইতিহাসের একনিষ্ঠ ছাত্র- তা ওর জানা ছিল না। অতএব, বক্তাকে থামাতে সে বিনয়ের স্বরে বলল- স্যার, যদি কিছু মনে না করেন- আমরা এখন কী বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসতে পারি? 

কিন্তু রথীন দত্ত রিপোর্টারের কথা কানে তুলবেন কেন! তিনি বলে চললেন- বাংলাদেশের জন্ম তো অন্যায্য ভারত ভাগেরই অনিবার্য পরিণতি। অপেক্ষা কর- আসব সে প্রসঙ্গে। 

তারপর বলতে থাকলেন- তোমরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস পড়েছ কি? মনে হয় না। দেখ, তোমাদের জেনারেশনে মোবাইল এসেছে, কম্পিউটার এসেছে, তথ্যপ্রযুক্তি দারুণভাবে এগিয়েছে। পৃথিবীটা মনে হয় হাতের আঙুলে। কিন্তু কেউ তোমরা বই পড়বে না- পড়া উচিত। 

সেদিন ছিল শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল, ১৯৩০। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘রেড লেটার ডে’। পরাক্রমশালী ইংরেজের বিরুদ্ধে বাংলার মাটিতে স্বাধীনতার পরিকল্পিত সশ্রস্ত্র যুদ্ধ। নির্ধারিত সময়ে চারটা বাড়ি থেকে বের হলেন চট্টগ্রামের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। পাশের রেলস্টেশনে একটা মালগাড়ি উল্টিয়ে রাখা হলো যাতে চট্টগ্রামকে বাইরের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যায়। পরিকল্পনা মতো কাজ এগোতে লাগল। ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’র একটি দল নন্দনকাননের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ করল, আগুন ধরিয়ে সব যন্ত্রপাতি ধংস করল- যাতে ব্রিটিশ শাসকরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। অন্য দল পাহড়তলীর ইউরোপিয়ার ক্লাব দখলে নিল, রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করল। নিয়ন্ত্রণে নিল উন্নতমানের বহু রাইফেল ও রিভলবার। আরেকটি দল দখল নিল দামপাড়ার পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক। ওড়ানো হলো চট্টগ্রামের মাটিতে স্বাধীন ভারতের পতাকা। 

সার্জন দত্তকে ইতিহাসে পেয়ে বসেছে। এরই মধ্যে বেশ খানিকটা সময় চলে গেছে। এক-দুবার তাকে মূল বিষয়ে ফেরাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে টিভি রিপোর্টার। 

-তারপর কী হলো জান? ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ চট্টগ্রামকে স্বাধীন ঘোষণা করল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অধিনায়ক সূর্য সেনকে মিলিটারি কায়দায় স্যালুট জানাল। 

চলবে...

১ম পর্ব

২য় পর্ব

৩য় পর্ব