ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত হয়। এর ফলে টিউমার তৈরি হয়, যা কাছের টিস্যু আক্রমণ করতে পারে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্যানসারকে অনেকেই মারণব্যাধি মনে করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সেই ক্যানসার চিকিৎসায় বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছেন। মনে করছেন, তাদের এই গবেষণা ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিক খুলে দেবে।
বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার মূল বিষয় হচ্ছে, ক্যানসার কোষ কীভাবে শক্তি অর্জন করে সেটি খতিয়ে দেখা। বাধার মুখে পড়েও কীভাবে শক্তি অর্জন করে আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় ক্যানসারের কোষ। এই গবেষণায় সে বিষয়টাও কিছুটা উদঘাটন করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।
খবরে বলা হয়েছে, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর বায়োপসি খতিয়ে দেখে কিছু গবেষণা করেছে বার্সেলোনার সেন্টার ফর জেনোমিক রেগুলেশন (সিআরজি)। এখানকার বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, শারীরিকভাবে চাপে পড়লেই নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে সমর্থ হয় ক্যানসারের কোষগুলো। এই শক্তির জন্যই ডিএনএর যে ক্ষতি হয়, তা মেরামত করে ফেলে কোষগুলো।
প্রশ্ন হচ্ছে, কী কী বাধার মুখে পড়ে ক্যানসারের কোষ? বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিউমার, ছিদ্রযুক্ত রক্তনালির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বাধাপ্রাপ্ত হয় ক্যানসারের কোষ। ওই সময়ই বিশেষভাবে এই শক্তি অর্জন করে বাধা প্রতিরোধ করে শরীরে আরও ছড়িয়ে পড়তে সমর্থ হয় ক্যানসারের কোষ।
গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার কমিউনিকেশনসে। গবেষকদের ওই দল একটি বিশেষ মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করেছেন। সেই মাইক্রোস্কোপ জীবিত কোষে চাপ দিয়ে তার আকার কমিয়ে দিতে পারে। ওই মাইক্রোস্কোপের চাপের ফলে তিন মাইক্রন পর্যন্ত বহরে ছোট হয় কোষ; যার অর্থ একটি চুলের ৩০ ভাগের এক ভাগ ব্যাস। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, চাপ দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোষে থাকা মাইটোকনড্রিয়া সরে গিয়ে নিউক্লিয়াসের পৃষ্ঠে চলে যায়। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত এটিপি (শক্তি) ক্ষরণ করতে থাকে।
গবেষক দলের সমন্বয়ক ডা. সারা এসডেলসি বলেন, ‘মানবকোষে মাইটোকনড্রিয়ার ভূমিকা কী এই গবেষণার পরে আমরা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছি। ওরা কিন্তু শুধু ব্যাটারি নয়, যা কোষকে শক্তি জোগায়। কোষ যখন প্রচণ্ড চাপে পড়ে, সে রকম জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে কার্যোদ্ধারে ছুটে আসে মাইটোকনড্রিয়া।’
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইটোকনড্রিয়া কোষে একটি চক্র তৈরি করে। সেই চক্র এতটাই দৃঢ় হয় যে, কোষের নিউক্লিয়াসে চাপ পড়ে টোল পড়ে। ক্যানসার কোষের ৮৪ শতাংশের মধ্যে এই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করেন বিজ্ঞানীরা। এই গঠনকে তারা বলছেন ‘এনএএম’ (নিউক্লিয়াস অ্যাসোসিয়েটেড মাইটোকনড্রিয়া)। এই এনএমএম কীভাবে কাজ করে, তা দেখার জন্য গবেষকরা একটি ফ্লুরোসেন্ট সেন্সর ব্যবহার করেন। চাপের ফলে ক্যানসার কোষে যে এটিপি (শক্তি) উৎপন্ন হয়, তা নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করলে এই সেন্সর আলোকিত হয়। কোষগুলো চাপের মধ্যে পড়লেই এই সেন্সর সংকেত দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে থেকে কোষে চাপ প্রয়োগের ফলে ডিএনএ চাপে পড়ে যায়। তার ভেতরে থাকা জিনোম তখন জট পাকিয়ে ফেলে। কোষ তখন সেই ক্ষত মেরামতের জন্য এটিপির ওপরেই নির্ভর করে। প্রচণ্ড চাপে পড়লে কোষে যে অতিরিক্ত পরিমাণ এটিপি উৎপন্ন হয়, তা সহজেই ওই ক্ষত মেরামত করে দেয়। এক ঘণ্টার মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করে সে।
বিষয়টি নিয়ে আরও নিশ্চিত হতে ক্যানসার আক্রান্ত ১৭ জন রোগীর ব্রেস্টে থাকা টিউমারের বায়োপসি নিয়ে পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। দলের অন্যতম গবেষক ঋতব্রত ঘোষ জানিয়েছেন, সেই পরীক্ষা থেকেই বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হয়েছেন তারা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পেশিকে নমনীয় করে যে প্রোটিন তা নিউক্লিয়াসের চারপাশেও থাকে। এন্ডোপ্লাসমিক রেটিকিউলাম নিউক্লিয়াসের চারপাশে একটি জাল তৈরি করে। এই জাল এবং প্রোটিন তার এনএএমকে ধরে রাখে। তার চারপাশে তৈরি হয় চক্র। এই পরিস্থিতিতে কোষে এক রাসায়নিক (লাট্রানকুলিন এ) প্রয়োগ করেন বিজ্ঞানীরা। তাতে দেখেছেন এনএএমের গঠন ভেঙে পড়েছে। এটিপির জোগানও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
জানা গেছে, ক্যানসার কোষের শক্তি অর্জনের এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পেরে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা মনে করছেন, তাদের এই গবেষণা ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিক খুলে দেবে। সূত্র: সায়েন্স ডেইলি