গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মালেঙ্গা গ্রামের ব্যবসায়ী শহীদ মোল্লা। প্রতি সপ্তাহে তিনি মধুমতি নদী দিয়ে নৌকায় করে উপজেলার উফরির হাটে মাছ বিক্রি করতে আসেন। গত শনিবারও একই পদ্ধতিতে হাটের দিকে রওনা দেন। কিন্তু এবার তিনি হাট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। অন্তত এক কিলোমিটার আগের একটি ঘাটে তাকে থেমে যেতে হয়েছে। মূলত মানিকহার সেতুর নিচে থাকা কচুরিপানার স্তূপের কারণেই তার নৌকাটি আর এগুতে পারেনি।
শহীদ মোল্লার ভাষ্য, ‘আমাকে এক কিলোমিটার দূরে নৌকা থামাতে হয়েছে। পরে কিছুদূর মাথায় নিয়ে, কিছুপথ ভ্যানে করে উফরির হাটে পৌঁছেছি। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আমার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কচুরিপানাগুলো পরিষ্কারের দাবি জানাচ্ছি।’ শুধু শহীদ মোল্লাই নন, তার মতো শত শত ব্যবসায়ী ও হাজারও মানুষকে কচুরিপানার কারণে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধুমতি নদীতে কচুরিপানার স্তূপ জমায় গত ১৫ দিন ধরে পাঁচ জেলার নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বাগেরহাট, পিরোজপুর, নড়াইল, বরিশাল ও খুলনার মধ্যে খাদ্য, নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি, কৃষি পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী আনা-নেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
গত শনিবার উপজেলার উরফি ইউনিয়নের মানিকহার ব্রিজ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ছয় গুচ্ছ পিলারের মাধ্যমে মধুমতি নদীর ওপর সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি গুচ্ছে ফাঁকা ফাঁকা করে ছয়টি পিলার রয়েছে। মোট পিলারের সংখ্যা ৩৬টি। এর মধ্যে পাঁচ সেট পিলারের অবস্থান নদীর পানিতে। এসব পিলারের ফাঁকে ফাঁকে কচুরিপানা আটকে গেছে। জমতে জমতে তা স্তূপে পরিণত হয়েছে। ব্রিজের নিচ থেকে এই স্তূপগুলো প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলোর কারণে আটকে যাওয়া অসংখ্য নৌকা, ট্রলার ও কার্গো আশপাশে নোঙ্গর করে আছে।
এদিকে কচুরিপানার স্তূপে জমে থাকা পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ওই পানি যারা ব্যবহার করছেন তারা বিভিন্ন চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বদ্ধ পানিতে মশা-মাছির পাশাপাশি সাপের উপদ্রপ দেখা দিয়েছে। গত শুক্র ও শনিবার এই দুই দিনে স্থানীয়রা ৯টি সাপ পিটিয়ে হত্যা করেছে। এলাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে সাপ আতঙ্ক। এ ঘটনা জানার পর গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহসিন উদ্দীন ও গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেফাত জামিল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
উপজেলার মালেঙ্গা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী শাহাদাত ফকির বলেন, ‘নৌকায় করে মাছ বিক্রি করতে এসেছিলাম। কিন্তু মানিকহার এলাকার বাজারের এক কিলোমিটার দূরে নৌকা রাখতে হয়েছে। এখন মাথায় করে মাছ নিয়ে হাটে যেতে হচ্ছে।’
বরিশালের সবজি ব্যবসায়ী শাওন মোল্লা বলেন, ‘এখন শীতের সবজির চারা বিক্রির ভরা মৌসুম। বরিশাল ও পিরোজপুর থেকে নৌকায় করে বিভিন্ন সবজির চারা এনে গোপালগঞ্জে বিক্রি করি। কিন্তু কচুরিপানার কারণে নৌকা গোপালগঞ্জ শহর ও আশপাশের গ্রামের হাট বাজারে নিতে পারছি না। এতে ব্যবসার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’
স্থানীয় যুবক জাহিদুল খান বলেন, ‘আগে সরাসরি নৌকায় করে উরফি হাটে আসা-যাওয়া করা যেত। কিন্তু কচুরিপানার কারণে প্রায় ২৫ কিলোমিটার ঘুরে যোগানিয়া হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।’ উরফি গ্রামের গাজী ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এ নদী দিয়ে আমাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্য, নির্মাণসামগ্রী কম খরচে পরিবহন করতে পারি। কিন্তু কচুরিপানার কারণে দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ব্যাহত হচ্ছে। পণ্য বাজারজাত করতে পারছি না।’
কার্গোচালক বশির মিয়া বলেন, এই নদী দিয়ে আমরা ধান, চালসহ বিভিন্ন পণ্য খুলনা ও বরিশালে পরিবহন করি। কিন্তু মানিকহার ব্রিজের নিচে কচুরিপানার স্তূপের ওপর দিয়ে কার্গো চালাতে পারছি না। তাই মানিকহার ঘাটে কার্গো নোঙর করে বসে আছি। এতে আমাদের জীবন-জীবিকা অচল হয়ে পড়েছে।’
উরফি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘গুচ্ছ পিলারের ওপর ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে পিলারের ফাঁকে ফাঁকে কচুরিপানা ঢুকে এ অবস্থার সৃষ্টি করে। দুই বছর আগেও এমন অবস্থা হয়েছিল। তখন সরকারি উদ্যোগে সেগুলো অপসারণ করা হয়। এখন আবার একই সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রিফাত জামিল বলেন, বিষয়টি আমি লিখিত ও মৌখিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কচুরিপানা অপসারণে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার প্রয়োজন। বরাদ্দ বা অনুমোদন পেলেই আমরা কাজ শুরু করতে পারব।’