কালো জাদু এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। এর মাধ্যমে একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়াও সম্ভব। মানুষে মানুষে বিভেদ আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কোচ্ছেদ অনেক সময় কালো জাদুর প্রভাবেই হয়ে থাকে। বর্তমানে এর প্রয়োগ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সমাজের অনেকেই জাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। বিশেষভাবে যারা আধুনিক ও মডারেট চিন্তাভাবনা লালন করেন। কিন্তু বাস্তবে কি জাদুর অস্তিত্ব আছে। ইসলাম এ ব্যাপারে কী বলে, তা জানা প্রয়োজন।
সুলায়মান (আ.)-এর জামানায় জাদুর চর্চা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। জাদুর তালিম ছিল তাদের নিত্যদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নবির নিষেধ সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি জাদুচর্চা। এহেন পরিস্থিতিতে মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহতায়ালা বাবেল শহরে দুইজন ফেরেশতা অবতীর্ণ করেন। তারা মানুষকে জাদু শিখিয়ে তার কুপ্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করত এবং তা প্রয়োগ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করত। কিন্তু যারা পরীক্ষায় ফেল করার, তারা ঠিকই ফেরেশতাদের থেকে জাদুবিদ্যা শিখে তার অপপ্রয়োগ ঘটাত।
এ পূর্ণ বিষয়টি কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে—‘আর তারা (বনি ইসরাঈল) সুলায়মান (আ.)-এর শাসনামলে শয়তানরা যা কিছু (মন্ত্র) পড়ত তার পেছনে পড়ে গেল। সুলায়মান (আ.) কোনো কুফর করেননি। অবশ্য শয়তানরা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরিতে লিপ্ত করেছিল। তা ছাড়া (বনি ইসরাঈল) বাবেল শহরে হারূত ও মারূত নামক ফেরেশতাদ্বয়ের প্রতি যা (জাদুবিদ্যা) নাজিল হয়েছিল তার পেছনে পড়ে গেল। এ ফেরেশতাদ্বয় কাউকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো তালিম দিত না, যতক্ষণ না বলে দিত, আমরা কেবলই পরীক্ষাস্বরূপ (প্রেরিত হয়েছি)। সুতরাং তোমরা (জাদুর পেছনে পড়ে) কুফরি অবলম্বন করো না। তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত, (তবে প্রকাশ থাকে যে,) তারা তার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও কোনো ক্ষতিসাধন করতে পারত না। (কিন্তু) তারা এমন জিনিস শিখত, যা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল, উপকারী ছিল না।’ (সুরা বাকারা, ১০২)
এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে জাদুবিদ্যার অস্তিত্ব সাব্যস্ত হয় এবং এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয় যে, জাদু যত ভয়ংকরই হোক—আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারও ক্ষতি করা সম্ভব নয়। সবই আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে লাবিদ নামক এক ইহুদি জাদু করেছিল। জাদুর প্রভাবে নবিজির মধ্যে কিছু বিষয় ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট দুইজন ফেরেশতা এসে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অসুস্থতার কারণ, জাদুর স্থান, আকৃতি ইত্যাদি স্পষ্ট করেন। এর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লিখিত স্থান থেকে জাদুর বস্তুটি বের করে নষ্ট করেন। এ ঘটনাটি হাদিসে বিবৃত হয়েছে এভাবে—
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যুরায়ক গোত্রের লাবিদ ইবনে আ’সাম নামক এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জাদু করে। তাঁর খেয়াল হতো যেন তিনি একটি কাজ করছেন, অথচ তা তিনি করেননি। এক দিন বা এক রাত্রিতে তিনি আমার কাছে ছিলেন। তিনি বারবার দোয়া করতে থাকেন। তার পর তিনি বলেন, হে আয়েশা, তুমি কি উপলব্ধি করতে পেরেছো যে, আমি আল্লাহর কাছে যা জানতে চেয়েছিলাম, তিনি আমাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। (স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দুজন লোক আসেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং অপরজন দুই পায়ের কাছে বসেন। একজন তার সঙ্গীকে বলেন, এ লোকটির কি ব্যথা? তিনি বলেন, জাদু করা হয়েছে।
প্রথম জন বলেন, কে জাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বলেন, লাবিদ ইবনে আ’সাম। প্রথম জন জিজ্ঞাসা করেন, কিসের মধ্যে? দ্বিতীয় জন উত্তর দেন, চিরুনি, মাথা আঁচড়ানোর সময় ওঠা চুল এবং পুরুষ খেজুর গাছের ‘জুব’-এর মধ্যে। প্রথম জন বলেন, তা কোথায়? দ্বিতীয় জন বলেন, ‘যারওয়ান’ নামক কূপের মধ্যে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন সাহাবি নিয়ে সেখানে যান। পরে ফিরে এসে বলেন, হে ‘আয়েশা! সে কূপের পানি মেহেদির পানির মতো (লাল) এবং তার পাড়ের খেজুর গাছের মাথাগুলো শয়তানের মাথার মতো। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দেবেন না? তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন, আমি মানুষকে এমন ব্যাপারে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে। তার পর রাসুলুল্লাহর নির্দেশে সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।’ (বুখারি, ৫৭৬৩)
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেন, জাদুর প্রভাবে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মরণশক্তি কিছুটা লোপ পেয়েছিল। তাই অনেক বিষয় স্মরণ রাখতে পারতেন না। তাঁর ওপর জাদুর ক্রিয়া হওয়া দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জাদুর অস্তিত্ব সত্য এবং এটাও প্রমাণিত হয় যে, তিনি জাদুকর ছিলেন না; যেমনটা কাফেররা বলত। কারণ, জাদুকরের ওপর স্বভাবত জাদুর ক্রিয়া হয় না।
এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদিসে জাদুকে ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনেও জাদুকরের ব্যর্থতা, মুসা (আ.)-এর যুগের জাদুকরদের ঘটনা ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে। এসব দ্বারা জাদুর অস্তিত্ব এবং প্রভাব প্রমাণিত হয়। সুতরাং জাদু অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আল্লাহর হুকুম এবং ইচ্ছা ছাড়া জাদু মানুষের ক্ষতি করার শক্তি রাখে না। জাদুর অস্তিত্বের ব্যাপারে আমাদের পূর্বসূরি দুইজন মনীষীর বক্তব্য জেনে নিই—
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, বিশুদ্ধ মত হলো নিশ্চয় জাদুর বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। এটিই জমহুর উলামা ও সাধারণ উলামার মত। এ মত প্রমাণিত হয় কোরআন ও প্রসিদ্ধ বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা। (ফতহুল বারি, ১০/২২২)
ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, জাদুর বাস্তবতা রয়েছে। কিছু জাদু মানুষকে মেরে ফেলে, কোনটি অসুস্থ করে, কোনটি ব্যক্তিকে তার স্ত্রী থেকে দূরে রাখে, কিছু আবার স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়। কিছু জাদু একজনকে অপরের শত্রু বানিয়ে দেয়, কিছু আবার বন্ধু বানায়। (আল-মুগনি, ৯/২৮)
লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া মোহাম্মদিয়া দারুল উলূম, রামপুরা, ঢাকা