প্রতিবছর অক্টোবর মাসটি বিশ্বজুড়ে ‘পিঙ্ক রিবন’ বা গোলাপি ফিতার মাধ্যমে স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এই মাসে বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজন হয়। এসব আয়োজনের মূল লক্ষ্য স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা। এসব আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পৃথিবীর সব নারীর জন্য একটি জোর বার্তা- যে বার্তায় বাঁচতে পারে লাখ লাখ জীবন। স্তন ক্যানসার যদিও বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ, তবুও এর বিরুদ্ধে আমাদের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র আছে: তা হচ্ছে এ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। এই রোগ সম্পর্কে জানতে হবে, জানাতে হবে এবং ভয় না পেয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
স্তন ক্যানসার নারীদের অন্যতম প্রধান ঘাতক হলেও, অসংখ্য নারীর গল্প প্রমাণ করে যে এটিই শেষ কথা নয়। আমাদের মাঝে এমন অনেক নারী আছেন, যারা স্তন ক্যানসারকে পরাজিত করে ফিরে এসেছেন। তাদের গল্প আমাদের প্রেরণা জোগায়। তাদের অদম্য মনোবল এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, স্তন ক্যানসার এখন আর নিরাময় অসাধ্য কোনো রোগ নয়।
এমনই একজন নারী মাজেদা রহমান ঝর্ণা। একজন গৃহিণী ও মা। স্তন ক্যানসার ধরা পড়ার পর ভেঙে না পড়ে বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে রোগ নয়, তিনিই জিতবেন। যখন তার ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন তিনি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। তার ক্যানসার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা এবং মনের অদম্য জোর। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী সব চিকিৎসা ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেন। হ্যাঁ, তার এই চিকিৎসা বাংলাদেশেই হয়েছে। চিকিৎসা চলাকালে শারীরিক কষ্টের সময়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব হারাননি। তার পরিবার তাকে সার্বক্ষণিক সমর্থন জুগিয়েছিল, যা তার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। ঝর্ণার গল্প এই বার্তা দেয়, প্রাথমিক লক্ষণ দেখলে দ্বিধা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং মনের জোর বজায় রাখতে হবে, তবেই জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।
কণ্ঠশিল্পী সিঁথি সাহার কথা বলা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ক্যানসার জয় করে সুস্থ জীবন এবং স্বাভাবিক মাতৃত্বও সম্ভব। তিনি একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ক্যানসার নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তৃতীয় বা চতুর্থ স্টেজ থেকেও অনেক নারী কামব্যাক করছেন এবং আমার মতো হাসিখুশিভাবে জীবনযাপন করছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিকা গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ২০২১ সালে স্তন ক্যানসারের তৃতীয় পর্যায় ধরা পড়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মনের জোর থাকলে ক্যানসারের থার্ড স্টেজ অবধি সারিয়ে ফেলা যায়।’ তার এই লড়াই ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিক— বহুমুখী। তিনি দেখিয়েছেন যে, মানসিক শক্তি, চিকিৎসকের সহযোগিতা এবং ভালোবাসার মাধ্যমে সামাজিক ছুঁতমার্গকে উপেক্ষা করেও জীবন ফিরিয়ে আনা যায়।
এসব নারীর জীবনজয়ের গল্প প্রমাণ করে যে স্তন ক্যানসার মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ বহুদূর এগিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যদি স্তন ক্যানসার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তবে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯৯% পর্যন্ত হতে পারে।
আসুন, এই বিশেষ মাসে আমরা স্তন ক্যানসারসংক্রান্ত সেই দুটি মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করি, যা জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
১. নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হউন
চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়া। স্তন ক্যানসার হঠাৎ করে হয় না। এর লক্ষণগুলো প্রথম দিকে সামান্য হলেও, তা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেকেই দ্বিধা বা অজ্ঞতার কারণে এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করেন। তাই ২০ বছর বয়স থেকেই প্রত্যেক নারীর উচিত মাসে অন্তত একবার নিজের স্তন পরীক্ষা করা। ঋতুচক্র শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর এটি করার উপযুক্ত সময়। পিণ্ড বা চাকা অনুভব করা, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে টোল পড়া বা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ— এমন যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ৪০ বছর বয়স হলে বা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ম্যামোগ্রাম এবং ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট পরীক্ষা করাতে হবে।
এক্ষেত্রে সামান্য দ্বিধা বা অবহেলা রোগকে কঠিন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। মনে রাখবেন, স্তন ক্যানসার যত আগে ধরা পড়বে, নিরাময়ের সম্ভাবনা তত বেশি।
২. ‘মনের জোর রাখুন’
ক্যানসার শব্দটাই ভয়ের। কিন্তু স্তন ক্যানসার মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়— এটি একটি যুদ্ধ, যা জেতা সম্ভব। যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন সুচিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অদম্য মানসিক শক্তি। চিকিৎসা পদ্ধতি এখন অনেক উন্নত। ইতিবাচক মানসিকতা শরীরকে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। ক্যানসার রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তার মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আসুন, এই অক্টোবরে আমরা সবাই মিলে শপথ করি: আমরা আর নীরব থাকব না। ‘পরীক্ষা করুন’ এবং ‘মনের জোর রাখুন’— এই দুটি কথাকে আমরা আমাদের জীবনের মন্ত্র করে তুলব। আপনার সামান্য সচেতনতাই পারে একটি জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট