ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

জলঘরে জল নেই!

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৪, ০৩:৪৫ পিএম
জলঘরে জল নেই!
ঢাকার প্রথম পানির ট্যাংকটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঢাকাবাসীর কাছে যেন তার পুরনো গৌরব আর ইতিহাসেরই জানান দেয়। ছবি: শরিফ মাহমুদ

১৮৭৮ সালে ঢাকায় প্রথম স্থাপিত হয় ওভারহেড পানির ট্যাংক, যা পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তর দিকে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এ ট্যাংকটি ‘বাহাদুর শাহ পার্ক পানির ট্যাংক’ বা ‘জলঘর’ নামে পরিচিত। পানির ট্যাংকটির বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছেন সৈয়দ শিশির।

একটা সময় ছিল যখন নিয়মিত প্রতিবছর মহামারিতে ঢাকা শহরে অনেক মানুষের মৃত্যু হতো। এর কারণ ছিল বিশুদ্ধ পানির অভাব। ১৮৭৮ সালের পূর্ব-পর্যন্ত ঢাকায় খাবার পানির উৎস ছিল বুড়িগঙ্গা, বিভিন্ন পুকুর-ডোবা আর নোংরা পাতকুয়ো। তখন বাড়ি বাড়ি পানি সরবরাহের কাজ করত সাক্কা বা ভিস্তিওয়ালারা।

গত শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত মশকের সাহায্যে পানি সরবরাহের কাজ করত তারা। কিন্তু রোগ-শোক থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন দেখা দেয় পরিশ্রুত (যান্ত্রিকভাবে বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যে পানি থেকে অপদ্রব্যাদি দূর করা হয়।) পানির। মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকার টুকিটাকি’ বই থেকে জানা যায়, ১৮৭১ সালে ঢাকার নবাব আবদুল গনি সরকারকে ৫০ হাজার টাকা দান করেন শহরের কল্যাণার্থে ব্যয় করার জন্য। পরে ঠিক হয় এ টাকা ব্যয় করা হবে ঢাকায় পরিশ্রুত পানি সরবরাহের জন্য। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা ছিল এ প্রকল্পের জন্য অপ্রতুল। ১৮৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে নবাব আবদুল গনি এজন্য শহরের গণ্যমান্যদের নিয়ে বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকে কেবল শহরের বিখ্যাত দুজন বাঈজি রাজলক্ষ্মী আর আমিরজান ৫০০ টাকা করে দান করতে চাইলেন।

ফলে নবাব গনি নিজেই আরও এক লাখ টাকা দান করেন। তবে নবাব গনির শর্ত ছিল ঢাকাবাসীকে বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করতে হবে। অবশ্য পরে নবাব আহসানউল্লাহ ৫০ হাজার টাকা এবং সরকার ৯০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন প্রকল্পের জন্য। ১৮৭৪ সালে তৎকালীন ভাইসরয় চাঁদনীঘাটে ওয়াটার ওয়ার্কসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৭৮ সালে এর কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকায় শুরু হয় পরিশ্রুত পানি সরবরাহ।  ইতিহাস বলছে, ১৮৭৮ সালে ঢাকায় প্রথম স্থাপিত হয় ওভারহেড পানির ট্যাংক, যা পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তর দিকে অবস্থিত।

স্থানীয়দের কাছে এই ট্যাংকটি ‘বাহাদুর শাহ পার্ক পানির ট্যাংক’ বা ‘জলঘর’ নামে পরিচিত। এর লাল ইটের প্রাচীর কাঠামো, স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণকৌশল এতই অসাধারণ এবং স্বতন্ত্র যে পথচারীদের নজর কাড়ে। কিছুটা গম্বুজের মতো দেখতে দানবীয় এ স্থাপনাটি লম্বায় প্রায় পাঁচতলা বাড়ির সমান। ১৮৭৮ সালের ২৪ মে থেকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ট্যাংকটি ব্যবহার করা শুরু হয়।

ট্যাংকটি বাহাদুর শাহ পার্কের সেই মোড়ের আকর্ষণীয় এক নিদর্শন। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে দাবার বোর্ডের মতো সাদা-কালো মেঝে আর গোলাকার ট্যাংকটির মাঝে একটি লম্বা খাম্বা। ট্যাংকটির মাথার চারদিক খেয়াল করলে চোখে পড়ে সিমেন্টের তৈরি সিংহমুখের। যা বাইরের দিকে হা করে আছে। কিছুটা মিল পাওয়া যায় সিঙ্গাপুরের লায়ন স্ট্যাচুর সঙ্গে। অনেকের মতে, বৃষ্টির পানি যেন না জমতে পারে, তাই পানি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এ ব্যবস্থা করেছিল ব্রিটিশরা।

অবশ্য তারপর ঠিক কবে এ ট্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। কেউ বলেন, পাকিস্তান আমলেই এটি বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কারও মতে, ২৫ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। যখনই বন্ধ হোক, ১৪৬ বছর বয়সী এ পানির ট্যাংকটি বর্তমানে কেবল একটি অকেজো, জরাজীর্ণ বিশাল স্তম্ভ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে! অবশ্য ২০২০ সালের মে মাসে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক এ ট্যাংকটিকে ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তাতেও এটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ তো নেই-ই, বরং এর ভেতরে মাজার ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, বহুদিন আগেই ট্যাংকটি চলে গেছে দখলদারের খপ্পরে। ট্যাংকের নিচের খালি জায়গায় কয়েক দশক আগে স্থাপিত হয়েছে মাজার। বর্তমানেও ট্যাংকের দেয়ালের পাশ ঘেঁষে রয়েছে বেশ কয়েকটি অস্থায়ী দোকান। প্রবেশপথে একটি লোহার গেট, সে গেটের ওপরে মাজারের বিভিন্ন ব্যানার, পোস্টার, শানে নুজুল লেখা। অথচ ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি যে এক সময় ঢাকাবাসীকে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে মৃত্যু, মহামারির হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, তা নিয়ে নেই কোনো স্মৃতিফলক।

ঢাকার প্রথম পানির ট্যাংকটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঢাকাবাসীর কাছে যেন তার পুরোনো গৌরব আর ইতিহাসেরই জানান দেয়। ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ওয়াসার মোট ৩৮টি অকেজো ওভারহেড পানির ট্যাংক। বাহাদুর শাহ পার্কের সমসাময়িক আরেকটি পানির ট্যাংকের দেখা মেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ভাট্টিখানা এলাকায়। যার স্থাপত্যশৈলী অনেকটা একই রকম। লাল ইট-সুরকি দিয়ে নির্মিত ট্যাংকটি। এলাকাবাসীর মতে, এটি ছিল ঢাকা শহরের দ্বিতীয় পানির ট্যাংক। হাটখোলা রোড, ফুলবাড়িয়া, ফকিরাপুল, বিজয়নগর, লালমাটিয়া, মিরপুর-১০ এলাকার ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলোরও প্রায় একই চিত্র। ফকিরাপুল আর লালমাটিয়ার ট্যাংক দুটি স্টিলের তৈরি। সাধারণ ট্যাংকগুলোর চেয়ে আকারেও বেশ বড় এগুলো। যে ট্যাংকগুলোর সঙ্গে ওয়াসার জোন অফিস অবস্থিত, সেগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও বাকি ট্যাংকগুলো পড়ে আছে অরক্ষিত।

বিশাল আকৃতির ওভারহেড ট্যাংকগুলো মূলত ব্যবহৃত হতো ওয়াসার পানি জমিয়ে রাখার কাজে। পানি শোধনাগার থেকে পরিশোধিত করে পাম্পের সাহায্য ট্যাংকে উঠিয়ে রিজার্ভ করে রাখা হতো। কোনো কারণে পাম্প নষ্ট হলে সারানোর সময়টুকুতে যেন এলাকাবাসী পানির অভাবে না থাকে, সে জন্যই ছিল এ ব্যবস্থা। সে সময় ঢাকার জনসংখ্যা ছিল বেশ কম। বর্তমানে এ শহরের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটির বেশি। জানা যায়, ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলো পানিতে ভরতে সময় লাগত ১০ ঘণ্টার মতো।

বর্তমানে ঢাকার বিপুল জনগোষ্ঠীকে পানি সরবরাহ দিতে হিমশিম খেতে হয় ওয়াসাকে। তাই রিজার্ভ ট্যাংকে পানি উঠিয়ে রাখার মতো সময় আর নেই। এখন সরাসরি লাইনে পানি সাপ্লাই করা হয় বাড়িগুলোর নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাংকে। এ ছাড়া বড় বড় পানির ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণও ছিল বেশ ঝামেলাপূর্ণ। উঁচু ট্যাংক থেকে পানি সাপ্লাই করায় পানির চাপও হতো অনেক বেশি; যে কারণে অনেক বাসাবাড়ির পানির ট্যাপ ভেঙে যেত। তাই মূলত আশির দশক থেকে বন্ধ হতে শুরু করে ওভারহেড পানির ট্যাংকগুলো।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত সুবিশাল পানির ট্যাংকগুলো এখনো নজর কাড়ে পথচারীদের। কোনো কোনো জায়গায় বিশাল বিশাল অট্টালিকা এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি সেসব ট্যাংকের সামনে। কালের আবর্তে নির্দিষ্ট কিছু এলাকার নামকরণও হয়ে গেছে পানির ট্যাংকের নামে। যেমন- ‘ফকিরেরপুল পানির টাংকি’, ‘বিজয়নগর পানির টাংকি’। অথচ এসব ট্যাংকের বেশির ভাগই এখন অকেজো ও জরাজীর্ণ বিশাল স্তম্ভ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানীর প্রাচীন এ নিদর্শনগুলোর তালিকা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

কলি

বিশ্বের বিপজ্জনক বিমানবন্দর

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১৪ পিএম
বিশ্বের বিপজ্জনক বিমানবন্দর
বিমান দুর্ঘটনার জন্য যতরকম কারণ থাকতে পারে, তার সবই রয়েছে পারো বিমানবন্দরটিতে। ছবি: সংগৃহীত

বিমান আধুনিক বিশ্বের এক চমকপ্রদ আবিষ্কার। বিমানের কারণে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া এখন পানির মতোই সহজ। তবে বিমান অবতরণের সময় আপনি যদি সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দরের সম্মুখীন হন, তবে তা হবে আপনার জন্য অনেকটাই ভীতিকর। বিশ্বের অনেক বিমানবন্দর আছে যা কিনা রোলার কোস্টারের চেয়েও বেশি ভয়ানক।সেরকম কয়েকটি বিপজ্জনক বিমানবন্দরের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো-

পারো বিমানবন্দর: বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দরের তালিকা তৈরি করলে ভুটানের পারো বিমানবন্দরের নাম সবার শীর্ষে থাকবে। এই বিমানবন্দরে বিমান অবতরণ করতে হয় এঁকেবেঁকে। অবতরণের পর প্রচণ্ড গতিতে চলমান অবস্থায়ই বিমানকে বাঁক নিতে হয়। অনেক সময় অল্প জায়গায় বিমান ঘুরানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সর্বসাকুল্যে মাত্র আটজন পাইলটকে এই বিমানবন্দরে অবতরণ করার ক্ষেত্রে যোগ্যতাসম্পন্ন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য সে সংখ্যা বেড়েছে।

বিমানবন্দরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দেড় মাইল ওপরে অবস্থিত, যার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ১৮ হাজার ফুটেরও দীর্ঘ সব চূড়া। অন্যদিকে বিমানবন্দরটির রানওয়েটি মাত্র ৬ হাজার ৫০০ ফুট লম্বা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এমন উঁচুতে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এত ছোট রানওয়ে পৃথিবীতে খুব একটা নেই। বিমান দুর্ঘটনার জন্য যতরকম কারণ থাকতে পারে, তার সবই রয়েছে এই বিমানবন্দরটিতে। তাই এটিকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর মনে করা হয়।

লুকলা এয়ারপোর্ট: এভারেস্ট পাহাড়ের দেশ নেপাল। আপনি যদি এভারেস্টের চূড়ায় চড়তে চান তাহলে আপনাকে লুকলা এয়ারপোর্টে আসতেই হবে। কারণ মাউন্ট এভারেস্টে চড়ার জন্য লুকলাতে বেসক্যাম্প বানানো হয়েছে।

সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৯ হাজার ৩৩৪ ফিট, এই এয়ারপোর্টের রানওয়ে খুবই ছোট এবং ভয়ংকর। লুকলা এয়ারপোর্টের রানওয়ের দৈর্ঘ্য মাত্র ১ হাজার ৭২৯ ফিট। এখানকার পাহাড়ি হাওয়া এবং ভয়ংকর প্রাকৃতিক পরিবেশ এই এয়ারপোর্টকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

জিব্রালটার বিমানবন্দর: ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরের তালিকায় রয়েছে এটিও। গ্রেট ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত এই প্রণালিতে থাকা বিমানবন্দরটির সামনে কোনো ট্রেন লাইন নয়, চলে গেছে গোটা একটা যান চলাচলের রাস্তা। অর্থাৎ ওই রাস্তায় বিমানও চলে, বাস-কার, মোটরসাইকেলও চলে। শুধু বিমান অবতরণের সময় ট্রেনের মতোই দুই পাশে সিগন্যাল পোস্ট নামিয়ে অন্য যানগুলোর চলাচল রোধ করা হয়।

করশেভেল বিমানবন্দর: ফ্রান্সের এ বিমানবন্দরটিতে যেতে হলে বিমানে চড়ার আগেই উড়তে হবে ৬ হাজার ৫৮৮ ফুট উঁচুতে। কারণ বিমানবন্দরটি আছে আলপস পর্বতমালার ওপরে! একটা স্কি রিসোর্টের পাশেই এর রানওয়ে। এটাও ছোট, মাত্র ১ হাজার ৭২২ ফুট। ছোট আকারের সেসনা আর হেলিকপ্টার ছাড়া পারতপক্ষে এখানে ল্যান্ড করার সাহস করে না কোনো উড়োজাহাজ। সময়মতো উড়তে না পারলে বরফের রাজ্যে আছড়ে পড়বে বিমান।

কলি

আভিজাত্যের প্রতীক ‘সেমাই’

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১২ পিএম
আভিজাত্যের প্রতীক ‘সেমাই’

আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় রোজা পালনের পর ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা উদযাপন করে থাকেন পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর এই ঈদের দিনকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে তৈরি হয় বিভিন্ন স্বাদের খাবার। সেই তালিকায় মুখরোচক খাবার হলো সেমাই। ‘সেমাই’ এই খাবারের পরিচয় অনেকটা ঈদের সেমাই নামেও পরিচিত। ঈদের দিনে এমন কোনো বাড়ি নেই যেখানে সেমাই রান্না হয় না। ঈদের দিন সেমাই খাওয়ার দাওয়াত বাঙালি সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের।

একটা সময় রমজানের শুরুতেই সেমাই তৈরির কাজে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা নিয়োজিত থাকতেন। হালকা পরিশ্রমের এই কাজটি করতে তারা অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কেননা ঈদের খুশির দিনে প্রিয়জনরাই খাবে তাদের হাতের তৈরি সেমাই। ঘরের তৈরি সেমাই খাওয়ার দাওয়াত দেওয়ার মধ্যে এক প্রকার অভিজাত্যের প্রতীক ফুটে ওঠে। কিন্তু এই সেমাইয়ের উৎপত্তি কোন জায়গা থেকে? ঈদের সঙ্গে সেমাইয়ের কেন এত নিবিড় সম্পর্ক, তা অনেকের কাছেই অজানা।

বাংলা অভিধানে সেমাই শব্দটাকে কোথাও বলা হয়েছে দেশি, কোথাও বলা হয়েছে হিন্দি। ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, গ্রিক শব্দ সেমিদালিস থেকে সেমাই শব্দের উৎপত্তি। সেমিদালিস শব্দের মূল অর্থ ময়দা।

আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের মধ্য দিয়ে গ্রিসের সঙ্গে ভারতের পরিচয় ঘটে। সেই সময় খাদ্যদ্রব্য হিসেবে সেমিদালিস বা ময়দার সঙ্গে ভারতের পরিচয় ঘটা বিচিত্র নয়। সেমিদালিসের সমিদা হওয়া এবং সমিদা থেকে সেমাই হওয়া ভাষাতত্ত্বে নতুন কোনো ঘটনা নয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সেমাই শব্দের বুৎপত্তি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিয়েছেন- সেমাই শব্দের গায়ে গ্রিসের গন্ধ থাকলেও সেমাই দ্রব্যটা আসলে ভারতীয়।

মধ্যযুগের ইতিহাস গ্রন্থে সেমাইয়ের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু ফিরনির চাহিদা উল্লেখ আছে। নবাব আলিবর্দি খাঁর খাদ্য তালিকায় খিচুড়ির উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল। সেমাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না মোগল রসুইঘরেও। অর্থাৎ সেমাই মোগলাই খাবারের অংশে পড়ে না। তবে বাংলাদেশে এখন ঘরে ঘরে সেমাই তৈরির প্রচলন কমতে শুরু করেছে। রমজানের শুরুতেই সেমাই তৈরির আনন্দ মাখা সময়গুলো আজ বড্ড মলিন।

কলি 

খুকুর চলে যাওয়া

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০১:১০ পিএম
খুকুর চলে যাওয়া

মূল ভবনের ৩১১ নম্বর রুমে ক্লাস করছি। সব ক্লাসরুমে মনোযোগ দিতে পারলেও এখানে মনোযোগ আসত না। আমি তিন নম্বর সারির জানালার পাশের চেয়ারটায় বসতাম। একদিন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, একটি কাক দেখতে পেলাম বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। কাকটিকে খুব বিষণ্ন মনে হলো। তারপর আরেকটি কাক তার পাশে এসে বসল। তখন আগের কাকটিকে উৎফুল্ল মনে হলো। আমি তিন ক্রেডিটের কোর্স কাটিয়ে দিলাম কাক দেখেই

এর মধ্যে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ধউড় বেড়িবাঁধ থেকে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য আশুলিয়ার একটি বাসে উঠলাম। আমার ডান পাশের সিটে মা আর ছয়-সাত বছরের মেয়ে খাঁচাসহ একটি পাখি নিয়ে বসে আছে। এই বন্দি পাখিকে দেখে আমার বুক কেমন জানি ধপধপ করছিল।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘আন্টি, পাখিটা কোথা থেকে কিনেছেন?’ আন্টি বলল, ‘বাবা আজিমপুর থেকে কিনেছিলাম, কিন্তু মেয়ে এটা পছন্দ করছে না। তাই পাল্টাতে যাচ্ছি’। আমি বললাম, ‘আন্টি, কিছু না মনে করলে এটা আমাকে দিয়ে দেন, টাকা দিয়ে দিচ্ছি। আপনি তো এটা ফেরতই দিয়ে দেবেন’।

পাখিটা উনি আমাকে দিয়ে দিলেন। খাঁচা দেননি অবশ্য। যদিও আমার খাঁচার দরকার নেই। পাখিটা হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে ছেড়ে দিলাম। আন্টি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এটা ছেড়ে দিলা?’ বললাম, ‘আন্টি, পাখিটা যখন আপনার খাঁচায় ছিল, তখন আমি ছটফট করছিলাম। তাই ছেড়ে দিয়েছি’।

আমাকে নামিয়ে বাসটি আবার আহসানিয়া মিশন হাসপাতালের সামনে থামল। তাকিয়ে দেখি আন্টি আর উনার মেয়ে বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হয়ে রিটার্ন কোনো বাসে উঠল । দুই দিন পর সকালে দেখি আন্টি ভার্সিটির গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। কী মনে করে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলেন। তারপর আন্টির সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো।

তারপর কী হলো? যার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ করে একটি কাক আসা বন্ধ করে দিল। অন্য কাকটি রোজ দুপুরে বিষণ্ন মনে বসে থাকত। একদিন বিকেলে পেছনের মাঠে ওই গাছটার নিচে গেলাম। আয়া কাজ করছে। কী মনে করে যেন উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘একটা মৃত কাক দেখেছেন’? আয়া বলল, ‘কয়েকদিন আগে একটা কাক মরে পড়ে ছিল। নদীর পাড়ে ফেলে দিয়েছি’।

ওইদিন আর ক্লাস করিনি (বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি দুই দিন ক্লাস মিস করেছি, এর মধ্যে ওই দিনটি একটি)। বিষণ্ন মন নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। পরের দুই সেমিস্টার একা কাকটিকে দুপুরবেলা বসে থাকতে দেখেছি। এখন যেদিন ভার্সিটি যাই, ওই ৩১১ নম্বর রুমটায় একবার হলেও উঁকি দিয়ে আসি। জানালা দিয়ে গাছটার দিকে তাকাই ‘কেউ কোথাও নেই’।

গত বছর মে মাসে আন্টি আমাকে কল দিলেন। ‘বাবা, আমার এগারো বছরের মেয়েটা করোনায় আক্রান্ত। পাঁচ দিন ধরে আইসিইউতে বন্দি। আমার বুকটা সারাক্ষণ ধুপধুপ করে। তুমি আমার মেয়ের জন্য দোয়া করো’।

কারও দোয়া কাজে লাগেনি। মে-র ১৭ তারিখ খুকুমণি চলে গেল মায়ের কোল শূন্য করে। 

ইঙ্গোলস্ট্যাড, জার্মানি,মাস্টার্স ইন অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং

কলি 

রাজার হাত থেকে বাঁচতে ট্যাটু!

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০১:০৪ পিএম
রাজার হাত থেকে বাঁচতে ট্যাটু!
মূলত সম্ভ্রম বাঁচাতেই চীন রাজ্যের নারীরা মুখে ট্যাটু আঁকেন। বিকৃত করেন তাদের চেহারা। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে ফ্যাশনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ট্যাটু। অন্যের চেয়ে নিজেকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপন করার জন্য অনেকেই হাতে, ঘাড়ে কিংবা শরীরের দৃশ্যমান কোনো জায়গায় ট্যাটু এঁকে থাকেন। আবার এমনো দেখা যায়, যারা একটি ট্যাটু করতে গিয়েই পরিবারের সঙ্গে লড়াই শুরু করে দেন।

তবে একটা সময় মায়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলের চিন রাজ্যে ট্যাটু করা ছিল বাধ্যতামূলক। সেখানকার কন্যাশিশুদের ছয় বছর বয়স পেরোলেই মুখে আঁকা হতো ট্যাটু। মায়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলের চিন রাজ্যের নারীরা তাদের মুখভর্তি ট্যাটুর জন্য বিখ্যাত। পুরো বিশ্বেই এই নারীদের ট্যাটুর জন্য তাদের আলাদাভাবে দেখা হয়। এর পেছনে অবশ্য একটি মর্মান্তিক কারণ রয়েছে। এই প্রথা এখানে শুরু থেকেই ছিল না। মূলত সম্ভ্রম বাঁচাতেই এখানকার নারীরা মুখে ট্যাটু আঁকেন। বিকৃত করেন তাদের চেহারা।

২০১৪ সালের আদমশুমারি অনুসারে, প্রায় ৫ লাখ মানুষের বাস চিন রাজ্যে। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী চিনদের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি অদ্ভুত প্রথা আছে, যা কিছুটা বর্বরও মনে হতে পারে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে এই উপজাতির প্রত্যেক মেয়ের মুখে এঁকে দেওয়া হয় ট্যাটু অর্থাৎ তাদের চেহারা বিকৃত করে দেওয়া হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলে আসছে চিনদের এই রীতি। সেখানে গেলে প্রত্যেকটি নারীর মুখেই দেখা মিলবে এই ট্যাটুর।

মায়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলে মূলত শত শত বছর ধরে বাস করে এই উপজাতির মানুষ। কয়েকশ বছর ধরে রাজ্যটির বাসিন্দারা আধুনিক পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নই ছিলেন বলা যায়। তবে পর্যটকদের আনাগোনায় তারা সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। নারীদের মুখে ট্যাটু করা সেখানকার প্রাচিন প্রথা। গ্রামের প্রত্যেক মেয়ে তা করে। এর পেছনের কারণ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে এক কাহিনি। একবার এক বার্মিজ রাজা ঘুরতে এসেছিলেন এখানে। সে সময় এক নারীর রূপে মুগ্ধ হন রাজা।

সেই নারী ছিলেন বিবাহিতা। তবু তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় রাজার জন্য। একপর্যায়ে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন তিনি। কিন্তু শঙ্কা আর কাটে না। কখন যেন রাজার লোকেরা আবার ধরে নিয়ে যায় তাকে। আর তখনই ছদ্মবেশ ধারণ করতে ছুরি দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল বিকৃত করে ফেলেন ওই নারী। সেই রাজা যখন যে মেয়েকে খুশি সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যেতেন। এতে মেয়ের সম্মতি থাকুক বা না থাকুক। তবে মেয়েটিকে কখনোই স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হতো না। রাখা হতো উপপত্নী করে। যখন ইচ্ছে একজনকে ত্যাগ করে আবার নতুন কোনো মেয়েকে সঙ্গী করত তারা।

ওই রাজার মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার কারও সাধ্য ছিল না। শেষ পর্যন্ত সম্ভ্রম রক্ষার্থে ট্যাটু এঁকে মুখমণ্ডল বিকৃত করার চর্চা শুরু করে এই সম্প্রদায়ের নারীরা। সবাই জানত, রাজকীয় শক্তির বিরোধিতা মানেই নির্মম নির্যাতন। আর তাই শেষ পর্যন্ত এই পথ বেছে নেওয়া। রাজার হাত থেকে রাজ্যের মেয়েদের বাঁচাতে ছোটবেলাতেই তাদের মুখে ওই নকশা করে দিত মা-বাবারা। একটা সময় ট্যাটু শিল্পেও রীতিমতো সৃজনশীল হয়ে ওঠেন চিন নারীরা। এরপর মুখে ট্যাটু তাদের সংস্কৃতিরও একটি অংশ হয়ে ওঠে।

একবার ট্যাটু করতে প্রায় পুরো দিন সময় লেগে যেত। এই ট্যাটু আঁকাতে ভয়ানক যন্ত্রণাও হতো। বিশেষ করে চোখের পাতায় ট্যাটু করার সময়। শরীরে যে অংশে ট্যাটু আঁকা হয় সেই অংশে লোহার অস্ত্র দিয়ে কেটে তার ওপর গরু, ছাগল বা ভেড়ার কালো চর্বি লাগানো হয়। একবার ট্যাটু আঁকলে প্রায় ছয় থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। তারপর আবার, এভাবেই ট্যাটু আঁকা চলতে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। কখনো কখনো পুরুষদের আকৃষ্ট করতেও মুখে আঁকা হয় ট্যাটু। সেখানকার মানুষ এমনো বলেন, মাকড়সা জাল দিয়ে যেমন পোকামাকড় ধরে থাকে, মাকড়সার জালের মতো ট্যাটু দিয়েও নারীরা পুরুষদের ফাঁদে ফেলেন। তবে এলাকাভেদে এই ট্যাটুর নকশাও আলাদা। নকশা দেখেই বলে দেওয়া যায় কোন নারী কোন এলাকার। ছয়টি আলাদা জাতি আছে তাদের মধ্যে। তারা কপালে ইংরেজি পি, ডি ও ওয়াই অক্ষর আঁকেন। তারা ট্যাটু আঁকতে লোহার দণ্ড ছাড়াও পাতা, ঘাসের কাণ্ড, বেতের কাঁটা ও কাচের টুকরা ব্যবহার করেন। কালি তৈরি হয় পশুর চর্বি পুড়িয়ে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা পরিণত হয় এক চিত্তাকর্ষক শিল্পে। প্রথমে মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শুরু হলেও পরে তার বিপরীত প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। মুখে অঙ্কিত ট্যাটুই হয়ে উঠল সৌন্দর্যের প্রতীক। আর এটি হয়ে দাঁড়াল চিন নারীদের গৌরবের বিষয়। তবে শুধু নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় নয়। এই ট্যাটু করার পেছনে রয়েছে আরেকটি ব্যাখ্যা। সেটি অবশ্য ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় থেকে অনেক চিন সংখ্যালঘুরা খ্রিষ্টান ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছে বা অন্যথায় এটিকে অ্যানিমিস্ট বিশ্বাসের পাশাপাশি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় যাজকরা বলতেন যে শুধু যাদের ট্যাটু ছিল তারাই স্বর্গে যাওয়ার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে।

১৯৬০ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মাত্রায় প্রচলিত ছিল চিনদের ট্যাটু প্রথা। এরপর থেকেই পদক্ষেপ নেয় দেশটির সরকার। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা এখনো মানতে নারাজ সরকারের সিদ্ধান্ত। মুখমণ্ডল ঢেকে রাখতে কানজুড়ে বিশাল আকৃতির দুল পরেন তারা। নতুন প্রজন্ম অবশ্য দিন দিন বিরক্ত হয়ে উঠছে প্রথাটির প্রতি। নিজেদের সুন্দর মুখমণ্ডল আর বিকৃত করতে চায় না তারা। মায়ানমারের সামরিক সরকার ট্যাটু আঁকলে তার ওপর জরিমানার বিধানও করেছিল। সেই ভয়েও অনেকে আর ট্যাটু আঁকতে চান না।

কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই হয়তো পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে প্রথাটি। তবে এখন মায়ানমার সরকারের কোনো অনুমোদন নেই এই রীতিতে। এমনকি এতে কোনো সমর্থনও নেই তাদের।

সূত্র: বিবিসি

কলি

অদ্ভুত যত লোকাচার

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৭ পিএম
অদ্ভুত যত লোকাচার
মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগণ তাদের পূর্বপুরুষদের কবর থেকে তুলে কাঁধের ওপর নিয়ে গানের তালে নাচতে থাকে।     ছবি: সংগৃহীত

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে পছন্দ করে তারা। আর সে সমাজে আছে নানা নিয়ম-নীতি, আচার-সংস্কৃতি। সমাজের নানা ধরনের আচার, সংস্কৃতি, প্রথা, রীতি-নীতি নিয়ে তৈরি হয় লোকাচার। লোকাচার দেশ-জাতির পরিচয় বহন করে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত এসব লোকাচার দেশ, জাতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু লোকাচার আছে যা খুবই অদ্ভুত। বিভিন্ন দেশ ও জাতির এসব অদ্ভুত লোকাচার নিয়ে জানাব আজকে।

বসনিয়ার বসন্ত উৎসব: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার লোকেরা নতুন বছর শুরু করে ডিম দিয়ে। একে বসন্ত উৎসবও বলা হয়। বসন্তের প্রথম দিনে বসনা নদীর তীরে কাম্বেরোভিকা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। যেখানে সব লোক জড়ো হয়। নদীর ধারে একটি বড় প্যানে ডিম ভাঙা হয়। তারপর তা ভেজে খায় লোকজন। বসনিয়ার সংস্কৃতিতে ডিম নতুন জীবনের প্রতীক। তাই তারা নতুন বছর শুরু করে ডিম খেয়ে। এই উৎসবকে বলা হয় সিম্বুরিজাদা বা ফেস্টিভ্যাল অব স্ক্র্যাম্বলড এগ।

প্লেট ভেঙে নতুন বছর উদযাপন: নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ডেনিশরা অদ্ভুত এক রীতি পালন করে। ডেনমার্কের লোকেরা নববর্ষের জন্য ভাঙা প্লেট, থালা-বাসন, কাপ, বাটি সংরক্ষণ করে। তারপর তা নতুন বছরের শুরুতে বন্ধু-বান্ধবদের বাড়ির সামনে রেখে আসে। নতুন বছরে শুভেচ্ছা জানাতে ডেনিশরা ভাঙা বাটি, প্লেট ব্যবহার করে। তারা মনে করে এতে সৌভাগ্য আসে। এই অদ্ভুত রীতিটি ‘স্ম্যাশিং প্লেট’ বা ‘প্লেট স্ম্যাশিং’ নামে পরিচিত।

বুলেট পিঁপড়ার কামড়: ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইন ফরেস্টের সাতেরে-মাওয়ে উপজাতির মধ্যে এক ভয়ংকর রীতি প্রচলিত আছে। সাতেরে-মাওয়ে উপজাতির মতে একটি ছেলে মানুষ হতে পারে না যতক্ষণ না সে বুলেট পিঁপড়ার কামড় সহ্য করতে পারে। সাতেরে-মাওয়ে উপজাতিদের রীতি হলো অল্পবয়সী ছেলেদের বুলেট পিঁপড়ার দীক্ষা দেওয়া হয়। অল্পবয়সী ছেলেদের হাতে গ্লাভসবন্দি করে সেখানে পিঁপড়া দেওয়া হয়।

এই বুলেট পিঁপড়ার কামড় বুলেটের আঘাতের মতোই যন্ত্রণাদায়ক। পিঁপড়ার দংশন যারা সহ্য করতে পারবে তারাই যোদ্ধা হতে পারবে। যন্ত্রণা না মানলে তারা দীক্ষায় ব্যর্থ হয়। পিঁপড়ার বিষের ফলে উভয় হাত এবং নিচের বাহু সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যায় এবং ছেলেরা গুরুতর ব্যথা, পুরো শরীরের অনিয়ন্ত্রিত কম্পন এবং হ্যালুসিনেশনে ভুগতে পারে, যা সাধারণত বেশ কয়েক দিন স্থায়ী হয় যতক্ষণ না তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়। এই উপজাতির ছেলেরা সাধারণত যোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আগে বেশ কয়েক মাস ধরে প্রায় ২০ বার এই দীক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

মৃতদের সঙ্গে বসবাস: ইন্দোনেশিয়ার তানা তোরাজার বাসিন্দাদের অদ্ভুত এক রীতি আছে। যেখানে মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে হাঁটা হয়। মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিশেষ উৎসব করা হয়। বিশাল কুচকাওয়াজ হয়। পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ঘন জঙ্গলের গভীরে, তানা তোরাজা ‘স্বর্গীয় রাজাদের দেশ’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার বাসিন্দারা মনে করেন মৃত ব্যক্তিও পারিবারিক প্রাত্যহিক জীবনের অংশ।

এখানে কেউ মারা গেলে তাকে সমাধিস্থ করা হয় বহু বছর পর। মৃত ব্যক্তিদের বিশেষ রাসায়নিক দিয়ে মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এমনকি মৃত ব্যক্তিদের খাবারও দেওয়া হয়। মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবিও তোলা হয়। আবার বহু বছর পর যখন তাদের সমাধিস্থ করা হয় তখন বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়। তবে মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে বসবাস করার এই প্রথা এখন প্রায় বিলুপ্ত।

তিন দিন নিষিদ্ধ টয়লেট: ইন্দোনেশিরাই আরেকটি অদ্ভুত প্রথা রয়েছে টিডং জাতির মধ্যে। টিডং জাতি একটি স্থানীয় গোষ্ঠী যা বোর্নিওর উত্তর-পূর্ব অঞ্চল থেকে উদ্ভূত এবং ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার সীমান্তের উভয় পাশে বসবাস করে। এই উপজাতির বিবাহ রীতিতে একটি প্রথা আছে। যেখানে বিবাহ অনুষ্ঠানের পরে নতুন দম্পতিকে একটি নির্দিষ্ট ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের বিয়ের প্রথম তিন দিন কাটাতে হয়। এই তিন দিনের মধ্যে তাদের টয়লেট ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে।

এমনকি যখন তাদের প্রয়োজন হয় তখন তিন দিনের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এটি ধরে রাখতে হবে। টয়লেট ব্যবহার করা এড়াতে তাদের অল্প পরিমাণ পানি এবং খাবার দেওয়া হয়। দম্পতিদের তিন দিন মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাহারা দেওয়া হয়। যাতে তারা নিয়ম ভঙ্গ না করে।

টিডং উপজাতির বিশ্বাস বিবাহের পর এই তিন দিন যারা চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হয় তারাই একটি স্থায়ী/দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য জীবন অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং যারা ব্যর্থ হবে তাদের দাম্পত্য জীবনে দুর্ভাগ্য হবে। তাই টিডং উপজাতিরা এই অনুষ্ঠানটি গুরুত্ব সহকারে পালন করে।

দারুচিনি নিক্ষেপ: ডেনমার্কে কেউ যদি ২৫ বছর বয়সে অবিবাহিত থাকে তাহলে তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর পাঁচ বছর তাকে সময় দেওয়া হয়। ডেনমার্কের একটি রীতি প্রচলিত আছে, যেখানে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেউ অবিবাহিত থাকলে তাকে রাস্তার ধারে গাছের বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর তাকে তার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব মিলে দারুচিনির স্তূপ নিক্ষেপ করে। সারা শরীর ঢেকে যায় দারুচিনি দিয়ে। যদি ৩০ বছরেও কেউ বিয়ে না করে তাহলে তাকে মরিচ নিক্ষেপ করা হবে। কখনো কখনো ডিমও ছুড়ে দেওয়া হয়। ডেনমার্কে এই রীতি শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এই অদ্ভুত রীতির প্রচলন হয়েছে মসলা ব্যবসায়ীদের থেকে। কেননা তারা ব্যবসার কাজে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হতো। তাই আর বিবাহ করা হয়ে উঠত না।

মরদেহের সঙ্গে নাচ: মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগণের একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঐতিহ্য হলো ফামাদিহানা। যেখানে মৃত ব্যক্তির শরীর নিয়ে নাচা হয়। এখানকার লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের কবর থেকে তুলে নতুন কাপড়ে মুড়িয়ে নেয়। তারপর কাঁধের ওপর নিয়ে গানের তালে নাচতে থাকে। কাপড়ে তাদের নাম লেখা থাকে। তাদের মতে এভাবে মরদেহকে সম্মান জানানো হয় এবং তাদের স্মরণ করা হয়। মাদাগাস্কারে প্রতি পাঁচ-সাত বছরে এই অনুষ্ঠান করা হয়। তবে বর্তমানে ফামাদিহানা অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে।

সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট, মিডিয়াম ও উইকিপিডিয়া

কলি