রমজানে মৃত্যুবরণ করলে কবরের আজাব মাফ হয়ে যায়— আমাদের সমাজে এটি একটি অতি প্রচলিত এবং বিশ্বাসযোগ্য কথা। পবিত্র রমজান মাসের সম্মান ও মহিমা অপরিসীম বলে অনেকেই মনে করেন, এ মাসে মৃত্যু হওয়া মানেই পরকালীন সব হিসাব চুকে যাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলামের মৌলিক দলিল— কোরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের আয়নায় এই ধারণার ভিত্তি কতটুকু? আবেগ নাকি দলিল, মুমিনের আকিদা কিসের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত?
অনেকেই বুখারি ও মুসলিম শরিফের প্রসিদ্ধ একটি হাদিস দিয়ে বিষয়টি প্রমাণের চেষ্টা করেন, যেখানে বলা হয়েছে— ‘রমজান প্রবেশ করলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ মুহাদ্দিসিনে কেরাম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো এই মাসে নেক কাজের সুযোগ বেড়ে যায় এবং মহান আল্লাহর ক্ষমার ঢল নামে। এর সঙ্গে কবরের আজাব মাফ হয়ে যাওয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) তার কিতাবে হযরত আনাস (রা.) থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যে, রমজানে মৃত ব্যক্তি থেকে আজাব উঠিয়ে নেওয়া হয়। তবে তিনি নিজেই একে ‘জয়িফ’ বা দুর্বল বলেছেন। এমনকি এর কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ বা সূত্র হাদিসের প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি হলো, ‘ফজিলত’ বা সওয়াবের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস কিছুটা নমনীয়ভাবে গ্রহণ করা গেলেও ‘আকিদা’ বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অকাট্য ও সুনিশ্চিত দলিল (ইয়াকিনি দলিল) আবশ্যক। সুতরাং কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া ‘রমজানে মৃত্যু মানেই আজাব মাফ’— এমন বিশ্বাস পোষণ করা আকিদাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
যুক্তি ও বাস্তবতার নিরীক্ষা
১. আল্লাহতায়ালা জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারণ করেছেন মানুষের ‘আমল’ বা কর্মের ওপর ভিত্তি করে। মৃত্যু মানুষের নিজ হাতে নয়; এটি একটি ‘গায়রে এখতিয়ারি’ বা অনিচ্ছাকৃত বিষয়। সারা জীবন পাপাচারে লিপ্ত থাকা কোনো ব্যক্তি কেবল রমজানে মারা গেলেই কি সব আজাব থেকে মুক্তি পাবেন? যেখানে বহু নেককার সাহাবিকেও কবরের সংকীর্ণতার সম্মুখীন হতে হয়েছে!
২. অনেক ক্ষেত্রে নাসর ইবনে হাম্মাদ নামক একজন বর্ণনাকারীর উদ্ধৃতি দেওয়া হয়, যাকে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রহ.) ‘মিথ্যাবাদী’ বলেছেন। তার বর্ণিত হাদিস দিয়ে আকিদা গঠন করা অসম্ভব।
৩. কেউ জান্নাতে যাবে এর অর্থ এই নয় যে তার কবরে আজাব হবে না। কবরের আজাব মূলত নির্দিষ্ট কিছু পাপাচার (যেমন-গিবত বা প্রস্রাব থেকে পবিত্র না থাকা) থেকে বাঁচার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
রমজান মাস নিঃসন্দেহে রহমত ও মাগফিরাতের। এ মাসে মৃত্যুবরণ করা একজন মুমিনের জন্য সৌভাগ্যের লক্ষণ হতে পারে এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি আজাব মাফ পেতেই পারেন— এটি আমরা আশা করতে পারি। তবে একে একটি ‘ধ্রুব সত্য’ বা ‘ইসলামি আকিদা’ হিসেবে প্রচার করা শরয়ি দলিল অনুযায়ী সঠিক নয়। কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন বিশুদ্ধ ইমান এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন।
আসুন, ভিত্তিহীন প্রচারণার মোহে না পড়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করি এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে রমজানের মতো পবিত্র রাখার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক