ছাত্রদের আর শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন হচ্ছে না, কিংবা মুহূর্তেই একজন সাধারণ মানুষ হয়ে যাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, করছেন জটিল সব সার্জারি। অথবা নতুন দেশে এসেছেন, নতুন কোনো ভাষা শেখা প্রয়োজন -একমুহুর্তেই সেই ভাষা শিখে ফেলছেন, কথা বলছেন অনর্গল স্থানীয়দের মতোই। কিংবা ভাবছেন এসির টেমপারেচার একটু কম হলে ভাল হতো -আর নিজে থেকেই কমে গেল রুমের টেম্পারেচার। এগুলোকে বিজ্ঞানের জগত থেকে মূলত হ্যারি পটারের যাদুর পৃথিবীই বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু এমনটা কি সম্ভব?
এমন সব সম্ভাবনার কথাই বলছেন ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা ব্রেইন মেশিন ইন্টারফেস (বিএমআই) নিয়ে কাজ করা কোম্পানি নিউরালিংক এবং তার মালিক বিলিয়নেয়ার ও ইনফ্লুয়েন্সার ইলন মাস্ক।
বিএমআই আসলে কী? বিএমআই হলো এমন এক প্রযুক্তি -যেখানে কোনো ধরনের স্পর্শ ছাড়াই কেবল চিন্তার মাধ্যমে কম্পিউটারের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ স্থাপন করা যায়।
ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত নিউরালিংক কোম্পানি এরই মধ্যে মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে কম্পিউটারের ওয়ারলেস সংযোগের ডিভাইস তৈরি করেছে এবং এটি মাথায় স্থাপনের জন্য সার্জারি করতে সক্ষম রোবটও তৈরি করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে তারা মানুষের মস্তিষ্কে নিউরালিংক ডিভাইস স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ড্রাগ অ্যান্ড ফুড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে অনুমোদনও পেয়ে গেছে গত মে মাসে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক টুইটে নিউরালিংক বিএমআই ডিভাইস স্থাপনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিতে আবেদন করার জন্য অনুরোধও করেছে। প্রাথমিক অবস্থায় এই ডিভাইস স্থাপনের উদ্দেশ্য -যাতে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী কারো সাহায্য ছাড়াই নিজের স্মার্টফোন, টেলিভিশন বা এসির মতো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন। তাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদানের জন্য এমন প্যারালাইসিস রোগীদেরই আবেদন করার অনুরোধ জানিয়েছে নিউরালিংক। তবে পরীক্ষামূলকভাবে ঠিক কতোজনের মস্তিষ্কে এই ডিভাইস স্থাপন করা হবে তা জানায়নি কোম্পানিটি।
যদিও অনেক বিশেষজ্ঞই এই সার্জারির নিরাপত্তা ও সফলতা নিয়ে শংকিত। কারণ এর জন্য মাথার হাড়ের খানিকটা অংশ কেটে বাদ দিয়ে এই ডিভাইসটি স্থাপন করতে হয়। তবে মাস্ক বরাবরই বলেছেন, রোবট দিয়ে ডিভাইস স্থাপন একদমই নিরাপদ। তিনি ভবিষ্যতে তার সন্তানদের মাথায় ডিভাইস স্থাপনে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন।
নিউরালিংকের কার্যক্রম নিয়ে আগে যেসব সমালোচক গালগল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন -তাদেরকে শক্ত জবাব এরই মধ্যে দিয়ে দিয়েছে নিউরালিংক। তারা পরীক্ষামূলকভাবে শূকর ও বানরের মস্তিষ্কে সফলতার সঙ্গে বিসিআই ডিভাইস স্থাপন করেছে। বিশেষ করে, পেইজা নামের এক বানরের ভিডিও প্রকাশের পর প্রযুক্তি জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যেখানে নিউরালিংক ডিভাইস কাজে লাগিয়ে পেইজাকে কম্পিউটারে পিংপং বল খেলতে দেখা যায়। এ ছাড়া কিছু লেখালেখির কাজও পেইজাকে করতে দেখা যায় নিউরালিংকের প্রকাশিত ভিডিওতে।
২০১৯ সালে নিউরালিংকের এক ইভেন্টে ইলন মাস্ক বলেছিলেন ভবিষ্যৎ বিএমআই প্রযুক্তির সম্ভাবনার কথা। তার মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্ক সংক্রান্ত বহু সমস্যা, যেমন -স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা, ব্রেইন ড্যামেজ, হতাশা, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগও সারাতে পারবে।
এমনকি এর মাধ্যমে নতুন কোনো স্কিলও মুহুর্তে মস্তিষ্কে কম্পিউটার ডিভাইসের মতোই আপলোড করা যাবে বলে জানিয়েছেন মাস্ক। সেটি হতে পারে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বা মেডিক্যাল সার্জারির মতো জটিল বিষয়। সেই হিসেবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে হয়তো কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন হবে না।