সপ্তম অধ্যায় : বাংলাদেশের বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম
নমুনা প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: গ্রামীণ ব্যাংক কী? গ্রামীণ ব্যাংকের পটভূমি, বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখ।
উত্তর: গ্রামীণ ব্যাংক: বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্র, দুস্থ ও ভূমিহীন পরিবারের উন্নয়নে যেসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক অন্যতম। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বাস্তবায়নকারী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অক্লান্ত পরিশ্রম ও মৌলিক চিন্তার মধ্য দিয়ে ব্যাংকটির উৎপত্তি ও বিকাশ হয় এবং জনগণের কাছে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের অনেক দেশ গ্রামীণ ব্যাংককে অনুসরণ করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার গ্রামীণ ব্যাংক সারা বিশ্বে এখন একটি মডেল। যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, কেনিয়া প্রভৃতি দেশে আজ গ্রামীণ ব্যাংকের আদলে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের পটভূমি: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জোবরা গ্রামের ভূমিহীন নারীদের করুণ ও অসহায় অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত হন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন যে, শুধু পুঁজির অভাবে গ্রামের দুস্থ ও অসহায় মানুষ মহাজন ও ভূস্বামীদের শোষণ এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জোবরা গ্রামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করেন। প্রকল্পটির নামকরণ করা হয় গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প।
প্রাথমিক প্রকল্পের ফল সন্তোষজনক হওয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে সোনালী ব্যাংকের অর্থসহায়তায় জোবরা গ্রামে ১৯৭৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি শাখা চালু হয়। পরে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে পার্শ্ববর্তী গ্রামে প্রকল্পটি বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রামে এভাবে তিন বছর চালু থাকার পর ১৯৭৯ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় টাঙ্গাইল জেলায় এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ১৯৮০ সালের মে মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইল জেলা মিলে মোট ২৪টি পরীক্ষামূলক গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা খোলা হয়। ১৯৮২ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD) প্রকল্পে সহায়তাদানে এগিয়ে আসায় এ প্রকল্প ঢাকা, রংপুর ও পটুয়াখালী জেলায় সম্প্রসারিত করা হয়। এ প্রকল্পে ইউনিসেফ (UNICEF) এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন (Ford Foundation) অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করে। গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ জারির মাধ্যমে সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ সালে প্রকল্পটি গ্রামীণ ব্যাংক নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
গ্রামীণ ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য: অন্যান্য সাধারণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ ব্যাংক পৃথক ধরনের। গ্রামীণ ব্যাংকের ধারণা ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে কতিপয় সাধারণ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। গ্রামীণ ব্যাংকের এ বৈশিষ্ট্যই একে অন্যান্য ব্যাংক থেকে স্বতন্ত্রতা দান করেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১। গ্রামীণ ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসিত আধা সরকারি অর্থলগ্নিকারী ব্যাংক।
২। গ্রামীণ ব্যাংক শুধু গ্রামীণ ভূমিহীন ও দরিদ্রদের মধ্যে ঋণ দিয়ে থাকে। ভূমিহীন বলতে তাদেরই বোঝায়, যাদের আধা একর বা এক একরের সমান সম্পদ নেই।
৩। গ্রামীণ ব্যাংক সঞ্চয় বৃদ্ধিকল্পে আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে ঋণ দেয়।
৪। ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের কাছে যায় না, বরং ব্যাংকের কর্মকর্তারাই ঋণগ্রহীতাদের কাছে যান।
৫। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ পেতে কোনো জামানতের প্রয়োজন পড়ে না।
৬। গ্রামীণ ব্যাংক সব ধরনের আয় সৃষ্টির কাজে ঋণ দিয়ে থাকে।
৭। ভূমিহীনরা শুধু ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাই নয়, তারা ব্যাংকের মালিকও বটে।
৮। গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং ব্যাংক ঋণের পূর্ণ তদারক করে।
৯। ঋণ নিতে আগ্রহীকে কমপক্ষে পাঁচজনের দল গঠন করতে হয়।
১০। গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের গ্রামে থাকতে হয়।
১১। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় একজন মাঠ ম্যানেজার এবং কয়েকজন পুরুষ ও নারী দিয়ে পরিচালিত।
১২। ব্যাংকের সদস্য হওয়ার জন্য লেখাপড়াসংক্রান্ত কোনো শর্ত নেই।
১৩। গ্রামীণ ব্যাংকের দলীয় সঞ্চয় আছে, যেখানে প্রতি সপ্তাহে এক টাকা চাঁদা দিতে হয়।
১৪ । ব্যাংক-বিমা সুবিধা হিসেবে ভূমিহীনদের জন্য একটি জরুরি ফান্ড সৃষ্টি করে।
১৫। ঋণ পরিশোধে শুধু ঋণগ্রহীতাই নয়, দলের সব সদস্য যৌথভাবে দায়ী থাকে।
গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্দেশ্য: গ্রামীণ ব্যাংক মডেলকে একটি আর্থসামাজিক মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রামীণ ব্যাংক ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এর সাফল্য দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত-উন্নয়নশীল-অনুন্নত বহু দেশে গ্রামীণ ব্যাংকের অনুকরণে কর্মতৎপরতা শুরু হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের অভিনব দর্শন, প্রয়োগ, উপযোগিতা এবং অভূতপূর্ব সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মাননা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ পদকে ভূষিত হন এবং ২০১৩ সালে আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল’ এ ভূষিত হন। গ্রামীণ ব্যাংকের কতগুলো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য রয়েছে। সেগুলো হলো-
প্রথমত, সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করার মাধ্যমে ভূমিহীনদের জামানত ছাড়াই আর্থিকভাবে সাহায্য করা।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ সুদখোর মহাজনদের শোষণের চেষ্টা বিলোপ সাধন।
তৃতীয়ত, অব্যবহৃত ও নিম্ন ব্যবহৃত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
চতুর্থত, ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নারী ও পুরুষদের মধ্যে বৃদ্ধিকরণ।
পঞ্চমত, অবহেলিত গ্রামীণ জনগণকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা, যে কাঠামো তারা সহজে বুঝতে পারে এবং পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করতে পারে।
ষষ্ঠত, মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে পার্শ্ব-জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা।
সপ্তমত, দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে উৎপাদনশীল ও সম্প্রসারণশীল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
অষ্টমত, দরিদ্র শ্রেণি যাতে তাদের শ্রমের মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ব্যবস্থা করা।
নবমত, দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নে তাদের মধ্যে সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা ।
দশমত, ধনিক শ্রেণি ও মহাজনদের কবল থেকে গ্রামীণ নিঃস্ব ও ভূমিহীনদের রক্ষা করা। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার নিজস্ব কার্যপন্থা উদ্ভাবন করেন।
লেখক : প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
কবীর