বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত ১৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে দলের ভেতরেই তীব্র বিতর্ক চলছে। কমিটিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচ নেতা-কর্মীকে পদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে একজন মৃত ব্যক্তি, দীর্ঘদিনের একজন শয্যাশায়ী এবং দুজন প্রবাসীকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে। পদবঞ্চিত নেতারা এসব দাবি করেছেন।
তাদের অভিযোগ, তিন সদস্যবিশিষ্ট উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে দুই সদস্যকে না জানিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এর নেপথ্যে কমিটি-বাণিজ্য, আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুলাই নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক, সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্যসচিব এবং আব্দুস সালাম রাঢ়ীকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর পরই তা নিয়ে দলের ভেতর অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন, প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ঝাড়ু মিছিল করেন পদবঞ্চিত একাংশের নেতা-কর্মীরা।
কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সালাম রাঢ়ী অভিযোগ করেন, তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে তিনি এবং সদস্যসচিবের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই আহ্বায়ক নিজে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠান। কমিটিতে অন্তত পাঁচজন সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ছাড়া একজন মৃত ব্যক্তি, একজন শয্যাশায়ী এবং দুজন প্রবাসীকেও সদস্য করা হয়েছে।
পদবঞ্চিত নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিটির ২২ নম্বর সদস্য ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মাস্টার, ৬১ নম্বর সদস্য হুমায়ুন কবির বাদল ঢালী, ৮৮ নম্বর সদস্য মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ১০২ নম্বর সদস্য মো. সাহাবুদ্দিন স্বপন এবং ১৩৪ নম্বর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের আমলে জাতীয় সংসদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছেন। এমনকি বিএনপি থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছিলেন।
কমিটির ৬০ নম্বর সদস্য মিরাজ ব্যাপারী এবং ৯৮ নম্বর সদস্য গিয়াস উদ্দিন ফকির বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পদবঞ্চিত নেতাদের দাবি, সাংগঠনিক নিয়ম উপেক্ষা করে তাদের সদস্য করা হয়েছে। ১০৭ নম্বর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত মিজানুর রহমান ওরফে আয়নাল ব্যাপারী দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন। প্রায় আট বছর ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন তালুকদারকে ১৮ নম্বর সদস্য করা হয়েছে।
বিএনপি নেতা জিয়াউল ইসলাম সাবু বলেন, সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন আগে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পরও তিনি জামায়াতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। ২০২২ সালে নুরুল আমিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে সেই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।
বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন বলেন, ‘এই কমিটি সম্পর্কে আমি বা জেলা কমিটি কিছুই জানতাম না। নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। কেন্দ্র থেকেই সরাসরি কমিটি করা হয়েছে। এখন যে বিতর্ক চলছে, কেন্দ্র যদি আমাদের কাছে মতামত চায়, তাহলে আমরা বিষয়টি তুলে ধরব।’
সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। তিনি বলেন, ‘আমি যতদূর জেনেছি, এই কমিটি সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের মতামতের ভিত্তিতে হয়েছে। অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল সবাইকে নিয়ে বসে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় কমিটি করা। কিন্তু তা করা হয়নি। তাকে ওই কমিটির নেতাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে।’
তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘কমিটিতে ত্রুটি থাকতে পারে। তবে এই কমিটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি কারা কমিটিতে এসেছেন, সেটিও ভালোভাবে দেখিনি। অনেকেই রয়েছেন, যারা কোনো পদ-পদবি পাননি। তারা আমার ঘনিষ্ঠ। তারা আমাকে জানাতে পারতেন কিংবা প্রতিবাদ কর্মসূচি দিতে পারতেন। আমি সমাধানের উদ্যোগ নিতাম। কিন্তু তারা ঝাড়ু মিছিল করেছেন। তাদের এই কর্মকাণ্ডে আমি বিস্মিত। মনে হচ্ছে, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে।’
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, ‘কমিটি নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর পর কেন্দ্রীয় নেতারা যাচাই-বাছাই করেই অনুমোদন দিয়েছেন। আমি দল থেকে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না; বরং দলের জন্য কাজ করতেই রাজনীতি করি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি যখন কমিটির সদস্য ও যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম, তখন কোনো অভিযোগ ছিল না। আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ তুলছে।’
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময়ই মসজিদ, মাদ্রাসা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পাশে থাকি। এ ক্ষেত্রে বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা ভিন্নমতের মানুষকে সহযোগিতা করলে সেটিকে রাজনৈতিকভাবে দেখার সুযোগ নেই।’ উল্লেখ্য, আলহাজ নুরুল আমিন বরিশালের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।