প্রতি বছরান্তে বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করে, আমরা আপ্লুত হই। কিন্তু সমষ্টিগত মানুষের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, স্বজন হারানোর কান্না এ বিজয় দিবসের কেতন ওড়ে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হৃদয়ের অনুভূতিতে। লাখ লাখ শহিদের আত্মদান আর অগণিত নারীর সম্ভ্রম হারানোর এ বিজয় হস্তগত করেছে স্বজাতি শাসকগোষ্ঠী। এদের পরাভূত করে বিজয় ছিনিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সমষ্টিগত মানুষের জীবনে বিজয়ের প্রকৃত কেতন উড়বে না। এটাই বাস্তবতা। বিজয় অর্জনে সমাজবিপ্লবের বিকল্প নেই। সমাজবিপ্লবের অভিযাত্রা হোক বিজয়ের মাসের অঙ্গীকার।...
ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধে জয়ী বাঙালি জাতি বিশ্বের শক্তিধর সেনাবাহিনীখ্যাত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এ মাসের ১৬ তারিখে নতুন রাষ্ট্রের সূচনা করেছিল, আজ থেকে ৫৫ বছর আগে। যে রাষ্ট্রের প্রাথমিক শর্ত ছিল শোষণহীন গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। যুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার তিন প্রধান স্তম্ভের ঘোষণা দিয়েছিল। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। যার ভিত্তিতে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালিত হবে। জাতীয়তাবাদ বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের সময় অগ্রে যুক্ত করা হয়। আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তিমূলে ছিল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর জাতীয়তার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলেও, আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসকরা স্বাধীন দেশেও জাতীয়তার মোড়কটি ত্যাগ করতে পারেনি। সে কারণে উদ্দেশ্যমূলকভাবে শাসনতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভের প্রারম্ভে জাতীয়তাবাদ যুক্ত করেছিল, নিজেদের জাতীয়তাবাদী সীমাবদ্ধতায়।
স্বাধীনতার পর জাতীয়তার প্রশ্নটির স্থায়ী সমাধানের পর আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্রের অভিমুখে যাত্রা। অর্থাৎ সব নাগরিকের সমমর্যাদা, সমঅধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। বাস্তবে কিন্তু সেটা ঘটেনি। কেন ঘটেনি? সে প্রশ্নটিও অমূলক নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে আমাদের জাতীয়তাবাদীরা গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় সমাজতন্ত্রকে উপেক্ষা করতে পারেনি। নিরুপায়ে ঢেঁকি গেলার মতো সমাজতন্ত্রের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল। সমাজতন্ত্রকে অবদমনের অভিপ্রায়ে জাতীয়তাবাদকে ঠেলে শাসনতন্ত্রের প্রধান চার স্তম্ভে যুক্ত করেছিল। সেটাও উদ্দেশ্যবিহীন ছিল না। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের এযাবৎকালের সব শাসক দলই নিজেদের জাতীয়তাবাদী পরিচয় দিয়ে এসেছে। সেটা সামরিক বা অসামরিক প্রতিটি শাসক দলই জাতীয়তাবাদী তকমা এঁটে নিজেদের জাতীয়তাবাদী দাবি করে এসেছে। কেউ মুখ ফসকেও বলেনি সমাজতন্ত্রী। আচার-আচরণেও প্রকাশ পায়নি ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক।
অতীব দুঃখজনক হচ্ছে, ক্ষমতার পট-পরিবর্তনে উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে শাসনতন্ত্রের মূল স্তম্ভ থেকে সমাজতন্ত্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে এসেছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সাংবিধানিক উপায়ে। জাতীয়তাবাদ বাঙালি ও বাংলাদেশি বিভাজনে বিভাজিত করার চেষ্টাও করা হয়েছিল। গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটা দেশে রয়েছে বলেও অনুমান করা যাবে না। ৫৫ বছর কেবলই জাতীয়তাবাদীদের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। ক্ষমতার ভেতরে-বাইরে কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করতে তারা কেউ কসুর করেনি। বাস্তবে গণতন্ত্রের কবর রচনায় তাদের প্রত্যেকের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। প্রতিটি শাসক দলই যেন গণতন্ত্র অন্তপ্রাণ। গণতন্ত্রের নামাবলি পাঠে কারও ক্লান্তি নেই। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রের নাম-নিশানা মুছে দিতে এযাবৎ কোনো শাসকই কার্পণ্য করেনি।
এত ত্যাগ-আত্মদানে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করলাম; সেই স্বাধীনতা প্রকৃতই জনসমষ্টির কত শতাংশ মানুষকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছে? কত শতাংশ মানুষকে স্বাধীন করেছে? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলা যাবে ১ শতাংশ। এই ১ শতাংশই জাতির কাঁধে চেপে বসা আমাদের শাসকশ্রেণি, যাদের অধীনে-নিয়ন্ত্রণে ৯৯ শতাংশ মানুষ। যারা কেবল পরাধীন আমলের পুনরাবৃত্তির বৃত্তে শোষণ-বঞ্চনায় জীবনের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। যাদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুসীমায়। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিক ত্যাগ-আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছিল এ ৯৯ শতাংশ মানুষই। প্রতি বছর বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তারা যেমন পায় না স্বাধীনতার সামান্য সুফল-প্রশান্তি, তেমনি পায় না স্বাধীনতার স্পর্শ। বিপরীতে জোটে স্বদেশি শাসকদের সাবেকি আমলের মতো শোষণ-বঞ্চনা।
আমাদের প্রতিটি শাসক দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা রাষ্ট্রের পাহারাদারদের অবাধে ব্যবহার করে জনগণের ওপর, নিজেদের কায়েমি স্বার্থে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের শাসকরা জনরায়ে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মাত্র। এটা কিন্তু ক্ষমতাও নয়, নয় মালিকানাও। রাষ্ট্রের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে- রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক রাষ্ট্রের জনগণ। আবার এটাও লেখা আছে সরকারের প্রধান নির্বাহীর কাছেই সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ নির্জলা স্ববিরোধিতা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরত প্রত্যেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী অর্থাৎ জনগণের সেবক। দেশের জনগণের করের টাকায় তাদের মাসোহারা দেওয়া হয়। দেওয়া হয় নানাবিধ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। অথচ বাস্তবে আমাদের অভিজ্ঞতা ঠিক বিপরীত। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলগুলো ‘ক্ষমতা’ লাভ করে বনে যায় জনগণের ভাগ্যবিধাতা। কুক্ষিগত করে দেশের মালিকানাও। যেটা সম্পূর্ণরূপে অসাংবিধানিক। সংবিধানকে কাগুজে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে আমাদের শাসকশ্রেণির জুড়ি নেই। জনগণকে আমলে নেওয়া তো পরের কথা, তোয়াক্কা পর্যন্ত করে না। মোটা দাগে আমাদের শাসকদের প্রসঙ্গে সর্বাধিক সঠিক মন্তব্যটি হচ্ছে, আমাদের শাসকরা ব্রিটিশ-পাকিস্তানি শাসন-অপশাসনের সংস্কৃতি ধারণ ও বহন করে এসেছে। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আইনকানুন, বিধিব্যবস্থা অবিকল অটুট রয়েছে স্বাধীন দেশে। তেমনি শাসক চরিত্রেরও ন্যূনতম পরিবর্তন ঘটেনি। যেটা আমরা বিগত ৫৫ বছর প্রত্যক্ষ করে এসেছি। পাকিস্তানি রাষ্ট্র ভেঙে পৃথক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হলেও, সম্ভব হয়নি সাবেকি রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করা। এটাই আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করা যায়।
ভারতবর্ষ ভেঙে তিন পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। শুরুতে দুটি, পরবর্তীতে বাংলাদেশ। ধর্মীয় বিভাজনে ভারতবর্ষ খণ্ডিত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। আপস ফর্মুলায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দয়া-দাক্ষিণ্যে, অনুকম্পায়। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের দুই পৃথক দল হিসেবে স্বীকৃত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ক্ষমতা ভাগাভাগিতে। চতুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পুরোনো কৌশল ভাগ ও শোষণ করার নীতির ভিত্তিতে। আজও ভারত ও পাকিস্তানে ১৪ ও ১৫ আগস্টে আড়ম্বরপূর্ণ স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হয়। দেশ দুটিতে ওড়ে স্বাধীনতার কেতন! যেটি স্বাধীনতার আনন্দের-বিজয়ের কেতন নয়। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম সম্প্রদায়ের রক্তে রঞ্জিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তাক্ত কেতন। বাস্তবতা হচ্ছে এ স্বাধীনতা দুই দেশের জনগণকে স্বাধীন করেনি। দ্বিজাতি তত্ত্বের খড়গে ভ্রাতৃপ্রতিম দুই সম্প্রদায়ের রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ব্রিটিশদের ইচ্ছাপূরণে দেশভাগ সম্পন্ন হয়েছিল। সেটাকেই স্বাধীনতা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। উপনিবেশিক শত্রুকে পরাজিত করে স্বাধীনতা আসেনি। বিপরীতে তারা দাতার মতো দেশ বিভাগে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গেছে তাদের অনুগত দুই সম্প্রদায়ের শাসকশ্রেণির অনুকূলে। ধর্মীয় আবেগে পাকিস্তানের অংশে যুক্ত হয় পূর্ব বাংলা। কিন্তু ওই আবেগের পরিসমাপ্তি ঘটতে বিলম্ব হয়নি। পাকিস্তানি বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবিরাম আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-আত্মত্যাগে এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বিজয় অর্জিত হয়েছি। অথচ কী নিষ্ঠুর ভবিতব্য, আমাদের এই বিজয় সমষ্টিগত জনগণকে স্বাধীন করেনি। মুক্তি তো পরের কথা। ব্রিটিশ কর্তৃক দয়া-দক্ষিণার ক্ষমতার হস্তান্তর আর হানাদার পাকিস্তানি শত্রুকে পরাজিত করে আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার বিজয় শাসকশ্রেণির অনুকূলে প্রকৃতই ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে। জনগণের কাছে ক্ষমতা পৌঁছাতে পারেনি। যার কারণে নির্মম ভুক্তভোগী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। যারা স্বপ্নভঙ্গের নিরাশায় অতিক্রম করছে বিজয়ের ৫৫ বছর।
আমাদের বিজয় ছিনতাই হয়েছে বিজয়ের পরক্ষণে; জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়ার মধ্যদিয়ে। ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তানিরা গেছে, কিন্তু তাদের প্রেতাত্মা প্রতিনিধি শাসকগোষ্ঠী ঘুরেফিরে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করেছে। জনগণের রাষ্ট্র, জনগণের সরকার, জনগণের কর্তৃত্ব কোনো ক্ষেত্রেই অর্জিত বা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিপরীতে জনগণ বিদ্যমান এ ব্যবস্থায় অসহায় প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। প্রতি বছরান্তে বিজয় দিবস আসা-যাওয়া করে, আমরা আপ্লুত হই। কিন্তু সমষ্টিগত মানুষের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, স্বজন হারানোর কান্না এ বিজয় দিবসের কেতন ওড়ে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হৃদয়ের অনুভূতিতে। লাখ লাখ শহিদের আত্মদান আর অগণিত নারীর সম্ভ্রম হারানোর এ বিজয় হস্তগত করেছে স্বজাতি শাসকগোষ্ঠী। এদের পরাভূত করে বিজয় ছিনিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সমষ্টিগত মানুষের জীবনে বিজয়ের প্রকৃত কেতন উড়বে না। এটাই বাস্তবতা। বিজয় অর্জনে সমাজবিপ্লবের বিকল্প নেই। সমাজবিপ্লবের অভিযাত্রা হোক বিজয়ের মাসের অঙ্গীকার।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
[email protected]

