ঢাকা ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
খুবির নারী হলের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণ, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে প্রতিবাদ চুলকানি হতে পারে বড় কোনো রোগের লক্ষণ বর্ষাকালে সুস্থ থাকতে…. হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু ২৭ জুলাই চাঁবিপ্রবির প্রো-ভিসি হলেন জাবির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লোকমান হোসেন ঝিনাইদহে লাইসেন্সবিহীন গরু জবাই, মাংস বিক্রেতাকে জরিমানা স্পিকারের চিঠি পাওয়ার পর গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা: ইসি দানি ওলমোর সঙ্গে হাতাহাতি নিয়ে ক্ষমা চাইলেন আয়ালা ঠোঁটকাটা-তালুকাটা শিশুদের পুনর্বাসনে জাতীয় কর্মসূচি করার প্রতিশ্রুতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছানিজনিত অন্ধত্ব ৫ বছরে নির্মূল করা হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ইবিতে শিক্ষক নিয়োগে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য কাসেমিরোকে ঘিরে ইন্টার মায়ামির বিরুদ্ধে তদন্তে এমএলএস ‘ফিকি এফডিআই কনফারেন্স-২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধর্ষণ মামলায় এনসিপি নেতা আফতাব মজুমদার জয় গ্রেপ্তার বিশ্বকাপে ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে যা বললো ফিফা ২৫ বছর পর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আহমদ ছফার দেহাবশেষ শীর্ষ ২৭-এর বাইরে থেকেই বিদায়, পুরস্কারবঞ্চিত নেইমার তীব্র গ্যাস সংকটের কারণ জানিয়ে সরকারের দুঃখ প্রকাশ ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট বিল পাস শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর হাতে ৯ ভারতীয় জেলে আটক প্রবাসীদের পাসপোর্ট সংশোধনের সুযোগ বাড়লো ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই গোপন বিয়ে নিয়ে উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসি ও ক্রেডেন্স হাউজিং লিমিটেডের মধ্যে হোম লোন সুবিধা প্রদানে চুক্তি সই কামরাঙ্গীরচরে মারামারি থামাতে গিয়ে প্রাণ গেল শ্রমিকের চাঁদপুরে এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে ৩ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ মেক্সিকোর মেয়র গুলি করে হত্যা করল দুর্বৃত্তরা ফিফার সেরা একাদশে আর্জেন্টিনার ৩ জন, জায়গা পাননি কোনো ব্রাজিলিয়ান মাসাই মারার 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-কে বিখ্যাত করে তোলা ৭টি প্রাণী বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘৩৫টি দেশে ভিসা ছাড়া’ ভ্রমণ, বাস্তবতা কতটুকু? প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ফাস্টট্র্যাক আদালত ঘোষণা নরেন্দ্র মোদির

বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘৩৫টি দেশে ভিসা ছাড়া’ ভ্রমণ, বাস্তবতা কতটুকু?

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ এএম
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘৩৫টি দেশে ভিসা ছাড়া’ ভ্রমণ, বাস্তবতা কতটুকু?
কাজী আসমা আজমেরী

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি গন্তব্যে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন, যার সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে Henley Passport Index-এর সূত্র।

দীর্ঘদিনের একজন আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী হিসেবে এই তথ্য আমাকে বিস্মিত করেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই তালিকার বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করেছি। কিন্তু বাস্তবে আমাকে অনেক দেশের জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাস থেকে আগাম ভিসা নিতে হয়েছে, কিছু দেশে ই-ভিসা (eVisa) করতে হয়েছে, আবার কিছু দেশে প্রবেশ করতে পেরেছি শুধুমাত্র বৈধ মার্কিন বা নিউজিল্যান্ডের ভিসা থাকার কারণে।

উদাহরণ হিসেবে-
Burundi (২০২২) - দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়েছি।
Cambodia (২০১০) - দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়েছি।
Guinea-Bissau (২০২৪) - দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়েছি।
The Gambia (২০২৪) - দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়েছি।
Djibouti (২০২৪) - অনলাইনে eVisa করেছি।
Kenya (২০২৬) - অনলাইনে ETA/অনুমোদন নিয়েছি।
Madagascar (২০২৬) - অনলাইনে আবেদন করেছি।
Grenada, Jamaica, Trinidad and Tobago - প্রবেশ করেছি বৈধ মার্কিন ভিসার ভিত্তিতে।
Kiribati - প্রবেশ করেছি নিউজিল্যান্ডের ভিসার ভিত্তিতে।

প্রশ্ন হচ্ছে- যদি বাস্তবে আগাম ভিসা, eVisa, ETA অথবা অন্য দেশের বৈধ ভিসা ছাড়া প্রবেশ সম্ভব না হয়, তাহলে এগুলোকে কীভাবে সাধারণ অর্থে ‘ভিসা ছাড়া’ বলা হচ্ছে?

হেনলি পাসপোর্ট ইনডেস্ক নিজেই ব্যাখ্যা করেছে যে, তাদের সূচকে Visa on Arrival (VoA) এবং ETA-কেও ‘without a prior visa’ হিসেবে গণনা করা হয়। তবে eVisa-কে তারা ভিসার একটি ধরন হিসেবেই বিবেচনা করে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ভ্রমণের আগে যেই IATA Timatic তথ্য ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস যে নির্দেশনা দেয়, বাস্তব ভ্রমণের ক্ষেত্রে সেটিই অনুসরণ করা হয়। একজন যাত্রীকে বিমানে উঠতে দেওয়া হবে কি না, সেটি নির্ধারণে Timatic ও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ইমিগ্রেশন নীতিই কার্যকর।

তাই আমার ওই পত্রিকা কতৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন- ‘বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন’-এই শিরোনামটি কি সাধারণ পাঠকের কাছে বিভ্রান্তিকর নয়?

কারণ, বাস্তবে এই ৩৫টির মধ্যে এমন দেশও রয়েছে যেখানে আগাম ভিসা, eVisa, ETA অথবা বৈধ যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের ভিসা ছাড়া প্রবেশ করা যায় না।

আমি বিশ্বাস করি, গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু আন্তর্জাতিক সূচকের সংখ্যা প্রকাশ করা নয়; বরং সেই তথ্যের বাস্তব ব্যাখ্যাও পাঠকের সামনে তুলে ধরা। বিশেষ করে ভিসা-সংক্রান্ত ৯টি তথ্যের ক্ষেত্রে একটি ছোট ভুল বোঝাবুঝিও একজন ভ্রমণকারীর জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।

আমার অনুরোধ, এ ধরনের সংবাদের ক্ষেত্রে ‘ভিসা ছাড়া’ শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে হেনলি পাসপোর্ট ইনডেস্ক অনুযায়ী ‘ভিসা-অ্যাক্সেস বা ভিসা-ফ্রি, Visa on Arrival ও ETA-সহ মোট ৩৫টি গন্তব্যে প্রবেশাধিকার’- এ ধরনের নির্ভুল ভাষা ব্যবহার করা হোক।

কারণ, আন্তর্জাতিক ভ্রমণে সঠিক তথ্য শুধু একটি সংবাদ নয়, একজন ভ্রমণকারীর নিরাপদ যাত্রার পূর্বশর্ত।

লেখক: ১৬০ দেশ ভ্রমণকারী পর্যটক

বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের মহাকাব্য: শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে ফুটবলের বিশ্বজনীন অভিযাত্রা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০২ এএম
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের মহাকাব্য: শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে ফুটবলের বিশ্বজনীন অভিযাত্রা
ছবি: সংগৃহীত

১৯ জুলাই ২০২৬। উত্তর আমেরিকার আকাশে শেষবারের মতো বাজল বিশ্বকাপের বিদায়ের সুর। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ফুটবল মহোৎসবের পর্দা নামলেও থামেনি তার আবেগ। কারণ বিশ্বকাপ কোনো সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব, যেখানে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও সীমান্তের বিভেদ মুছে গিয়ে কোটি কোটি মানুষ এক পতাকার নিচে দাঁড়ায়–ফুটবলের পতাকায়।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দল। সেই ছোট পরিসরের আয়োজনই আজ ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। ১৩ দলের বিনম্র সূচনা থেকে ৪৮ দলের বৈশ্বিক মহাযজ্ঞ, এই যাত্রাই বিশ্বকাপের ক্রমবিকাশ ও বিশ্বজুড়ে ফুটবলের বিস্তারের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ।

২০২৬ সালে এসে তার বয়স দাঁড়াল ৯৬ বছর। এই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে মোট ২৩টি ফিফা বিশ্বকাপ। ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়নি। ইতিহাসের বাকি প্রতিটি অধ্যায়ই ফুটবলকে দিয়েছে নতুন মাত্রা, নতুন কিংবদন্তি এবং নতুন অনুপ্রেরণা।

বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর তালিকাই যেন ফুটবলের বিশ্বভ্রমণের মানচিত্র। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে, এরপর ইতালি (১৯৩৪), ফ্রান্স (১৯৩৮), ব্রাজিল (১৯৫০), সুইজারল্যান্ড (১৯৫৪), সুইডেন (১৯৫৮), চিলি (১৯৬২), ইংল্যান্ড (১৯৬৬), মেক্সিকো (১৯৭০ ও ১৯৮৬), পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪), আর্জেন্টিনা (১৯৭৮), স্পেন (১৯৮২), ইতালি (১৯৯০), যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৪), ফ্রান্স (১৯৯৮), দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান (২০০২), জার্মানি (২০০৬), দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০), ব্রাজিল (২০১৪), রাশিয়া (২০১৮), কাতার (২০২২) এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে ২৩তম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলো। এই আসর প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে এবং ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস আসলে ফুটবলের বিবর্তনের ইতিহাস। উরুগুয়ে থেকে শুরু করে ইতালি, ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন- মাত্র আটটি দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করেছে। এর মধ্যে ব্রাজিল পাঁচটি শিরোপা নিয়ে সর্বাধিক সফল দল। তারপরই চারটি করে শিরোপা জিতেছে জামার্নি ও ইতালি। আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে তিনবার। দুটি করে শিরোপা জিতেছে উরুগুয়ে, ফ্রান্স, স্পেন। ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের আবেগ, বিস্ময় আর অনিশ্চয়তায়। এখানেই দুর্বল দল জায়ান্টকে হারায়, অচেনা ফুটবলার রাতারাতি বিশ্বতারকায় পরিণত হন, আর একটি গোল বদলে দেয় একটি জাতির ইতিহাস।

বিশ্বকাপ ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য তারকার আবির্ভাব ঘটেছে। তবে নৈপুণ্য, নেতৃত্ব, রেকর্ড, ব্যক্তিগত অর্জন এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে রেখে যাওয়া অমলিন অবদানের কারণে কয়েকজন ফুটবলার সর্বকালের কিংবদন্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই কিংবদন্তিদের তালিকায় রয়েছেন- ব্রাজিলের পেলে, গ্যারিঞ্চা, লেওনিদাস, রোমারিও, রোনালদো নাজারিও রোনালদিনহো, নেইমার; আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা, মারিও কেম্পেস ও লিওনেল মেসি; জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার ও লোথার ম্যাথাউস; নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ; ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান, কিলিয়ান এমবাপ্পে; ইতালির জিউসেপ্পে মিয়াজা, পাওলো রসি ও সালভাতোরে স্কলাচি; ইংল্যান্ডের স্যার ববি চার্লটন; পর্তুগালের ইউসিবেও ও রোনালদো; হাঙ্গেরি ফেরেঙ্ক পুসকাস; উরুগুয়ের হোসে নাসাসি, আলসিদেস গিগিয়া ও দিয়েগো ফরলান; ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ এবং সর্বশেষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের রদ্রি, ইয়ামাল। এই কিংবদন্তিরা কেউ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, কেউ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতা, আবার কেউ বা নিজেদের অনন্য ফুটবল দর্শন ও নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, ফুটবলের এই মহাতারকাদের অবদান ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যুগ। প্রায় দুই দশক ধরে তাদের দ্বৈরথ ফুটবল বিশ্বকে মোহিত করেছে। ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মেসি নিজের ক্যারিয়ারের অপূর্ণতা দূর করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল সেই প্রজন্ম থেকে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের এক প্রতীকী অধ্যায়, যেখানে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তরুণদের আত্মবিশ্বাসও সমানভাবে আলো ছড়িয়েছে। 

এবারের বিশ্বকাপ আরেকটি সত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা হলো- ফুটবল আর কয়েকটি দেশের একচ্ছত্র আধিপত্যের খেলা নয়। আধুনিক প্রশিক্ষণ, ক্রীড়াবিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিভা বিকাশের ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোও এখন বড় শক্তিগুলোর জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ। এ কারণেই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ এখন সম্ভাবনার নতুন গল্প। প্রযুক্তিও আধুনিক বিশ্বকাপকে বদলে দিয়েছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ খেলার নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। যদিও বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবু প্রযুক্তির উপস্থিতি এখন বিশ্ব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। বিশ্বকাপের প্রভাব কেবল মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতি, পর্যটন, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলে। প্রতিটি বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের জন্য হয়ে ওঠে নিজেদের সক্ষমতা ও সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ।

এখন ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে আছে ২০৩০ সালের দিকে। কারণ সেই বছর পূর্ণ হবে ফিফা বিশ্বকাপের শতবর্ষ। ১৯৩০ সালে যে অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল, তার ১০০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করবে সমগ্র পৃথিবী। শতবর্ষের সেই বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট হবে না; এটি হবে ফুটবল ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের এক মহাসম্মিলন। এক শতাব্দীর এই যাত্রা মানবসভ্যতাকে মনে করিয়ে দেবে- যুদ্ধ, সংকট কিংবা রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও একটি ফুটবল কখনো কখনো পৃথিবীকে এক পরিবারের মতো একত্রিত করতে পারে।

বিশ্বকাপ শেষ হয়, ট্রফি বদলায়, নায়ক বদলায়; কিন্তু ফুটবলের এই মহাকাব্য কখনো শেষ হয় না। ১৯৩০ থেকে ২০২৬, ২৩টি বিশ্বকাপ পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের দোরগোড়ায়। চার বছর পর শুরু হবে সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়, যেখানে পৃথিবী উদ্‌যাপন করবে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং মানবতার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের ১০০ বছরের অবিনাশী অভিযাত্রা।

মো. দেলওয়ার হোসেন পাপ্পু: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

অর্থ পাচারের সেকাল একাল

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
অর্থ পাচারের সেকাল একাল
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ইউরোপ-আমেরিকাসহ শিল্পন্নোত দেশগুলো অনেকের কাছে স্বপ্নের স্বর্গরাজ্য, অনেকের কাছে সোনার হরিণ। এটি এমন এক স্বর্গরাজ্য, যা নিয়ে কল্পনার ডানায় ভর করে মর্মস্পর্শীভাবে চিন্তা করা যায়; কিন্তু বাস্তবে সেখানে ভ্রমণ করার অথবা বাসিন্দা হওয়ার সৌভাগ্য সবার অদৃষ্টে লেখা থাকে না। আর এ  সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি  পাড়ি দিয়ে অনেকেই  ইউরোপে প্রবেশের চূড়ান্ত  চেষ্টা করে। তবে সবার ভাগ্য  সুপ্রসন্ন হয় না। কাঙ্খিতলক্ষ্যে পৌঁছানোর পূর্বেই  অনেকের সলিল  সমাধি হয় । কেউ কেউ আমাজনের মতো গহীন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত পার হয়ে  মাইলের পরে মাইল পায়ে হেঁটে আমেরিকায় অভিবাসী হিসেবে  প্রবেশের জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রচেষ্টা  চালায়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, নেহায়েত  অর্থের জন্য, সুখের থাকার জন্য এ মানুষগুলো জীবন নিয়ে এমনই জুয়া খেলায় মত্ত হয়।

আমেরিকার মতো ভারতীয় উপমহাদেশ একটা সময় ‘ল্যান্ড অফ অপরচুনিটি’ ছিল। চতুর্দশ শতকে পৃথিবীর তিনটা ধনী অঞ্চলের মধ্যে একটি ছিল দিল্লি সালতানাত। বাকি দুটি ছিল পশ্চিম আফ্রিকার মালি ও তুর্কি  সাম্রাজ্য।  ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডিগবির ‘Prosperous  British India’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় সম্রাট আলমগীরের শাসনামলে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে চীনকে পিছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। যার মূ্ল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। ওই সময় ভারতের জিডিপি তৎকালীন বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ ছিল। যুক্তিসঙ্গত কারণে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ইউরোপীয়রা নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করতে নৌপথে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ উপমহাদেশে আগমন করে। স্বতঃসিদ্ধ যে, এখানকার মানুষের সরলতা, বন্ধুবৎসল ও আন্তরিক আতিথিয়তার সুযোগে ছলে-বলে-কৌশলে বাণিজ্যের ছদ্মবেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ইউরোপীয়রা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তবে ইংরেজদের অনৈতিক, ধূর্ত এবং সুদূরপ্রসারী কূটকৌশল অবলম্বনের ফলে অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক  জাতিসমূহ  তাদের সম্মুখে  ধোপের টিকে থাকতে পারেনি। সর্বশেষ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ইংরেজরা বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে  প্রতারণামূলক যুদ্ধের মাধ্যমে পরাজিত করে তাদের দীর্ঘ লালায়িত ও প্রত্যাশিত  হীন স্বার্থ চরিতার্থ  করতে সক্ষম হয়। 

১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় বিশেষত বাংলার বাণিজ্যের উপর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজস্ব  সংগ্রহ শুরু করে। এরপর অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে সেই রাজস্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্রিটিশদের ব্যবহারের জন্য ভারতীয় পণ্য কেনার কাজে ব্যবহার করে। তারা চাষি ও তাঁতিদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করতো  ঠিকই কিন্তু সেই টাকা ব্যবহার করতো যা একটু আগেই তাদের কাছ থেকে কর হিসেবে প্রতারণার মাধ্যমে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। মোটকথা পকেটের এক আনা খরচ না করেই ধাপ্পাবাজি করে মাগনা পণ্য লুফে নিত। রাজস্ব সংগ্রাহক ও পণ্য কেনার প্রতিনিধি ভিন্ন হওয়ায় সাধারণ চাষি ও তাঁতি গড়মিল বা চালাকি টের পেত না। আর এভাবেই বাণিজ্যের আড়ালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে প্রথম অর্থ পাচারের অশুভ সূচনা হয়।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমন ও শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে সম্রাটকে রেঙ্গুনে (আরাকানে)  নির্বাসনে দেওয়ার মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন হয়। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘Government of India Act’ পাশের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন কার্যত শেষ এবং রানীর রাজত্ব শুরু হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্য আধিপত্য ভেঙ্গে যাওয়ার পরে, ঔপনিবেশিক শাসকরা  রাজস্ব ও ক্রয় ব্যবস্থায় একটি নতুন  কৌশল অবলম্বন করে। এ সময় ভারতীয় উৎপাদকরা সরাসরি অন্যদেশে পণ্য  রপ্তানির  অনুমতি পায়। তবে সেই পণ্যের মূল্যবাবদ পরিশোধিত অর্থ যাতে শেষ পর্যন্ত লন্ডনে জমা হয়, ব্রিটেন এটি নিশ্চিত করেছিল। ভারতে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য স্বর্ণ  বা রৌপ্যের বিনিময়ে ব্যাংক  অফ ইংল্যান্ড  থেকে ‘কাউন্সিল বিল’ কিনতে হতো। বিলগুলো রুপিতে ভাঙ্গানোর পরে  ভারতীয় পণ্য ক্রয় করা যেতো । আর পণ্য ক্রয়ে যে রুপিগুলো ব্যবহার হতো তা ছিল ভারতীয়দের থেকে সরবরাহ করা রাজস্ব। ফলশ্রুতিতে  ব্রিটিশরা পূর্বের ন্যায় বিনামূল্যে পণ্য লুফে  নিচ্ছিল। আর পণ্যের বিনিময়ে আবারো স্বর্ণ-রৌপ্য ইংল্যান্ডেই জমা হচ্ছিল। এভাবে ১৭৬৫  হতে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার উপমহাদেশ হতে ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যায়। 

এটা নিখাদ সত্য যে, ইউরোপীয়রা এদেশ থেকে চুরি, ডাকাতি, লুণ্ঠন এবং পাচার করে তাদের দেশগুলো উন্নত করেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইংল্যান্ড আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়। ১৭৫৭ সালে বাংলা জয়, ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ  এবং ১৭৬০ এর দশকে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। মূলত পলাশী যুদ্ধের পরে বাংলার সম্পদ স্রোতের মতো এসে লন্ডনে জমা হতে থাকে। ১৭৬০ এর আগে যেখানে শিল্প কারখানার নাম গন্ধও ছিল না সেখানে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। লর্ড ক্লাইভ  নিজেই স্বীকার করেছেন ‘এমন অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা,  ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের পরিস্থিতি চিত্র বাংলা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি।’ 

ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শাসন ও শোষণের পরে পাকিস্তানও ঔপনিবেশিক  নিয়মে শাসনকার্য পরিচালনা করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ হতে স্বাধীনতা লাভ এবং মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ অভ্যুদয় হয়। তবে টাকা পাচার কখনো বন্ধ হয়নি। সাদা চামড়ার বাবুদের জায়গায়, গায়ের রঙে পরিবর্তন আসে মাত্র। অর্থাৎ জাতিতে  বাংলাদেশী মগজে ব্রিটিশদের  অনুকরণকারীরা অর্থপাচারের সিলসিলা চলমান রাখে। টাকার গন্তব্য অধিকাংশই উত্তর আমেরিকা, ইউরোপী ও ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী সুইস ব্যাংকগুলোয় এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশীদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশি  মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ মাত্র এক বছর আগেও অর্থাৎ ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র অনুযায়ী কার্যক্রম নিষিদ্ধ  আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়। কিন্তু ২০০৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গত ৩৮ বছরের টাকা পাচারের  চিত্র আমাদের অজানাই থেকে গেল।

ইতোমধ্যে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য মামলাগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া খুবই  জটিল। যে অর্থ পাচার হয়, তার এক শতাংশ দেশে ফেরত আসে এবং সর্বসাকুল্যে  সময় লাগে  প্রায় ৭ থেকে ২০ বছর। আবার অর্থগুলো অন্য দেশে ঢুকেছে বিনিয়োগ হিসেবে। আর সেই বিনিয়োগটা গেছে তৃতীয় আরেকটি  দেশের মাধ্যমে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার আরেকটি বড় বাধা হলো দুই দেশের আইনগত ভিন্নতা। কারণ পাচার করা অর্থ আমাদের দৃষ্টিতে  অবৈধ হলেও বিনিয়োগ হিসেবে প্রবেশ করা অর্থ তাদের দৃষ্টিতে অবৈধ না। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ করলেও মালেশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত  ছাড়া কেউই ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। অথচ যেসব দেশে অর্থপাচার হয়েছে, ওই দেশগুলোয় অর্থ পাচাররোধে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ। একারণে নির্দ্বিধায় বলা যায়, চুক্তির ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ মানে টাকা পাচারে তাদের নিরব সমর্থন রয়েছে সেটাই প্রমাণ করে। 

এটা এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা, পাশ্চাত্য কোনদিনই নির্লোভ, নির্মহ ও নিঃস্বার্থ হতে পারেনি। প্রাচ্যবাদের জঠরে জন্ম হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। প্রকৃতপক্ষে প্রাচ্যবাদের মূলেই গ্রথিত আছে শোষণের হাতিয়ার। ফলে শাসকের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু শোষণের কোন পরিবর্তন হয়নি। যদিও প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটেছে, তথাপি সাবেক ঔপনিবেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবাদী বয়ান ও মানসিকতা এখনও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

পৃথিবীর মাঝে আমাদের মত দুর্ভাগা জাতি কমই আছে। অন্য দেশের মানুষ বিদেশ থেকে আয়-উপার্জন করে নিজ দেশের সম্পদ নিয়ে আসে। চোর-ডাকাতরা চুরি-ডাকাতি করেও অন্যদের সম্পদ নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসে। আর আমাদের দেশের চিত্রটাই উল্টো। এদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা চুরি হয়ে যায়, টাকা উদ্ধারের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেওয়া তো হয়নি বরং তৎকালীন গভর্নরকে রাখাল রাজা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এদেশের মেহনতী মানুষের হক ফাঁকি দিয়ে, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ ঔপনিবেশিক দাসরা এদেশ থেকে পাচার করে তাদের প্রভুর দেশে নিয়ে যায়। বস্তুত ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব থেকে এদেশের মানুষ এখনো পরিত্রাণ পায়নি। ঔপনিবেশিক আমলে প্রজাদের ওপর অত্যাচার করে এদেশীয় চাকুরিজীবী ও জমিদাররা ইংল্যান্ডে টাকা পাচারে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সাহায্য করত। সেই নিম্ন মানসিকতা এদেশের অর্থ বৃত্তে টইটম্বুর ও উচ্চশিক্ষিতরা জিনগতভাবে বহন করে আসছে। হয়তোবা এ কারণে, ঔপনিবেশিক আইন-কানুন এখনো পর্যন্ত সংশোধন করে নতুন আইন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সুতরাং আইনি জটিলতা, দুর্বলতা ও ফাঁক-ফোকরের মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করে যে কোন মূল্যে প্রচলিত আইনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এদেশ কস্মিনকালেও অর্থনৈতিকভাবে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected]

সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমাবেন কীভাবে: অভিভাবকদের জন্য নির্দেশিকা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমাবেন কীভাবে: অভিভাবকদের জন্য নির্দেশিকা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

মোবাইল ফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ। এটি শিশুদের শেখা, যোগাযোগ এবং বিনোদনে সহায়তা করে। কিন্তু যখন স্ক্রিনে কাটানো সময় ঘুম, পড়াশোনা, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা দখল করে নিতে শুরু করে, তখন সেটি একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। লক্ষ্য হওয়া উচিত মোবাইল ফোন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা নয়; বরং শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের গবেষণায় ভারসাম্যপূর্ণ স্ক্রিন ব্যবহার, শারীরিক কর্মকাণ্ড, পর্যাপ্ত ঘুম এবং অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে এমন কিছু বাস্তবসম্মত কৌশল তুলে ধরা হলো, যা অভিভাবকরা সহজেই প্রয়োগ করতে পারেন–

আসক্তির কারণ বোঝার চেষ্টা করুন
শিশুরা প্রায়ই একঘেয়েমি, একাকিত্ব, মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো আকর্ষণীয় কাজ না থাকার কারণে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তাই শুরুতেই ফোন কেড়ে নেওয়ার পরিবর্তে বোঝার চেষ্টা করুন, ডিভাইসটি তার কোন প্রয়োজন পূরণ করছে।

নিজেই ভালো উদাহরণ হোন
শিশুরা বড়দের অনুকরণ করে। যদি অভিভাবকরা খাওয়ার সময় বা কথোপকথনের মাঝেও বারবার নিজের ফোন দেখেন, তাহলে শিশুরাও সেটিই শিখবে। তাই পুরো পরিবারের জন্য কিছু ‘ফোনমুক্ত’ সময় নির্ধারণ করুন।

ঘরের নিয়ম বানান
পরিবারের সবাই মিলে কিছু সহজ নিয়ম ঠিক করুন। যেমন–খাবার টেবিলে ফোন নয়। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার নয়। বিনোদনের আগে পড়াশোনা। রাতে মোবাইল ফোন শোবার ঘরের বাইরে রাখা। কঠোর শাস্তির চেয়ে নিয়মের ধারাবাহিকতা অনেক বেশি কার্যকর।

ফোনের বিকল্প ব্যবস্থা করুন
শুধু ফোন সরিয়ে নিলে শিশুর মধ্যে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। তার পরিবর্তে আকর্ষণীয় বিকল্প দিন, যেমন–বাইরে খেলাধুলা। একসঙ্গে বই পড়া। ব্যায়াম। গান শেখা বা শোনা। ছবি আঁকা। রান্না বা বাগান করা। আকর্ষণীয় বিকল্প থাকলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিনের প্রতি নির্ভরশীলতা কমায়।

প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করুন
পড়াশোনা, খেলাধুলা, ব্যায়াম, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ঘুম–এসব নিয়ে একটি নিয়মিত দৈনন্দিন রুটিন গড়ে তুললে অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়।

বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করুন
বেশির ভাগ স্মার্টফোনেই এখন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং স্ক্রিন-টাইম পর্যবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। শুধু বকাঝকা বা নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর না করে এসব প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যবহার করে যুক্তিসংগত সীমা নির্ধারণ করুন।

কাছাকাছি হয়ে মেলামেশায় উৎসাহিত করুন
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করুন। বাস্তব জীবনের আলাপ, খেলাধুলা এবং একসঙ্গে কাটানো সময় ডিজিটাল বিনোদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়।

কোনো সাফল্যের পুরস্কার বা শিশুকে সামলানোর জন্য তার হাতে ফোন তুলে দেবেন না
শিশু কাঁদলেই বা ভালো আচরণ করলেই যদি তাকে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়, তাহলে সে শিখে যায় যে প্রতিটি আবেগের সমাধানই হলো স্ক্রিন। এর পরিবর্তে তাকে সান্ত্বনা দিন, কথা বলুন বা একসঙ্গে খেলুন।

সন্তানের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন 
অপর্যাপ্ত ঘুম এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, ছোট শিশুদের দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা সীমিত রাখতে হবে এবং তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

ভয় নয়, সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলুন
অনলাইন গেম, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। শুধু ‘ফোন ব্যবহার করো না’ বলার পরিবর্তে তাকে শেখান কীভাবে সে যা দেখছে, তা নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে পারে।

সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি
মোবাইল ফোন শত্রু নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো। যেসব অভিভাবক স্পষ্ট নিয়ম, ইতিবাচক বিকল্প, আন্তরিক পারিবারিক সম্পর্ক এবং নিজের ভালো উদাহরণের সমন্বয় ঘটান, তাদের সন্তানরা প্রযুক্তিকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখে এবং এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে না।

মোবাইল আসক্তি কমানোর অর্থ শিশুদের জীবন থেকে প্রযুক্তিকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিশ্চিত করা যে প্রযুক্তি যেন তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে একটি উপকারী হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যায়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

খেলা: আনন্দের উপলক্ষ, উন্মাদনার নয়!

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
খেলা: আনন্দের উপলক্ষ, উন্মাদনার নয়!
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

খেলা মানবজীবনের এক অনন্য বিনোদন। এটি শুধু শরীর ও মনকে সতেজ করে না, বরং মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য, দলগত চেতনা এবং প্রতিযোগিতার ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। খেলাধুলার মূল শিক্ষা হলো—জয় ও পরাজয় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যে দল আজ জয়ী হবে, অন্য দিন তারাই পরাজিত হতে পারে। তাই খেলাকে খেলার মতো করেই গ্রহণ করা উচিত।

বাংলাদেশে ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ অত্যন্ত প্রবল। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসির সমর্থক সংখ্যা দেশে অনেক বেশি। তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও মেসিকে আদর্শ হিসেবে দেখে। এই ভালোবাসা স্বাভাবিক এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন এই ভালোবাসা অন্ধ সমর্থনে পরিণত হয়, তখন তা সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, মারামারি এবং সহিংসতার খবর সামনে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ঘটনায় অন্তত ১২ জন সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। যদি খেলার ফলাফলকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন ঝরে যায়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক ব্যাধির লক্ষণ। একটি বিদেশি দলের জয়-পরাজয় কখনোই একজন মানুষের জীবন বা পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে না।

এই ঘটনাগুলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের মানসিক অবস্থার প্রতিও প্রশ্ন তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত উত্তেজনা, একে অপরকে কটাক্ষ করা, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, গুজব ছড়ানো এবং দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা—এসব আচরণ সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু-কিশোররাও বড়দের এই আচরণ অনুকরণ করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

খেলাধুলার উদ্দেশ্য কখনোই বিভেদ সৃষ্টি করা নয়; বরং মানুষকে একত্রিত করা। বিশ্বকাপ বা আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা পৃথিবীর নানা দেশের মানুষকে একই আনন্দে যুক্ত করে। সেখানে প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, পরাজয়কে মেনে নেওয়া এবং বিজয়ীকে অভিনন্দন জানানোই প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ আচরণ। এই মূল্যবোধ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিশু ও তরুণদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তানদের শেখাতে হবে যে একজন খেলোয়াড় বা একটি দলকে ভালোবাসা মানে অন্য দলকে ঘৃণা করা নয়। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে খেলাধুলার ইতিবাচক মূল্যবোধ তুলে ধরতে পারেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে উসকানিমূলক বা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা না ছড়ায়।

খেলা আনন্দের, সম্প্রীতির এবং মানবিকতার প্রতীক। একটি ফুটবল ম্যাচের ফলাফল কখনোই মানুষের জীবন, বন্ধুত্ব বা সামাজিক শান্তির চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না। জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই প্রকৃত ক্রীড়া সংস্কৃতির ভিত্তি। আমরা যদি খেলাকে শুধুই খেলা হিসেবে গ্রহণ করতে শিখি, তবে আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বহন করতে হবে না, এবং খেলাধুলা সত্যিকার অর্থেই আনন্দের উৎস হয়ে উঠবে।

লেখক: অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য ভাঙার দায় ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততার খতিয়ান–আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি?

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য ভাঙার দায় ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততার খতিয়ান–আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছি?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বারে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি যখন বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন দৃশ্যটি কোনো সাধারণ উচ্ছেদ অভিযানের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছিল আমাদের সামগ্রিক ইতিহাসের ওপর এক নির্মম কুঠারাঘাত। যে তরুণ মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের জীবন বিলিয়ে এই দেশের মানচিত্র কিনেছিলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে তার স্মারক ধূলিসাৎ করার পেছনে যে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আমরা দেখলাম, তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় ধাক্কাটি লেগেছিল এর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায়। একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে, শত শত মানুষের চোখের সামনে রাষ্ট্রীয় একটি স্মারক এভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেল, আর আমাদের প্রশাসনের স্থানীয় পাহারাদাররা সম্মিলিত কণ্ঠে দাবি করলেন–তারা কিছুই জানেন না। এই নির্লিপ্ততা কেবল দাপ্তরিক ব্যর্থতা নয়; এটি আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংস্কৃতির গভীর পচনকে নির্দেশ করে।

সেই সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর পাতায় প্রশাসনের কর্তাদের যে বক্তব্যগুলো ছাপা হয়েছিল, তা কোনো দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার উদাহরণ হতে পারে না; এটি ছিল স্রেফ এক সম্মিলিত দায় এড়ানোর মহোৎসব। দৈনিক সমকাল, দ্য ডেইলি স্টার কিংবা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালে এক অদ্ভুত তামাশা নজরে আসে। ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রকৌশল শাখা অবলীলায় দায় চাপিয়েছিল জেলা প্রশাসনের ওপর, সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন কারা এটি অপসারণ করছে তা তাদের জানা নেই, এমনকি পৌরসভার শীর্ষ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছিল। যে আমলারা সামান্য ফুটপাত সরাতেও আইনের শত পৃষ্ঠা ওল্টান, তারা একটা আস্ত চত্বর ধূলিসাৎ হওয়া পর্যন্ত টেরই পেলেন না–এই গল্প আধুনিক শাসনব্যবস্থায় এক বিরাট ফাঁকফোকর। আমলাতন্ত্রের এই ‘জানি না’র সংস্কৃতি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত ক্ষমতা কাঠামোর জবাবদিহিহীনতার এক স্থায়ী ব্যাধি। যেকোনো প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলতে চান, এই ঘটনা তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এই সমন্বয়হীনতা ও ঐতিহাসিক উদাসীনতার চূড়ান্ত রূপটি উন্মোচিত হয়েছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসকের একটি জবানবন্দিতে। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দায় এড়ানোর সুরে অন্য দপ্তরের দিকে আঙুল তুললেও সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছিল তার একটি আকস্মিক স্বীকারোক্তিতে। দেশের একটি জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, এটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ছিল, তা তার জানাই ছিল না! একটি জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মনস্তত্ত্বে যখন দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা এমন প্রান্তিক আর অচেনা অবস্থানে থাকেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের প্রটোকল কালচার সাধারণ মানুষের আবেগ ও জাতীয় গৌরব থেকে কতটা যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। যখন নীতিনির্ধারকদের কাছে বীরের স্মারক আর সস্তা ইটের ইমারত একাকার হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে জাতির নৈতিক মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরেছে।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য সড়ক নিরাপত্তার একটি জুতসই দোহাই দিয়ে বলা হয়েছিল যে, কুষ্টিয়া-খুলনা ও ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের সংযোগস্থলের ওই অসম্পূর্ণ বেদিটি দূরপাল্লার বাসের জন্য বিপজ্জনক ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি করছিল এবং জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ীই জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে এই অপসারণ প্রক্রিয়া চলেছে। জননিরাপত্তার এই যুক্তি যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই, তাহলেও প্রশ্ন থাকে–একটি জাতীয় আবেগের স্মারক স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি কেন চোরের মতো লোকচক্ষুর অন্তরালে, গভীর গোপনীয়তায় করতে হলো? যদি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিতই হয়ে থাকে, তবে ভাঙার আগে কেন নতুন নিরাপদ স্থানে তার বিকল্প ব্যবস্থা বা ভিত্তিপ্রস্তর দৃশ্যমান করা হলো না? কেন আগে থেকেই জনগণকে কিংবা গণমাধ্যমকে আস্থায় নিয়ে একটি সুষ্ঠু ও মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হলো না? প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের এই লুকোছাপা আর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই প্রমাণ করে, আমলাতন্ত্রের কাছে জাতীয় প্রতীকগুলো স্রেফ ফাইলের কিছু জড় বস্তু, যার কোনো আত্মিক মূল্য তাদের কাছে নেই।

‘যে জাতি তার বীরদের সম্মান করতে জানে না, সে জাতিতে কখনো বীরের জন্ম হয় না’–এই আপ্তবাক্যটি আমরা কেবল বক্তৃতার মঞ্চেই আওড়ে যাই। বাস্তবে ক্ষমতার পালাবদল, আদর্শিক দেউলিয়াত্ব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলি হয় আমাদের জাতীয় গৌরব। আমরা তো এমন এক বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে নীতিনির্ধারকদের ঠাণ্ডা মাথার ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যাবে কোটি মানুষের জাতীয় সেন্টিমেন্ট। পরবর্তী সময়ে পুলিশ লাইন্সের সামনে নতুন ভাস্কর্য গড়ার যে আশ্বাসই দেওয়া হোক না কেন, তা আমাদের এই অপূরণীয় মানসিক ক্ষত পুরোপুরি উপশম করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় যেকোনো স্মারক স্থানান্তর বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেন এমন অপেশাদার ও অসংলগ্ন লুকোচুরির আশ্রয় নেওয়া হলো, তার তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং দেশজুড়ে সব বীরশ্রেষ্ঠ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারকগুলোর স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। লজ্জার এই ক্ষত মুছে ফেলার দায়িত্ব আমাদের সবার। আসুন, বীরের অপমান রুখে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে–আমরা এই অবমাননা ও বিস্মৃতির বাংলাদেশ কখনো চাইনি, আর চাইবও না।

লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়