মাধ্যমিকের বেসরকারি শিক্ষকরা টানা ১০ দিনের আন্দোলন শেষে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া আদায় করে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলেন। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বার্ষিক পরীক্ষা পর্যন্ত শনিবারও ক্লাস নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি ভালো উদ্যোগ! কিন্তু শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কি পোষানো সম্ভব? শিক্ষকদের অবস্থা নিয়ে যাদের সঠিক চিন্তা করার কথা ছিল তারা কখনোই তা করেনি। দেশের শিক্ষার বিশাল অংশই চলে বেসরকারি পর্যায়ে। অথচ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বৈষম চরমে। কোনো সরকারই তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায়নি। যখন শিক্ষকরা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে, ঢাকায় এসে বল প্রয়োগ করেন, তখনই সবাই একটু নড়েচড়ে বসে। দেশে এত বছরে এত গণতন্ত্রের দাবিদার সরকার এল-গেল কিন্তু কেউই বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সঠিক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের অভিন্ন বেতন স্কেল প্রচলন করলেন ১৯৮০ সালে। সেই ঘোষণার মধ্যে বহু বছর জিইয়ে রাখা একটি বৈষম্য অন্তত দূর হয়েছিল কিন্তু অনেকটাই বাকি! এরশাদ আমলে শিক্ষা প্রায় জাতীয়করণ হয় হয় অবস্থা কিন্তু তৎকালীন শিক্ষা সচিব নাকি বাধা দিয়েছিলেন এই বলে- ‘এতবড় চাপ আপনার নেওয়ার কি দরকার’। পরে সেটি আর হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে সাহস দেখিয়েছিলেন কিন্তু এতে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়ে গেছে। প্রথমত, প্রাথমিকে কয়েক ধরনের শিক্ষা বিদ্যমান, সবগুলোকে জাতীয়করণ করা হয়নি বা বাকিগুলোর কী অবস্থা হবে সে নিয়ে তেমন কোনো কথাও শোনা যায়নি। দ্বিতীয়ত, সব এলাকার অর্থাৎ গড়পড়তা প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করার দরকার ছিল না। এতে শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়েছে কিন্তু শিক্ষার মান তলানিতে চলে গেছে। কারণ, প্রাথমিক শিক্ষার এত বড় পরিধি মানসম্পন্নভাবে সামাল দেওয়ার শক্তিশালী মেকানিজম নেই। রাষ্ট্রের পক্ষে এত বড় ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না এবং হচ্ছে না। কারা প্রাথমিক শিক্ষার বিশাল বহর পরিচালনা করবে তারও কোনো নির্দিষ্ট প্রেসক্রিপশন ছিল না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার দায়-দায়িত্ব চলে গেছে আমলাদের হাতে। সুবিধা যা হওয়ার তাদের হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার পর ২০১৩ সালে হাসিনা সরকার আরও ২৬ হাজার রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করল। এ পদক্ষেপের ফলে একেবারে মানহীন শিক্ষকরাও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ার দায়িত্ব পেলেন, ফলে শিক্ষার মান একেবারে তলানিতে চলে এল। শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু শিক্ষার বারোটা বেজেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে গেছে একই সংসারে অনেক সময় দেখা যায় বড় বোনকে বাদ দিয়ে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, ফলে বড় বোনের বিয়ের বহু সমস্যা হয়। এ ধরনের জাতীয়করণের ফলে সেটিই হয়েছে। মাধ্যমিককে জাতীয়করণ না করে শুধু প্রাথমিককে করায় এখন বহু সমস্যা দেখা দিয়েছে। গোল্লায় যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া! এমনিতেই ক্লাস হয় না, ক্লাস হয় তো যেভাবে হওয়ার তা হয় না। শিক্ষার্থীদের যা জানার কথা তার ধারে কাছেও তারা নেই। সেই অবস্থায় কয়েকদিন পর পর শিক্ষকদের সবকিছু বাদ দিয়ে ঢাকায় আসতে হয়। পুরো জাতি ও পৃথিবীর সামনে উন্মোচন করতে হয় বাংলাদেশের শিক্ষকরা কত অসহায়! আসলে শিক্ষকদের অবস্থা কোথাও ভালো নেই। উন্নত বিশ্বের শিক্ষকদের সমস্যা আছে সেটি অন্য ধরনের। আমি নিজে দেখে এসেছি আফ্রিকার দেশগুলোতে শিক্ষকদের কী অবস্থা! রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলগুলো দেখে এসেছি। একটি প্রতিষ্ঠানে একজন অধ্যক্ষ ছাড়া রাষ্ট্র থেকে অন্য কেউ বেতন বা অর্থ সহায়তা পান না। বাকিদের জিজ্ঞেস করলাম সংসার কীভাবে চলে। উত্তরে বললেন, স্কুলের পর অন্য কিছু করতে হয়। পরীক্ষার সময় বছরে এক দুবার কিছু অর্থ আদায় হয় তখন কিছু পাওয়া যায়। নিয়মিত মাসিক কোনো বেতন নেই। কারণ ওই সরকার! তৃতীয় বিশ্বের সব সরকারই এমন। রাষ্ট্রের সামর্থ্য না থাকলেও বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তারা পুলিশ লালন-পালন করবে, সেনা লালন-পালন করবে, প্রশাসনের লোকজন লালন-পালন করবে। কারণ, তারা সরকারকে রক্ষা করবে! শিক্ষকদের বেলায় সবাই নির্বিকার। বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে মূল বেতনের ১০০ ভাগ রাষ্ট্র থেকে পেয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত নিয়ে আসতে তাদের শত শতবার রাস্তায় নামতে হয়েছে। কিন্তু এটি কেন?
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন দাবি ছিল- মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা এবং এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসব-ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা। সরকার ১৯ অক্টোবর ৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে কিন্তু শিক্ষকরা তাতে সায় না দিয়ে ২৩ অক্টোবর যমুনা অভিমুখে যাত্রার হুঁশিয়ারি দেন। আমরা দেখলাম এবং এখনো দেখছি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব শিক্ষকই কোনো না কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায়, শিক্ষার্থীরাও রাস্তায়। সবাই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন, সবাই সরকারকে মারাত্মক ভয় দেখাচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে- আমরা কাদের ভয় দেখাচ্ছি, কাদের হুঁশিয়ার করছি? বর্তমান সরকারে যারা আছেন তাদের আমরা কেউ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করিনি। এমনও নয় যে, তাদের আমাদের কাছে আবার আসতে হবে ভোটের জন্য কিংবা আবার উপদেষ্টা হওয়ার জন্য। দেশের একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের অনুরোধ করা হয়েছিল জুলাই গণহত্যার বিচার করা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। কারণ, বর্তমান প্রজন্মের কেউই ভোট বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত নয়। তারা বহু বছর কোনো ভোট দিতে পারেনি। যেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের অধিকার ছিল। সেই কাজকে সব পেশাদার-অপেশাদারদের সহযোগিতা করার কথা ছিল কিন্তু আমরা দেখলাম কেউ কোনো দিক বিবেচনা না করে সবাই প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করছে সরকারের ওপর।
সবারই উচিত ছিল একটু ধৈর্য ধরা এবং নির্বাচিত সরকার যাতে আগের মতো আর না করতে পারে সে ধরনের একটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করতেই সরকারকে সহায়তা করা। তা কেউ করেনি। সরকারকে সবাই নাস্তানুবাদ করছে। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বিমানের পাইলট পর্যন্ত সবাই সবার মহা দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকারকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। সবাই পান থেকে চুন খসলেই যমুনায় যাত্রার ভয় দেখায়। কিছু একটা হলেই শিক্ষার্থীরা রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিচ্ছে। দেশের প্রতিটি সেক্টরের এত অরাজক পরিস্থিতি এ ধরনের সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, তারা কেউ আমাদের দেশের যে রাজনীতি, সে রাজনীতি করেনি। তাদের কেউ সহযোগিতা করতে চাইছে না। সবাই সামান্য স্বার্থের কারণে রাস্তায় নেমে পড়ছে। কোথাও কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিচ্ছে। দেশ কোনদিকে যাচ্ছে কেউ চিন্তা করছি না। কিন্তু এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের চিন্তা তো করতে হবে! আর শিক্ষকদের এসব বিষয়ে দায়িত্ব আরও বেশি!
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

