ঢাকা ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সলিমপুরে পাহাড়-টিলা কাটছে কারা, জানে না প্রশাসন! কুমিল্লায় পরীক্ষাকেন্দ্রে জলাবদ্ধতা, ৭ শিক্ষককে স্ট্যান্ড রিলিজ ব্যবসা বড় করার ৭টি কার্যকর উপায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লেও দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক তৈরির কৌশল নিয়ে আইএসইউতে বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ঢাকার কাছেই সবুজ অরণ্যের ভ্রমণস্বর্গ আর্জেন্টিনার পক্ষে মেসির স্ত্রীর কড়া জবাব চাঁদবুড়োর হারানো আলো রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যুতে বিকেলে জরুরি সংবাদ সম্মেলন রাজকীয় আয়োজনে কমনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধন নাগেলসম্যানের বিদায়ের পর জার্মানির কোচ হলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ বিয়ের ৩ দিন পর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল যুবকের সাউথইস্ট ব্যাংকের এজিএম-ইজিএম: মূলধন বৃদ্ধি ও লভ্যাংশ অনুমোদন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা যেভাবে নাজিল হয়েছে কোরআন ২০২৭ সাল পর্যন্ত এসি মিলানেই থাকছেন লুকা মদ্রিচ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন ওতামেন্দি আন্তর্জাতিক তদন্তের আওতায় স্পেনের দুই বিশ্বকাপ ম্যাচ এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে সরাসরি নকআউটে বাংলাদেশ পাঁচ শ টাকার গল্প ওয়াশিংটন উপকূলে কেনমোর এয়ারের সি-প্লেনে আগুন পশ্চিম তীরের নাবলুসের কাছে গুলিবর্ষণে ১ ইসরায়েলি নিহত বাদল ধারায় সিক্ত হবো পথ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান স্মরণে ছাত্রদলের কর্মসূচি ঘোষণা পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন: স্পিকার না বলার পাঠ রাবির ইন্টারনেট উন্নয়নে ১৩ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন উন্নয়নের চীন দর্শন: মর্যাদাপূর্ণ জীবনই মোক্ষ

মাসাই মারার 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-কে বিখ্যাত করে তোলা ৭টি প্রাণী

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১৮ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মাসাই মারার 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-কে বিখ্যাত করে তোলা ৭টি প্রাণী
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে বিশ্ব প্রাকৃতিক বিস্ময়ের অন্যতম এক দৃশ্য ফুটে ওঠে। 'গ্রেট মাইগ্রেশন' বা মহাপ্রস্থান নামে পরিচিত এই ঘটনায় ঋতুভিত্তিক বৃষ্টির পর নতুন সবুজ ঘাসের খোঁজে ১৫ লাখেরও বেশি ওয়াইল্ডবিস্ট এবং তাদের সঙ্গে হাজার হাজার জেব্রা ও গেজেল তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক থেকে কেনিয়ার মাসাই মারায় পাড়ি জমায়।

মারা নদীর নাটকীয় পারাপার যেখানে বিশাল পালের দল কুমিরে ভরা নদী পার হওয়ার ঝুঁকি নেয় এবং নদীর তীরে শিকারী প্রাণীরা অপেক্ষায় থাকে এই মহাপ্রস্থানকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিণত করেছে। স্থানান্তরিত হওয়া এই প্রাণীর পাল মূল আকর্ষণ হলেও, মাসাই মারা এ সময় আফ্রিকার আরও অনেক বিখ্যাত প্রাণীর মিলনমেলায় পরিণত হয়।

গ্রেট মাইগ্রেশনের সময় মাসাই মারায় দেখা মেলে উল্লেখযোগ্য ৭ প্রাণীর।

ওয়াইল্ডবিস্ট 

মহাপ্রস্থানের আসল তারকা হলো এই ওয়াইল্ডবিস্ট। তারা দিগন্তজুড়ে বিশাল পালে একসঙ্গে চলাফেরা করে। একসঙ্গে নদী পার হওয়া এবং নতুন ঘাসের সন্ধানে নিরন্তর পথচলাই এই বার্ষিক ঘটনাটিকে সংজ্ঞায়িত করে।

প্লেইনস জেব্রা

ওয়াইল্ডবিস্টের সঙ্গেই দল বেঁধে ভ্রমণ করে হাজার হাজার প্লেইনস জেব্রা। তারা সাধারণত তুলনামূলক লম্বা ঘাসগুলো আগে খায়, যার ফলে ওয়াইল্ডবিস্টরা নিচের ছোট কচি ঘাসগুলো খাওয়ার সুযোগ পায়। এদের গায়ের চোখধাঁধানো কালো-সাদা দাগ ছবি তোলার জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

নীল নদের কুমির

মারা নদী হলো আফ্রিকার বিশালাকার নীল নদের কুমিরদের বাসস্থান। নদী পার হওয়ার সময় এই চতুর শিকারীরা পানির নিচে ওৎ পেতে থাকে, যা এই মহাপ্রস্থানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও সংবেদনশীল মুহূর্তগুলো তৈরি করে।

সিংহ

প্রচুর শিকারের উপস্থিতির কারণে এখানে সিংহের বড় বড় দল ভিড় জমায়। মাসাই মারা আফ্রিকায় সিংহ শিকার করা, বাবলা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া কিংবা বাচ্চাদের দেখাশোনা করার দৃশ্য দেখার অন্যতম সেরা জায়গা।

চিতাবাঘ 

মাসাই মারার উন্মুক্ত তৃণভূমি চিতাবাঘের শিকারের জন্য আদর্শ। মহাপ্রস্থানের সময় এই দ্রুতগতির প্রাণীগুলো কচি হরিণ ও ছোট শিকারের সুযোগ নেয়, ফলে এ সময় তাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

লেপার্ড

সিংহের তুলনায় এরা কিছুটা আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। তবে প্রায়শই গাছের ডালে বিশ্রাম নেওয়া বা নদীর পাশের বনে শিকারের পিছু নিতে এদের দেখা যায়। এদের চমৎকার ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা ও একাকী স্বভাবের কারণে এদের দেখা পাওয়া সত্যিই এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

আফ্রিকান হাতি 

আফ্রিকান হাতির বিশাল দল সারা বছরই মাসাই মারায় ঘুরে বেড়ায়। মাইগ্রেট করা বা স্থানান্তরিত হতে থাকা হাজার হাজার প্রাণীর পটভূমিতে এই শান্ত দানবদের সোনালী স্যাভানা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা এক অবিস্মরণীয় সাফারি অভিজ্ঞতা। সূত্র: দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

তামান্না রুপা/

ব্রোমেলিয়াডের রূপের বাহার

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ এএম
ব্রোমেলিয়াডের রূপের বাহার
ছবি: লেখক

তখন আষাঢ়ের শেষ। দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। গাছপালা একবার ভিজছে, আবার বাতাসে শুকাচ্ছে। রোদ নেই। সারাটা আকাশে জোলো মেঘগুলো হাওয়ায় ভেসে চলেছে কোন দেশে জানি না। আমরা সেসব মেঘের তলে ঝোপঝাড়ের ভেতর খুঁজে বেড়াচ্ছি অচেনা বুনোফুল, পোকামাকড়, পাখি। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছি ওপরের বৃক্ষশাখায়। তার ডাক শুনছি কিন্তু দেখা পাচ্ছি না। পাখিগুলোও যেন আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। দূরে মেহগনি গাছে বসে থাকা একটা পাখি চোখে পড়ল ইনাম ভাইয়ের। ছোটখাটো একটা পরীক্ষা হয়ে গেল দলের সদস্যদের মধ্যে, কে ওকে চিনতে পারে? চেনা গেল, সে ছাতারে পাখি। 

হাঁটতে হাঁটতে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের মধ্যে আমরা কয়েকজন প্রকৃতি খেলায় মেতে উঠেছি। একবার এটা দেখি তো পরের বার অন্যটা। দেখতে দেখতে একজন বললেন, কৃষ্ণবট গাছটা যেন দেখাই। ওটা দেখতেই গেলাম নার্সারির পাশে থাকা সে গাছটির কাছে। সে গাছ দেখতে দেখতেই তার তলায় নিদারুণ অবহেলায় থাকা একটা গাছ চোখে পড়ল। ঝোপঝাড় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে। কিন্তু তাই বলে সে স্বরূপে উদ্ভাসিত হতে মোটেই কার্পণ্য করেনি। একটা টর্চলাইট জ্বেলে খাড়া করে রাখলে যেমন তার আলো বিচ্ছুরিত হয়, সে গাছের পুষ্পমঞ্জরিটা যেন তেমনই দেখতে, ফুলগুলো যেন আলো ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি দুটো গাছ। দুটো পুষ্পমঞ্জরিতেই ফুল ফুটে জায়গাটা উজ্জ্বল করে ফেলেছে। ফুলটাকে দেখে মনে পড়ল মান্না দের কণ্ঠে গাওয়া সেই বিখ্যাত গানের দুটি কলি- ‘চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি/ কোন জোছনায় বেশি আলো এই দোটানায় পড়েছি।’ কৃষ্ণবট দেখতে গিয়ে ব্রোমেলিয়াডকে দেখে ফেলেছি। আহা কী রূপ মরি মরি!

ব্রোমেলিয়াড ব্রোমেলিয়াসি গোত্রের গাছ। আনারসও এ গোত্রের গাছ। ইংরেজি নাম ফ্লেমিং টর্চ হলেও গাছটি এ দেশের উদ্যানবিদদের কাছে ব্রোমেলিয়াড নামে পরিচিতি পেয়েছে। ব্রোমেলিয়াডের প্রজাতিগত নাম Billbergia pyramidalis। সুইডিশ উকিল, উদ্ভিদবিদ ও প্রাণিবিদ জোহান গুস্তাফ বিলবার্জের (১৭৭২-১৮৪৪) নামানুসারে এ গাছের গণনাম রাখা হয়েছে বিলবার্জিয়া। ফুলের মঞ্জরির গড়ন অনেকটা পিরামিডের চূড়ার মতো। তাই প্রজাতিগত নামের শেষাংশ হয়েছে পিরামিডালিস। 

সেখানে দুটো গাছ রয়েছে। এ গাছ খুব বেশি বড় ও লম্বা হয় না, হাঁটুর নিচে থাকে। গাছ ৩০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ঝোপ সৃষ্টিকারী বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ বীরুৎ প্রকৃতির গাছ। দেখতে অনেকটা আনারসগাছের মতো, তবে পাতাগুলো চওড়া সবুজ ফিতার মতো, পুরু ও চামড়াসদৃশ, মসৃণ, আনারসগাছের পাতার কিনারার মতো এ গাছের পাতার কিনারা কণ্টকযুক্ত বা খাঁজকাটা না, মসৃণ। মাটির নিচে একটা কলসের মতো গড়নের অঙ্গ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে আবর্তাকারে পাতাগুলো জন্মে। পাতাগুলোর কেন্দ্রস্থল থেকে একটি লম্বা ডাটির মাথায় পুষ্পমঞ্জরিতে অনেক ফুল ফোটে। সাধারণত গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্ত ফুল ফোটে। ফুল ফোটা শুরু হলে পর্যায়ক্রমে সে মঞ্জরিতে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস ধরে ফুল ফুটতে থাকে। ফুলগুলো ঘনভাবে থাকে, ব্রাশ আকৃতির ফুলগুলোর রং টকটকে লাল। পুষ্পমঞ্জরি বেগুনি বা হলদে আভাযুক্ত লাল নলাকার ফুল দিয়ে সজ্জিত থাকে। তবে দুঃখের কথা হলো এ গাছের প্রতিটি রোজেট জীবনে মাত্র একবারই ফুল দেয়। তাই ফুলশেষে এ গাছের গোড়ায় জন্মানো অপত্য চারাগুলো আলাদা করে নতুনভাবে লাগাতে হয়। সেসব গাছে পরে আবার ফুল ফোটে। গাছ দ্রুত বাড়ে, ২ বছরের মধ্যেই পূর্ণরূপে বিকশিত হয় ও ফুল দেয়।

এ গাছ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে বা বেঁচে থাকতে পারে। মাইনাস এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও গাছ মরে না। খরা বা তুষারপাতেও মরে না। এরা পরাশ্রয়ীরূপে অন্য কোনো বৃক্ষের ডালের ওপরেও জন্মাতে পারে। বসন্ত বা শরৎকালে গোড়া চিরে ভাগ করে নতুন চারা তৈরি করা যায়। যেসব বনে বা জঙ্গলে প্রচুর পাতা পচা সার থাকে, ছায়া থাকে সেখানে এসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে বুনোগাছের মতো আনন্দে বাড়ে। ভারত মহাসাগরের বুকে মরিশাস দ্বীপে ব্রোমেলিয়াড বুনোগাছ।

টবেও লাগানো যায়। তবে টবের চেয়ে মাটিতে এদের বৃদ্ধি ও ফুল বেশি ভালো হয়। গাছের গোড়া বা মোথা তুলে লাগালে নতুন গাছের জন্ম হয়। গাছ লাগানোর পর কোনো যত্ন না নিলেও সেসব গাছ ফুল দেয়। এ কারণেই একে ইংরেজিতে ‘ফুলপ্রুফ প্ল্যান্ট’ বলে। ব্রোমেলিয়াড উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার গাছ। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জও এর আদি নিবাস। বাগানে ও ঘরে বাহারিগাছ হিসেবে লাগানো যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

ঘর চড়ুইয়ের ঘরবাড়ি

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম
ঘর চড়ুইয়ের ঘরবাড়ি
ছবি: সংগৃহীত

বছর দেড়েক আগের কথা। বিশেষ এক কাজে পরিবারের সদস্য ও দু-তিনজন সহকর্মী নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল আলোর মেলায় গিয়েছি। বিকেলের মধ্যে কাজ শেষ ঢাকায় ফিরছি। কিন্তু গাড়িতে গ্যাস প্রায় শেষ। তাই শহর থেকে বের হওয়ার পথে একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন দেখে ওখানে গাড়ি ঢোকালাম। কিন্তু ফিলিং স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড়। কাছেপিঠে আর কোনো স্টেশনও নেই। কাজেই গাড়ি থেকে নেমে এলাম। ক্যামেরা হাতে আশপাশটা দেখতে লাগলাম। গ্রামীণ পরিবেশ। চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। বেশ সুন্দর। এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে প্রায় আধা ঘণ্টা চলে গেল। 

সন্ধ্যা প্রায় নেমে এসেছে। কাজেই গাড়ির কাছে চলে এলাম। আর হঠাৎই কানে ভেসে এল কিচিরমিচির শব্দ। সন্ধ্যা যত বাড়তে থাকল, কিচিরমিচির ততই বাড়তে থাকল। শব্দের উৎস ধরে সামনে এগোতেই একটি ফুলেল ছোট্ট জারুলগাছে অনেকগুলো পাখিকে বসে থাকতে দেখলাম। একটু ভালোভাবে তাকাতেই ফিলিং স্টেশনের আশপাশের অন্তত ২০টি জারুল, একাশিয়া ও ঝাউগাছে হাজারখানেক পাখির দেখা পেলাম। স্টেশনের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাখিগুলো এভাবে এখানে আসে এবং রাত্রি যাপন করে ভোরে চলে যায়। তাদের মালিক পাখিগুলোকে যেন কেউ বিরক্ত না করে সে জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই ওরা বেশ আরামেই আছে এখানে। এভাবে দলগতভাবে বা উপনিবেশ তৈরি করে পাখিদের রাত্রি যাপন করতে দেখেছি চট্টগ্রাম ও সিলেট যাওয়ার পথে হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এবং রাজশাহী যাওয়ার পথে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলের ফুড ভিলেজের সামনে।

কিশোরগঞ্জ শহরসহ অন্যান্য স্থানে দলবেঁধে রাত্রিযাপনকারী এই পাখিগুলো আর কেউ নয় আমাদের চিরচেনা চড়ুই পাখি। এরা ঘর চড়ুই বা চড়াই নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম House Sparrow। গোত্র প্যাসারিডি (Passeridae) ও বৈজ্ঞানিক নাম Passer domesticus (প্যাসার ডমেস্টিকাস)। একমাত্র অ্যান্টার্কটিকা মহদেশ ছাড়া পৃথিবীর সবখানেই চড়ুই পাখি দেখা যায়।

চড়ুই ছোট আকারের পাখি। দৈর্ঘ্য ১৫ সেন্টিমিটার ও ওজন মাত্র ২৪ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে ভিন্নতা রয়েছে। পুরুষটি দেখতে বেশ সুন্দর। এর মাথার চাঁদি ধূসর, ঘাড় ও চক্ষুডোরা তামাটে। পিঠ জলপাই-বাদামি। বুক, পেট ও গাল সাদা। গলা কালো। মোটা ঠোঁট দুটো কালচে। অন্যদিকে প্রথম দর্শনে স্ত্রী চড়ুই হালকা হলদে-বাদামি। বুক ও পেট বাদামি-ধূসর। ঠোঁট গোলাপি। উভয়েরই চোখ বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা গোলাপি-বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো, তবে অপ্রাপ্ত পুরুষ ছানাগুলোর থুতনি কালো ও দেহ উজ্জ্বল বাদামি।
পুরো দেশের শহর, গ্রাম, বন্দর তথা লোকালয়ে এদের বাস করতে দেখা যায়। দরদালান, কৃষিজমি, ফলের বাগান, ক্ষুদ্র ঝোঁপ প্রভৃতিতে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে দেখা যায়। মাটির ওপর হেঁটে হেঁটে খাদ্যশস্য, ঘাসবিচি, ফুলের কুঁড়ি, ফল, পোকামাকড়, ভাত, খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ ইত্যাদি খায়। দলবেঁধে ধূলিস্নান করতে বেশ পছন্দ করে। ‘চির-চির-চির.....’ বা ‘চুর-চুর.....’ শব্দে ডাকে। 

সচরাচর মার্চ থেকে জুন মাস প্রজননকাল। তবে প্রজননকালে এরা কখনোই দলবেঁধে রাত্রি যাপন করে না। তখন জোড়ায় জোড়ায় থাকে। খড়, শুকনো ঘাস-লতা, পাটের আঁশ ইত্যাদি দিয়ে মানুষের ঘরবাড়ির ফোকর, ভেন্টিলেটর বা ঘরের চালের নিচে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৩-৭টি। ডিমের রং ফিকে সবুজাভ সাদা, তাতে বাদামি ছিট থাকে। ডিম ফোটে ১৪ দিনে। ছানারা ২০-২১ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল সচরাচর ৩-৫ বছর। কিন্তু অনেক সময় ১২-১৩ বছরও বাঁচতে পারে। এমনকি ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচার রেকর্ড রয়েছে।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ময়ূর আদা: পাতার ক্যানভাসে প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ এএম
ময়ূর আদা: পাতার ক্যানভাসে প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ময়ূর আদাগাছ। ছবি: লেখক

উদ্ভিদজগতের এক অপূর্ব বিস্ময় হলো ময়ূর আদা। এটি ইংরেজিতে Peacock Ginger নামে পরিচিত। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Kaempferia pulchra, এটি Zingiberaceae পরিবারের একটি কন্দজাত বহুবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি তার নজরকাড়া পাতার সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বাগানবিলাসীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ইংরেজি বলয়ে এটি ‘রেজারেকশন লিলি’ (Resurrection Lily) নামেও পরিচিত, কারণ শীতকালে এর ওপরের অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলেও বসন্তে মাটির নিচের কন্দ থেকে এটি অলৌকিকভাবে আবার জেগে ওঠে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আদি উদ্ভিদ হওয়ায় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় একে যথাক্রমে ‘বুঙ্গা সেকুর বাটিক’ ও ‘কেনকুর বাটেক’ নামে ডাকা হয়। 

পিকক জিঞ্জার মূলত একটি স্বল্প উচ্চতার, মাটির কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা (Ground cover) উদ্ভিদ। এর মূল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর পাতায়। এর পাতাগুলো ডিম্বাকৃতির এবং মাটির সমান্তরালে ছড়ানো থাকে। পাতার ওপরের অংশে গাঢ় সবুজ, ব্রোঞ্জ এবং রুপালি রঙের এমন এক জ্যামিতিক নকশা থাকে, যা দেখতে হুবহু ময়ূরের পেখমের মতো। পাতার নিচের দিকটি আবার হালকা বেগুনি বা লালচে আভার হয়ে থাকে। এই অনন্য রঙের বিন্যাসের কারণেই এর নাম হয়েছে ‘পিকক জিঞ্জার’।

পাতার বাহারি রূপের আড়ালে এর ফুলগুলোও কম সুন্দর নয়। বসন্ত থেকে শরৎকাল পর্যন্ত এই গাছে ছোট, চার পাপড়িবিশিষ্ট হালকা বেগুনি বা ল্যাভেন্ডার রঙের ফুল ফোটে। ফুলের কেন্দ্রস্থলে একটি উজ্জ্বল সাদা বা হলুদ বিন্দু থাকে। ফুলগুলো সাধারণত খুব ভোরে ফোটে এবং মাত্র এক দিন স্থায়ী হয়, তবে প্রতিদিন নতুন নতুন ফুল ফুটে গাছের সৌন্দর্য ধরে রাখে।

উদ্ভিদটি উচ্চতায় মাত্র ৬ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে চওড়ায় এটি প্রায় ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। মাটির নিচে এর রাইজোম বা কন্দসদৃশ ভূগর্ভস্থ কাণ্ড থাকে, যা থেকে নতুন নতুন পাতার জন্ম হয়। কেবল শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবেই নয়, পিকক জিঞ্জারের বহুমাত্রিক গুরুত্বও রয়েছে। 

ল্যান্ডস্কেপিংয়ে ও ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে গুরুত্ব রয়েছে এর। ছায়াযুক্ত স্থানে যেখানে অন্যান্য ফুলের গাছ ঠিকমতো বাড়তে পারে না, সেখানে পিকক জিঞ্জার চমৎকার গ্রাউন্ডকভার হিসেবে কাজ করে। বাগানের বড় গাছের নিচে, বর্ডার তৈরিতে কিংবা পাথুরে বাগানে (Rock Garden) এটি দারুণ মানিয়ে যায়। ইদানীং ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ফ্ল্যাট বাড়ির বারান্দা বা ঘরের ভেতরের ছায়াময় কোণ সাজাতে এর ব্যবহার প্রচুর বাড়ছে।

এই উদ্ভিদের ঐতিহ্যগত ঔষধি গুরুত্ব রয়েছে। আদা পরিবারের সদস্য হওয়ায় এর কন্দের বেশ কিছু ঔষধিগুণ রয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের লোকজ চিকিৎসায় এর রাইজোম পেটের অসুখ, বাতের ব্যথা এবং শরীরের প্রদাহ বা ফোলাভাব কমাতে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ও রন্ধনশিল্পে রয়েছে এর ব্যবহার। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এর সুগন্ধি কন্দ এবং কচি পাতা স্থানীয় কিছু ঐতিহ্যবাহী রান্নায় মসলা ও সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানে এর পাতা ডেকোরেশনের কাজে লাগে।

পিকক জিঞ্জার বা ময়ূর আদা উদ্ভিদের বেশি পরিচর্যার দরকার হয় না। এটি সরাসরি তীব্র রোদ সহ্য করতে পারে না। ফিল্টার করা আলো বা আংশিক ছায়াযুক্ত স্থান এর বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। জৈব উপাদানসমৃদ্ধ, জল নিষ্কাশনের সুব্যবস্থাযুক্ত আর্দ্র মাটি এই গাছের পছন্দ। টবে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে এর কন্দ পচে যেতে পারে। শীতকালে যখন গাছটি সুপ্তাবস্থায় চলে যায়, তখন পানি দেওয়া একদম কমিয়ে দিতে হয়। এর বংশবিস্তার করা খুবই সহজ। পরিপক্ব গাছের কন্দ বা রাইজোম খণ্ডিত করে আলাদা আলাদা টবে রোপণ করলেই নতুন গাছের জন্ম হয়।

পিকক জিঞ্জার যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত বাটিকশিল্প। কম আলো আর সামান্য যত্নেই এই গাছটি যেকোনো বাগান বা ঘরের কোণকে করে তুলতে পারে নান্দনিক ও প্রাণবন্ত।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ

হলুদ ফুটকি গান্ধি পোকা

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ এএম
হলুদ ফুটকি গান্ধি পোকা
সম্প্রতি ঢাকায় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা হলুদ ফুটকি গান্ধি পোকা। ছবি: লেখক

এ বছরের আষাঢ়ের ২৭ তারিখ। দিনটি ছিল শনিবার। সকাল বেলায় মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে জনাত্রিশেক প্রকৃতিবন্ধু মিলে গিয়েছিলাম গাছ-পাখি দেখতে। দেখা শেষ করে চুন্দুল নামের একটি বিশেষ গাছ দেখার জন্য আমরা উদ্যানের জালিয়াডাঙ্গা লেকের কাছে এক বিশেষ অংশে প্রবেশ করলাম। জায়গাটা একেবারে প্রাকৃতিক জঙ্গলের মতো। একজন চলতে পারে সে রকম একটা মাটির রাস্তা চলে গেছে গাছপালার মধ্য দিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে। রাস্তার লালচে মাটি বৃষ্টিতে ভিজে দুধ চায়ের মতো হয়ে আছে। সাবধানে হাঁটছি সবাই সারি ধরে।

সঙ্গে রয়েছেন পাখিবিদ ইনাম আল হক ভাই, বৃক্ষবন্ধু আজাহার ভাই, জাতীয় উদ্যানের ফিল্ড গাইড জিয়া ভাই, প্রকৃতিবন্ধু আরিফ ভাই, রবিন, আমিনা, রাতুল, মোহাম্মদ আলীসহ আরও অনেকে। একে একে সবাই হেঁটে চলে গেলেও আমি যেতে পারলাম না। একটা পোকা দেখে পথের পাশেই দাঁড়িয়ে পড়লাম।

অনেক বুনো গাছ, পায়ের কাছে একটা ছোট্ট বিজুফুল বা বনরঙ্গন গাছে লাল টকটকে পাকা ফল শোভা পাচ্ছে। হঠাৎ একটা গাছের ভেজা ডগায় চোখ পড়ল। হলুদ ফুটকি গান্ধি, দুটো পোকা, একটা ডগার কাণ্ডে, অন্যটা পাতার ওপর ধীরে ধীরে হাঁটাহাঁটি করছে। পোকাটা বেশ বড়। আকৃতিতে অনেকটা ঢাল বা শিল্ডের মতো যেগুলো একসময় ফুটবল খেলোয়াড়দের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হতো। তরবারি যোদ্ধারা সুরক্ষার জন্য যে ঢাল ব্যবহার করতেন, পোকাটা দেখতেও অনেকটা তেমন। দেহ পঞ্চভুজাকৃতি, সে জন্য এদের ফেলা হয়েছে হেমিপ্টেরা বর্গের পেন্টাটোমিডি গোত্রে।

দুটি গ্রিক শব্দ থেকে পেন্টাটোমিডি গোত্রের নামের উৎপত্তি। ‘পেন্টি’ অর্থ পাঁচ ও ‘টোমোস’ অর্থ অংশ বা খণ্ড। এসব পোকাদের শুঁড় পাঁচটি খণ্ডের। এ গোত্রের পোকাদের সহজে চেনা যায় কাঁধের ওপর থাকা ত্রিভুজাকার একটি অঙ্গ দেখে যাকে বলে স্কুটেলাম। পেন্টাটোমিডি গোত্রের পোকাদের সাধারণ নাম শিল্ড বাগ বা ঢাল গান্ধি এবং স্টিঙ্ক বাগ বা গন্ধি গান্ধি। বিশ্বে এ গোত্রের কত যে পোকা আছে! ইন্টারনেটে খুঁজতেই সে তথ্য বেরিয়ে এল, সারা পৃথিবীতে পেন্টাটোমিডি গোত্রে আছে ৯০০টি গণের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ প্রজাতির শিল্ড বাগ ও স্টিঙ্ক বাগ।

এগুলোর বেশির ভাগই ক্ষতিকর। গাছপালা ও ফসলের শত্রু। গাছের ডগা, ফল, বীজ ইত্যাদি থেকে রস চুষে খেয়ে ক্ষতি করে। বেশ কিছু স্টিঙ্ক বাগ ও শিল্ড বাগকে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি বালাই হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা এরা বিপুলসংখ্যায় বংশবৃদ্ধি করে, ফসল খেয়ে ক্ষতি করে ও অনেক কীটনাশকের বিরুদ্ধে ওরা প্রতিরোধী। এমনকি এদের দুর্গন্ধের কারণে পাখিরাও এ পোকা সহজে খেতে চায় না, অন্য কোনো শিকারি পোকারাও এদের কাছে ঘেঁষে না। হলুদ ফুটকি গন্ধি গান্ধি ধান, ভুট্টা, জোয়ার, সয়াবিন, তুলা, শিম ইত্যাদি ফসলের ক্ষতি করে। এমনকি অনেক আগাছা ও বাহারি গাছেও এদের দেখা যায়। বিদেশে আপেল, চেরি, কিউফ্রুট ইত্যাদি ফলেরও এরা ক্ষতি করে। পোকাটি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সে এটি একটি সাধারণ পোকা। ব্রাজিল ও আলবেনিয়ায়ও আছে এ পোকা।

পোকাটি শুধু ফসলের জন্যই ক্ষতিকর না, মানুষের জন্যও বিপজ্জনক। স্টিঙ্ক বাগগুলো কোনো হুমকি, বিরক্তি বা চাপের মুখে আত্মরক্ষার জন্য তীব্র গন্ধযুক্ত প্রতিরক্ষামূলক এক ধরনের বিষাক্ত রস স্প্রে করে দেয়। এ কারণেই এদের বলে গন্ধি গান্ধি পোকা। এ রসে সাধারণত অ্যালডিহাইড ও অ্যালকেন থাকে। প্রজাতিভেদে গন্ধের তীব্রতা ও বিষাক্ততা ভিন্ন হয়। কখনো কখনো তা তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে, কখনো কখনো কোনো কোনো প্রজাতির গান্ধি পোকা থেকে ধনেপাতার মতো গন্ধ ছোটে। যদি এ পোকা কোনো বিপদের আভাস পায় তাহলে নিজেদের রক্ষার জন্য দেহ থেকে এক ধরনের বিষাক্ত রস ছুড়ে দেয়। সে রসে বিষাক্ত সায়ানাইড যৌগ ও বাসি আখরোট বাদামের গন্ধ থাকে।    

হলুদ ফুটকি গন্ধি গান্ধি পোকার ইংরেজি নাম Yellow-spotted stink bug ev Yellow marmorated stink bug, প্রজাতিগত নাম Erthesina fullo। পূর্ণবয়স্ক পোকার আকার ১৮ থেকে ২৫ মিলিমিটার, বড় ঢাল আকৃতির কালচে-বাদামি দেহ, তার ওপর থাকে বিন্দু বিন্দু অসংখ্য হলুদ ছিট ছিট দাগ। পেটের পাশে পর্যায়ক্রমে কালো ও হলুদ দাগ থাকে। শুঁড় কালো, পাঁচটি খণ্ডবিশিষ্ট, চতুর্থ খণ্ডটি সাদা। মাথা ও দেহের সামনের অংশে একটি হলুদ মধ্যরেখা থাকে। সাধারণত এদের গরম কাল ও বর্ষা কালে বেশি দেখা যায়। এদের জীবনের তিনটি ধাপ– ডিম, নিম্ফ বা বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক।

ডিম থেকে পূর্ণবয়স্ক হতে এদের প্রায় ৭৫ দিন সময় লাগে, যার মধ্যে বাচ্চা অবস্থাতেই থাকে প্রায় ৩৫ দিন। পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর সেসব পোকা ৬ মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এরা বেশ দ্রুত চলাচল করতে পারে। এমনকি জাহাজের কনটেইনারের মাধ্যমে এরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়াতে পারে। এ দেশে ১৯০২ সালে প্রথম সিলেটে দেখা গিয়েছিল। এখন প্রায় সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।

নতুন দেখা উইস্টারিয়া ফুল

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
নতুন দেখা উইস্টারিয়া ফুল
সাভারের বরিশাল নার্সারিতে দেখা এভারগ্রিন উইস্টারিয়া ফুল। ছবি: লেখক

এ ফুলের নাম প্রথম শুনেছি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাসে। চাকরির সন্ধানে বিভূতিভূষণ যখন কলকাতার পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তার কলেজজীবনের বন্ধু ময়মনসিংহের জমিদারপুত্র অবিনাশের আমন্ত্রণে হ্যারিংটন স্ট্রিটে তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সে বাড়িটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বিভূতিভূষণ আরণ্যক উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদেই লিখেছেন–‘বাড়ি খুব বড় নয়, তবে সামনে-পেছনে বাগান। গেটে উইস্টারিয়া লতা, নেপালি দারোয়ান ও পিতলের প্লেট।’ 

উইস্টারিয়া আছে কয়েক রকমের। বিভূতিভূষণ কলকাতায় এলে কোন ধরনের উইস্টারিয়া গাছ দেখেছিলেন তা তিনি লেখেননি।

২০১৯ সালে ‘আরণ্যকের তরুলতা’ বইটি লিখতে গিয়ে উইস্টারিয়া নামের সঙ্গে পরিচয়। জানার পর সে ফুলটি দেখার জন্য উতলা হয়েছিলাম। কিন্তু দেখা পাইনি। পরে খোঁজ করতে গিয়ে জানলাম–মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে তানভীর আহাম্মদের বাগানে একটি জাপানি উইস্টারিয়ার (Wisteria floribunda) গাছ আছে। তানভীর আহাম্মদ ২০১৫ সালে গাছটি বাগানে লাগিয়েছিলেন। তার সে গাছে প্রতি বর্ষা ও শীতে ফুল ফোটে। শীতে পাতা ঝরে যায়, কিন্তু বর্ষায় পাতা ঝরে না। ছড়ায় গোলাপি-বেগুনি রঙের ছোট ছোট মটরফুলের মতো প্রচুর ফুল ফোটে। ঝুলন্ত ছড়াগুলো দেখতে অপূর্ব লাগে। তানভীর জানিয়েছেন, এই উইস্টারিয়া গাছ থেকে তিনি দুই শর বেশি চারা তৈরি করে বিক্রি করেছেন। অনেকের বাগানে লাগানো সেসব গাছে এখন ফুল ফুটছে।

এ উইস্টারিয়ার আদিনিবাস জাপান। তাই একে জাপানি উইস্টারিয়া বলা হয়। জাপানিরা উইস্টারিয়া গাছ দিয়ে চমৎকার বনসাই তৈরি করেন, যা অনেক বছর বাঁচে। চীনে আরেক প্রজাতির উইস্টারিয়া আছে, যাকে বলে চীনা উইস্টারিয়া (Wisteria sinensis)। মোস্তফা কামাল পাশা ও শেখ বখতিয়ার উদ্দিনের ‘ডিকশনারি অব প্ল্যান্ট নেমস অব বাংলাদেশ’ বইয়ে এ চীনা উইস্টারিয়ার উল্লেখ আছে। কিন্তু অন্য উইস্টারিয়ার উল্লেখ নেই। সংগত কারণে ধরে নেওয়া যায়, জাপানি উইস্টারিয়া এ দেশে নতুন এসেছে।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ব্যাম্বোরিয়ামের কিউরেটর সাইফউদ্দিন সাইফ বলেন, বান্দরবানের লামায় তাদের গার্ডেনে জাপানি ও এভারগ্রিন উইস্টারিয়া গাছ আছে। গত বছর সাভারে বরিশাল নার্সারিতে প্রথম এভারগ্রিন উইস্টারিয়া গাছটি দেখি, তখন তাতে ফুল ছিল না। এ বছর বর্ষায় সে গাছে দেখলাম–ফুল ফোটা শুরু হয়েছে। কিন্তু এ কেমন ফুল? যে উইস্টারিয়া ফুলের ছবি দেখে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল, এটা তো সে উইস্টারিয়া না, ফুলের মঞ্জরি বা ছড়া খাটো, পাতাও ছোট। ফুলের রং ঘন বেগুনি, তবে ছড়ার মতো পুষ্পশোভিত মঞ্জরি দেখতে বেশ চমৎকার। 

বরিশাল নার্সারির মো. ইব্রাহিম ভাই বলেন, ‘এর নাম এভারগ্রিন উইস্টারিয়া (Wisteriopsis reticulata Syn. Callerya reticulata or Millettia reticulata)। থাইল্যান্ড থেকে এর চারা এনেছিলাম। সে গাছটি থেকে এখন চারা তৈরি করে বিক্রি করছি। অনেক সৌখিন বাগানি এখন উইস্টারিয়া লতার নাম জেনে গেছেন। তাদের কেউ কেউ এ লতার খোঁজ করেন।’

ফ্যাবেসি গোত্রের এভারগ্রিন উইস্টারিয়া কাষ্ঠল লতানো প্রকৃতির গুল্মজাতীয় গাছ। এগুলো ৫-১০ মিটার লম্বা হয়। গাছের ভালো বৃদ্ধির জন্য অবলম্বন দরকার হয়। মাচা বা বেড়া কিংবা গেটের ওপর লতিয়ে দেওয়া যায়। এ গাছ লতিয়ে প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত ছড়ায়। পাতা সবুজ, চকচকে, ছোট। এভারগ্রিন উইস্টারিয়ার ফুল কর্পূরের মতো সুগন্ধযুক্ত। এ ফুলের আকৃতি বেগুনি-নীল মটরশুঁটি ফুলের মতো। এর কেন্দ্রস্থল হলদে, রেসিম পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফোটে। ফুল শেষে ছোট সরু ও লম্বা মটরশুঁটির মতো ফল হয়। বীজ থেকে চারা তৈরি করা যায়। তবে বীজের গাছে ফুল ফুটতে ১৫ থেকে ২০ বছর লেগে যায়। তাই এর আধা শক্ত ডাল কাটিং বা গুটিকলম করে চারা তৈরি করা ভালো। এ গাছ রোদ বা আধো ছায়া জায়গায় জন্মে। ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম এভারগ্রিন উইস্টারিয়ার আদিনিবাস।

এভারগ্রিন উইস্টারিয়া একটি বাহারি গাছ হলেও এশীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বা ভেষজ চিকিৎসায় এ গাছের শিকড় ও কাণ্ডের লোকায়ত ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে চীন ও পূর্ব এশিয়ার মানুষরা রক্তকে পুষ্ট করতে, রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে ও রক্তস্বল্পতাজনিত সমস্যা দূর করতে এ গাছের বিভিন্ন অংশকে টনিক হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রাচ্যে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য অটো-ইমিউন সিস্টেমিক রোগের চিকিৎসায় এর নির্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রক্ত-সম্পর্কিত বিভিন্ন অবস্থার ব্যবস্থাপনায় ও সুস্থ রক্ত সঞ্চালনে এ গাছ ব্যবহৃত হয়। 

ক্লিনিক্যাল এবং এথনোবোটানিক্যাল গবেষণায় গ্যাস্ট্রিক ও স্তন ক্যানসারে উইস্টারিয়া নির্যাসের সাইটোটক্সিক প্রভাব অনুসন্ধান করা হয়েছে। এই নির্যাস আইসোফ্ল্যাভোন, স্যাপোনিন ও লেকটিন সমৃদ্ধ, যা উদ্ভিদটিকে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। এসব উপাদান এ গাছের সার্বিক সুস্থতা দান করে। নতুন আসা এ গাছ নিয়ে উদ্যানবিদ, উদ্ভিদবিদ ও ভেষজ গবেষকরা বিস্তারিত গবেষণা করতে পারেন।