সিলেটের আলোচিত ‘সাদাপাথর’ লুটের অভিযোগে আলোচনায় আসা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে এবার ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তাদের দাবি, সাদাপাথর লুটের মামলায় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে দলীয় পদ ফিরে পাওয়ার পর সাহাব উদ্দিন আরও বেসামাল হয়ে উঠেছেন। ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের সিএনএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্টদের মাধ্যমে তিনি বন্দর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে বৈধভাবে ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেও অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো পণ্য খালাস করতে পারছেন না বলে অভিযোগ তাদের।
গত ১৯ জুলাই সিলেট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সাহাব উদ্দিনের নিয়ন্ত্রিত ভোলাগঞ্জ সমিতি তার এলসিতে আমদানি করা পাথর খালাসে বাধা দিচ্ছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এলসিতে আমদানি করা পণ্য কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিএনএফ এজেন্টের মাধ্যমে খালাস করতে হয়। কিন্তু সিএনএফ এজেন্টদের ওপর সাহাব উদ্দিনের প্রভাব রয়েছে। ফলে তারা তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেন। এমনকি ভোলাগঞ্জ সমিতিও তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে সাহাব উদ্দিনের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। তবে ভারতের রপ্তানিকারক প্রদীপ পালের সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। সে কারণে প্রদীপ পালের কাছ থেকে যেসব আমদানিকারক পণ্য আনছেন, তাদের পণ্য আটকে দেওয়া হচ্ছে। শুধু আমার নয়, আরও চার থেকে পাঁচজন ব্যবসায়ীর পণ্য একইভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেছি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
সাদাপাথর লুট, বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এলাকা ও ধলাই নদীসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপক অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার পর পাথর লুট, সরকারি প্রায় দেড় শ একর জমি দখল এবং চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি তাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। দলীয় বহিষ্কারের পর আত্মগোপনে গেলেও শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হন সাহাব উদ্দিন। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) দায়ের করা পাথর লুটের মামলায় ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর কুমারপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৯। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ওই সময় র্যাব-৯ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, সিলেটের প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর লুটের ঘটনায় সাহাব উদ্দিন ছিলেন ‘মূল হোতা’। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মামলাসহ তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা রয়েছে।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ পাথর উত্তোলনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে র্যাব গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টা ১৫ মিনিটে খনি ও খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় দুই মাস কারাভোগের পর নভেম্বরে তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।
দলীয় পদ ফিরে পেয়েই বেসামাল
কারাগার থেকে মুক্তির পর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে সাহাব উদ্দিনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তাকে দলে পুনর্বহাল করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, দলীয় পদ ফিরে পাওয়ার পর তিনি এলাকায় আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তাদের দাবি, বর্তমানে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর, পাথর ও বালু ব্যবসাসহ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন লাভজনক খাত তার ও তার অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্থলবন্দরসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর নির্মাণের শুরু থেকেই সাহাব উদ্দিন এ প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিলেন। প্রায় ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে তিনি ও তার অনুসারীরা বাধা সৃষ্টি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ মামলা করলে তিনি ওই মামলায় কিছু সময় কারাভোগও করেন বলে সূত্রটির দাবি।
এড়িয়ে চলছে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার সাহাব উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের ইনচার্জ গিয়াস উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্থলবন্দরে দুটি পৃথক কর্তৃপক্ষ কাজ করে। একটি বন্দর কর্তৃপক্ষ, অন্যটি কাস্টমস বিভাগ। আমরা কেবল অবকাঠামোগত সেবা দিয়ে থাকি। পণ্য ওজনের ব্যবস্থা, গুদাম সুবিধা এবং লোড-আনলোডের জন্য শ্রমিক সরবরাহ করি। এসব সেবার বিপরীতে নির্ধারিত ট্যারিফ আদায় করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘কোনো গাড়িতে কী পণ্য রয়েছে, তা পরীক্ষা করার এখতিয়ার বন্দর কর্তৃপক্ষের নেই। পণ্যসংক্রান্ত সব দায়িত্ব কাস্টমস বিভাগের। সিএনএফ এজেন্টদের লাইসেন্স ও তদারকির দায়িত্বও কাস্টমসের। কেউ অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের রয়েছে।’
ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা ইয়াকুব জাহিদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।