যশোরের অভয়নগর উপজেলার ডহরমশিয়াহাটি গ্রামের বাড়েদা পাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বী মতুয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। গত বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাতে তাদের একটি উৎসব চলছিল। আর এদিন রাতেই পাশেই খুন হন কৃষকদলের স্থানীয় এক নেতা। কিন্তু গান-বাজনার শব্দে ওই সম্প্রদায়ের মানুষ কিছুই টের পাননি। মানুষ খুন হয়ে গেছে, তারপরও গানবাজনার উৎসব করার ‘অপরাধে’ দুর্বৃত্তরা এদিন রাতে বাড়েদা পাড়ার অন্তত ২০টি বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও পরে অগ্নিসংযোগ করেন। রক্ষা পায়নি গোয়ালঘরও।
ভবদহ অঞ্চলের বিলের মধ্যে এই পাড়াটির অবস্থান। এই পাড়ায় দোচালা টিনের বাড়িতে এক ছেলেকে নিয়ে বসাবস করেন মহিতুল বিশ্বাস ও স্মৃতি বিশ্বাস দম্পতি। হামলা ও লুটপাটের সময় পরিবারের দুই পুরুষ সদস্য পালিয়ে যায়। এরইমধ্যে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ‘ক্ষোভের’ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় বছরের পর বছর তিলে তিলে জমানো স্মৃতি বিশ্বাসের সাজানো সংসার। মাথার গোঁজার ঠাই হারিয়ে উঠানের এক কোণে খোলা আকাশের নিচে দুই দিন রয়েছেন। আতংকে এখনও বাড়ি ফেরেনি তার ছেলে ও স্বামী।
স্মৃতি বিশ্বাস বলেন, ‘তিন দিন ধরে আমার বাড়িতে পূজা চলছিল। বিভিন্ন দল কীর্তন করছিলেন। বিভিন্ন বাজনা বাজছিল। হঠাৎ ছয়-সাতজন আমার বাড়িতে এসে কিছু না বলেই ভাঙচুর শুরু করে। গালিগালাজ করতে থাকে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। আমাকেও মারধর করেছে। আগুন ধরাতে শুরু করতেই ভগবানের নাম নিতি নিতি প্রাণে বাঁচতে দৌড় দিলাম বিলের দিকে। বনজঙ্গল পানি মাড়িয়ে বিলের এক ঢিবেতে লুকিয়ে থাকলাম। দূর থেকে দেখছি আমার বাড়িঘর আগুনে পুড়ছে। ফিরে এসে দেখি কিচ্ছু নেই। বাড়িতে দুটো মোটরসাইকেল ছিলো। যা পুড়ে ছাই। ঘরের ভিতর বাক্স ভাঙ্গা, তার ভিতরে কাপড় চোপড় আগুনে পুড়ে গেছে। ঘরের টিন পুড়েছে। স্বর্ণলংকার নিয়ে গেছে। আগুন দেওয়ার আগে তারা বাড়িঘর লুটপাট করেছে। গরু-ছাগলের ঘরও পুড়ে ছাই। পরণে কাপড় ছাড়া আমার আর কিছু নেই।’
আরেক বাসিন্দা চন্ডিকা বিশ্বাসের দুটি ঘর পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘কিছু বলার নেই। কি বলব! যা যাওয়ার তো আমাদের গেছে। আমরা কি অপরাধ করেছি। গরীব আমরা। যারা অপরাধ করেছে, তাদের শাস্তি দিক। আমরা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে আমাদের কেন বাড়ি পুড়ালো?’
হামলার ভয়াবহতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন হামলা হয় তখন ছেলে, ছেলের বউ আর আমার স্বামী বিলের জল মাড়িয়ে পাশের গ্রামে চলে যায়। আমার শ্বাশুড়ি অসুস্থ, হামলাকারীদের বলি- তোমরা আমাদের ঘরে যা আছে নিয়ে যাও, কিন্তু আগুন দিও না। তারপরও লুটপাট করে আগুন দিয়ে তারা চলে যায়।’
শুধু স্মৃতি বিশ্বাস ও চন্ডিকা বিশ্বাস নয়, তাদের মতো আগুনে পুড়ে গেছে বাড়েদা পাড়ার ২০টি বাড়ির সর্বস্ব। অগ্নিসংযোগের আগে লুটপাট চলে এসব বাড়িতে।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর কৃষক দলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম সরদার গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘের লিজ নেওয়ার জন্য ডহরমশিয়াহাটির বাড়েদা পাড়ায় পিন্টু বিশ্বাসের বাড়ি যান। সেখানে চুক্তিপত্র করা সময় গোলযোগ হলে অজ্ঞাত সাত-আটজন দুর্বৃত্ত এসে কুপিয়ে ও পরে গুলি করে তরিকুলকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর তরিকুলের সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা পিন্টু বিশ্বাসের তিনটি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন।

স্থানীয়রা আরও জানান, এরপর অজ্ঞাত লোকজন দল বেধে এসে পিন্টু বিশ্বাসের প্রতিবেশিদের বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ভয়ে তারা বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেয় বিলে ও ঝোপঝাড়ে। এরপর দূর থেকে দেখতে পান তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বলছে। তারা এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান।
বাড়েদা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, চারিদিকে ঘরবাড়ি-জিনিসপত্র পুড়ে ছাই। কারও বাড়ির দেওয়ালে ইট আছে, ছাউনি নেই। ঘরের জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে আছে। পাড়ার বেশিরভাগ বাড়ি পুরুষশুণ্য। দূরের আত্মীয় স্বজনরা খাবার নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িতে আসছেন।
পাড়াটিতে ওই রাত থেকেই বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। নিরাপত্তা দিতে মোড়ে মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। মাঝে মাঝে আসছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। তারপরও আতঙ্ক কাটেনি মতুয়া সম্প্রদায়ের এই পাড়াটিতে।
প্রথমে আগুন দেওয়া হয় পরিতোষের বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘কোনোরকম জানডা নিয়ে পালিয়েছিলাম। জামা গেঞ্জি পড়ার সময়টুকুও পায়নি। বাড়িতে বুড়ো মা-বাবা ছিল, তাদের ফেলে চলে গেছিলাম। আগুন দিলে ফায়ার সার্ভিসের লোকদের জানানো হয়। কিন্তু হামলাকারীরা তাদের আসতে দেয়নি।’
আগুনের আঁচে গাছের পাতাও পুড়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও চরম আতঙ্কে আছি। পাড়া পুরুষশূণ্য। আমরা নিরপরাধ। যারা ক্ষতি করেছে, তাদের আইননের আওতায় আনা হোক।’
অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, তরিকুল হত্যাকে কেন্দ্র করে কিছু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার রাতেই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনায় জড়িতদের সনাক্তের চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে। আর আগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। তবে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে।
এইচ আর তুহিন/অমিয়/