অগ্নিঝরা মার্চের দশম দিন আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে অর্থাৎ ১০ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে শোক প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সরকারি এবং বেসরকারি ভবন, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। প্রধান বিচারপতির বাসভবন এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও কালো পতাকা ওড়ে।
শেখ মুজিবুর রহমান তার বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকেলে ওয়ালী ন্যাপ স্বাধীন বাংলার দাবিতে ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় পথসভা করে। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ‘লেখক-শিল্পী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের’ ব্যানারে লেখক এবং শিল্পীরাও ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন।
নিউইয়র্কে প্রবাসী বাঙালি ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা বন্ধে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি করে মহাসচিব উ-থান্টের কাছে স্মারকলিপি দেন।
স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিবৃতিতে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি পাকিস্তানি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানায়।
করাচিতে ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান সাংবাদিকদের জানান, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য ১৩ মার্চ ঢাকায় আসবেন। ক্ষমতা যাতে হস্তান্তর করা যায় সে জন্য আগে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের চেষ্টা করবেন। করাচি থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আপসে বসার আহ্বান জানিয়ে এয়ার মার্শাল আসগর খান বলেন, পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। সেনানিবাস পাকিস্তানের পতাকার মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর আগে মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় এসে ঘুরে যান তেহরিক-ই-ইস্তিকলাল পার্টির সভাপতি এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান। শেখ মুজিবের সঙ্গে তার তিনবার বৈঠক হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে তৃতীয় কেউ উপস্থিত ছিলেন না। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে সে সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখেন, “শেখ মুজিব তাঁকে (আসগর খানকে) বলেছিলেন, তিনি নিশ্চিত যে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ব্যাপারে ইয়াহিয়া খান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করবেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুজিব বলেন, তিনি একজন পাকিস্তানি এবং পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন; পাকিস্তানি পতাকা হাতে নিয়ে ‘বান করেগা রাহেগা পাকিস্তান’ (পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়ব) স্লোগান দিয়ে কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ‘তখন কোথায় ছিলেন ইয়াহিয়া খান আর ভুট্টো?’ আসগর খান জানতে চান, কীভাবে এই অচলাবস্থা ভাঙবে? জবাবে মুজিব বলেন, এটি পরিষ্কার যে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসবেন। তারপর আসবেন মির্জা মুজাফফর আহমদ (পরিকল্পনা কমিশনের উপপ্রধান), তারপর আসবেন ভুট্টো। এরপর ইয়াহিয়া সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেবেন এবং এভাবেই শেষ হয়ে যাবে পাকিস্তান। মুজিব আশঙ্কা করছেন, তাঁকে বন্দি করা হবে, নতুবা তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কিংবা তাঁর নিজের লোকদের হাতে মারা যাবেন। বিস্ময়ের ব্যাপার, মুজিবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঘটনাগুলো ঘটেছিল।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের ওই দিনের (১০ মার্চ, ১৯৭১) কথোপকথনেও বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ উঠে আসে। মহিউদ্দিন আহমদের ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে বিষয়টির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে, “কিসিঞ্জার ১০ মার্চ নিক্সনকে বলেন, ‘ইয়াহিয়া এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করবে। তবে সামরিক অভিযান সফল নাও হতে পারে। শেখ মুজিব গান্ধীর মতো অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলন দমন করার জন্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। একটি দীর্ঘমেয়াদি বিদ্রোহ শুরু হলে তা দমন করার সামর্থ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নেই। প্রেসিডেন্টকে তিনি চুপচাপ থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো হবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং কিছুই না করা, যাতে ইয়াহিয়া আপত্তিকর কিছু না করেন। গৃহযুদ্ধ এড়ানোর বল এখন ইয়াহিয়ার কোর্টে। এ সময় কিছু বলা উচিত হবে না। কেননা পরিস্থিতির ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা কিছু বললে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাকে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ মনে করতে পারে এবং এর ফলে ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরতে পারে। পাকিস্তান এক আছে, এটি মনে করাই হবে সুবিধাজনক। আমাদের কোনো পদক্ষেপ যেন বিচ্ছিন্নতাকে উসকে না দেয়।”
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে ১০ মার্চের বর্ণনা করেছেন। ওই দিন তিনি ডায়েরিতে লেখেন, “ছেলে ছোকরারা স্বাধীনতা-স্বাধীকারের তর্কে একমত হতে পারছে না, ওদিকে আশি বছরের বৃদ্ধ ভাসানী গতকালকের পল্টন ময়দান মিটিংয়ে স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা করে বসে আছেন। গতকাল বিকেল তিনটেয় পল্টন ময়দানে ‘স্বাধীন বাংলা আন্দোলন সমন্বয় কমিটি’র উদ্যোগে যে জনসভা হয়, তাতে সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার যদি ২৫ মার্চের মধ্যে আপসে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা না দেয়, তাহলে ’৫২ সালের মতো মুজিবের সঙ্গে একযোগে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম শুরু করব।”
“ভাসানীর বক্তৃতার একটি কথা আমার মনে খুব দাগ কেটেছে। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেয়ে বাংলার নায়ক হওয়া অনেক বেশি গৌরবের।’ মহাকবি মিল্টনের অমর কাব্য ‘প্যারাডাইজ লস্ট’-এর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি মনে পড়ল- ‘ইট ইজ বেটার টু রেইন ইন হেল দ্যান সার্ভ ইন হেভেন’। স্বর্গে গোলামি করার চেয়ে নরকে রাজত্ব করা অনেক ভালো।”