ইতালির তস্কানি অঞ্চলের রাজধানী ফ্লোরেন্সের এক পুরোনো জাদুঘর ‘মুজেও গ্যালিলিও’। সেখানে হাজারো প্রাচীন যন্ত্রপাতির ভিড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে একটি বিশেষ কাচের বাক্সের সামনে। ভেতরে রাখা হলুদ হয়ে যাওয়া একটি মানুষের হাড়। দর্শনার্থীরা থামেন, কেউ বিস্ময়ে বিমূঢ় হন, কেউবা অস্বস্তিতে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেন। একটি প্রশ্ন সেখানে নীরবে ভেসে বেড়ায় কার এই মধ্যমা আঙুল? কেন এটি এখানে নির্জন বন্দি হয়ে আছে?
এই আঙুলটি এমন একজন মানুষের, যিনি একদা আকাশের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন সত্য সব সময় খালি চোখে পড়ে না, তবু তা সেখানেই থাকে অদৃশ্য অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি।
যে সময় আকাশের ব্যাখ্যা ছিল কেবল অন্ধবিশ্বাসের দখলে, তখন গ্যালিলিও দূরবীক্ষণের কাচে চোখ রেখে দেখলেন অন্য এক ধ্রুব বাস্তবতা। তিনি এমন সব প্রমাণ উপস্থাপন করলেন যা পৃথিবীর গতিশীলতার ধারণাকে অকাট্যভাবে সমর্থন করে। কোপার্নিকাসের সেই বৈপ্লবিক তত্ত্ব পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে তাকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন গ্যালিলিও। বৃহস্পতির উপগ্রহগুলোর ঘূর্ণন কিংবা শুক্র গ্রহের দশা পরিবর্তন জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই প্রতিটি তথ্য ছিল তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর বিরুদ্ধে এক নির্ভীক বিদ্রোহ। আর সেই সত্যের পথই তাকে নিয়ে গেল বিচারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
আরো পড়ুন: দুই বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন যে সম্রাট
১৬৩৩ সাল। রোমান ইনকুইজিশন গ্যালিলিওর বিচার শুরু করে তার কণ্ঠ রোধ করার উদ্দেশ্যে। প্রচণ্ড চাপের মুখে তাকে তার বৈজ্ঞানিক মতবাদ আংশিকভাবে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। জীবনের শেষ ৯টি বছর কাটে গৃহবন্দি অবস্থায়। তিনি বেঁচে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার দৃষ্টিকে করে দেওয়া হয়েছিল সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্র আর ধর্ম যেন সেদিন ঠিক করে দিতে চেয়েছিল আকাশ দেখার অধিকারটুকুও!
১৬৪২ সালে গ্যালিলিওর মহাপ্রয়াণ ঘটে। এর প্রায় ৯৫ বছর পর, ১৭৩৭ সালে যখন তার দেহাবশেষ ব্যাসিলিকা অব সান্তা ক্রোচে নামক ইতালীয় গৌরবের মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হচ্ছিল, তখন সময়ের চাকা ঘুরে গেছে। মাইকেলেঞ্জেলো এবং ম্যাকিয়াভেলির মতো মহাপুরুষদের পাশে স্থান পেলেন একসময়ের দণ্ডিত গ্যালিলিও।
কিন্তু সেই সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বিচিত্র। সমাধি স্থানান্তরের সময় সংগ্রাহক ও ঐতিহাসিকরা কৌতূহলবশত তার দেহ থেকে তিনটি আঙুল, একটি দাঁত এবং মেরুদণ্ডের একটি কশেরুকা আলাদা করে নেন। মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ব্যক্তিদের দেহাবশেষ বা ‘রেলিক’ সংগ্রহ করা ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আভিজাত্য। সেই ঐতিহাসিক বাতিক থেকেই গ্যালিলিওর হাতের মধ্যমা আঙুলটি আজ এই কাচের বাক্সে সংরক্ষিত। এখানেই জন্ম নেয় এক চরম পরিহাসের।
যে মানুষকে জীবদ্দশায় বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল, মৃত্যুর পর তার শরীরই হয়ে উঠল পরম পূজনীয় এক বস্তু। তার চিন্তাকে যে সমাজ একসময় ভয় পেয়েছিল, সেই সমাজই আজ তার আঙুলকে মিউজিয়ামের শোকেসে সাজিয়ে রেখেছে। এই আঙুল, যা হয়তো একসময় দূরবীক্ষণ যন্ত্রের নব ঘোরাত কিংবা আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে নির্দেশ করত, তা আজ স্থবির। সে আর কোনো ছায়াপথের দিকে ইশারা করে না। তবু অদ্ভুতভাবে সেই মৃত হাড়ের টুকরোটি যেন এখনো কিছু একটা নির্দেশ করে হয়তো তা বাইরের মহাকাশের দিকে নয়, বরং আমাদের ভেতরের সত্যের দিকে।
মানুষের এক অদ্ভুত প্রবণতা আছে; সে চিন্তার চেয়ে চিহ্নকে বেশি ভালোবাসে। দর্শনের গভীরতায় অবগাহন করার চেয়ে বস্তুগত উপস্থিতিতে সে বেশি নিশ্চয়তা খোঁজে। তাই সমাজ একটি আঙুল সযত্নে সংরক্ষণ করে ঠিকই, কিন্তু সেই আঙুল যে সত্যের দিকে নির্দেশ করেছিল, সেই ধ্রুব সত্যের সামনে দাঁড়াতে আজও আমাদের পা কাঁপে। আমরা পাঠ্যবইয়ে তার তত্ত্ব পড়ি, তার নামে মানমন্দির বানাই, ইতিহাসে তাকে বীরের মর্যাদা দিই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আমরা কি তার মতো করে সত্যের পাশে দাঁড়ানোর সৎ সাহসটুকু অর্জন করতে পেরেছি?
তারেক/
.jpg)
.jpg)