ময়মনসিংহের গৌরীপুরে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অতি দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ভিজিএফের চাল নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুস্থদের জন্য সরকারের দেওয়া এই উপহারের চাল ইউনিয়ন পরিষদের ফটকেই নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছে একটি চক্র। স্থানীয়দের ভাষায়- চাল ‘ঘরে লয়, আর দুয়ারেই বেচে’।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অভাবীদের বদলে সচ্ছল ব্যক্তিরা কার্ড পাওয়ায় এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে গরিবের এই হক নিয়ে এমন বাণিজ্য চলছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভিজিএফ চাল বিতরণ কার্যক্রমে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দেখা যায়, তিন চারজনের একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই চাল কিনছে।
হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি কার্ডপ্রতি ২২০ টাকা দরে চাল কিনছেন। ওজনে কম হওয়ার অজুহাতে তিনি চালের দাম কমিয়ে দিয়েছেন। আগে ১০ কেজি হতো এখন ৮-৯ কেজি হয়।
মোবারকপুরের সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘরে লয়, দুয়ারে (দরজায়) এসে বেচে ২০০-৩০০ টাকা নিয়ে যায়।’
অন্যদিকে সহনাটী ইউনিয়নে চাল কেনার অভিযোগে ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বুরহানকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিষেধ করলেও তিনি তা উপেক্ষা করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি চাল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাহগঞ্জের রহিমা খাতুন ও নুরজাহানের মতো অনেকেই চাল বিক্রি করে দিচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, চালের মান মোটা হওয়ায় এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝক্কি এড়াতে তারা ২৫০ টাকার কার্ড ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা উপোস থাকে তারা চাল পায় না। যাদের পাকা দালান আছে, তারাই রাজনৈতিক প্রভাবে কার্ড পেয়েছে। তারা চাল নিয়ে কী করবে? তাই বিক্রি করে দিচ্ছে।’
মইলাকান্দা ইউনিয়নের চাল ক্রেতা ফজলুল হক জানান, প্রতিজনের চাল ২৫০ টাকা (প্রতিকেজি চাল ২৫ টাকা) দামে কিনছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩০-৪০ জনের চাল কিনেছেন। তিনি নিজেও প্রতিবন্ধী। তাই এ ব্যবসা করছেন।
কাউরাট গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, আমি চাল তুলেছি। চারজনের সংসার। তাই আরও ১২ জনের চাল কিনেছি।
একাধিক সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদের নামে বরাদ্দ চালের কার্ড বিতরণ করেছেন দলীয় লোকজন। সিংহভাগ বরাদ্দের কার্ড তারা নিয়ে গেছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, গরীরের এ চাল ক্রয়ে অসাধু একাধিক মিল মালিকও জড়িত। তাদের হাত ধরে এই চাল আবারও ঢুকছে গুদামে।
অভিযোগ উঠেছে, এই স্বল্পমূল্যে কেনা চাল অসাধু মিলমালিকদের হাত ঘুরে আবারও সরকারি খাদ্য গুদামে ঢোকার প্রক্রিয়া চলছে। অথচ সরকারি হিসাবে এই চালের ক্রয়মূল্য প্রতি কেজি ৫০ টাকা, যা বাইরে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-২৫ টাকায়।
ইউনিয়ন পরিষদের সামনেই চাল ক্রয় প্রসঙ্গে অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জায়েদুর রহমান বলেন, বারবার বলার পরেও তাদের সরানো যাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন বলেন, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ২৫ হাজার ৮১১টি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে মোট ২৫৮ দশমিক ১১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, ‘ঘটনা জানার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমার নেতৃত্বে পুলিশসহ একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’