একটি হাঙর অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম অস্বাভাবিক খুনের রহস্য সমাধানে সাহায্য করেছে। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও কয়েক দশক আগে এমনটিই ঘটেছে সিডনিতে। ‘শার্ক আর্ম কেস’ নামে পরিচিত এই রহস্য আসলে কিছু ধারাবাহিক ঘটনা, যা ১৯৩৫ সালের ২৫শে এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে শুরু হয়েছিল।
এদিন জেলেদের হাতে একটি বন্দী হাঙর অ্যাকোয়ারিয়া্মে একটি মানুষের হাত বমি করে দেয়। যার ফলে পরবর্তীতে একটি অমীমাংসিত হত্যার তদন্ত এবং বিচার শুরু হয়।
সেদিন বার্ট হবসন নামে একজন জেলে কুজি বিচে একটি ছোট হাঙরকে আটকে ফেলে। এর কিছুক্ষণ পরই, প্রায় চার মিটার লম্বা আরেকটি টাইগার হাঙর ছোট হাঙরটিকে গিলে ফেলে। তারপর জেলে বড় হাঙরটিকেও ধরতে সক্ষম হয় এবং তাদের কুজি অ্যাকোয়ারিয়াম বাথসে নিয়ে আসে।
দর্শনার্থীদের কাছে হাঙরটি অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কেননা সেসময় সিডনিতে হাঙররা বেশ আতংক সৃষ্টি করেছিল। সেবার বছরের শুরুতেই সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি তিন যুবক হাঙরের হাতে মারা পড়ে। তাই মাছটিকে "জনসাধারণের শত্রু নম্বর ওয়ান" বলা হত।
২৫শে এপ্রিল, আনজাক দিবসে, হাঙরটি অ্যাকোয়ারিয়ামে অদ্ভুত আচরণ শুরু করে এবং হঠাৎ করে মানুষের একটি বিচ্ছিন্ন হাত বমি করে, যা দর্শকদের হতবাক করে দেয়।
অ্যাকোয়ারিয়াম কর্মী চার্লস হবসন তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে ফোন করে। আর যা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সূত্রপাত করে।
প্রথমে, সবাই ভেবেছিল এটি হয়ত হাঙ্গর আক্রমণের ঘটনা হবে। কিন্তু মেডিকেল পরীক্ষায় জানা যায় হাতটি কামড়ে ছেড়া হয়নি। এটি একটি ছুরি বা অন্য ধারালো বস্তু দিয়ে পরিষ্কারভাবে কাটা হয়েছিল।
তাছাড়া, হাঙরের পেটে তীব্র অ্যাসিড থাকা সত্ত্বেও (যা সাধারণত মানুষের টিস্যু ধ্বংস করে দেয়), হাতটি অক্ষতই ছিল। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, হাতটি ৮ থেকে ১৮ দিন ধরে হাঙরের পেটে ছিল, কারণ এটি আগে থেকেই রাসায়নিক দিয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল। এছাড়া, কাটা হাটে ট্যাটুটি তখনও চেনা যাচ্ছিল।
তদন্তে বেরিয়ে আসে বাহুটি জেমস জিমি স্মিথ নামে একজন ব্যক্তির ছিল। জিমি স্মিথ কয়েক সপ্তাহ আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদন পড়ে, জিমির ভাই এডউইন স্মিথ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন এবং জানান হাতটি তার নিখোঁজ ভাইয়ের হতে পারে। তারপর আঙুলের ছাপ মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত করে যে, এটি জিমি স্মিথের হাত।
জিমি স্মিথ ছিলেন সিডনির আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে যুক্ত একজন ছোটখাটো অপরাধী, একজন সাবেক বক্সার, এবং অবৈধ জুয়ারি।
পুলিশ তদন্তে পরে জানা যায়, জিমিকে শেষবার তার বন্ধু প্যাট্রিক ব্র্যাডির সাথে ক্রোনুলার সেসিল হোটেলে মদ্যপান করতে দেখা যায়। তিনিও একজন পরিচিত অপরাধী । এরপর, তারা গুন্নামাত্তা উপসাগরের কাছে একটি কটেজে যান।
পরের দিন সকালে, ব্র্যাডি জিমিকে রেজিনাল্ড লয়েড হোমসের বাড়িতে নিয়ে যান। তিনি একজন ব্যবসায়ী হলেও গোপনে একটি চোরাচালানকারী দল পরিচালনা করতেন। তারা স্পিডবোটে করে সিডনিতে কোকেন, সিগারেট এবং অন্যান্য অবৈধ জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন। জিমি এই অভিযানগুলোতে হোমসের হয়ে কাজ করতেন।
কিন্তু একটি ব্যর্থ বীমা কেলেঙ্কারির কারণে তাদের দুজনের মধ্যে বিবাদ হয়। সন্দেহ করা হয়, জিমি হোমসকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করেছিল। পরে ব্র্যাডি জিমিকে হত্যা করেন এবং তার কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য জিমির কাটা হাত ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এরপর প্যাট্রিক ব্র্যাডির বিচার হলেও প্রমাণের অভাবে তিনি ছাড়া পেয়ে যান।
সুলতানা দিনা/