বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর্থিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি করে। প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি ছিল। বর্তমান সরকারের সময়েও রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে অর্থ প্রবাহ কমেছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সংস্কার এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি বছর’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য জোর দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল, জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। এই অর্থনীতি এক দিনে গতিশীল হবে না। সময় লাগবে। বিনিয়োগ বাড়াতে বর্তমান সরকার অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। ব্যবসা কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়েনি। এসব কারণে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে। তাই অর্থনীতি সেভাবে গতি পায়নি। তবে এই সরকারের নেওয়া অনেক পদক্ষেপের সুফল আগামীতে পাওয়া যাবে।’
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে। সুদের হার সমন্বয় করে এবং বিলাসবহুল পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা দেয়। মুদ্রা বিনিময় হার অনেকটা স্থিতিশীল হয়। ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতে সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিগত সরকারের সময়ে বছরের পর বছর অকার্যকর ঋণের ওপর দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষমতায়িত করেছে। তদারকি জোরদার করেছে, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এবং ঋণ ও চুরি হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করার জন্য একাধিক সংস্কার শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে সফলভাবে আলোচনা করে পারস্পরিক শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনে সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বেকারত্ব, শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করাকে চিহ্নিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি। সংস্কার, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে কেবল যাত্রা শুরু হয়েছে। বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার ত্রুটির কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে তার রোডম্যাপ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। এ ধরনের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিও দায়ী। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমাতে কম খরচের চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন। গত দেড় দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বেশির ভাগ সামাজিক উন্নয়ন সূচক স্থবির ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল বিগত কর্তৃত্ববাদী এবং দমনমূলক সরকার। এই ধরনের শাসনব্যবস্থার কারণে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। স্থানীয় শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে ই-কমার্স লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নেওয়া নীতি-সহায়তার সুফল আসতে সময় লাগবে। সে সময়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে। এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরজুড়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু শাকসবজি, ইলিশ, বেগুন, টমেটো, সয়াবিন তেল, আলু, পেঁয়াজ এবং পাঙাশসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্টে, অন্তর্বর্তী সরকার দুই অঙ্কেরও বেশি মূল্যস্ফীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ২০২২ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩.২৫ বিলিয়ন ডলার ছিল। ২০২৫ অর্থবছরে যা ২০.৫ বিলিয়ন ডলার হয়। এ পরিসংখ্যান রপ্তানি বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। শিল্প উপকরণ, ভোগ্যপণ্য এবং জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নেওয়া নীতি নির্বাচিত সরকার কতটা মূল্যায়ন করবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। ব্যবসা বাড়াতে সহযোগিতা করতে হবে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’