ঢাকা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বাজেট অধিবেশন বসছে আজ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ জনগণের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা: সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী দৌলতদিয়া ফেরিতে বাস দুর্ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল মধুখালীতে জাল সনদে মাদরাসায় চাকরির অভিযোগ তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর গাইবান্ধায় ট্রেন থেকে পড়ে পা বিচ্ছিন্ন হওয়া সেই যুবকের মৃত্যু দৈনিক খবরের কাগজের শাকিলা ববিসহ সিলেটের ৬ সাংবাদিকে প্রেস লিগেসি অ্যাওয়ার্ড প্রদান নড়াইলে বাস উল্টে আহত ১৫ দক্ষিণ এশিয়ার মুকুট হারাল বাংলাদেশ নড়াইলে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে নিহত ২ সরু একটি আইলই এখন তাদের আশ্রয়স্থল ১২০০ ফুট লম্বা পতাকা নিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের র‍্যালি কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার ৩ যাত্রী নিহত শহিদ জিয়ার প্রস্তাবে যুদ্ধের নাম হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অথচ বাজেট বরাদ্দ তলানিতে ঢাকায় শুরু হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী অধস্তনকে চড় মারায় সিলেটের এক নির্বাচন কর্মকর্তাকে লঘু দণ্ড তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় দেশ, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জাপা চেয়ারম্যানের দেশীয় প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করবে সরকার আরেকবার সাফের ফাইনালে ঋতুপর্ণার গোল দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে মাটির নিচ থেকে উঠছে ধোঁয়া, এলাকায় চাঞ্চল্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৩ জন গ্রেপ্তার দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩ এক টুকরো হৃদয়ের নাম বাংলাদেশ রামিসার  মামলার  দ্রুত রায় মা হচ্ছেন সোহিনী গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় নিহত পাঁচজন চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
Nagad desktop

পাঠকের গল্প : যে সম্পদ ভোগ করা যায় না

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ১২:৪০ পিএম
পাঠকের গল্প : যে সম্পদ ভোগ করা যায় না
ছবি: এআই জেনারেট

নিজের কিশোর বাচ্চার জ্বরের চিকিৎসা নিতে আমার বাড়ির অদূরে একটি বাজারের ফার্মেসিতে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। ডাক্তার ভদ্রলোককে আমি চিনি কয়েক যুগ হলো। ডাক্তার সাহেব শুরুর দিকে একটি দাতব্যলয় প্রতিষ্ঠানে বেতনে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে বাজারের একটি ফার্মেসিতে বসেই তিনি রোগী দেখছেন। বাড়ি জেলা শহরের মধ্যে। তিনি সকালের শিফটে রোগী দেখা শেষ করে ছয় কিলোমিটার দূরে তার নিজ বাড়িতে রিকশায় চড়ে যান। দুপুরের খাবার আর বিশ্রাম শেষে চেম্বারে আসেন আবার বিকেলে। তবে তিনি তার পুরো পরিবার নিয়ে বসবাস করেন পুরান ঢাকায়।

তিনি দীর্ঘদিন একই জায়গায় বসে প্র্যাকটিস করার কল্যাণে তার বিরাট একটা পরিচিতি লাভ হয়েছিল। রোগীরা লাইন ধরেন তার চেম্বারে। তাকে দেখাতে গেলে রীতিমতো বড় ধরনের সিরিয়ালের ফাঁদে পড়তে হয়। সব সময়ই রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। বিশেষ করে শিশু রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাতযশ তার খুবই ভালো। তা ছাড়া এ বাজারের আশপাশে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় তার একচেটিয়া আধিপত্য বলা চলে এখানে। 

তার চেম্বারে রোগীর সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ কোম্পানি আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদেরও যথেষ্ট ভিড় লক্ষ করা যায়। এমন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় হঠাৎ করেই বাজারের চতুর্মুখী মোড়ে একজন ডাক্তার এলাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। আর এ সুযোগেরই তিনি ষোলোআনা ব্যবহার করেন। তিনি চেম্বার পরিবর্তন করে চার রাস্তার মোড়ে চলে আসেন। এখন জনসমাগমস্থানে এসে প্র্যাকটিস শুরু করায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আমার বাচ্চাকে নতুন চেম্বারে দেখাতে গিয়ে একটা ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম। রোগীর ভিড় সামাল দিতে তার রুমে একসঙ্গে দুই থেকে তিনজন করে রোগী পাঠানো হতো।

আরো পড়ুন: পেট্রল-ডিজেলের বাংলা অর্থ জানেন?

রোগী অনেক বেশি। কিন্তু তাতে ডাক্তার সাহেবের তেমন কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি চেম্বারে প্রবেশ করেই আগে এসিটা চালু করেন। তারপর তার পিয়ন তার জন্য এক কাপ রং চা নিয়ে এলেন। তিনি দুধ চা খান না। বেশি দিন বাঁচবেন বলে তিনি খুবই স্বাস্থ্য সচেতন। তিনি খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে চা পান করছেন। চারদিকে রোগী থাকা সত্ত্বেও তার কোনো ভাবাবেগ নেই। চা পান করা শেষ হলে তারপর আগে ডাক আসে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের। তাদের সঙ্গে শুরু হয় খোশগল্প। তাতে রোগীরা বিরক্ত হলেও তার কিছু যায় আসে না। কারণ, তাদের কাছ থেকেও ডাক্তার সাহেবের বড় একটা বাণিজ্য আসে। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ শেষ হলে এবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এসে তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্যাড দিয়ে যান। এখানেই শেষ নয়। বাইরে আরও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা অপেক্ষা করতে থাকেন। তাকে যে মাসোহারা এবং বিভিন্ন ধরনের উপহার আর উপঢৌকন দিয়ে থাকেন তার সদ্ব্যবহার তিনি করেন কি না মানে তাদের কোম্পানির ওষুধ তিনি লিখলেন কি না; তা দেখার জন্য রোগীরা চেম্বার থেকে বের হলেই ওষুধের প্রেসক্রিপশন ছোঁ মেরে নিয়ে দেখতে থাকেন। এভাবেই চলছে আমাদের হাটবাজারের ডাক্তারদের নৈরাজ্য এবং অপবাণিজ্য। 

ডাক্তারের চেম্বারে আমার বাচ্চা নিয়ে প্রবেশের আগে একজন মুরুব্বি ভদ্রলোক মসজিদের ইমাম প্রবেশ করেছেন। তিনি ডাক্তার সাহেবকে দেখিয়ে ৪০০ টাকার বদলে  ৩০০ টাকা দিয়েছেন ফি বাবদ। অমনি ডাক্তারের কর্কশ ভাষা শুরু হলো। রোগী মুরুব্বি অনেক অনুনয়-বিনিময় করছেন। স্যার আমার কাছে আর টাকা নেই। তখন তিনি বলে বসলেন, আপনার কাছ থেকে আমি যে ফি বাবদ ৩০০ টাকা নিয়েছি এটা যদি আমার সংগঠন জানতে পারে তাহলে তারা আমাকে জবাই করবে। কেন আমি কমে রোগী দেখি। এ দৃশ্যটা আমার ভেতর কাঁপিয়ে দিল। একবার ভাবলাম তার বাকি ১০০ টাকা আমার কাছ থেকে দিয়ে দিই। কিন্তু হঠাৎ করেই দমে গেলাম। তিনি যদি আবার আমার ওপর নাখোশ হন। তিনি এত রোগী দেখেন। ওষুধ কোম্পানি থেকে ভাতা গ্রহণ করে থাকেন। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পুরো ৫০ শতাংশ কমিশন তো রয়েছেই। 

ডাক্তারের একটি ছেলে। ভারতে একটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে তখন ছেলেকে দেশের টাঙ্গাইলের শাহিন একাডেমিতে ভর্তি করেছেন। তিনি জেলা শহরের বাড়ি ছেড়ে পুরান ঢাকায় আলিশান ফ্ল্যাট কিনে সেখান থেকেই গাড়িতে চড়ে নিয়মিত আসতেন আমাদের বাজারে রোগী দেখতে। তার আভিজাত্য লুকিয়ে রেখে প্রতিদিন ঢাকা থেকে গাড়িতে চড়ে ধলেশ্বরী নদীর অপর পাড়ে গাড়ি রেখে আসতেন। গাড়ি নিয়ে এলাকায় ঢুকলে মানুষজন বলাবলি শুরু করবে ডাক্তার সাব তো মাল ভালোই কামাচ্ছেন। এটা যাতে কেউ টের না পায় সে জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি দূরে রেখে আসতেন। 

একদিন ফেসবুকের কল্যাণে দেখতে পেলাম অমুক ডাক্তার না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি হায় হায় করে উঠলাম। যে ডাক্তার একজন মসজিদের ইমাম ১০০ টাকা ফি কম দেওয়ায় তার ওপর রুষ্ট হলেন এখন সে ডাক্তারের আলিশান বাড়ি-গাড়িতে কে চড়বে। ব্যাংকে থাকা কাড়ি কাড়ি টাকা এখন কে ভোগ করবে? কত রোগীকে অকারণে টেস্ট দিয়ে হাতিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ লিখে মাসের পর মাস টাকা হাতিয়েছেন। আর রোগীর ফি তো আছেই। এখন অনৈতিকতার এত সম্পদের হিসাব তিনি কীভাবে দেবেন এটা ভেবেই আমি হায় হায় করে উঠলাম। 

যে সম্পদ মানুষ ভোগ করতে পারবে না কিন্তু মৃত্যুর পরই তার হিসাব শুরু হবে। তার হিসাব দিতে না পারলে তার সন্তান আর স্ত্রী সে পাপের ভাগ নেবে না। স্ত্রী-সন্তান ভোগ করবে আর পাপের বোঝা তাকেই একা ভোগ করতে হবে। এমন সম্পদ কি দরকার আছে? চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেশে যে হারে নৈরাজ্য চলছে তা শিউরে ওঠার মতো। মানুষের জীবনের অর্থের প্রয়োজন আছে। কিন্তু নৈতিকতা হারিয়ে অর্থ উপার্জন করলে তার ফলাফল তেমন ভালো হয় না। 

মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ

তারেক/

তারার দেশে সাইকেল যাত্রা

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
তারার দেশে সাইকেল যাত্রা
ছবি: সংগৃহীত

রাতের নিস্তব্ধতায় আপনি সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে চলেছেন। চাকার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার জ্বলজ্বলে নক্ষত্র। আপনার চারপাশে এক মায়াবী নীল আভা। মনে হবে, ডাচ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গগের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য স্টারি নাইট’ (The Starry Night) বুঝি আকাশ থেকে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে আপনার পায়ের তলায়। তবে এটি কোনো অলীক কল্পনা নয়। এটি নেদারল্যান্ডসের আইন্দহোভেন শহরের এক বাস্তব ও জাদুকরী সাইকেল পথ–যার নাম ‘ভ্যান গগ-রুসেগার্ড সাইকেল পথ’।

এই অনন্য পথটি ডাচ ডিজাইনার ড্যান রুসেগার্ড এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হাইজম্যানসের যৌথ এক শিল্পকর্ম। রুসেগার্ড এই প্রকল্পের নাম দিয়েছেন ‘টেকনো-পোয়েট্রি’ বা প্রযুক্তি ও কবিতার মেলবন্ধন। এই রাস্তার নির্মাণশৈলী সাধারণ পথের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে ব্যবহার করা হয়েছে হাজার হাজার ছোট লুমিনেসেন্ট বা স্ব-আলোকিত পাথর। এই বিশেষ পাথরগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো দিনের বেলা তীব্র সূর্যালোক শুষে নিয়ে শক্তি জমা রাখে। আর যেইমাত্র অন্ধকার নামে, অমনি পাথরগুলো নীল ও সবুজ আভায় জ্বলতে শুরু করে। এটি কোনো কৃত্রিম বিদ্যুৎ বা তারের সংযোগ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠে, যা একে বিশ্বের অন্যতম টেকসই ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আরো পড়ুন: বিশ্বের সবচেয়ে দামি চাল

এ পথটি তৈরির পেছনে কেবল আধুনিকতার ছোঁয়া নেই, আছে গভীর ঐতিহাসিক আবেগ। নেদারল্যান্ডসের উত্তর ব্রাবান্টে অবস্থিত এই অঞ্চলটি শিল্পী ভ্যান গগের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, আইন্দহোভেন এবং নুইনেন এলাকার মাঝামাঝি ওপওয়েন এবং কোলেন ওয়াটারমিলের সংযোগস্থলে এই পথটি তৈরি। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে যে, ভ্যান গগ নিজে তার চিত্রকর্মে এই দুটি ওয়াটারমিলকে অমর করে রেখেছিলেন। ২০১৫ সালে শিল্পী ভ্যান গগের ১২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। সেই মহান শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবেই ২০১৪ সালের নভেম্বরে এই নান্দনিক পথটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

রাতের অন্ধকারে সাইকেল চালানো প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু রুসেগার্ডের এই উদ্ভাবন সেই ভয়ের জায়গাটিকে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় বদলে দিয়েছে। এটি তার উচ্চাভিলাষী ‘স্মার্ট হাইওয়ে’ (Smart Highway) প্রকল্পের একটি অংশ। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো–আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ রাস্তাগুলোকে কেবল দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা থেকে নিরাপদ করে তোলা নয়, বরং সেগুলোকে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নান্দনিক করে তোলা। সাইকেল আরোহী যখন এই পথ দিয়ে যান, তিনি কেবল গন্তব্যে পৌঁছান না, বরং এক অপার্থিব জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা পথে এক মায়াবী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান।

সৃজনশীলতা এবং দূরদর্শী চিন্তার এই দারুণ সমন্বয় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি ডাচ ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড এবং অ্যাকসেঞ্চার ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের মতো বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জয় করেছে। আজকের দিনে এটি কেবল নেদারল্যান্ডসের এক গর্বের জায়গা নয়, বরং সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে একটি ‘বাকেট লিস্ট’ গন্তব্য হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের অনেক শহরই এখন এই মডেল অনুসরণ করে তাদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেওয়ার কথা ভাবছে।

ভ্যান গগ-রুসেগার্ড সাইকেল পথ আমাদের নতুন করে একটি বার্তা দেয়। আমরা প্রায়ই প্রযুক্তিকে দেখি যান্ত্রিকতা বা শীতল যন্ত্রের সমার্থক হিসেবে। কিন্তু এই পথটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তির সঙ্গে যদি শিল্পের ছোঁয়া থাকে, তবে তা ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে কতটা জীবন্ত করে রাখতে পারে। এটি আধুনিক সভ্যতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন, যেখানে প্রযুক্তি কেবল মানুষের প্রয়োজন মেটায় না, বরং মানুষের কল্পনাশক্তিকেও স্পর্শ করে।

নেদারল্যান্ডসের এই পথে সাইকেল চালানো মানে কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া নয়; এটি যেন এক মহাজাগতিক যাত্রার অংশ হওয়া। যেখানে প্রতিটি প্যাডেলে চাকা ঘোরে, আর নিচে জ্বলে ওঠে এক টুকরো নক্ষত্র।

তারেক/

আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ভাঙা দুর্গ’

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ভাঙা দুর্গ’
ছবি: সংগৃহীত

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের গর্জন, খাড়া পাথুরে উপকূল আর প্রকৃতির অলৌকিক শিল্পকর্ম, সব মিলিয়ে আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে দাঁড়িয়ে থাকা দান ব্রিস্টে (Dún Briste) যেন পৃথিবীর এক বিস্ময়। 

আইরিশ ভাষায় ‘Dún Briste’ শব্দের অর্থ ভাঙা দুর্গ। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এর জন্মের ইতিহাস, বিচ্ছেদের কাহিনি এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বয়ে চলা প্রকৃতির নির্মম সৌন্দর্য।

আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি মেয়র উত্তর উপকূলে অবস্থিত ডাউনপেট্রিক হেড এলাকায় এই বিখ্যাত সামুদ্রিক স্তম্ভ বা sea stack-এর অবস্থান। মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৮০ মিটার দূরে আটলান্টিকের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাথুরে স্তম্ভটির উচ্চতা প্রায় ৫০ মিটার বা ১৫০ ফুট। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সমুদ্রের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় দুর্গের ধ্বংসাবশেষ।

আরো পড়ুন: মিলনের পরই গিলে খায় পুরুষ সঙ্গীকে!

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দান ব্রিস্টের শিলাগুলো প্রায় ৩৫ কোটি বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগে গঠিত হয়েছিল। স্তরীভূত পাললিক শিলার এই গঠন প্রকৃতির দীর্ঘ বিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষী। কোটি কোটি বছর ধরে বাতাস, বৃষ্টি আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ উপকূলকে ক্ষয় করতে করতে একসময় এই অংশটিকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে দেয়।

ইতিহাস বলছে, ১৩৯৩ সালে এক ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাকৃতিক পাথরের খিলানটি ধসে পড়ে। সেই ঘটনার পর থেকেই দান ব্রিস্টে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় কয়েকজন মানুষ সেখানে আটকা পড়েছিলেন। পরে দড়ির সাহায্যে তাদের উদ্ধার করা হয়। বাস্তব হোক কিংবা লোককথা, এই গল্প এখনো স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে।

এই দান ব্রিস্টে ঘিরে রয়েছে ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনিও। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের সময় সেন্ট প্যাট্রিক এক অবাধ্য পৌত্তলিক সর্দারের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তার লাঠি দিয়ে ভূমিতে আঘাত করেছিলেন। আর সেই আঘাতেই নাকি মূল ভূখণ্ডের অংশ ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয় এই বিচ্ছিন্ন পাথুরে স্তম্ভ। যদিও এটি নিছক লোকগাথা, তবু দান ব্রিস্টের রহস্যময় আবহকে আরও গভীর করে তুলেছে এই কাহিনি।

দীর্ঘদিন ধরেই এই পাথুরে দ্বীপটি মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮০ সালে একদল বিজ্ঞানী হেলিকপ্টারের সাহায্যে এর সমতল চূড়ায় অবতরণ করেন। সেখানে তারা প্রাচীন পাথরের নির্মাণ, দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ এবং মানব বসতির বিভিন্ন নিদর্শন খুঁজে পান। ধারণা করা হয়, বহু শতাব্দী আগে মানুষ এখানে বসবাস করত অথবা এটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

বর্তমানে দান ব্রিস্টে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় নয়, এটি বহু সামুদ্রিক প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলও। পাফিন, কিটিওয়াক, ফুলমারসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক পাখি এখানে বাসা বাঁধে। মাঝে মাঝে আশপাশের সমুদ্রে সিলও দেখা যায়। ফলে এটি পাখিপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক স্বর্গরাজ্য।

প্রতি বছর হাজারো পর্যটক ডাউনপেট্রিক হেডে ভিড় জমান শুধু এই বিস্ময়কর দৃশ্যটি একনজর দেখার জন্য। উপকূলে নির্মিত নির্দিষ্ট ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম থেকে দান ব্রিস্টেকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় আটলান্টিকের সোনালি আলো যখন পাথরের গায়ে পড়ে, তখন পুরো দৃশ্যটি যেন জীবন্ত কোনো চিত্রকর্মে পরিণত হয়।

আধুনিক পৃথিবীতে প্রযুক্তি ও নগর সভ্যতার বিস্তারের মধ্যেও দান ব্রিস্টে আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তি কতটা গভীর এবং সময় কতটা বিশাল। কোটি বছরের ইতিহাস নিজের শরীরে ধারণ করে আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ভাঙা দুর্গ’ আজও নীরবে বলে যায় পৃথিবীর সৃষ্টি, ধ্বংস আর পুনর্জন্মের গল্প।

তারেক/

কোন দেশে কত পশু কোরবানি হয়?

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৪০ পিএম
আপডেট: ২৫ মে ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম
কোন দেশে কত পশু কোরবানি হয়?
ছবি: সংগৃহীত

কোরবানির পশু হিসেবে সাধারণত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এবং উট ব্যবহৃত হয়। দেশ ও সংস্কৃতিভেদে কোরবানির পশুর ধরন এবং সংখ্যা ভিন্ন হয়। নিচে কয়েকটি মুসলিম প্রধান দেশে কোরবানির পশুর সংখ্যার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো–

বাংলাদেশ: বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি মুসলিম বাস করে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি পশু কোরবানি করা হয়েছে, যার মধ্যে গরু এবং ছাগলের সংখ্যা বেশি।

সৌদি আরব: সৌদি আরবে হজের সময় প্রচুর পশু কোরবানি হয়। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর প্রায় ১৫ লাখ হজযাত্রী হজে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য প্রায় ১০ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। এর মধ্যে ভেড়া এবং ছাগলের সংখ্যাই বেশি। ২০২৫ সালেও সৌদি আরবে ১০ থেকে ১১ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। এছাড়া ঈদুল আজহার দিন সাধারণ সৌদি নাগরিক ও দেশটিতে থাকা অন্য মুসলিমরা কয়েক লাখ পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন।

আরো পড়ুন: তিমির দুধ পানিতে মিশে না!

পাকিস্তান: পাকিস্তানে প্রায় ২৪ কোটি মুসলিম বাস করে, যা দেশটির জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ। এখানে কোরবানির পশুর সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ; যার মধ্যে গরু, ছাগল, ভেড়া এবং উট অন্তর্ভুক্ত। শীতপ্রধান অঞ্চলে দুম্বার কোরবানি বেশি প্রচলিত।

ইন্দোনেশিয়া: বিশ্বের সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২০ দশমিক ৩ কোটি) মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানির পশুর সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ। এখানে গরু এবং ছাগল প্রধানত কোরবানি করা হয়।

ইরান ও তুরস্ক: এই দেশগুলোয় প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। ইরানে গরু ও ভেড়া এবং তুরস্কে ভেড়া ও ছাগল বেশি জনপ্রিয়।

তারেক/

সমুদ্রের তলদেশে দাঁড়িয়ে থাকে যে মাছ

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
সমুদ্রের তলদেশে দাঁড়িয়ে থাকে যে মাছ
ছবি: সংগৃহীত

ট্রাইপড মাছ গভীর সমুদ্রের এক অত্যন্ত রহস্যময় ও বিস্ময়কর প্রাণী। এটি ইপনোপিডি (Ipnopidae) পরিবারের Bathypterois গণের অন্তর্ভুক্ত। এই মাছকে বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্রের ‘unique adaptation species’ হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ এটি এমন পরিবেশে টিকে আছে যেখানে আলো নেই, চাপ অত্যন্ত বেশি এবং খাদ্যও সীমিত।

ট্রাইপড মাছের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর তিনটি অত্যন্ত লম্বা পাখনা, যা দেখতে অনেকটা ত্রিপদের (tripod) মতো কাজ করে। এই কারণে এর নাম ‘ট্রাইপড ফিশ’ রাখা হয়েছে। মাছটির দুটি পাখনা আসে শ্রোণিদেশ (pelvic fins) থেকে এবং আরেকটি আসে লেজ (caudal fin) থেকে। এই পাখনাগুলো অনেক সময় প্রায় এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা মাছটির শরীরের তুলনায় অনেক বড়।

ট্রাইপড মাছের মূল দেহ সাধারণত ছোট; প্রায় ১০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। কিন্তু লম্বা পাখনার কারণে একে অনেক বড় ও অদ্ভুত আকৃতির প্রাণী বলে মনে হয়। এই পাখনাগুলোর সাহায্যে মাছটি সমুদ্রের তলদেশে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যেন এটি একটি স্ট্যান্ড বা ত্রিপদের ওপর ভর করে আছে।

এই মাছ সাধারণত ৯০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ মিটার গভীর সমুদ্র অঞ্চলে বসবাস করে। এই গভীরতায় সূর্যের আলো একেবারেই পৌঁছায় না, ফলে সেখানে চির অন্ধকার বিরাজ করে। তাপমাত্রাও খুব কম এবং পানির চাপ অত্যন্ত বেশি। এমন কঠিন পরিবেশেও ট্রাইপড মাছ তার বিশেষ অভিযোজন ক্ষমতার মাধ্যমে বেঁচে থাকে।

আরো পড়ুন: গাছে ওঠে খাবার খায় যেসব ছাগল

ট্রাইপড মাছের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতি। এটি সক্রিয়ভাবে শিকার করে না; বরং সমুদ্রের তলদেশে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং পানির স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা ক্ষুদ্র প্রাণীর অপেক্ষা করে। এর প্রধান খাদ্য হলো প্ল্যাঙ্কটন, ছোট ক্রাস্টেশিয়ান, চিংড়িজাতীয় প্রাণী এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীব। এই শিকার ধরার কৌশলকে বলা হয় ‘ambush feeding strategy’ বা আক্রমণ অপেক্ষা কৌশল।

এই মাছের চোখ তুলনামূলকভাবে খুব ছোট এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রায় অকার্যকর। কারণ, গভীর সমুদ্রের অন্ধকার পরিবেশে দৃষ্টিশক্তির তেমন প্রয়োজন হয় না। এর পরিবর্তে পাখনাগুলো একটি সংবেদনশীল অঙ্গ হিসেবে কাজ করে, যা পানির কম্পন ও আশপাশের নড়াচড়া অনুভব করতে সাহায্য করে। এ কারণে ট্রাইপড মাছকে অনেক সময় ‘living sensor’ বলা হয়।

ট্রাইপড মাছের প্রজনন ব্যবস্থাও অনেক বিশেষ। বিভিন্ন প্রজাতির ট্রাইপড মাছ উভলিঙ্গ (hermaphrodite), অর্থাৎ একই দেহে স্ত্রী ও পুরুষ উভয় প্রজনন অঙ্গ বিদ্যমান থাকে। গভীর সমুদ্রে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হওয়ায় এটি তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন, যা প্রজননকে সহজ করে তোলে।

মানুষের জন্য ট্রাইপড মাছ সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক বা খাদ্যগত গুরুত্ব বহন করে না। এটি সাধারণত মানুষের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে অনেক সময় গভীর সমুদ্রের ট্রলিং বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার সময় এটি ধরা পড়ে এবং পরে আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, ট্রাইপড মাছ এখনো গভীর সমুদ্রের এক রহস্যময় প্রাণী। এর জীবনচক্র, আচরণ এবং অভিযোজন সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এই মাছ সম্পর্কে আরও নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে ট্রাইপড মাছ প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সমুদ্রের গভীরে এখনো কত রহস্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারিনি।

তারেক/

দেশভেদে কোরবানির ঈদ পালনের নানা রীতি

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম
দেশভেদে কোরবানির ঈদ পালনের নানা রীতি
ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলমানদের দ্বিতীয় ধর্মীয় উৎসব। প্রচলিত অর্থে ঈদুল আজহার দিন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়তের বিধানমতে যে পশু জবাই করা হয়, তাকে কোরবানি বলা হয়। ধর্মীয় রীতি অনুসারে কোরবানির মাংস তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়–একটি অংশ ব্যক্তির নিজের বাড়ির জন্য, একটি অংশ তার আত্মীয়দের জন্য এবং একটি অংশ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য।

অন্য সবকিছুর মতো স্থানীয় পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে কোরবানিতেও বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন দেশে কীভাবে পালিত হয় ঈদুল আজহা–

পাকিস্তান

পাকিস্তানে চার দিন ধরে ঈদুল আজহার উৎসব উদযাপিত হয়। ঈদের দিন সকালে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নামাজের জন্য রওনা হন। তারপর বাড়ি ফিরে গরু, ছাগল, ভেড়া বা উট কোরবানি করেন। পাকিস্তানে সবাই পালিত পশুই কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য অনেক আগ থেকেই পশু কেনাবেচা শুরু হয়। অন্তত এক মাস আগে তারা পশু কিনে নিজেরাই তার যত্ন নেন। সরকারি ছুটি থাকায় যে যার মতো করে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করে নেন। 

ভারত

ভারতীয় মুসলমানরা ঈদুল আজহার জন্য সাধারণত ছাগল বা ভেড়া কোরবানি করে থাকেন। ঈদের নামাজের জন্য সেখানে নির্ধারিত এলাকা আছে। যেহেতু ওই দেশে গরুকে পবিত্র বলে মনে করা হয় তাই ভারতীয় মুসলমানরা সাধারণত তাদের বাড়িতে বা স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রে একটি ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দেন। মাংস প্রস্তুত করার পর বাড়িতে এনে রান্নার কাজে লেগে পড়েন সবাই। সাধারণ জনগণের অসুবিধা এড়াতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রাস্তায় পশু কোরবানি করতে নিরুৎসাহিত করে।

আরো পড়ুন: যে হোটেলে একই সময়ে দুই দেশে ঘুমানো যায়

তুরস্ক

ঈদুল আজহাকে তুর্কি ভাষায় কুরবান বায়রামি বলা হয়। এ দেশের মানুষও ঈদের দিন শুরু করে নামাজের মাধ্যমে। তারপর বাড়ি ফিরে আল্লাহর নামে পশু (সাধারণত ভেড়া) কোরবানি দেন। তুরস্কেও অনুমোদিত কসাইখানা/বসাখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু কোরবানি করা বেআইনি। এগুলোর বেশির ভাগই বড় শহরের উপকণ্ঠে নির্মিত। তুরস্কের অনেকেই পশু কোরবানি দেওয়া এড়িয়ে যান, এর পরিবর্তে তারা সমমূল্যের অর্থ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করতে পারেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

পশু কোরবানির আগে সকালে ঈদের নামাজ আদায় করা হয় সেখানে। আবুধাবির শেখ জায়েদ মসজিদে প্রতি বছর ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তিন থেকে চার দিন ধরে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। যদিও সেখানকার মানুষ নিজের বাড়িতে পশু জবাই করতে পারেন, তবে যথাযথভাবে কোরবানি ও এর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের লক্ষ্যে কসাইখানার স্থান নির্ধারণ করা থাকে। এ কারণে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কারের বিষয়ে ভাবতে হয় না তাদের।

ইরান

সংযুক্ত আর আমিরাতের মতো ইরানেও পশু কোরবানির জন্য নির্ধারিত স্থান রাখা হয়। এর বাইরে পশু জবাই করা বেআইনি হতে পারে। ইরানে ভোরেই কোরবানি দেওয়া হয়। সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের আগে কসাইখানায় রওনা হন সবাই মাংস সংগ্রহ করতে। তারপরে তারা নতুন পোশাক পরে নামাজ আদায় করেন। আর সারা দিন প্রিয়জনদের সঙ্গে খাসি বা গরুর মাংসের নানা পদ খেয়ে উদযাপন করেন ঈদুল আজহা।

তাজিকিস্তান

তাজিকিস্তাসের মানুষ ঈদের নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু করেন ঈদুল আজহা। তারপর শিশুরা প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সেখান থেকে তারা পুরস্কার ও মিষ্টি পেয়ে খুশি হয়। এরপর পুরুষরা পশু কোরবানির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাজিকিস্তানেও অনুমোদিত স্থান ছাড়া কোরবানি দেওয়ার নিয়ম নেই। মাংস নিয়ে বাড়িতে আসতেই তা রান্না শুরু করেন নারীরা। তাজিকিস্তানে বাড়ির শিশুরাই ঈদের দিন খাবার পরিবেশন করে। অতিথিকে প্রথমে ফল, পেস্ট্রি ও বিস্কুট নাশতা দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন: গরুর লাটসাহেবি জীবনযাপন

তারপর মাংসের বাহারি খাওয়ার পর কেক ও মিষ্টি মুখ করে সবাই। তাজিকিস্তানে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এই দেশের প্রতিবেশীরা অবাধে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে পারে, কারণ তাদের সবার ঘরের দরজায় প্রতিবেশীদের জন্য সব সময় খোলা থাকে।

আফ্রিকান নেশনস

আফ্রিকার বেশির ভাগই মুসলিম দেশ যেমন–তিউনিসিয়া, মরক্কো ও মিসরে ঈদুল আজহা উদযাপন শুরু হয় ঈদের নামাজ আদায় করার মধ্য দিয়ে। ভেড়া, ছাগল বা মহিষের মতো পশুই তারা বেশি কোরবানি দেয়। এরপর পরিবার নিয়ে মজাদার সব পদের স্বাদ উপভোগ করেন।

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদুল আজহা উদযাপনের রীতিনীতি অনেকটাই পাকিস্তানের মতোই। ঈদের নামাজের পরে তারা রাস্তায় কোরবানি করে। পশু কোরবানি দেখতে প্রতিবেশী, পরিবার, বন্ধুসহ সবাই জড়ো হয়।

তারেক/