খুলনার ময়ূর নদ থেকে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে তাবলিগ মসজিদ পর্যন্ত নিরালা খাল। একসময়ে এই খালের প্রশস্ততা ছিল ৪০ থেকে ৭০ ফুট পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমানে নিরালা খাল যে স্থানে ময়ূর নদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, সেখানে চওড়া আছে মাত্র ৪ থেকে ৫ ফুট। খালের বিভিন্ন অংশের চিত্রও প্রায় একই। খালের জায়গা ভরাট করে রাস্তা, বাড়িঘর, দোকানপাট, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।
একইভাবে দখল-বেদখলে হরিণটানা খাল থেকে কাজীবাছা নদী পর্যন্ত মতিয়াখালী খালের প্রশস্ততাও কমে গেছে। একসময়ে পিটিআই এলাকা, মির্জাপুর এলাকা ও টুটপাড়াসংলগ্ন এলাকার পানি এই খাল দিয়ে নিষ্কাশন হলেও এখন খালের ভেতর আড়াআড়ি বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ করায় পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
এভাবে হাতিয়া নদী ও ডুবি হরিণটানার মধ্যবর্তী খাল, মিস্ত্রিপাড়া এলাকার পেছনে হরিণটানা খাল থেকে নিরালা কবরস্থানের দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িছড়া খাল, রূপসা সাহেবখালী খাল, পাইপের মোড়ের খাল, হরিণটানা থেকে কাজীবাছা নদী পর্যন্ত মতিয়াখালী খাল, ক্ষেত্রখালী খাল, লবণচরা গোড়া খাল, লবণচরা স্লুইসগেট খাল, গল্লামারী নর্থ ব্যাংক খাল, মন্দার খাল, বাস টার্মিনালের পেছনে সবুজবাগ এলাকার মধ্যবর্তী খাল, নবীনগর খাল, ময়ূর নদ থেকে দৌলতপুর দেয়ানা পর্যন্ত খুদে খাল, হাসানবাগ থেকে খুদে খাল পর্যন্ত তালতলা খাল, ছোট বয়রা শ্মশানঘাট খাল, বয়রা ইসলামিয়া কলেজের পেছন থেকে খুদে নদী পর্যন্ত বাটকেমারী খালসহ ২২টি খালের অধিকাংশ জায়গা বেদখল হওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে গঠিত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এসব খালের অধিকাংশ খুদে খাল ও ময়ূর নদ হয়ে ভৈরব, রূপসা ও কাজীবাছা নদীতে মিশেছে। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে খালের জায়গা দখল করে কয়েক শ মানুষের অবৈধ স্থাপনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অফিস, খাল খনন না করায় ভরাট হয়ে যাওয়া ও খালের প্রশস্ততা কমিয়ে ছোট ড্রেনে পরিণত করায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামান বলেন, খুলনা নগরীর জলাবদ্ধতার নেপথ্য কারণ হলো শহরের মধ্য থেকে বয়ে যাওয়া ২২টি খালের অবৈধ দখল ও পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, খালের জমি ভরাট এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এই ২২টি খালের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের পানি নদীতে নামতে না পেরে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।
বৃষ্টি হলেই শহরে হাঁটুপানি
বৃষ্টি হলেই নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলিসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। কোথাও পানি সরতে এক দিনেরও বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে মুজগুন্নী, লবণচরা, রয়্যাল মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকছে।
জানা যায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছে কেসিসি। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ হলেও নগরবাসী কোনো সুফল পাচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল খালগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত না করে শুধু কংক্রিটের সরু ড্রেন তৈরি করায় এই বিপুল বিনিয়োগ ব্যর্থ হচ্ছে। এ ছাড়া রূপসা নদীর সঙ্গে সংযোগকারী আলুতলা স্লুইসগেট ও অন্যান্য পকেট গেট সময়মতো সচল না থাকায় জোয়ারের পানি নগরীতে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টির পানি নামতে বাধা পায়।
জোয়ারে নদীর পানি ঢুকছে শহরে
ভৈরব ও রূপসা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত স্লুইসগেট ও আউটলেটগুলো অকার্যকর হওয়ায় রূপসা ঘাট এলাকা, টুটপাড়ার একাংশ, লবণচরা, দারোগাপাড়া, খানজাহান আলী রোড, গগন বাবু রোড, টিবি ক্রস রোড এলাকা প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়।
কেসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় পানি শহরে ঢুকছে। ফলে জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে রূপসা, লবণচরা ও আলুতলা বাঁধে তিনটি বড় পাম্প হাউস নির্মাণ এবং ড্রেন পরিষ্কারের জন্য আধুনিক এক্সকাভেটর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ২২টি খাল দিয়ে শহরের পানি নির্বিঘ্নে বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়।
দখলদারের তালিকায় কারা
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিরালা খালের জমিতে একটি মসজিদ করা হয়েছে। আলকাতরা মিলের পেছনে আয়েলা খাতুন, নিরালা এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা মনির হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, আজাহার আলীসহ আরও অনেকে খালের জমিতে স্থাপনা করেছেন। লবণচরা গোড়াখালের জমিতে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড অফিস, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র, রাইসমিল সমিতি, মাদ্রাসা, ক্লাবসহ ৪১ জন দখলদার রয়েছেন। মন্দার খালে অবসরপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মো. শাহজাহান, রফিক হোসেন, মমতাজ বেগম, কুদ্দুস মাওলানাসহ আরও অনেকে বাড়ি করেছেন। খুদে খালের জমিতে রেভা পলস স্কুলের আবাসিক ভবন, সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল ইসলাম, হারুণ মুন্সিসহ আরও অনেকে দখলে রেখেছেন।
প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণে কমিটি
বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণে কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. মাসুদ করিমের নেতৃত্বে একটি মূল কমিটি গঠনের পাশাপাশি মুজগুন্নী, লবণচরা ও রয়্যাল মোড়কে কেন্দ্র করে তিনটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে মূল কমিটির কাছে রিপোর্ট পেশ করবে। প্রাপ্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পূর্ত বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
জানা যায়, জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হলে নগরীর মোট ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের এক-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে তিনটি পাম্প হাউস নির্মাণ, ড্রেন পরিষ্কারের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধে বৈদ্যুতিক স্লুইসগেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে গেছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বিগত সরকারের আমলে সমস্যার গভীরে কেউ যায়নি। শহরের পানি বের হওয়া আউটলেট নিয়ে আগে কাজ করা উচিত ছিল। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন হয়েছে, কিন্তু সেই পানি বের করার পরিকল্পিত আউটলেট না থাকায় জলজট হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে জন্য করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিকদের মতামত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।