ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাত থেকে ব্যাপক আকার ধারণ করলে বহু স্থানে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালায়। তেহরানের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’কে জানান, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে—যাদের বেশির ভাগই নিহত হয়েছেন জীবন্ত গুলিতে।
এই মৃত্যুসংখ্যা নিশ্চিত হলে তা হবে ভয়াবহ দমন-পীড়নের স্পষ্ট ইঙ্গিত, যার আভাস সরকার বৃহস্পতিবার রাত থেকেই দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে দিয়েছিল। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প ওই দিনই সতর্ক করে বলেছিলেন, ২৮ ডিসেম্বর থেকে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষদের হত্যা করা হলে ইরানি সরকারকে “চরম মূল্য দিতে হবে”।
বর্তমানে বিক্ষোভ ইরানের সব ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতে এটি ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা রূপ নেয় ১৯৭৯ সাল থেকে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশটিতে শাসন করে আসা ইসলামী শাসনব্যবস্থা উৎখাতের দাবিতে।
বিক্ষোভগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ হলেও যেখানে “স্বাধীনতা” ও “স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক” স্লোগান শোনা গেছে এবং বেশ কিছু সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি বিক্ষোভকারী কর্তৃত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপরও গুলি চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
চিকিৎসক জানান, শুক্রবার হাসপাতাল থেকে লাশ সরিয়ে নেওয়া হয়। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনের সামনে নিরাপত্তা বাহিনী মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করলে সেখানে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, ওই ঘটনায় অন্তত ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হন।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুক্রবার চিকিৎসকের দেওয়া সংখ্যার তুলনায় কম মৃত্যুসংখ্যা জানিয়েছে। এই পার্থক্যের কারণ হিসেবে ভিন্ন রিপোর্টিং পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (যারা কেবল শনাক্ত হওয়া নিহতদের হিসাব করে) বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬৩ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যার মধ্যে ৪৯ জন বেসামরিক নাগরিক।
এদিকে সরকার থেকে একের পর এক কঠোর বার্তা আসতে থাকে। শুক্রবার প্রচারিত এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, ট্রাম্পকে “খুশি করতে চাওয়া” “ভাঙচুরকারীদের” সামনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কখনোই পিছু হটবে না। একই সময়ে তেহরানের প্রসিকিউট ঘোষণা দেন, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের এক কর্মকর্তা অভিভাবকদের সন্তানদের বিক্ষোভ থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যদি গুলি লাগে, তাহলে অভিযোগ করবেন না।”
বিক্ষোভের প্রথম ১১ দিনে সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। উত্তর-পশ্চিম ইরানের একটি কুর্দি শহরে দায়িত্বরত কালো পোশাকের এক দাঙ্গা-পুলিশ কর্মকর্তা বুধবার টাইমকে বলেন, শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের দমন-পীড়ন চালানো হবে কি না—এ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যেই তীব্র মতবিরোধ চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “দাঙ্গা পুলিশের ভেতর শতভাগ বিভ্রান্তি রয়েছে।”
তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এমন সব বৈঠকে নেওয়া হচ্ছে, যার কিছুই তার মতো কর্মকর্তাদের জানানো হচ্ছে না। “আমি এখানে একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, অথচ কী হচ্ছে আমি জানি না। সবকিছু গোপনে করা হচ্ছে, আর আমরা সামনে কী আসছে তা নিয়ে আতঙ্কে আছি,” তিনি বলেন।
“শহরে, ঘরে, রাস্তায়—সবখানেই বিশৃঙ্খলা। এমনকি পুলিশের মধ্যেও,” তিনি যোগ করেন। “আমার থানার সব কর্মকর্তাই মনে করেন, এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।”
তবে শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রক্তাক্ত ছবির সঙ্গে সরকারের খোলাখুলি হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয়, কঠোর নির্দেশ ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিভিত্তিক ইরান বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হোসেইন হাফেজিয়ান বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে, যেহেতু বিক্ষোভ মধ্যবিত্ত এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে, সরকার আগের মতোই নির্মম শক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না।” তার মতে, “এই মুহূর্তে বিষয়টি তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এখন থেকে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে।” তবে যোগ করেন, “যদি ট্রাম্প কয়েকটি দাঙ্গা-পুলিশ ব্যারাকে হামলা চালান, তাহলে পরিস্থিতি আমূল বদলে যেতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তারের ঘটনা—এই দুটোই বিক্ষোভের শুরুর দিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের অস্থির ও অসম প্রতিক্রিয়ার একটি ব্যাখ্যা হতে পারে।
ইরানের পশ্চিম ইলামের মালেকশাহি শহরে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর একটি ভবনের সামনে গুলিতে অন্তত পাঁচ বিক্ষোভকারী নিহত হন বলে প্যারিসভিত্তিক কুর্দিস্তান হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে। অথচ বিক্ষোভের সূতিকাগার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার, যা ঐতিহ্যগতভাবে সরকারের সমর্থনকেন্দ্র, নিরাপত্তা বাহিনী মূলত টিয়ার গ্যাস ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমেই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করেছে, গুলি চালায়নি।
অনেকে মনে করছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখন একাধিক সংকটে জর্জরিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যাভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অধ্যাপক ও ইরান বিষয়ে দুটি বইয়ের লেখক আফশোন ওস্তোভার বলেন, “এটি এখনো একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা। কিন্তু চারদিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরের সময়ের তুলনায় প্রায় সব দিক থেকেই এটি এখন সবচেয়ে দুর্বল।”
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয় এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বড় ধাক্কা খায়। এসময় যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের নির্দেশে বি-২ বোমারু বিমান পাঠিয়ে ইসরায়েলকে সহায়তা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত মুদ্রা, পানির সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট—যা দেশজুড়ে সংকটের অনুভূতি আরও তীব্র করেছে।
হাফেজিয়ান বলেন, “তারা নিজেদের জনগণের ন্যূনতম অর্থনৈতিক কল্যাণও নিশ্চিত করতে পারছে না। এখন তারা কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছে।”
এই সংকটকে আরও জটিল করেছে বিক্ষোভের সামাজিক ভিত্তি। ২০২২ সালে ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের বিপরীতে, বর্তমান বিক্ষোভ শুরু হয় বাজারের ব্যবসায়ীদের হাত ধরে এবং পরে ছড়িয়ে পড়ে শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে—যাদের ক্ষুব্ধ করতে সরকার বরাবরই সতর্ক থাকে বলে জানান তেহরানভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন দমন করা প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি কঠিন।” তবে তিনি যোগ করেন, “কিছু জায়গায় কঠোর আচরণ দেখা গেছে… আর বিক্ষোভ যত ছড়াবে, সরকারের সংযমের মাত্রা ততই পরীক্ষার মুখে পড়বে।”
ইরানের শাসন কাঠামোও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। এর শীর্ষে রয়েছেন খামেনি, যিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসহ পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে কিছুটা সমঝোতামূলক সুর নিলেও তার মন্ত্রিসভা দমন-পীড়নের পক্ষেই ঝুঁকছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মন্ত্রী জানিয়েছেন।
একজন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিকাংশ সদস্য মনে করছেন, বিক্ষোভ শক্ত হাতে দমন করা উচিত, কারণ তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেখছেন।”
আরেক মন্ত্রীর মতে, খামেনি ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে যাওয়ার পর থেকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে তার সরাসরি বৈঠক বন্ধ রয়েছে। “এখন তিনি একাধিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করেন,” তিনি বলেন।
ইরান সরকারের জনসংযোগ উপদেষ্টা মাশাল্লাহ শামসোলভায়েজিন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন “ইরানিদের রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করতে চায় এবং পরে জনগণকে বাঁচানোর অজুহাতে ভেনেজুয়েলার মডেলে ইরানে হামলা চালাতে চায়।” তিনি জানান, সরকার ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে যেমন: বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন এবং আগামী চার মাস প্রতিটি ইরানিকে মাসে ১০ লাখ তুমান (প্রায় ৭ ডলার) দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সময় কেনার চেষ্টা করেছে।
শামসোলভায়েজিন আরও বলেন, সরকার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের বিষয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করেছে। শাসকগোষ্ঠী আশা করছে, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে, তিনি বলেন।
বৃহস্পতিবার রাতের রক্তপাতের আগে বিশ্লেষকেরা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েকটি অনিশ্চিত বিষয় তুলে ধরেছিলেন। এর একটি হলো—মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির আরও বেশি মানুষ এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী সহিংসতার আশঙ্কা সত্ত্বেও বিক্ষোভে যোগ দেয় কি না। অনেকেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের বড় ছেলে রেজা পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী পাহলভি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ব্যাপক বিক্ষোভের ডাক দেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি ইরানে ফিরে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।
কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকেও আলাদা আহ্বান আসে। কুর্দিস্তান হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের বোর্ড সদস্য রেবিন রহমানি বলেন, অনেক ইরানি কুর্দ রাস্তায় নেমেছেন, কারণ তাদের হারানোর কিছু নেই এবং তারা বুঝতে পারছেন সরকার দুর্বল। “এই উপলব্ধি ভয় কমিয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের সাহস বাড়িয়েছে,” তিনি বলেন।
তবু এক কুর্দি বিক্ষোভকারী মনে করেন, বড় পরিবর্তন আসবে না, যদি না বড় শহরগুলোর আরও বেশি মানুষ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি জড়িত হন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “আমাদের আশা ট্রাম্পের ওপর। তিনি ইরানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার মতোই আচরণ করুন।”
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়তো নিরাপত্তা বাহিনী নিজেই। পর্যবেক্ষকদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের বিদ্রোহের লক্ষণ নেই, তবে প্রতিটি বিক্ষোভেই আরও বেশি সাধারণ পুলিশ ও বাসিজ সদস্য দমন-পীড়নে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
“আমার নিজের পরিবার আমাকে ইউনিফর্ম খুলে এই চাকরি ছেড়ে দিতে বলছে,” দাঙ্গা-পুলিশ কর্মকর্তা বলেন। “আমি ভয় পাচ্ছি, যেদিন কমান্ডাররা গুলি চালানোর নির্দেশ দেবেন।”
তিনি যোগ করেন, “আমি আদেশ অমান্য করলে ওরাই আমাকে মেরে ফেলবে।” “আমি এই বাহিনীতে আছি জীবিকার জন্য,” তিনি বলেন, “মানুষ মারার জন্য নয়।” সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন
মাহফুজ/