দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংকটের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে কোথাও না কোথাও অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে আরও কঠোর হওয়া জরুরি।...

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর সক্ষমতা এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি। এ সংকটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে জ্বালানি খাতের সব প্রতিষ্ঠান- বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। দক্ষতা, সক্ষমতা এবং সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে সংকট অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু আমরা কী দেখছি? তেলের বাজারে এখনো কালোবাজারি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আইন প্রয়োগের সক্ষমতা না বাড়ালে এ ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
অতীতের উদাহরণ থেকে বলা যায়, ’৬০-এর দশকের দুর্ভিক্ষের সময় রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা চাল নিতাম। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন একটি নিয়ন্ত্রিত বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তাও করা হচ্ছে না। সংকটের এ সময়ে তেল মজুত করে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠলেও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক পদক্ষেপও খুবই সীমিত। ফিলিং স্টেশন মালিকদের তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে সরকার। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারি না বাড়ালে এ সংকট আরও গভীর হবে।
দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংকটের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে কোথাও না কোথাও অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে আরও কঠোর হওয়া জরুরি। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও বিতরণ; সব পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো ছাড়া এ সংকট কাটানো কঠিন। আপাতত এর কোনো দ্রুত বিকল্প সমাধানও নেই।
দেশের জ্বালানি তথা গ্যাস-কয়লা রপ্তানি দেশের মানুষ জীবন ও রক্ত দিয়ে প্রতিহত করলেও সে সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিগত সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরল জ্বালানি ও কয়লা আমদানির প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়। এমন আগ্রহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ এর আওতায় বিগত সরকারের আমলে প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ একদিকে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘদিন হলো নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবয়ব, বিশেষ করে জ্বালানি খাত যদি লুণ্ঠনমূলক শোষণের চিত্র ধারণ করে, তাহলে দুটি বিষয় অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এর একটি জ্বালানি অবিচার এবং অন্যটি জ্বালানি দারিদ্র্য। জ্বালানি অবিচার এবং জ্বালানি দারিদ্র্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ জ্বালানি অবিচার থেকে জ্বালানি দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। সাধারণভাবে জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে আধুনিক জ্বালানি সেবাসমূহে নাগরিকদের প্রবেশাধিকারের অভাবকে বোঝায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, জীবন মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল সূত্র হচ্ছে জ্বালানি সেবায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত থাকা। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান প্রতিটি মৌলিক অধিকারই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি রান্নার প্রয়োজনে বছরে মাথাপিছু ৩৫ কেজি এলপিজি না পাওয়া বা ব্যবহার করতে না পারা অথবা বার্ষিক মাথাপিছু ১২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করার মতো তার সামর্থ্য না থাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বালানিতে প্রবেশাধিকার থাকলেও ব্যবহারে প্রবেশ অধিকার অধিকাংশ ভোক্তার খুবই সীমিত। অর্থাৎ জ্বালানির ওপর অধিকাংশ ভোক্তা স্বত্বাধিকার অর্জনে সক্ষম নয়। ফলে প্রবেশাধিকার সেখানে অর্থহীন। বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে দারিদ্র্যবিমোচনের ধারণা অসম্পূর্ণ।
অতীতে জ্বালানি খাত পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতিকৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। সঠিক তথা ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যহারে ভোক্তার জন্য বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাথমিক জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসপ্রাপ্তির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবার সরাসরি প্রভাব ফেলছে বৈশ্বিক বাণিজ্যে। বর্তমানে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি- এ দুটি সামুদ্রিক ধমনি চরম ঝুঁকির মুখে। যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহনের ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয় লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে। অন্যদিকে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এ রুটগুলো অনিরাপদ হওয়া মানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়া। নিরাপত্তার খাতিরে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো এখন সুয়েজ খালের পরিবর্তে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে ঘুরে যাতায়াত করছে।
যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বা ‘ফ্রেইট চার্জ’ বাড়লে সেই বাড়তি ডলারের হিসাব মেলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠে আমদানিকারকদের। সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগে একদম সাধারণ মানুষের ওপর। এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ। এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন হয়। হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে।
বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতিতে তিনটি বিভাজন শনাক্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে: (১) ছোট দুর্নীতি (যেমন- মিটার রিডার ও কারিগরি কর্মচারীদের দুর্নীতি), (২) মাঝারি দুর্নীতি (যেমন- কোম্পানি ম্যানেজার ও মধ্যস্তরের আমলা ও তাদের প্রশ্রয়ে সংঘটিত দুর্নীতি) এবং (৩) মহাদুর্নীতি বা গ্রান্ড করাপশন (পাবলিক বা প্রাইভেট কোম্পানিকে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়ার বিনিময়ে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে গোষ্ঠীর নামে ও নিজের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়া, যার বড় অংশই সুবিধাদানকারীর নির্ধারিত বৈদেশিক অ্যাকাউন্টে পাচার হয়। মহাদুর্নীতি সরকারের শীর্ষ মহলের আশীর্বাদ ছাড়া করা সম্ভব নয়। এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করতে এর সঠিক সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর; তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট না থাকলে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে। তাই বিদ্যমান সম্পদ ও সরবরাহব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরই এখন জোর দিতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ডিন, ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও
জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

