নিজের কিশোর বাচ্চার জ্বরের চিকিৎসা নিতে আমার বাড়ির অদূরে একটি বাজারের ফার্মেসিতে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। ডাক্তার ভদ্রলোককে আমি চিনি কয়েক যুগ হলো। ডাক্তার সাহেব শুরুর দিকে একটি দাতব্যলয় প্রতিষ্ঠানে বেতনে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে বাজারের একটি ফার্মেসিতে বসেই তিনি রোগী দেখছেন। বাড়ি জেলা শহরের মধ্যে। তিনি সকালের শিফটে রোগী দেখা শেষ করে ছয় কিলোমিটার দূরে তার নিজ বাড়িতে রিকশায় চড়ে যান। দুপুরের খাবার আর বিশ্রাম শেষে চেম্বারে আসেন আবার বিকেলে। তবে তিনি তার পুরো পরিবার নিয়ে বসবাস করেন পুরান ঢাকায়।
তিনি দীর্ঘদিন একই জায়গায় বসে প্র্যাকটিস করার কল্যাণে তার বিরাট একটা পরিচিতি লাভ হয়েছিল। রোগীরা লাইন ধরেন তার চেম্বারে। তাকে দেখাতে গেলে রীতিমতো বড় ধরনের সিরিয়ালের ফাঁদে পড়তে হয়। সব সময়ই রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। বিশেষ করে শিশু রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাতযশ তার খুবই ভালো। তা ছাড়া এ বাজারের আশপাশে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় তার একচেটিয়া আধিপত্য বলা চলে এখানে।
তার চেম্বারে রোগীর সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ কোম্পানি আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদেরও যথেষ্ট ভিড় লক্ষ করা যায়। এমন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় হঠাৎ করেই বাজারের চতুর্মুখী মোড়ে একজন ডাক্তার এলাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। আর এ সুযোগেরই তিনি ষোলোআনা ব্যবহার করেন। তিনি চেম্বার পরিবর্তন করে চার রাস্তার মোড়ে চলে আসেন। এখন জনসমাগমস্থানে এসে প্র্যাকটিস শুরু করায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আমার বাচ্চাকে নতুন চেম্বারে দেখাতে গিয়ে একটা ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম। রোগীর ভিড় সামাল দিতে তার রুমে একসঙ্গে দুই থেকে তিনজন করে রোগী পাঠানো হতো।
আরো পড়ুন: পেট্রল-ডিজেলের বাংলা অর্থ জানেন?
রোগী অনেক বেশি। কিন্তু তাতে ডাক্তার সাহেবের তেমন কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি চেম্বারে প্রবেশ করেই আগে এসিটা চালু করেন। তারপর তার পিয়ন তার জন্য এক কাপ রং চা নিয়ে এলেন। তিনি দুধ চা খান না। বেশি দিন বাঁচবেন বলে তিনি খুবই স্বাস্থ্য সচেতন। তিনি খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে চা পান করছেন। চারদিকে রোগী থাকা সত্ত্বেও তার কোনো ভাবাবেগ নেই। চা পান করা শেষ হলে তারপর আগে ডাক আসে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের। তাদের সঙ্গে শুরু হয় খোশগল্প। তাতে রোগীরা বিরক্ত হলেও তার কিছু যায় আসে না। কারণ, তাদের কাছ থেকেও ডাক্তার সাহেবের বড় একটা বাণিজ্য আসে। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ শেষ হলে এবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এসে তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্যাড দিয়ে যান। এখানেই শেষ নয়। বাইরে আরও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা অপেক্ষা করতে থাকেন। তাকে যে মাসোহারা এবং বিভিন্ন ধরনের উপহার আর উপঢৌকন দিয়ে থাকেন তার সদ্ব্যবহার তিনি করেন কি না মানে তাদের কোম্পানির ওষুধ তিনি লিখলেন কি না; তা দেখার জন্য রোগীরা চেম্বার থেকে বের হলেই ওষুধের প্রেসক্রিপশন ছোঁ মেরে নিয়ে দেখতে থাকেন। এভাবেই চলছে আমাদের হাটবাজারের ডাক্তারদের নৈরাজ্য এবং অপবাণিজ্য।
ডাক্তারের চেম্বারে আমার বাচ্চা নিয়ে প্রবেশের আগে একজন মুরুব্বি ভদ্রলোক মসজিদের ইমাম প্রবেশ করেছেন। তিনি ডাক্তার সাহেবকে দেখিয়ে ৪০০ টাকার বদলে ৩০০ টাকা দিয়েছেন ফি বাবদ। অমনি ডাক্তারের কর্কশ ভাষা শুরু হলো। রোগী মুরুব্বি অনেক অনুনয়-বিনিময় করছেন। স্যার আমার কাছে আর টাকা নেই। তখন তিনি বলে বসলেন, আপনার কাছ থেকে আমি যে ফি বাবদ ৩০০ টাকা নিয়েছি এটা যদি আমার সংগঠন জানতে পারে তাহলে তারা আমাকে জবাই করবে। কেন আমি কমে রোগী দেখি। এ দৃশ্যটা আমার ভেতর কাঁপিয়ে দিল। একবার ভাবলাম তার বাকি ১০০ টাকা আমার কাছ থেকে দিয়ে দিই। কিন্তু হঠাৎ করেই দমে গেলাম। তিনি যদি আবার আমার ওপর নাখোশ হন। তিনি এত রোগী দেখেন। ওষুধ কোম্পানি থেকে ভাতা গ্রহণ করে থাকেন। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পুরো ৫০ শতাংশ কমিশন তো রয়েছেই।
ডাক্তারের একটি ছেলে। ভারতে একটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে তখন ছেলেকে দেশের টাঙ্গাইলের শাহিন একাডেমিতে ভর্তি করেছেন। তিনি জেলা শহরের বাড়ি ছেড়ে পুরান ঢাকায় আলিশান ফ্ল্যাট কিনে সেখান থেকেই গাড়িতে চড়ে নিয়মিত আসতেন আমাদের বাজারে রোগী দেখতে। তার আভিজাত্য লুকিয়ে রেখে প্রতিদিন ঢাকা থেকে গাড়িতে চড়ে ধলেশ্বরী নদীর অপর পাড়ে গাড়ি রেখে আসতেন। গাড়ি নিয়ে এলাকায় ঢুকলে মানুষজন বলাবলি শুরু করবে ডাক্তার সাব তো মাল ভালোই কামাচ্ছেন। এটা যাতে কেউ টের না পায় সে জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি দূরে রেখে আসতেন।
একদিন ফেসবুকের কল্যাণে দেখতে পেলাম অমুক ডাক্তার না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আমার ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি হায় হায় করে উঠলাম। যে ডাক্তার একজন মসজিদের ইমাম ১০০ টাকা ফি কম দেওয়ায় তার ওপর রুষ্ট হলেন এখন সে ডাক্তারের আলিশান বাড়ি-গাড়িতে কে চড়বে। ব্যাংকে থাকা কাড়ি কাড়ি টাকা এখন কে ভোগ করবে? কত রোগীকে অকারণে টেস্ট দিয়ে হাতিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ লিখে মাসের পর মাস টাকা হাতিয়েছেন। আর রোগীর ফি তো আছেই। এখন অনৈতিকতার এত সম্পদের হিসাব তিনি কীভাবে দেবেন এটা ভেবেই আমি হায় হায় করে উঠলাম।
যে সম্পদ মানুষ ভোগ করতে পারবে না কিন্তু মৃত্যুর পরই তার হিসাব শুরু হবে। তার হিসাব দিতে না পারলে তার সন্তান আর স্ত্রী সে পাপের ভাগ নেবে না। স্ত্রী-সন্তান ভোগ করবে আর পাপের বোঝা তাকেই একা ভোগ করতে হবে। এমন সম্পদ কি দরকার আছে? চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেশে যে হারে নৈরাজ্য চলছে তা শিউরে ওঠার মতো। মানুষের জীবনের অর্থের প্রয়োজন আছে। কিন্তু নৈতিকতা হারিয়ে অর্থ উপার্জন করলে তার ফলাফল তেমন ভালো হয় না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)