জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় ঢালাও মামলা করে ইচ্ছামতো আসামি করার অনেক ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এসব মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশিষ্ট চার ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ
মামলা হতে হবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে: বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলাগুলোর মধ্যে যেগুলো ঢালাও মামলা, তার একটাও টিকবে না। যাদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের সবাই ছাড়া পেয়ে যাবেন।
ঢালাওভাবে যারতার নামে মামলা করা ঠিক হচ্ছে না। মামলা হতে হবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। যে বা যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল, মামলা করতে হবে শুধু তাদের বিরুদ্ধে। তাদেরকে চেনা খুব কঠিন কিছু না। সবাই জানে, সবাই চেনে। সবার হাতে হাতে মোবাইল সেট- ক্যামেরা, সবার কাছে ছবি আছে।
আন্দোলনকেন্দ্রিক কোনো ঘটনায় কে জড়িত, এসব কিছুর ছবি/ভিডিও মানুষের হাতে হাতে আছে। ইন্টারনেটে এসব ছবি/ভিডিও সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মামলা করতে হবে, সে সব দেখে দেখে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে, প্রমাণ সাপেক্ষে। এর বাইরে যারতার নামে মামলা করলে, যাকে তাকে আসামি করলে বিষয়টা হালকা হয়ে যায়।
যাকে ভুয়া আসামি করা হলো, শেষ পর্যন্ত সে তো ছাড়া পেয়েই যাবে, মাঝে পুরো মামলাটাই হাস্যকর হয়ে যাবে, হালকা হয়ে যাবে। তাই ঢালও মামলা করা বা ঢালাও আসামি করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কারণে ঢালাও গ্রেপ্তার: জেড আই খান পান্না
দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কারণে তদন্ত ছাড়াই এক ধরনের ঢালাও গ্রেপ্তার বা আটকের মতো ঘটনা ঘটছে। আমরা দেখলাম, অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তারের পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বললেন যে, ‘মামলা ছিল তাই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ এখানে মামলাটি ভুয়া নাকি সত্যি, সেগুলো কোনো বিষয় না।
পুলিশ পুলিশের কাজ করেছে। কিন্তু মামলা হলেই যে গ্রেপ্তার করতে হবে, সেটা ঠিক না। মামলার অভিযোগ, তথ্যপ্রমাণ ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়ার কথা, কিন্তু তা সব সময় হচ্ছে না। ধর্তব্য অপরাধ বা গ্রহণযোগ্য তথ্যপ্রমাণ থাকলে পুলিশ মামলা হলেই গ্রেপ্তার করতে পারে।
তা ছাড়া আমি এখানে পুলিশের দোষ দেব না। মামলাসহ গ্রেপ্তার আসামি যখন আদালতে তোলা হলো তখন ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা কী ছিল? আমরা দেখলাম, ওই আসামি (নুসরাত ফারিয়া) ঘটনার সময় দেশের বাইরে ছিলেন। যদি সেটার সপক্ষে প্রমাণ তুলে ধরা হয়, তাহলে তো গ্রেপ্তার হওয়ার কথা না, কারাগারেও পাঠানোর কথা নয়। কাজেই এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তা ছাড়া অভিনেতা-অভিনেত্রী বা সাংবাদিকসহ এই জাতীয় পেশার মানুষদের বিরুদ্ধে মামলা হলে ভালোভাবে তদন্ত করে তারপর গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় যাওয়া উচিত।
চেয়ারপারসন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
পুলিশে মাঠ পর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা যাচ্ছে না: মুহাম্মদ নুরুল হুদা
বাংলাদেশ পুলিশের মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের কাছে স্পষ্ট বা পরিষ্কারভাবে নির্দেশনা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। ঢালাও আটক কিংবা গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো থেকে তেমনটাই মনে হচ্ছে। মামলা যে কেউ করতে পারেন, কিন্তু গ্রেপ্তার ঢালাওভাবে নয়। গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে।
অনেক সময় মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হচ্ছে। সেটা হতে পারে। কেননা, পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) অথবা সিআরপিসি (ফৌজদারি কার্যবিধি) অনুসারে যে কেউ ‘ধর্তব্য’ অপরাধের অভিযোগ নিয়ে গেলে পুলিশ সেটি গ্রহণ করবে বা আমলে নিতে হবে। কিন্তু মামলা বা অভিযোগ হলেই ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তদন্ত কর্মকর্তাকে নৈতিক অবস্থান থেকে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে অভিযোগের তদন্ত করতে হবে। যদি সেরকম তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, তবেই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। অর্থাৎ অভিযোগ অনুসারে সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্যপ্রমাণ পেলেই কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা আসামিকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
এখানে মামলা করার বিষয়টি সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে- মামলা-পরবর্তী কার্যক্রমে। এক শ্রেণির অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য আছেন, যারা এসব মামলা বা অভিযোগের সুযোগে অন্য কোনো স্বার্থ হাসিল বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভূমিকা ও সরকারের স্বচ্ছতা-সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ
ঢালাও মামলা দিয়ে মামলাজট বাড়ানো উচিত নয়: এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন
দেশে এত এত মামলার জট। এ জট কমাতেই হবে। গত সপ্তাহে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতেও আমি এই কথা বলেছি। অথচ বাস্তবতা তার উল্টো। ঢালাও মামলা হচ্ছে। ঢালাও মামলা করে, মিথ্যা মামলা দিয়ে মামলাজট বাড়ানো হচ্ছে।
যাদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা দেওয়া হচ্ছে, মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে, আদালত থেকে খালাস পেলে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা থাকলে ভালো হয়। যারা মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, ঢালাও মামলা দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে বর্তমানে ঢালাও/মিথ্যা মামলায় ভুক্তভোগী এবং একই সঙ্গে গত ১৫-১৬ বছরে যারা মিথ্যা/ঢালাও মামলার ভুক্তভোগী ছিলেন, তাদেরও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাহলে বৈষম্য দূর হবে।
সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি


