ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রায় ৩০ লাখ পোস্টাল ও মাইগ্রেট (স্থানান্তরিত) ভোটার। প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হওয়া আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট এবং বিভিন্ন আসনে ভোটার স্থানান্তরের বিষয় (মাইগ্রেশন) রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এই দুই ধরনের ভোটারকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ–অস্বাভাবিক মাইগ্রেশন ও বৃহৎ পরিসরের পোস্টাল ভোট নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়ায় কারচুপির সুযোগ নেই।
পোস্টাল ব্যালট: সংখ্যায় রেকর্ড, রাজনীতিতে শঙ্কা
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে দেশে ও বিদেশে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত এই ভোটারদের মধ্যে দেশের ভেতর রয়েছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন আর প্রবাসী ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন। এরই মধ্যে বিদেশে পাঠানো হয়েছে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৮টি পোস্টাল ব্যালট এবং দেশের ভেতর পাঠানো হয়েছে ৫ লাখ ১৮ হাজার ৬০৩টি। সব মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ৮৫ হাজার। বাস্তবে কত ব্যালট ভোট হিসেবে ফিরে আসবে, তার ওপর নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত প্রভাব।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অনেক আসনেই অতীতে ৫ থেকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। অথচ এবার একাধিক আসনে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে পোস্টাল ব্যালট হয়ে উঠতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’।
মাইগ্রেশন ভোটার: আরেকটি বড় হিসাব
পোস্টাল ব্যালটের পাশাপাশি বিএনপির উদ্বেগের বড় জায়গা হলো ভোটার মাইগ্রেশন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে দেশে মাইগ্রেশন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। বিএনপির অভিযোগ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আসনে অস্বাভাবিক হারে ভোটার স্থানান্তর ঘটেছে, যা স্বাভাবিক জনসংখ্যা গতিবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গতকাল রবিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গত এক-দেড় বছরে বিশেষ কিছু এলাকায় বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার ও মাইগ্রেশন হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। অনেক জায়গায় একটি হোল্ডিং নম্বরে যেখানে পাঁচজন থাকার কথা, সেখানে ২০-৩০ জন ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’ তিনি এসব ভোটারের আসনভিত্তিক সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।
পরিকল্পিত স্থানান্তর ও ভোটের অঙ্ক
বিএনপির অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু আসনে পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকা ফুলিয়ে তোলা হয়েছে। এতে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। একই সঙ্গে বিএনপি অভিযোগ করেছে, কিছু এলাকায় ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে ভোট চাইছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন। ‘কবরের চতুর্থ প্রশ্ন’সংক্রান্ত বক্তব্যকে তারা চরমভাবে আপত্তিকর ও নির্বাচনি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছে।
ইসি বলছে অভিযোগ ভিত্তিহীন
বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, যেকোনো নির্বাচনে ভোট প্রদানের সুবিধার্থে মাইগ্রেশন স্বাভাবিক ঘটনা। অস্বাভাবিক কিছু হয়নি। দলটির অভিযোগ ভিত্তিহীন। তারা তথ্য চেয়েছে, দেওয়া হবে।’ ইসি আরও দাবি করছে, কোনো আসনেই দুই-তিন হাজারের বেশি মাইগ্রেশন হয়নি। যদিও বিএনপি এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ইসির ব্যাখ্যা
প্রবাসী ভোট নিয়ে ওঠা শঙ্কার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই। লাইভ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যালটের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।’ এই কমিশনারের দাবি, প্রবাসীদের ব্যালটে প্রতীক বেশি থাকায় গণরায়ে সময় লাগলেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ভোটের সমীকরণ
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, পোস্টাল ব্যালটের প্রায় ১৫ লাখ ভোটার এবং সম্ভাব্য ১৫ লাখ মাইগ্রেশন ভোটার–এই মোট ৩০ লাখ ভোট নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে ভোটের ব্যবধান কম, সেখানে এই ভোটের ধারা জয়-পরাজয়ের ফল বদলে দিতে পারে। বিশ্লেষক জেসমিন টুলীর মতে, ‘পোস্টাল ব্যালটের মতো নতুন ব্যবস্থায় আস্থা প্রতিষ্ঠাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইসি কিছু সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু ভোটার মাইগ্রেশন ও তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর না এলে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়তে পারে।