দেশের বিভিন্ন জেলায় উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্যের বাজার বাড়াতে চালু হওয়া 'কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন' প্রথমদিন কৃষিপণ্য ছাড়াই রাজশাহী থেকে ঢাকা গেছে।
শনিবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটিতে কোনো কৃষিপণ্যই ওঠেনি। শুধু রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে ১৫০ কেজি ওজনের ডিমের ফাঁকা খাঁচা তুলে ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে গেছে ট্রেনটি। এতে আয় হয়েছে ৩৬০ টাকা, বিপরীতে ট্রেনটি চলাচলে খরচ হয়েছে লক্ষাধিক টাকা।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য কৃষিপণ্য স্পেশাল নামে ট্রেনটি শনিবার থেকে চালু করা হয়েছে। এই ট্রেনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মালামাল স্বল্প মূল্যে পরিবহন করতে পারবেন কৃষকরা। ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে ঢাকার তেজগাঁও রেলস্টেশনে পৌঁছাবে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে। এতে প্রতি কেজি কৃষিপণ্যে পরিবহন খরচ পড়বে ১ টাকা ৩০ পয়সা। রাজশাহী থেকে তেজগাঁওয়ে এক কেজি কৃষিপণ্য পৌঁছাতে খরচ পড়বে ১ টাকা ১৮ পয়সা। গত মঙ্গলবার খুলনা থেকে ঢাকা রুটে চলাচল করে এই স্পেশাল ট্রেন। গত বৃহস্পতিবার পঞ্চগড় থেকে ঢাকা যায় ট্রেনটি। শনিবার থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশন থেকে রাজশাহী হয়ে ঢাকায় যাচ্ছে কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন। বিশেষ এই ট্রেনে সাতটি বগি (লাগেজ ভ্যান) আছে। এরমধ্যে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং অপর ছয়টি সাধারণ বগি। অত্যাধুনিক লাগেজ ভ্যানে কৃষিপণ্যের মধ্যে ফল, সবজি ছাড়াও রেফ্রিজারেটেড লাগেজ ভ্যানে হিমায়িত মাছ, মাংস ও দুধ পরিবহনের ব্যবস্থা আছে। সবজি চাষি, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ঢাকায় যাওয়ার জন্য অন্তত ২০টি চেয়ার আছে। সবজির সঙ্গে তাদের বিনা ভাড়ায় যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ প্রতি শনিবার সকালে রহনপুর থেকে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।
রহনপুর থেকে ঢাকার দূরত্ব ৩৪৬ কিলোমিটার। এই স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে নাচোল, আমনুরা জং, কাঁকনহাট, রাজশাহী, সরদহ রোড, আড়ানি, আব্দুলপুর, আজিমনগর, ঈশ্বরদী বাইপাস, চাটমোহর, বড়ালব্রিজ, জয়দেবপুরসহ ১৩টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে তেজগাঁও স্টেশনে যাবে। ট্রেনটির ধারণক্ষমতা ১০ মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শনিবার প্রথম দিনে ট্রেনটিতে গেছে মাত্র ১৫০ কেজি ওজনের ডিমের ফাঁকা খাঁচা। এতে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ আয় হয়েছে মাত্র ৩৬০ টাকা। ট্রেনটি পরিবহন করতে খরচ হয় লক্ষাধিক টাকা। ফলে প্রথম দিনেই ট্রেনটিতে লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রহনপুর, রাজশাহী, সরদহ রোড, আড়ানি, আব্দুলপুর, আজিমনগর, ঈশ্বরদী বাইপাস, চাটমোহর কোনোটিতে সবজি বুকিং দেওয়া হয়নি।
রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মামুন আলি বলেন, রাতে পণ্যবাহী স্পেশাল ট্রেনটি রহনপুর স্টেশনে এসেছিল। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কোনো কৃষিপণ্য ছাড়াই ট্রেনটি ছেড়ে গেছে। এই ট্রেনে কেউ কোনো সবজি পরিবহন করেননি।
রাজশাহী স্টেশন ম্যানেজার শহিদুল আলম বলেন, ট্রেনটির উদ্বোধনী দিনে রাজশাহী থেকে কোনো সবজি বুকিং হয়নি। তবে ১৫০ কেজি ক্যারেট পাঠানো হয়েছে। ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন মাস্টার পাভেল হোসেনসহ সরদহ রোড, আড়ানি, আব্দুলপুর, আজিমনগর, চাটমোহর স্টেশন মাস্টার একই কথা জানান।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্বীকার করে জানান, কৃষকের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসায়ীদের সমন্বয় ও আবহাওয়া খরাপের কারণে প্রথমদিন সবজি আসেনি।
রহনপুর এলাকার বাসিন্দা আরাফাত রহমান বলেন, পিকআপের থেকে ট্রেনের ভাড়া কম। কিন্তু ট্রেনে পরিবহন করতে এই ভাড়ার পাশাপাশি কুলি খরচ, ফসলের মাঠ থেকে স্টেশন এবং স্টেশন থেকে মোকামের আলাদা পরিবহন খরচ পড়ে যাচ্ছে কেজিপ্রতি ৩ টাকার বেশি। অথচ সড়কপথে ট্রাকে মাল পরিবহন করতে তাদের খরচ হয় কেজিপ্রতি দুই থেকে আড়াই টাকা।
শফিকুর রহমান নামে আরেক কৃষক বলেন, ট্রেনের সময় সকালে হওয়ায় পণ্য বাজারজাত নিয়েও রয়েছে নানা শঙ্কা। মূলত আমাদের সড়কপথে সবজি ঢাকায় যায়। আমরা সন্ধ্যায় যাত্রা শুরু করে ফজরের আজানের সময় ঢাকায় পৌঁছেই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু এই ট্রেনের সময় সকালে, তাহলে আমরা বিক্রি করবো কখন?
রাজশাহী মহানগর পাইকারি কাঁচাবাজার সমিতির সভাপতি ফাইজুল ইসলাম বলেন, ট্রেনটি আমাদের জন্য ভালো হবে। আমরা এটি ব্যবহার করতে পারলে বেশ সুবিধাও হবে। তবে ট্রেনটি যে চালু হবে সেটি আমরা জানি না। আমাদের কেউ জানায়নি কীভাবে বা কখন চালু হবে। জানলে হয়তো কিছু মাল পাঠাতে পারতাম।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনটি চালুর সময় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগের সহকারি বাণিজ্যিক কর্মকর্তা একেএম নুরুল আলম বলেন, বাংলাদেশে কৃষি পণ্য স্পেশাল ট্রেনটি গত ২২ তারিখ খুলনা ও এরপর পঞ্চগড় থেকে সর্বশেষ আজ রাজশাহী থেকে ট্রেনটি চালু হলো। এ এলাকা সবজির বড় বাজার। আমরা ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলেছি। তারা ট্রেনে পণ্য পাঠাবে বলে আশা করছি।
তবে প্রথমদিনে পণ্য না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সবজায়গাতেই প্রচার প্রচারণা করেছি। সবজি কেবল বাজারে উঠছে। প্রতিদিনই ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক ঢাকায় যায়। তবে প্রথম দিনে রাজশাহী পর্যন্ত কোন সবজি পায়নি। তবে ১৫০ কেজি ক্যারেট রাজশাহী থেকে ঢাকা যাচ্ছে। ৩৬০ টাকায় আদায় হয়েছে। আমরা আশা করছি সামনে এটি ভালো সাড়া ফেলবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা কয়েকদিন ধরে বিভন্ন তৃণমুল প্রচার প্রচারণা চালিয়েছি। কৃষি বিপণন ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমেও প্রচার করেছি। মূলত কৃষকদের সাথে ঢাকা ব্যবসায়ীদের সমন্বয় নেই। তারা কথা না বলে যদি মালামাল নিয়ে যায় তবে তারা ঝামেলায় পড়বে। পাশাপাশি কয়েকদিন ধরে আবহাওয়ায় ভালো নয় তাই হয়তো কৃষক ফসল সংগ্রহ করতে পারে নি। কৃষকদের সাথে যদি ঢাকায় সমন্বয় করা যায় তাহলে ট্রেনটি সাড়া ফেলবে।
এনায়েত করিম/এমএ/