পরমাত্মার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সাধনায় ধ্যানের মাধ্যমে যুগে যুগে মানুষ আত্মনিমগ্ন হয়ে পরিণত হয়েছেন মহামানবে। স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণের জন্য সুফিসাধকরা নিমগ্ন হয়েছেন মোরাকাবা-মোশাহেদায়। আত্ম উপলব্ধির জন্য কালে কালে সাধক মুনি-ঋষিরা বেছে নিয়েছেন ধ্যানকে। ধ্যান, মেডিটেশন, মোরাকাবা, তাফাক্কুর- শব্দগুলো ভিন্ন হলেও এর মূল নির্যাস একই। বিভিন্ন ধর্ম আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এর প্রায়োগ ভিন্ন রূপ নিলেও পানির সার্বজনীনতার মতোই ধ্যানের নির্যাস সার্বজনীন।
ধ্যান চর্চার প্রচলন হয়ে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। আধুনিক বিজ্ঞানের এ যুগে মেডিটেশন এক অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগ মুক্তি, স্ট্রেস, রাগ নিয়ন্ত্রণ, হতাশা, নেতিবাচকতার শৃঙ্খল থেকে শুরু করে জীবনের সমস্যাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে এবং নেতিবাচকতা ও মনোজাগতিক শৃঙ্খল থেকে নিজেনে স্বমহিমায় ফিরে পেতে মেডিটেশন বিজ্ঞানসম্মত কার্যকর মাধ্যম। মেডিটেশন হচ্ছে জীবন যাপনের বিজ্ঞান।
প্রাচ্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য এই ধ্যান। মোরাকাবা বা মেডিটেশনই এখন পাশ্চাত্যে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রয়োগ হচ্ছে মূলত প্রশান্তি ও আত্মনিরাময় লাভের ক্ষেত্রে।
ধ্যানের কথা লেখা আছে পাঁচ হাজার বছর আগে
প্রাচীন মানুষ যে ধ্যান বা মেডিটেশন চর্চা করতেন তার লিখিত প্রমাণের বয়সই কমপক্ষে ৫ হাজার বছর। ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রশাস্ত্রে ধ্যানের উল্লেখ আছে। এটি সতের শতকের একটি দুর্লভ উপনিষদ পান্ডুলিপির খণ্ডাংশ। এখানে ধ্যানের কথা বলা আছে।
মোজেস বা মুসা
ইহুদি ধর্মের প্রাণপুরুষ মোজেস বা মুসা সিনাই পাহাড়ে ৪০ দিন ধ্যানমগ্ন থেকে আল্লাহর বাণী লাভ করেন। তাওরাতে পিতা আইজ্যাকের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনার জন্যে মাঠে যাওয়া প্রসঙ্গে হিব্রুতে যে ‘লাসাচ’ (Lasuach) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, এটা আসলে ধ্যানেরই একটি পরিভাষা।
মহেঞ্জোদারো সভ্যতা
ধ্যানচর্চার প্রাচীন ইতিহাসের আরও কিছু নিদর্শন মিলেছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে। আজ থেকে ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে বিকশিত এ সভ্যতার একটি প্রাচীন সিলমোহরে দেখা যায় ধ্যানাসনে বসে একজন যোগী গভীর ধ্যানে মগ্ন।
মহামতি বুদ্ধ
মহামতি বুদ্ধ ধ্যানের পথে বোধি লাভ করেছেন। ধ্যানের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভের পন্থা শিখিয়েছেন অনুসারীদের। তার ধ্যান পদ্ধতিকে ইউরোপ-আমেরিকায় এখন নানাভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক-মানসিক নিরাময়ের ক্ষেত্রে।
ইমাম গাজ্জালী
ইমাম গাজ্জালী। দীর্ঘ ১০ বছর নির্জনবাসের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেন আত্মশুদ্ধি এবং ধ্যানের পথেই মুক্তি। শরিয়তের সঙ্গে সাধনাকে সম্পৃক্ত করে তিনি ইসলামি জীবনদৃষ্টির পুনর্জাগরণ ঘটান। পরবর্তী হাজার বছরে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সাধক-দার্শনিকদের তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তার লেখা থেকেই পাওয়া যায় যে, হযরত ইমাম বোখারীও মেডিটেশন করতেন।
মধ্যযুগীয় সুফিধারা
সুফিধারায় ধ্যান বা মেডিটেশনের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। জিকর বা স্রষ্টার স্মরণ এবং ফিকর বা আত্মমগ্ন ভাবনার চর্চার ধারাই পরে পরিণত হয়েছে বিশেষ প্রক্রিয়ার ধ্যানে। ১৬৩০ সালের একটি ছবিতে একজন সুফিকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখা যায়।
মহাঋষি মহেশ যোগী
মহাঋষি মহেশ যোগী ষাটের দশকে পাশ্চাত্যে বেদান্ত দর্শনকেন্দ্রিক টিএম-কে পরিচিত করান। পরবর্তীতে যা পাশ্চাত্যের মিডিয়া এবং জনজীবনে ধ্যানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
দালাই লামা
তিববতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা। বুদ্ধের ধ্যান পদ্ধতিকে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
যিশু
যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান এবং প্রার্থনা হয়ে গিয়েছিল একাকার। যখনই সুযোগ পেতেন তিনি ধ্যান ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতেন। শিষ্যদেরও উৎসাহিত করতেন ধ্যানমগ্ন হতে।
হযরত মোহাম্মদ (স.)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) বছরের পর বছর হেরা পর্বতের গুহায় কাটিয়েছেন ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। ধ্যানের স্তরেই মহগ্রন্থ আল-কোরআনের বাণী নাযিল হয়েছে তাঁর ওপর।
পবিত্র কোরআনের ধ্যান সম্পর্কে যা বলা আছে
“নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাত্রির আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয় এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি কর নি।” (সূরা আলে ইমরানের ১৯০-১৯১ আয়াত)।
কোরআনের আরও বেশ কটি আয়াতে তাফাক্কুর বা তাদাব্বুরের যে কথা বলা হয়েছে, তা আসলে সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ধ্যানেরই তাগিদ।
কোরআন অনুধাবনের জন্য ধ্যান
মহান রাব্বুল আলামীন মানবজাতির জন্য যে পথনির্দেশিকা কোরআন নাজিল করেছেন, তাতেই আছে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কিন্তু এই জীবন বিধান অনুসরণের জন্য প্রয়োজন এ বাণীর অনুধাবন, উপলব্ধি। আর কোরআন নিজেই কোরআন অনুধাবনের জন্য বলেছে এই ধ্যানের কথা।
‘হে নবী ! আমি তোমার ওপর এই কল্যাণময় কিতাব নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এই কোরআনের বাণী নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়, সেই সঙ্গে সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে এর শিক্ষা অনুসরণ করে।’ (সূরা সাদ, আয়াত ২৯)
‘এরপরও কি ওরা কোরআন নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে তা অন্তরে ধারণ করবে না? নাকি মনের দরজা বন্ধই করে রাখবে?’ (সূরা মুহাম্মদ আয়াত ২৪)
‘(হে নবী! ওদের) বলো, আমি তোমাদের একটিমাত্র পরামর্শ দিচ্ছি এককভাবে বা যৌথভাবে আল্লাহর সামনে সচেতন হয়ে দাঁড়াও। নিজের গভীরে ধ্যানে নিমগ্ন হও, (তাহলেই উপলব্ধি করতে পারবে) তোমাদের সঙ্গী আদৌ উন্মাদ নয়। আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সে একজন সতর্ককারী মাত্র’। (সূরা সাবা ৪৬ নম্বর আয়াত)
‘এরপরও কোরআনকে অনুধাবন করার জন্য ওরা কি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হবে না (বা ওদের সহজাত বিচারবুদ্ধিও প্রয়োগ করবে না)? কোরআন যদি আল্লাহর কালাম ছাড়া অন্য কিছু হতো, তাহলে অবশ্যই এর মধ্যে অনেক অসঙ্গতি থাকত। (সূরা নিসা, ৮২)
হাদীসে ধ্যান সম্পর্কে যা বলা আছে
‘একঘণ্টার ধ্যান ৭০ বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।’ -আবু হুরায়রা (রা); জামে উস-সগীর, ইবনে হিব্বান।
‘রাতে একঘণ্টা জ্ঞানচর্চা বা ধ্যান সারারাত ইবাদতের চেয়ে উত্তম।’ -আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা); মেশকাত।
‘আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য নিয়ে ধ্যান করো, তাঁর মহিমা আঁচ করতে পারবে। আল্লাহকে নিয়ে ধ্যান করতে যেও না। (কারণ তুমি কখনো তাঁর ক্ষমতার কূলকিনারা পাবে না।)’ -আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা); আবু নায়ীম, গাজ্জালী।
‘গভীর ধ্যানের তুল্য কোনো ইবাদত নেই।’ -আলী ইবনে আবু তালিব (রা); বায়হাকি।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলার এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ধ্যানের শিক্ষা দিয়ে উপমহাদেশ, তিববত ও চীনের সমাজ-জীবনের পঙ্কিলতা দূর করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
নতুন যুগের সূচনা
১৯৬৯-১৯৭০ দশকে মেডিটেশন চর্চায় নতুন যুগের সূত্রপাত হয়। নতুন নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে টিএম, বা ট্রান্সেনডেন্টাল মেডিটেশন, সহজ যোগ, ন্যাচারাল স্ট্রেস রিলিফ, ফাইভ রিদম, থিটা হিলিং, সিলভা মেথড, ডা. হার্বার্ট বেনসনের রিলাক্সেশন রেসপন্স, ডা. কাবাত জিনের মাইন্ডফুলনেস বা মনোনিবেশায়ন উল্লেখ্যযোগ্য।
ধর্মের আলোকে মেডিটেশন
ধর্মচর্চা ভিন্ন হলেও সব ধর্মের মূলবাণী একই। আর তা হলো অনৈতিকতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে আদর্শ জীবন গঠন। আত্মপর্যালোচনা এবং আত্মউপলব্ধির মাধ্যমে নিজের পরিবর্তন। আর এই উপলব্ধির প্রক্রিয়ায় ধ্যান বা মেডিটেশনকে পৃথিবীর সব ধর্মেই বিবেচনা করা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে।
সনাতন ধর্মে ধ্যান
মহাভারত, বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে, ধ্যানে মগ্ন হলে একজন মানুষ আত্মার সন্ধান পেতে পারে নিজের মাঝেই। ভগবতগীতায় ধ্যানযোগের ওপর রয়েছে বিশেষ অধ্যায়। আর পতাঞ্জলির সময় থেকে যোগসাধনায় সংযুক্ত হয়েছে ধ্যান, যার পরিণতি সমাধির স্তরে।
বৈদিক হিন্দুধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র হলো গায়ত্রী মন্ত্র। এ মন্ত্রকে বলা হয় সমস্ত মন্ত্রের জননী। পন্ডিত সত্যকাম বিদ্যালংকারের অনুবাদ দি The Holy Vedas এ রয়েছে — O Supreme Lord
Thou art ever existent, ever conscious, ever blissful. We meditate on Thy most adorable glory. Mayest Thou guide and inspire our intellect on the path of highest divinity! May we be able to discriminate between truth and falsehood. (Rig.3.62.10)
সদাসর্বত্র বিরাজমান তন্দ্রা-নিদ্রাহীন সদা সজাগ প্রতিনিয়ত করুণা বর্ষণকারী সর্বশক্তিমান হে প্রভু! আমরা শুধু তোমারই মহিমার ধ্যান করি, প্রভু হে! তুমি আমাদের সর্বোত্তম আলোকিত পথে পরিচালিত করো। [ঋগ্বেদ : ৩.৬২.১০]
বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যান
বৌদ্ধ ধর্মমতে ধ্যান বা মেডিটেশনই হলো নির্বাণপ্রাপ্তির উপায়। দুঃখসংক্রান্ত চতুরার্থ সত্য উপলব্ধির পর মহামতি বুদ্ধ এর প্রতিকারের জন্যে যে দুই ধর্মচক্রের কথা বলেন, তার প্রথম হলো মধ্যপন্থা অনুসরণ অর্থাৎ জীবনে অতি সুখ-বিলাস-ব্যসন যেমন পরিত্যাজ্য, তেমনি অতি সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনও অপ্রয়োজনীয়। আর দ্বিতীয় ধর্মচক্রে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে তিনি আটটি সৎপথের কথা বলেন। আর তা হলো, সৎদৃষ্টি, সৎসংকল্প, সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎজীবিকা, সৎপ্রচেষ্টা, সৎস্মৃতি এবং সৎসমাধি। আর এর যথার্থ উপলব্ধির জন্যে একজন মানুষকে মেডিটেশন বা ধ্যানে আত্মমগ্ন হতে হবে।
বুদ্ধের মতে মেডিটেশনের প্রাপ্তি হলো দুটি–এক, সমাধি বা স্থিরতা যা মনকে কেন্দ্রীভূত করে; দুই, বিপাসন বা প্রজ্ঞা, যা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরেও উপলব্ধির চেতনাকে জাগ্রত করে। ফলে একজন মানুষ তার স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করে ত্রিকাল দর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। অর্থাৎ মহামতি বুদ্ধ ধ্যানের পথে বোধি লাভ করেছেন। ধ্যানের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভের পন্থা শিখিয়েছেন অনুসারীদের।
খ্রিষ্ট ধর্মে ধ্যান
যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান এবং প্রার্থনা হয়ে গিয়েছিল একাকার। যিশুর শক্তির উৎস ছিল তাঁর ধ্যান, তাঁর প্রার্থনা—যে ধ্যানে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতেন। যে প্রার্থনা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, প্রার্থনায় যা-কিছু তোমরা চাও, বিশ্বাস করবে তা পেয়েছ, তাহলে তা-ই পাবে। সারাদিন ধরে ভক্ত-শিষ্য-অভ্যাগতদের সাথে সময় কাটানোর পর সন্ধ্যাবেলা খানিকটা নির্জনে গিয়ে তিনি প্রার্থনায় নিমগ্ন হতেন, ভুলে যেতেন সমস্ত ক্ষুধা-ক্লান্তি-অবসাদ। অন্যদেরকেও তিনি বলতেন, অনেক কাজ করেছ, এখন ধ্যান করো। নিজেকে পর্যালোচনা করো, ভুলগুলো খুঁজে বের করো, মনের পর্দায় নিজেকে দাঁড় করাও, জীবন পরিবর্তন করো।
যিশুখ্রিষ্টের এ আদর্শের অনুসরণে যারা অনুপ্রাণিত, তারা চর্চা করেন খ্রিষ্টীয় মেডিটেশন। স্রষ্টার মহিমা ও বাণী নিয়ে বিশেষ প্রার্থনা। খ্রিষ্টীয় মেডিটেশনের একজন একনিষ্ঠ প্রবক্তা সেইন্ট পিয়েত্রিলসিনা। তিনি বলেন, বাইবেল পড়ে একজন মানুষ স্রষ্টাকে খোঁজে, আর মেডিটেশনের মধ্য দিয়ে সে স্রষ্টাকে পায়।
ইসলাম ধর্মে ধ্যান
ইসলামে ধ্যান বা মেডিটেশনকে একটি উচ্চস্তরের ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ কোরআনের বহু জায়গায় সরাসরি ধ্যান বা মেডিটেশনের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে তাফাক্কুর। এর অর্থ হচ্ছে কনটেমপ্লেশন, মেডিটেশন বা ধ্যান।
আল কোরআনের সূরা আনআমে আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! ওদের জিজ্ঞেস করো, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি কখনো সমান হতে পারে? তোমরা কি এরপরও (কোরআনের শিক্ষা অনুধাবনে) গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হবে না (বা তোমাদের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না)?’ (আনআম: ৫০ )
সূরা সাদে আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আমি তোমার ওপর এই কল্যাণময় কিতাব নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এই কোরআনের বাণী নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়! (সেইসঙ্গে সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে) এর শিক্ষা অনুসরণ করে।’
একইভাবে সূরা মুহাম্মদের ২২, ২৩, ২৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন, (হে নবী! ওদের জিজ্ঞেস করো) তোমরা যদি (আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে পুরনো ধ্যানধারণায়) ফিরে যাও, তবে কি তোমরা দুনিয়ার বুকে পুনরায় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে? বন্ধন ছিন্ন করে পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদে লিপ্ত হবে? এদেরকেই আল্লাহ তার রহমত থেকে বঞ্চিত করেন, (সত্যের ব্যাপারে) বধির ও অন্ধ করেন। এরপরও কি ওরা কোরআন নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে তা অন্তরে ধারণ করবে না? নাকি মনের দরজা বন্ধই করে রাখবে?
বিজ্ঞানের চোখে ধ্যান বা মেডিটেশন
মেডিটেশন হচ্ছে বিজ্ঞান। এটা অলৌকিক কিছু নয় বা নয় কোনো আশ্রম, খানকা বা শ্রেণি সম্প্রদায়ের বিষয়। বরং মেডিটেশন হলো এক সার্বজনীন কল্যাণ প্রক্রিয়া। মেডিটেশন চর্চা করে নারী-পুরুষ, কিশোর-বৃদ্ধ, পাপী-পুণ্যাত্মা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ শারীরিক মানসিক সামাজিক ও আত্মিক কল্যাণ লাভ করতে পারেন। গত ৬০ বছরের অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্য দিয়ে এটা এখন এক প্রমাণিত সত্য।
‘এভরিবডি সে ওম’
নিউসায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে ৮ জানুয়ারি, ২০১১ সংখ্যায় মেডিটেশনের ওপর একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘এভরিবডি সে ওম’ শিরোনামের এ প্রচ্ছদ নিবন্ধে মেডিটেশন নিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যাপক গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়। নিবন্ধে বলা হয় — মেডিটেশন শুধু সাধকদের জন্যে নয় বা এ থেকে উপকার লাভের জন্যে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কেউ মেডিটেশন করে উপকৃত হতে পারে। মেডিটেশনে সময় ব্যয় করা হচ্ছে ফলপ্রসূ সময় ব্যয়।
আপনি যে-ই হোন বা যেখানেই থাকুন, মেডিটেশন থেকে উপকৃত হবেনই
এসব গবেষণার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, আপনি যে-ই হোন বা যেখানেই থাকুন, মেডিটেশন থেকে আপনি উপকৃত হবেনই। আপনাকে এজন্যে মেডিটেশনে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না, দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে অনুশীলন করতে হবে না, ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গলেও যেতে হবে না।
মেডিটেশনের ব্যথানিরোধক ক্ষমতার ওপর মনোবিজ্ঞানী ফিদেল জাইদানের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ২০ মিনিট করে মাত্র তিন দিন অনুশীলন করেই উপকার পেতে শুরু করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। তার দ্বিতীয় গবেষণায়ও দেখা গেছে, অল্পসময়ের জন্যে একটুখানি মেডিটেশন করেই বেড়ে গেছে তাদের মনোযোগের ক্ষমতা, বেড়েছে বড় বড় সংখ্যা মনে রাখা ও বলতে পারার দক্ষতা। তার এই গবেষণালব্ধ তথ্য বেরিয়েছে কনশাসনেস এন্ড কগনিশন জার্নালে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে মেডিটেশন
মেডিটেশন বা আত্ম উন্নয়নমূলক ধ্যানের ব্যাপারটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বর্তমানে সেখানে এক কোটি মানুষ নিয়মিত মেডিটেশন করছেন যা নব্বই দশকের দ্বিগুণ। মেডিটেশন এখন তাদের স্মার্টনেসের একটি অংশ। মেডিটেশনে অবিশ্বাসীরা পরিণত হচ্ছেন সংখ্যালঘুতে।
ডাক্তাররা এখন মেডিটেশনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইদানীং প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে মেডিটেশন কাজ করে। আমেরিকার অধিকাংশ ডাক্তারই এখন রোগ প্রতিরোধ, রোগের প্রকোপ কমিয়ে আনা বা রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্যে মেডিটেশনকে সহায়ক ভাবছেন। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা উপশম, হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ, উচ্চরক্তচাপ কমিয়ে আনা, চর্মরোগ, ক্যান্সার কিংবা বন্ধ্যাত্ব মোকাবেলায় মেডিটেশনের সাহায্য নিচ্ছেন।
হতাশা, অমনোযোগ, অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ এসব মানসিক সমস্যা নিয়ে অনেক রোগী ডাক্তারের কাছে আসেন। বিশেষজ্ঞরা তাদের সুস্থতার জন্যে এখন মেডিটেশনকেই সফল ওষুধ হিসেবে মনে করছেন।
তথ্যসূত্র: কোয়ান্টামমেথড ডট ওআরজি ডট বিডি (quantummethod.org.bd)