১৯ জুলাই ২০২৬। উত্তর আমেরিকার আকাশে শেষবারের মতো বাজল বিশ্বকাপের বিদায়ের সুর। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ফুটবল মহোৎসবের পর্দা নামলেও থামেনি তার আবেগ। কারণ বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব, যেখানে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও সীমান্তের বিভেদ মুছে গিয়ে কোটি কোটি মানুষ এক পতাকার নিচে দাঁড়ায়–ফুটবলের পতাকায়।
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দল। সেই ছোট পরিসরের আয়োজনই আজ ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। ১৩ দলের বিনম্র সূচনা থেকে ৪৮ দলের বৈশ্বিক মহাযজ্ঞ, এই যাত্রাই বিশ্বকাপের ক্রমবিকাশ ও বিশ্বজুড়ে ফুটবলের বিস্তারের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ।
২০২৬ সালে এসে তার বয়স দাঁড়াল ৯৬ বছর। এই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে মোট ২৩টি ফিফা বিশ্বকাপ। ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের বাকি প্রতিটি অধ্যায়ই ফুটবলকে দিয়েছে নতুন মাত্রা, নতুন কিংবদন্তি এবং নতুন অনুপ্রেরণা।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর তালিকাই যেন ফুটবলের বিশ্বভ্রমণের মানচিত্র। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে, এরপর ইতালি (১৯৩৪), ফ্রান্স (১৯৩৮), ব্রাজিল (১৯৫০), সুইজারল্যান্ড (১৯৫৪), সুইডেন (১৯৫৮), চিলি (১৯৬২), ইংল্যান্ড (১৯৬৬), মেক্সিকো (১৯৭০ ও ১৯৮৬), পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪), আর্জেন্টিনা (১৯৭৮), স্পেন (১৯৮২), ইতালি (১৯৯০), যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৪), ফ্রান্স (১৯৯৮), দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান (২০০২), জার্মানি (২০০৬), দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০), ব্রাজিল (২০১৪), রাশিয়া (২০১৮), কাতার (২০২২) এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে ২৩তম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলো। এই আসর প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে এবং ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস আসলে ফুটবলের বিবর্তনের ইতিহাস। উরুগুয়ে থেকে শুরু করে ইতালি, ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন- মাত্র আটটি দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিল পাঁচটি শিরোপা নিয়ে সর্বাধিক সফল দল। তারপরই চারটি করে শিরোপা জিতেছে জামার্নি ও ইতালি। আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে তিনবার। দুটি করে শিরোপা জিতেছে উরুগুয়ে, ফ্রান্স, স্পেন। ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের আবেগ, বিস্ময় আর অনিশ্চয়তায়। এখানেই দুর্বল দল জায়ান্টকে হারায়, অচেনা ফুটবলার রাতারাতি বিশ্বতারকায় পরিণত হন, আর একটি গোল বদলে দেয় একটি জাতির ইতিহাস।
বিশ্বকাপ ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য তারকার আবির্ভাব ঘটেছে। তবে নৈপুণ্য, নেতৃত্ব, রেকর্ড, ব্যক্তিগত অর্জন এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে রেখে যাওয়া অমলিন অবদানের কারণে কয়েকজন ফুটবলার সর্বকালের কিংবদন্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই কিংবদন্তিদের তালিকায় রয়েছেন- ব্রাজিলের পেলে, গ্যারিঞ্চা, লেওনিদাস, রোমারিও, রোনালদো নাজারিও রোনালদিনহো, নেইমার; আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা, মারিও কেম্পেস ও লিওনেল মেসি; জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার ও লোথার ম্যাথাউস; নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ; ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান, কিলিয়ান এমবাপ্পে; ইতালির জিউসেপ্পে মিয়াজা, পাওলো রসি ও সালভাতোরে স্কলাচি; ইংল্যান্ডের স্যার ববি চার্লটন; পর্তুগালের ইউসিবেও ও রোনালদো; হাঙ্গেরি ফেরেঙ্ক পুসকাস; উরুগুয়ের হোসে নাসাসি, আলসিদেস গিগিয়া ও দিয়েগো ফরলান; ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ এবং সর্বশেষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের রদ্রি, ইয়ামাল। এই কিংবদন্তিরা কেউ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, কেউ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতা, আবার কেউ বা নিজেদের অনন্য ফুটবল দর্শন ও নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, ফুটবলের এই মহাতারকাদের অবদান ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যুগ। প্রায় দুই দশক ধরে তাদের দ্বৈরথ ফুটবল বিশ্বকে মোহিত করেছে। ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মেসি নিজের ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা দূর করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল সেই প্রজন্ম থেকে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের এক প্রতীকী অধ্যায়, যেখানে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তরুণদের আত্মবিশ্বাসও সমানভাবে আলো ছড়িয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপ আরেকটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা হলো- ফুটবল আর কয়েকটি দেশের একচ্ছত্র আধিপত্যের খেলা নয়। আধুনিক প্রশিক্ষণ, ক্রীড়াবিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিভা বিকাশের ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোও এখন বড় শক্তিগুলোর জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ। এ কারণেই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ এখন সম্ভাবনার নতুন গল্প। প্রযুক্তিও আধুনিক বিশ্বকাপকে বদলে দিয়েছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ খেলার নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। যদিও বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবু প্রযুক্তির উপস্থিতি এখন বিশ্ব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। বিশ্বকাপের প্রভাব কেবল মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতি, পর্যটন, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলে। প্রতিটি বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের জন্য হয়ে ওঠে নিজেদের সক্ষমতা ও সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ।
এখন ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে আছে ২০৩০ সালের দিকে। কারণ সেই বছর পূর্ণ হবে ফিফা বিশ্বকাপের শতবর্ষ। ১৯৩০ সালে যে অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল, তার ১০০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করবে সমগ্র পৃথিবী। শতবর্ষের সেই বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট হবে না; এটি হবে ফুটবল ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের এক মহাসম্মিলন। এক শতাব্দীর এই যাত্রা মানবসভ্যতাকে মনে করিয়ে দেবে- যুদ্ধ, সংকট কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও একটি ফুটবল কখনো কখনো পৃথিবীকে এক পরিবারের মতো একত্রিত করতে পারে।
বিশ্বকাপ শেষ হয়, ট্রফি বদলায়, নায়ক বদলায়; কিন্তু ফুটবলের এই মহাকাব্য কখনো শেষ হয় না। ১৯৩০ থেকে ২০২৬, ২৩টি বিশ্বকাপ পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের দোরগোড়ায়। চার বছর পর শুরু হবে সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়, যেখানে পৃথিবী উদ্যাপন করবে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং মানবতার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের ১০০ বছরের অবিনাশী অভিযাত্রা।
মো. দেলওয়ার হোসেন পাপ্পু: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।