জাপান- প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা ও কর্মদক্ষতার এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু দেশটির সাফল্যের আরেকটি শক্ত ভিত হলো নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু। যখন বিশ্বের বহু উন্নত দেশ স্থূলতার মহামারিতে আক্রান্ত, তখন জাপান নিয়েছে এক ভিন্ন পথ। ২০০৮ সালে তারা চালু করে বহুল আলোচিত ‘মেটাবো আইন’, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
‘মেটাবো’ শব্দটি এসেছে ‘মেটাবলিক সিন্ড্রোম’ থেকে। একটি জটিল শারীরিক অবস্থা, যা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। জাপান সরকার বুঝতে পেরেছিল, নাগরিকদের গড় আয়ু দীর্ঘ হলেও যদি তারা জীবনের শেষভাগে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগে, তবে তা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ তৈরি করবে। তাই তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই অগ্রাধিকার দেয়।
২০০৮ সালে জাপানে প্রবর্তিত এ স্বাস্থ্যনীতি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত ‘স্পেসিফিক হেলথ চেকআপ অ্যান্ড স্পেসিফিক হেলথ গাইডেন্স’ কর্মসূচি নামে। এটি মূলত ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক বার্ষিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা। এর উদ্দেশ্য কেবল রোগ নির্ণয় নয়; বরং রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ আইনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো কোমরের মাপ নির্ধারণ। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরুষদের জন্য সর্বোচ্চ ৮৫ সেন্টিমিটার এবং নারীদের জন্য ৯০ সেন্টিমিটার সীমা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক কঠোর। জাপানিদের বিশ্বাস, পেটের ভিসারাল ফ্যাট নিয়ন্ত্রণে রাখলেই অধিকাংশ জীবনযাপনজনিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জাপানে মোটা হওয়া কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ব্যক্তিকে সরাসরি জরিমানা বা কারাদণ্ড দেওয়া হয় না। বরং এটি একটি নজরদারি ও পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শে পাঠানো হয় এবং তাকে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রথম ধাপে তিন মাসের জন্য নির্দিষ্ট ডায়েট চার্ট ও ব্যায়াম পরিকল্পনা অনুসরণ করতে বলা হয়। নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। উন্নতি না হলে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালু হয়। অর্থাৎ শাস্তির পরিবর্তে সচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনই এখানে মূল কৌশল।
তবে দায়বদ্ধতার বিষয়টি ব্যক্তির চেয়ে বেশি আরোপ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির ওপর। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক জরিমানা বা স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে করপোরেট জাপানে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, অফিসে ব্যায়াম বিরতি এবং পুষ্টিকর খাবারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যনীতি বাস্তব ফলও দিয়েছে। জাপানে স্থূলতার হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম- প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বহু দেশে এ হার বহু গুণ বেশি। সুস্থ কর্মশক্তি জাপানের উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করেছে।
অবশ্য সমালোচনাও কম নয়। অনেকে মনে করেন, কেবল কোমরের মাপ দিয়ে স্বাস্থ্য বিচার করা বৈজ্ঞানিকভাবে সবসময় যথাযথ নয়। কারও পেশির গঠন বা উচ্চতার পার্থক্য উপেক্ষিত হতে পারে। আবার কেউ কেউ একে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা ‘বডি শেমিং’-এর শামিল বলেও অভিহিত করেছেন। তবুও রাষ্ট্রীয় নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি প্রিভেনশন-ভিত্তিক সামাজিক প্রকল্প।
জাপানের মেটাবো আইন শাস্তিমূলক নয়; বরং সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো। এখানে বার্তা একটাই- স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। কোমরের মাপ নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও ব্যয়সংকোচী রাষ্ট্র গঠন। জাপান দেখিয়েছে, সুস্থ নাগরিকই একটি সমৃদ্ধ জাতির আসল ভিত্তি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)