কই মাছ নিয়েও এখন আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটে না। কোনটা চাষের কই মাছ, কোনটা প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই মাছ সেটা বুঝতেও হিমশিম খেতে হয়। দামের ক্ষেত্রে চাষের কই আর প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই মাছের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। চাষের কই এক কেজি যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, সেখানে প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই-এর কেজি ১০০০-১২০০ টাকা।...
.jpg)
কই মাছ নিয়েও এখন আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটে না। কোনটা চাষের কই মাছ, কোনটা প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই মাছ সেটা বুঝতেও হিমশিম খেতে হয়। দামের ক্ষেত্রে চাষের কই আর প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই মাছের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। চাষের কই এক কেজি যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, সেখানে প্রাকৃতিক জলাশয়ের কই-এর কেজি ১০০০-১২০০ টাকা।
মকবুল সাহেবের স্ত্রীর খুব ইচ্ছে শীতের টাটকা ফুলকপি আর নতুন আলুর সঙ্গে আসল কই মাছ খাবেন। মকবুল সাহেব আসল কই মাছ কেনার জন্য বাজারে এসেছেন। কিন্তু আসল কই মাছ খুঁজে পাচ্ছেন না। তার মানে এই নয় যে, মাছের বাজারে কই মাছ নেই। বাজারভর্তি কই মাছ। কিন্তু আসল, নকল বোঝা মুশকিল। এক দোকানির মাছের ডালায় কই মাছের খলবলানি (লাফালাফি) দেখে আসল বলেই মনে হলো। দাম জানতে চাইলেন মকবুল সাহেব। দোকানদার কই মাছের শরীরে পানি ছিটিয়ে বলল, স্যার একদাম বলব?
মকবুল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ বলেন।
কই মাছের শরীরে আবার পানি ছিটিয়ে দোকানদার বলল, স্যার, আপনার জন্য ১৩০০ টাকা কেজি...
দাম শুনে মকবুল সাহেব একটু বিব্রত হলেন। তবে দোকানদারকে বুঝতে না দিয়ে বললেন, আসল কই তো?
দোকানদার অবাক হয়ে বলল, কী যে বলেন স্যার! হাওড়ের মাছ। দেশি কই...
দামটা একটু বেশি চাচ্ছ না? কত রাখতে পারবে বলো!
মকবুল সাহেবের কথা শুনে দোকানদার আবার কই মাছের শরীরে পানি ছিটিয়ে বলল, কতটুকু নেবেন। সবটাই...
না, না সবটা না।
তাহলে কতটুক? এক কেজি?
না।
হাফ কেজি?
না। আড়াই শ গ্রাম... দাম কিন্তু কমাতে হবে।
দোকানদার হতাশ কণ্ঠে বলল, আড়াই শ গ্রাম বেচি না স্যার। তবুও আপনি যখন বলতেছেন... ১৩০০ টাকার এক পয়সাও কম হবে না।
আড়াই শ গ্রামে কয়টা উঠবে?
বড়জোর তিনটা। ছোট সাইজের নিলে চারটাও উঠতে পারে।
না না ছোট সাইজের না, বড় সাইজের দরকার। দামটা একটু কম রাখেন। হাজার টাকা...
মকবুল সাহেবের কথা শেষ করতে দিল না দোকানদার। দূরে একজন কাস্টমারকে দেখে উচ্চস্বরে সালাম দিল! স্যার স্লামালেকুম... কেমুন আছেন? আপনার জন্য হাওড়ের দেশি কই আনছি। আসেন স্যার আসেন।
ধোপদুরস্ত পোশাকের একটি লোক মাছের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে বাজারভর্তি শাকসবজির ডালা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন মিন্তি।
মকবুল সাহেব ১৩০০ টাকা কেজি দরেই আড়াই শ গ্রাম কই মাছ ওজন করার জন্য দোকানদারকে তাড়া দিলেন। দোকানদার তাকে আর পাত্তাই দিল না। ধোপদুরস্ত ভদ্রলোকের দিকেই তার বেশি আগ্রহ। বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল- স্যার ভালো আছেন?
ধোপদুরস্ত ভদ্রলোক মাছের দোকানদারের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। বরং অবজ্ঞা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, দেশি কই?
জি স্যার। হাওড়ের মাছ।
কেজি কত?
আপনার জন্য ১৬০০।
এত দাম?
হাওড়ের কই। দাম তো একটু বেশিই হবে স্যার!
দাম কমাও।
মাছের দোকানদার ভেবে নিয়ে বলল, সবটাই নেবেন স্যার।
হ্যাঁ সবটাই নেব।
ঠিক আছে আপনার জন্য ১৫০০ টাকা কেজি।
আরও কমাও।
এবার তাহলে আপনিই বলেন স্যার।
১২০০ টাকা।
আর একটু বাড়ান স্যার।
আর বাড়ানো যাবে না।
আমি একটা কথা বলি স্যার?
বলো।
১৩০০ টাকা স্যার আমার কেনা দাম। আপনি আমাকে ১০০ টাকা লাভ দেবেন। ১৪০০ টাকা কেজি!
হাওড়ের মাছ। খায়া স্বাদ পাবেন।
ধোপ দুরস্ত ভদ্রলোক ১৪০০ টাকাতেই রাজি হলেন!
প্রিয় পাঠক, এটি গল্প নয়। বাস্তব ঘটনা। রাজধানীর একটি মাছের বাজারে চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি! একজন মধ্যবিত্ত মানুষের বিব্রত অসহায় মুখটি ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভাসে। আহারে মধ্যবিত্ত। আমাদের দেশে সবচেয়ে অসহায় চরিত্র হলো মধ্যবিত্ত মানুষ। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন উচ্চবিত্তরা দেয়। নিম্নবিত্তরা সেটা নেয়। কিন্তু মধ্যবিত্তরা দিতেও জানে না। নিতেও জানে না। গরুর মাংসের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। উচ্চবিত্তের এনিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। নিম্নবিত্তের মানুষ রাস্তার ধারে ‘ভাগা’ করে রাখা মাংসের দোকান থেকে সহজেই আড়াই শ গ্রাম মাংস কেনার সাহস রাখে। কিন্তু মধ্যবিত্তের লজ্জা বেশি। সামর্থ্যও কম। তাই দূর থেকেই মাংসের দোকানে ঝোলানো মাংস দেখে আর হা-হুতাশ করে। মাছের রাজা ইলিশ। মধ্যবিত্তের কাছে অধরা। ১৫০০, ২০০০ টাকা কেজি দরের ইলিশ কজন মধ্যবিত্ত কেনার সামর্থ্য রাখে? শুধু তো মাছ-মাংসই নয়, শীতের শাকসবজির ক্ষেত্রেও মধ্যবিত্তের নাকাল অবস্থা। শীতকালে শাকসবজির দাম সাধারণত কমে যায়। অথচ এবারের শীতে রাজধানীর সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। উচ্চবিত্তের এনিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। নিম্নবিত্ত যেকোনো পরিস্থিতি সহজেই মেনে নেয়। কিন্তু মাঝখানে চিঁড়েচ্যাপটা বেচারা মধ্যবিত্ত। না পারে ওপরে উঠতে না পারে নিচে নামতে।
আবু বকর সিদ্দিক (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বেতন পান সর্বসাকল্যে ৫৫ হাজার টাকা। মালিবাগে দুই রুমের বাসায় থাকেন। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মেজো মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সবার ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। আবু বকর অসহায় কণ্ঠে বললেন, অভিযোগ কার কাছে করব জানি না। অথচ সংসারের কর্তা হিসেবে আমি বড়ই অসহায়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে। সেই তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়েনি। বরং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। বেতন কমিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে- এ বেতনে চাকরি করতে পারলে করেন, না করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের করার কিছুই নেই।
আবু বকর বললেন, বলতে গেলে হঠাৎ করে সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ দেশে মধ্যবিত্ত বলে যে কিছু মানুষ আছে, যারাই মূলত ভোট দিয়ে সরকার বানায়, তাদের ব্যাপারে কারও কোনো নজর নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। আবু বকর দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ইলিশের মৌসুম চলে যাচ্ছে অথচ একটা ইলিশ কেনার সাহস করতে পারিনি। গরুর মাংসে তো হাত দেওয়া যায় না। ব্রয়লার মুরগি আর চাষের মাছই মধ্যবিত্তের প্রধান ভরসা। অথচ ব্রয়লার মুরগি এবং চাষের মাছের ক্ষেত্রে কত যে ভয়ংকর খবর শুনি। ব্রয়লার মুরগি এবং চাষের মাছকে নাকি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাবার খাওয়ানো হয়। তার মানে মধ্যবিত্ত মানুষ জেনেশুনে বিষ পান করছে! হায়রে মধ্যবিত্ত।
মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস কমবে কবে? কার কাছে এর জবাব খুঁজব?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক আনন্দ আলো

