সারা দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে জোর প্রচার চলছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত ভোটের মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ অন্যরা। তবে এই ব্যস্ততার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবায়। নগরবাসীর অভিযোগ, একদিকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির শূন্যতা, অন্যদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় প্রশাসনের মনোযোগ সরে যাওয়ায় তারা কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকাগুলোতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। আগে যেখানে সপ্তাহে তিন দিন স্প্রে দেওয়া হতো, সেখানে তা এক দিনে নেমে এসেছে। পরে মাসে একবার স্প্রে হলেও এখন অনেক এলাকায় একেবারেই মশা নিধনের কোনো কার্যক্রম নেই।
এর ফলে রাজধানীতে মশার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শুধু সন্ধ্যায় বা রাতে নয়, দিনেও সমানতালে মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন নগরবাসী। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি অফিসপাড়াতেও মশার উপদ্রব বেড়েছে। অনেক এলাকায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জ্বরের আতঙ্কে বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়লেও তা দেখভালের কেউ নেই। সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলরসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় নাগরিক সেবা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা– জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও আদায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা), সড়কবাতি স্থাপন, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ-রক্ষণাবেক্ষণ চলছে ঢিমেতালে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে দুই সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের প্রশাসনিক অস্থিরতা। একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিদেশ গমনে আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর সংস্থাটিতে একধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাপ্তরিক কাজে গতি হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শীর্ষ পদে একের পর এক রদবদল হচ্ছে এবং তীব্র অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থছাড় না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে আছে। নিয়মিত নাগরিক সেবার খাতগুলোতে তদারকি কমে গেছে। মশার উপদ্রব বাড়লেও কোনো কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন না বলে অভিযোগ করছেন এলাকাবাসী।
এই অবস্থার প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক অফিস ও ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোতেও। নির্বাচনি আমেজে কর্মকর্তাদের একটি অংশ নাগরিক সেবার চেয়ে অন্য কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক এলাকায় বাসিন্দারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে ওষুধ কিনে মশা নিধনের চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত খরচে স্প্রে করতে দেখা গেছে স্থানীয়দের। তবে এতে টেকসই সমাধান মিলছে না।
কলাবাগান জামে মসজিদের মুসল্লি আশফাক হোসেনের অভিযোগ, ‘সুস্থ থাকা কঠিন হয়ে গেছে। নামাজে দাঁড়ালে কামড় দিলেও কিছু করার থাকে না। অভিযোগ করেও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। কার কাছে গেলে সাড়া পাব তাও কেউ বলতে পারছে না।’
ধানমন্ডির বাসিন্দা রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘দিন-রাত মশার কামড়ে থাকা যায় না। সিটি করপোরেশনের লোকজন মাসের পর মাস আসে না। বাধ্য হয়ে নিজেরাই ওষুধ কিনে স্প্রে করছি।’
মিরপুরের বাসিন্দা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘মানুষের সেবার দিকে কারও মনোযোগ নেই। শুধু নির্বাচনের কথা, নাগরিক সেবার কথা কেউ বলছে না।’
সচেতন মহলের মতে, নির্বাচন একটি সাময়িক প্রক্রিয়া হলেও নাগরিক সেবা একটি চলমান দায়িত্ব। নির্বাচনি ব্যস্ততার অজুহাতে নগর ব্যবস্থাপনা উপেক্ষা করা হলে জনস্বাস্থ্য ও জীবনমান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারসহ পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সেবা স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
এসব বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যস্ততা থাকলেও নাগরিক সেবা যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্বাচনের সময়ও যেন সেবা ঠিক থাকে, সে জন্য সিটি করপোরেশনের কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) অভিযোগ পাওয়ামাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধানে কাজ করবে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন খবরের কাগজকে লিখিত জানান, পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মীরা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন। নির্বাচনের জন্য নাগরিক সেবা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর পরও নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটি সমাধানে কিউআরটি টিম কাজ করবে।
নগরবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান অচলাবস্থার দ্রুত কোনো সমাধান আসার সম্ভাবনা নেই। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবায়।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সরিয়ে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন এবং এলাকার বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে জনপ্রতিনিধি না থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনো পথ পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ জানালেও তা সিটি করপোরেশনের নগর ভবন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নগরবাসী সমস্যায় পড়ছে, কোনো সমাধানও পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও ভোটের মাধ্যমে গঠিত সরকার নয়। সরকার সংস্কারের কথা বললেও অল্প সময়ে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এখন সবাই নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকায় নাগরিক ভোগান্তির দিকে কারও মনোযোগ নেই।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, সরকার সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও তারা ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকর তদারকি করছেন না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।