ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩১, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪

মন ভালো নেই

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৪, ০৫:১২ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৪, ০৫:১২ পিএম
মন ভালো নেই
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

মন মরে গেলে,
মানুষ মরে যায়।
বন পুড়ে গেলে
বন্যপ্রাণীর মন মরে যায়।

এ সপ্তাহের নতুন বই

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০২:০৬ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০২:০৬ পিএম
এ সপ্তাহের নতুন বই

গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে হলে ভালোমানের বই পড়ার বিকল্প নেই। হতে পারে, আপনি এমন একটি বই পড়লেন, যা আপনার পুরো জীবনটাই বদলে দিল। এ প্রসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগো বলেছেন, ‘পড়তে শেখা মানে আগুন জ্বালানো, বানান করা প্রতিটি শব্দাংশ একটি স্ফুলিঙ্গ।’…

বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য
আহমদ শরীফ
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: আগামী প্রকাশনী, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ১০২৮; মূল্য: ২৫০০ টাকা

মধ্যযুগ ও আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যবিষয়ক অসংখ্য ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হলেও সেই দীর্ঘ তালিকায় যাকে বলে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, তার অনুপস্থিতি ছিল দীর্ঘদিন। কলকাতার ইতিহাসকারগণ মুসলমান লেখকের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। অন্যদিকে ঢাকার ইতিহাসকাররা শ্রমসাধ্য এ কাজে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসা ও জ্ঞান নিয়ে আত্মনিয়োগ করেননি। ফলে বাঙালির ও বাংলা সাহিত্যের শত ইতিহাসের ভিড়েও মেলে না ইতিহাসের কোনো পূর্ণ অবয়ব। এ কারণেই মধ্যযুগের ইতিহাস রচনায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তার সেই অপূর্ণ স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন তার সুযোগ্য উত্তরসূরি ড. আহমদ শরীফ। দীর্ঘকাল গবেষণার ফলে যে জ্ঞান, তত্ত্ব, প্রজ্ঞা ও বোধি তিনি অর্জন করেছেন তার স্বাক্ষর রয়েছে এ গ্রন্থের পাতায় পায়ায়।...

নজরুল ইসলাম: কালজ কালোত্তর
আবদুল মান্নান সৈয়দ
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ১৭২; মূল্য: ৪০০ টাকা

রবীন্দ্রনাথের পরেই কবিতায় যে বহুমুখী প্রতিভার নাম করতে পারি আমরা, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। বৈপরীত্যকে আর কোনো বাঙালি কবি এমন একসঙ্গে আমন্ত্রণ জানাননি। উত্তাল আবেগের কবিতা, সূক্ষ্মতম ইন্দ্রিয় অনুম্পনের কবিতা, ব্যঙ্গ-তীক্ষ্ণ কবিতা; সামাজিক কবিতা, প্রমিক কবিতা, লিরিক কবিতা, নাটকীয় কবিতা, কাহিনিকাব্য- একজন কবি জীবনের কবিতাকে এক বিরাট অর্কেস্ট্রার মতো ধারণ করেছেন। কবিতার বাইরেও তার বিরাট বিচিত্রতাও নিশ্চিয় অবিস্মরণ দ্যুতিময়। তার গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ চর্চা, পত্রিকা সম্পাদনা ও পরিচালনা, অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনা, গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বক্তা হিসেবে দক্ষতা- সব মিলেই নজরুল। বিশেষ করে তার গানের কথা বলব, যে গানের অনেকগুলো কবিতা হিসেবেই বিবেচ্য এবং যে গানের বিষয় ও সুরের বিচিত্রতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গীতিকারদের তুল্য। না মেনে উপায় নেই, রবীন্দ্রনাথের পরে আর কোনো লেখকের মধ্যে এত বিচিত্র বিষয়ে এত বিপুল সাফল্য অর্জিত হতে দেখা যায়নি।...

বাঙালির চার ট্র্যাজিক নায়ক 
রকিবুল হাসান
শ্রেণি: সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিষয়ক প্রবন্ধ
প্রকাশনী: গ্রাফোসম্যান পাবলিকেশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ, ২০২৪
পৃষ্ঠা: ১২৮; মূল্য: ৪৫০ টাকা

বাঙালির আবেগ-মননশীলতা, সংগ্রাম-সংঘর্ষ-বিপ্লবের পাশাপাশি রয়েছে তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির গৌরব ও বিয়োগান্তক ইতিহাসও। এই ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই ইতিহাসে যেমন ছাপ রেখেছেন বাঙালির প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তেমনি পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামও। অন্যদিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যেমন প্রাণবিসর্জন দিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে তরান্বিত করে গেছেন বিপ্লবী বাঘা যতীন, তেমনি সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালিকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড, তথা রাষ্ট্র উপহার দিয়ে গেছেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই গ্রন্থে এই চারজনের কর্ম ও জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ অন্য সব ট্র্যাজিক নায়কের কীর্তি ও পরিণতিকে ছাপিয়ে গেছে। এই কারণে এই চারজনকে নিয়ে বর্তমান গ্রন্থ।...

Swift River 
সুইফট রিভার
এসি চেম্বার্স
প্রকাশনী: সিমোন অ্যান্ড সাস্টার, নিউইয়র্ক     
প্রকাশকাল: ৪ জুন ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৩০৪; মূল্য: ২৭.৯৯ ডলার 

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নির্বাহী এসি চেম্বার্স এখন কথাসাহিত্যিক হিসেবে পাঠকের মন জয় করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস, লসঅ্যাঞ্জেলেস টাইমসসহ আরও কয়েকটি পত্রিকার জরিপে তার উপন্যাস বেস্ট সেলারের তকমা পেয়েছে। তার সাম্প্রতিক উপন্যাসের নাম ‘সুইফট রিভার’। এ উপন্যাসের কাহিনি তৈরি হয়েছে মা-মেয়ের জটিল পারিবারিক সম্পর্ক, বাবার অন্তর্ধান এবং নিউ ইংল্যান্ডের পতিত এক শহরের দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস নিয়ে। ১৯৮৭ সালের সামারে ডায়মন্ড নিউবেরির মা তাকে জানায়, ডায়মন্ডের বাবা হয়তো আর ফিরে আসবে না। তার মৃত্যুর কথা বিমা কোম্পানিকে নিশ্চিত করতে হবে; না হলে ব্যাংকের নিকট থেকে বাড়ি ফিরে পাওয়া যাবে না।

Icon and Inferno
আইকন অ্যান্ড ইনফার্নো
মেরি লু
প্রকাশনী: রোরিং বুক প্রেস, নিউইয়র্ক     
প্রকাশকাল: ১১ জুন ২০২৪
পৃষ্ঠা: ৩২০; মূল্য: ১১.৯৯ ডলার 

বেস্ট সেলিং ‘ইয়াং এলিটস’ সিরিজের লেখক মেরি লুর নতুন উপন্যাসের নাম ‘আইকন অ্যান্ড ইনফার্নো’। রোমান্স-রহস্য মেশানো এ উপন্যাসের কাহিনিতে প্রধান চরিত্র হয়ে এসেছে সুপারস্টার উইন্টার এবং গুপ্তচর সিডনি কোসেট। লন্ডনের সবচেয়ে খারাপ লোকটাকে ধরার জন্য তারা বিপজ্জনক এক মিশনে নেমে পড়ে। অন্য লোকদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় তারা। কাজ শুরু করার পর উইন্টার সিডনির কথা মন থেকে সরাতে পারে না। অন্যদিকে সিডনি চেষ্টা করে উইন্টারের প্রসঙ্গে বেভুল থাকতে। প্রায় এক বছর পর ফিরে আসে সিডনি। তবে এবার তাদের মিশন আর শুধু কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এ মিশনের গুরুত্ব। উদ্ধারকাজ মনে হচ্ছে, খুনের ঘটনার দিকে মোড় নিচ্ছে। পুরনো আগুন আবার জ্বলে ওঠার কারণেই উইন্টারকে আরও এগিয়ে যেতে হচ্ছে।...

আলোর পথে

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৯ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
আলোর পথে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

আমি যখন আলো খুঁজি 
আলো তো কোথাও পাই না,
আলো কি আদৌ আছে কোথাও?
আছে তো শুধু অন্ধকার! 
না! অন্ধকারের মাঝেই
আলোকে চিনে নিতে হয়।

ভালোবাসা কি কোথাও আছে? 
ভালোবাসা তৈরি করতে হয়! 
ভালোবেসে ভালোবাসা শেখাতে হয়।
মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে হয়,
বিমুখ হলে তো ভালো কিছু হবে না,
পতন আর ধ্বংস ছাড়া। 

মনুষ্যত্ব যার মধ্যে আছে 
সেই শুধু পারবে 
অন্যকে আলোর পথ দেখাতে,
ভালোবেসে ভালোবাসা শেখাতে।

শূন্যতা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৭ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৭ পিএম
শূন্যতা
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

সারি সারি ছায়াচ্ছন্ন মানুষের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাই 
এখানে শরীরে রাত্রি
কিন্তু নিরালম্ব শূন্যতায় মেঘের ওপরে দিবালোক
মানুষের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে সচকিত চারপাশ
কেউ সযত্ন চুমুক দিচ্ছে পানীয়পাত্রে

আমি তোকে রেখে এসেছি সেখানে
মানুষ যেখানে মানুষের দেহ থেকে আত্মা পর্যন্ত সবকিছু নির্বিকার খেয়ে ফেলে
এবং তা উদযাপন করে দল বেঁধে

আসলে আমরা প্রত্যেকেই সিঁড়ি খুঁজি 
আর সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে চাই ওপরে
আরও ওপরে
যদিও সিঁড়ির নিচে মাটি
ওপরে শূন্যতা

তুমি বন্ধু আড়ালে ছুরির ফলা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৩ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৭ পিএম
তুমি বন্ধু আড়ালে ছুরির ফলা
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

তুমি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্র্যাকেটে বিদ্বেষ
যখন উজ্জ্বল আকাশ আয়না হয়ে যায়
সেখানে তোমার মুখ কী যে মোহময়
‘ও বন্ধু আমার’ তুমি শুধু বন্ধু নও
তোমাকে উজার করে বন্ধুতার যত প্রেক্ষাপট
দিয়েছি প্রত্যক্ষ করে 
সারা দিন আপ্তবাক্য মুখোশে মুখোশে
আড়ালে ছুরির ফলা উদ্যত সঙ্গীন
ঘনিষ্ঠ বন্ধু তুমি ব্রুটাসের মতো
আমাকেই প্রতিদিন নির্দ্বিধায় হত্যা করে ফেলো।

সম্ভ্রম

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৩৯ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
সম্ভ্রম
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

বাজারে যে মেয়েটি কলমি শাক নিয়ে বসে, তার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন দেখা হয় অরিন্দমের। আজ যেমন, সকালে বাজারের মুখে দেখা হতেই মেয়েটি বলল, কটা আঁটি রাখব বলে দিয়ে যাও। খুব বেশি তুলতে পারিনি আজ।

কেন পারিসনি?

বাবার খুব জ্বর। সেই তো আমাকে পুকুরে নামিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ বলল, পারব না। তাই ধার ধার থেকে যা পেরেছি নিয়ে এসেছি।
দুটো রাখ। বলে বাজারের মধ্যে ঢুকে গেল অরিন্দম। 

মেয়েটির নাম পারু। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিবিরহাটের কাছের কোনো গ্রাম থেকে সে বেহালা বাজারে শাক নিয়ে আসে। এই ব্যবসা তাদের বংশপরম্পরার। ঠাকুমা থেকে মা। তারপর পারু। ক্লাস ফোরে পড়তে পড়তে মা মারা গেল, বাবা জনমজুর খাটে। এখন হাতের 
কাজ করে না। তাই পারুর ভবিষ্যৎ যে কলমি শাকে থামবে, এ আর আশ্বর্য কী! 

অরিন্দমের বাজারের অনেক কায়দা। সে খুব সকালে বাজারে ঢোকে না বটে, কিন্তু তার সব বাঁধা দোকান। আলু-পিঁয়াজের জন্য রামুর দোকান, মাছের জন্য দেবার আর ফলের জন্য বিশুর দোকান। সবজি সে খাবলা মারে এ দোকানে ও দোকানে। পারুর দোকান থেকে শাক তুলে সে বাড়ি ফেরে। 

এই মেয়েটিকে নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবে অরিন্দম। কত আর বয়স? এই বয়সে ভোরে শীতের দিনে, বর্ষার দিনে শাক ঘাড়ে করে এত দূর আসে! কেউ তো দেখার নেই। মায়াকারা মুখ, সর্বদা হাসি লেগে আছে মুখে। মেয়েটি অরিন্দমের কেউ নয়, তবু কেন তার কথা মনে হয়? আজ ফেরার সময় পারু প্রশ্ন করল, এত দেরি করে বাজারে আস কেন তুমি? সকাল সকাল এলে তোমাকে দিয়ে বউনি করতে পারি। তার এই প্রভাতী মৃদু শাসনটা বেশ লাগে অরিন্দমের। অরিন্দম বলল, ঠিক বলেছিস। এবার ভোরে উঠে আসার চেষ্টা করব। 

কিন্তু খুব ভোরে কোনো দিনই ওঠার অভ্যাস নেই অরিন্দমের। কী শীত, কী গ্রীষ্ম কোনো দিনই সে ৭টার আগে বিছানা ছাড়ে না। প্রতিদিনের তার এই অভ্যাস প্রায় ৩০ বছরের। কিন্তু সে কথা তো পারুকে বলা যায় না। আর বলবেই বা কেন? তার সঙ্গে তো খালি শাকের কেনাবেচার সম্পর্ক! 

টাটকা শাকের প্রতি অরিন্দমের একটা আলাদা আগ্রহ। তা কেবল টাটকা, নধর বলে নয়, তাদের এই নাগরিক জীবনে এই সবুজ শাকের মধ্য দিয়েই যেন প্রকৃতি সংসারে ঢোকে। বাজারের ব্যাগ থেকে শাকের সবুজ ডগাগুলো বেরিয়ে থাকলে কেমন যেন গ্রামের গন্ধও তার সংসারে ঢোকে। মনে হয় সেই ছোটবেলায় হাটবসন্তপুরে আছি। পদ্ম দিদি স্কুলে কাজে আসার সময় জমি থেকে নরম মাটিসমেত পালং কিংবা বেতো শাক তুলে এনেছে। 

পারুকে দেখলে কে বলবে সে এই বয়সেই বাপের সর্বক্ষণ খেয়াল রাখে? বনবিবিতলায় তাদের একচালা ঘরের বাইরে একচিলতে জায়গা ঘিরে যে বসতবাড়িটি হেমন্ত করেছিল বছর দশেক আগে, সেই বাড়ির আর উন্নতি হয়নি। কী করে হবে? স্বাধীনতার এত দিন পরও দিনমজুরের ভাগ্য একটুও খুলল না। সে দিনমজুরই থেকে গেল। ভাগ্যিস ছেলে নেই। মেয়ে, পরে বিয়ে হবে। অথচ কোটি কোটি টাকা নাকি খরচ হচ্ছে জনকল্যাণের নাম করে। কোথায় যায় সেসব টাকা? হেমন্ত বা পারুর গায়ে তো লাগে না সেসব টাকার একটু গরম বাতাস? কথাটা অনেক দিন ভেবেছে অরিন্দম। কাজের ব্যস্ততায় কি এসব কথা মাথায় আসে? আসে না। বাজারে ঢুকেই তার চোখের সামনে পারুর মতো অনেককে দেখে। কেউ শাক, কাঁচা কলা, লেবু, মোচা এসব নিয়ে বাজারের এখানে-সেখানে বসে পড়ে সকালেই। অরিন্দমের মনে পড়ে কোনো এককালে হাটবসন্তপুরে এমনি লোকেদের দেখেছে সে। এতদিন গেল সেই মানুষের পরিবর্তন আর হলো কই? সেই দারিদ্র্য-আক্রান্ত মানুষগুলো যেন হাটবসন্তপুর থেকে এই বেহালার বাজারে এসে বসেছে আজ। অথচ এই মানুষের সেবায় নাকি রাজনীতির দলেরা সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করে?

পারুর বসার জায়গাটা বাজারের সামনেই। এখানে বসা নিয়ে একবার খুব গোলমাল হয়েছিল। খুব ঝগড়া করেছিল একজন। পরে সাধারণ মানুষের অনুরোধে, পারুর বয়স বিবেচনা করেই তাকে বসতে দিয়েছিল বাজারের মালিক। সেই দাক্ষিণ্যে সে রোজ তার কাছে এক আঁটিতে এক আঁটি ফ্রিতে শাক নেয়। এই কথাটা পারু কাউকে বলেনি। একদম চেপে গেছে। 
 
পারুকে নিয়ে বাজারে নানান আলোচনা হয়, সেটা পারু জানে। আঠারো বছরের মেয়ে, টানা দুটো চোখে পুকুরের গভীরতা, পান পাতার মতো মুখের সীমান্ত রেখা। চারপাশে হাসি ছড়িয়ে যখন সে কথা বলে তখন তার কথা না শুনে উপায় থাকে না। তাকে নিয়ে ফলের দোকানের ছেলেটার অনেক দিনের লক্ষ্য, পারু সে কথা জানে। তার সেই বাবলুর দিকে সে যখন তাকায় তখন আর বাবলু কথা খুঁজে পায় না। তাই বাবলুর ফলের বিক্রি তুমুল হলেও মনটা তার খুব বিষণ্ন থাকে। কিছুতেই সে ব্যবসার সাফল্য উপভোগ করতে পারে না। আর দু-একজন যে তার দিকে তাক করে নেই তা নয়, তবে সেগুলোকে পারু ততটা ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। সবগুলোকেই তার মেনি মুখ মনে হয়।

এই বাজারের একটি সুবিধা এই যে, এক এক জিনিসের একাধিক দোকান, নানান দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে। তাই দরদাম করা অনেক সোজা। অরিন্দমের বাঁধা দোকান কিন্তু আজ সে থোড় খুঁজতে অনেক সময় কাটিয়ে দিয়েছে বাজারে। শেষে সে পারুর কাছে ফিরে আসতেই পারু তার ব্যাগে দুটো কলমি শাকের বান্ডিল ছুড়ে দিয়ে বলল, কথাটা মনে থাকে যেন। 

অরিন্দম বলল, মনে থাকবে। কিন্তু তুই আমাকে দিয়ে বউনি করতে চাস কেন? 
-করলে সেদিন আমার সব মাল বিক্রি হয়ে যায়। সে তুমি 
বুঝবে না। 
অরিন্দম বলল, তাই নাকি? বাজে কথা।
পারু বলল, ওই তো? সত্যি কথা তোমরা বিশ্বাস কর না। মিথ্যে কথা শুনতে শুনতে তাকেই সত্যি ভাব। হায় গো কাকা। কালীর দিব্বি।
অরিন্দম, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, পারুর দিকে। 
তোর বাবার কী হয়েছে বললি না তো? পারু বলল, কোভিডের পর থেকেই তো পড়ে গেছে। সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকে, কাজকম্মো আর করতে পারে না। এই আমার ওপর ভরসা। চেহারাটা একেবারে ঝরে গেছে। তার ওপর শ্বাসের কষ্ট। 
কিছু না বলে বাড়ির দিকে পা বাড়াল অরিন্দম। 
 
বেশ কয়েকদিনের জন্য অফিসের কাজে বাইরে যেতে হলো অরিন্দমকে। মাধবীর কাছে একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল, এই নম্বরে ফোন করে বাজারের সব বলে দিও। বাড়িতে দিয়ে যাবে। কুড়ি টাকা ডেলিভারি চার্জ নেবে। দিয়ে দিও। ভালো ছেলে বাসব। মাধবীর কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়, মাধবী তা জানে। কোভিডের সময় থেকে এই সিস্টেম চালু হয়েছিল। এখনো আছে। কোভিড চলে গেলেও এই সিস্টেম আজও বেঁচে আছে বয়স্ক মানুষের জন্য। 

টু্র থেকে ফিরে বাজারে গিয়ে দেখল পারু জায়গায় নেই। আসেনি। একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে জানাল, আসছে না কদিন। কারণটা কেউ জানে না। বাবার আবার কিছু বাড়াবাড়ি হলো নাকি? পারুর কাছে শাক না কিনলে বাজারটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এমনি মনে হয় অরিন্দমের। 

কদিন পর অরিন্দম বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ল পারুর। অরিন্দমকে দেখে যেভাবে হাসে পারু, সেভাবে হাসল না। সে বসে আছে তার নিজের জায়গায়। তার সামনে অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি শাক, সঙ্গে লেবু, কাঁচা আম, থর সাজানো। তার পাশে ছেঁড়া জিন্স পরে একটা অপরিচিত ছেলে। তাকে কোনোদিন দেখেনি অরিন্দম।

অরিন্দমকে দেখে পারু বলল, অনেক দিন পরে এলুম। 
আসিসনি কেন? আমি খোঁজ করছিলাম। 
জানি তুমি করবে। 
এত শাক তুললি কী করে, এত সবজি?
আমি একা করিনি। ওই যে আমার বয়ফ্রেন্ড। ওই জোগাড় করে দিয়েছে। 
বয়ফ্রেন্ড? শুনে চমকে উঠল অরিন্দম। ছেলেটিকে ভালো করে দেখল অরিন্দম। তারপর জিজ্ঞেস করল, কোথায় ছিলি এত দিন?
-হাসপাতালে। দেখ না, একদিন রাতে এমন হাঁপানি উঠল। সেই কোভিডের সময় যেমন হয়েছিল একদিন। বেশ ছিল। হঠাৎ সেদিন রাতে বড্ড বাড়াবাড়ি হলো। সবাই মিলে হাসপাতালে নিয়ে গেলুম। 
-তোদের ওখানে হাসপাতাল আছে? আছে, তবে ডাক্তার নেই। দুজন হাতুড়ে ডাক্তার চালায়। তারাই ভর্তি করে নিল। ছিল দিন তিনেক। তারপর শহর থেকে ডাক্তার আসার কথা ছিল। এল কিন্তু বাঁচাতে পারল না। পাঁচ দিনের মাথায় চলে গেল। 
মারা গেল? প্রায় আঁতকে উঠল অরিন্দম।
-তা নয় তো কী। চোখের ওপর মানুষটা দম আটকে মারা গেল। কম্পাউন্ডার বলল, অনেক অঙ্গ নাকি ভিতরে পড়ে গেছে। বাঁচানো মুশকিল।
কেন, কলকাতায় আনা গেল না?
-পয়সা কোথায় যে আনব? আমার হাতে যা ছিল, শ্মশান ঘাটেই শেষ। 
ঠিক কী উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না অরিন্দম। ওর কাছে তো তার মোবাইল নম্বর নেই, না সে তার বাড়ি চেনে। জানলে কিছুটা সাহায্য করা যেত। সেটা ভেবে এখন আর কোনো মানেই হয় না।
পারু তাকিয়ে রইল অরিন্দমের দিকে। তারপর বলল, আজ তোমায় দু-আঁটি শাক বেশি নিতে হবে। সবাইকেই বলছি। অন্য সবজিও নিতে পার। এই দেখ না। এসব নিয়ে এসেছি যাতে বিক্রি করে বাবার কাজটা করতে পারি। হাতে একদম পয়সা নেই। 
আরে সে না হয় আমি…

না না তা কখনো হয়? থামিয়ে দিয়ে পারু বলল, যা শাক ও সবজি এনেছি তা সব বিক্রি হলে বাবার কাজটা ভালোভাবেই চলে যাবে। আমি আর বিমল সামলে নেব। আজ আমার কাছ থেকে যা চাও, নাও, বলেই শাকের আঁটি দুহাতে তুলে ধরলে অরিন্দম বাজারের ব্যাগটি এগিয়ে দেয় পারুর দিকে। 
আর সেই মুহূর্তে অরিন্দম দেখল, কী অসীম সম্ভ্রমবোধ পারুর চোখে ঝলমল করছে তার দারিদ্র্যকে ছাপিয়ে। সে দাঁড়িয়ে আছে একটি জীবনের শেষপ্রান্ত বিন্দুতে আর তাকিয়ে আছে নতুন এক জীবনের রুপালি রেখার দিকে।