সকাল বেলা চোখ মেলা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের একটা বিশাল অংশ বন্দি হয়ে আছে পাঁচ ইঞ্চির একটা ডিজিটাল স্ক্রিনে। ফেসবুকের স্ক্রোলিং, টিকটকের রিলস, আর ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল লাইক-কমেন্টের দুনিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করার কথা ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি আজ আমাদের যুবসমাজকে এক গভীর ও অন্ধকার নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ক্ষয় শুধু কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, এটি গ্রাস করছে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং সামগ্রিক জাতীয় চেতনাকে।
আজকের তরুণ সমাজ বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। লাইক আর ভিউ পাওয়ার সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিশোর-কিশোরীরা লিপ্ত হচ্ছে নানাবিধ অনৈতিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। টিকটক, লাইকি বা ফেসবুক রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে সস্তা বিনোদনের আড়ালে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সমাজ ও পরিবারের ভিত্তিমূলে সরাসরি আঘাত করছে। কৃত্রিম ফিল্টারের চাকচিক্য আর সস্তা পরিচিতির মোহে পড়ে তরুণ মন আজ হারিয়ে ফেলছে আপন সত্ত্বা।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ভার্চুয়াল অবাধ মেলামেশা ও নৈতিক শিথিলতা আজ আমাদের পবিত্র পারিবারিক বন্ধনগুলোকে চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনায়াসে ছড়িয়ে পড়ছে পরকীয়ার মতো সামাজিক মহামারী, যার বিষাক্ত ছোবলে ভেঙে যাচ্ছে হাজারো সাজানো সংসার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্স আর গোপন চ্যাটিংয়ের আড়ালে মুহূর্তের মধ্যে একজনের মন আটকে থাকছে অন্যের স্ত্রী বা স্বামীর ভার্চুয়াল আইডিতে। এই গোপন ও অবৈধ মেলামেশা সমাজে এক ধরণের অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং কখনো কখনো নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
আরো পড়ুন: এতিম ও দ্বীনি শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণের অপচেষ্টা
এই অন্ধকার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় এবং নির্মম শিকার হচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী যে শিশুদের হাতে থাকার কথা ছিল খেলার সামগ্রী কিংবা পাঠ্যবই, অনিয়র্তিত ইন্টারনেটের নীল ছোবলে তারা আজ ডুবে থাকছে পর্নোগ্রাফি আর মাদকের মরণনেশায়। শৈশবের পবিত্রতা হারিয়ে অপরিণত বয়সেই তারা শিকার হচ্ছে নানাবিধ অপরাধের, হারাচ্ছে তাদের সতীত্ব ও নৈতিক চরিত্র। এই অকাল নৈতিক স্খলন ও মানসিক পচন কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি পুরো প্রজন্মের নিঃশব্দ আত্মহনন। বাস্তব জীবনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করার যে চিরন্তন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি ছিল, তা আজ কমেন্টের ঘরের সস্তা ট্রোল, সাইবার বুলিং আর অনৈতিকতার নিচে চাপা পড়ে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া তরুণদের মাঝে এক ধরণের কৃত্রিম একাকীত্ব এবং 'ডিপ্রেশন' বা মানসিক অবসাদ তৈরি করছে। বাস্তব জগতের বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা পরিবারের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে স্ক্রিনের ওপাশের অচেনা মানুষের 'লাইক' পাওয়াটা আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যের বানিয়ে রাখা চাকচিক্যময় জীবন আর কৃত্রিম হাসির ছবি দেখে নিজের জীবনের ওপর তৈরি হচ্ছে চরম ক্ষোভ ও গভীর হতাশা।
আর এই মানসিক ক্ষোভ ও হতাশা থেকেই তরুণ প্রজন্ম জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং কালচার, জুয়া, কিংবা মারাত্মক অপরাধ জগতের সাথে। ভার্চুয়াল জগতের এই সাময়িক তৃপ্তি তরুণদের বাস্তব জীবন থেকে এতটাই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে যে, তারা যেকোনো ছোট ব্যর্থতাতেই আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নিতে দ্বিধাবোধ করছে না।
আরো পড়ুন: পশুর হাটের হাসিলের বিধান
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে না পারলে একটি জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। এই নৈতিক ধস রুখতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে এখনই সম্মিলিতভাবে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। মা-বাবাকে নিশ্চিত করতে হবে তারা যেন সন্তানকে শুধু একটি ডিজিটাল ডিভাইস দিয়ে একা ঘরে বসিয়ে না রাখেন। ডিভাইস দেওয়ার চেয়ে নিজেরা সন্তানের সাথে মূল্যবান সময় কাটান, তাদের সাথে মনোযোগ দিয়ে কথা বলুন এবং চমৎকার কিছু পারিবারিক মুহূর্ত উপহার দিন। সন্তান ইন্টারনেটে কী দেখছে, কার সাথে মিশছে, সেদিকে গোয়েন্দার মতো নয়, বরং বন্ধুর মতো স্নেহশীল নজরদারি রাখতে হবে।
২. সুস্থ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে ধর্মীয় অনুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। ইসলাম ধর্মে যে আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিকতার কথা বলা হয়েছে, তরুণদের মাঝে তার বাস্তব চর্চা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কওমি ও আলিয়া মাদরাসা এবং ওলামায়ে কেরামদের এই বিষয়ে একধাপ এগিয়ে আসতে হবে। আধুনিক তরুণ প্রজন্ম যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়াতেই বেশি সময় কাটায়, তাই ওলামায়ে কেরামদেরও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে যুবসমাজকে সচেতন করার জন্য আকর্ষণীয় ও আধুনিক ইসলামিক কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে।
৩. প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের তীব্র অভাবে তরুণদের ঘরের কোণে মোবাইলমুখী করে তুলছে। যুবসমাজকে ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করতে হলে তাদের মাঠমুখী করতে হবে, পাড়ায় পাড়ায় বই পড়ার ক্লাব গড়ে তুলতে হবে এবং বিভিন্ন সৃজনশীল সামাজিক ও সেবামূলক কাজে তাদের যুক্ত করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম ও সুস্থ বিনোদন তাদের মস্তিষ্ককে এই ডিজিটাল মাদক থেকে দূরে রাখবে।
৪. সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা কিংবা কিশোর গ্যাং কালচারকে উস্কে দেয়,এমন কন্টেন্ট, গ্রুপ ও আইডির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যে সমস্ত প্ল্যাটফর্ম বা পেজ যুবসমাজের নৈতিক চরিত্র হরণের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, রাষ্ট্রকে অবিলম্বে সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা এই আধুনিক যুগে সম্ভব নয়, আর তার প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন প্রযুক্তির 'নিয়ন্ত্রিত ও কল্যাণকর' ব্যবহার। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম আলো যেন তরুণের ভেতরের আসল মনুষ্যত্ব, মেধা আর বিবেকের আলোকে চিরতরে নিভিয়ে না দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া যেন আমাদের যুবসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, বরং যুবসমাজ যেন সোশ্যাল মিডিয়াকে দেশের এবং মানবতার কল্যাণের কাজে নিয়ন্ত্রণ করে,সেই পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষণস্থায়ী লাইক-ভিউয়ের মোহ আর ভার্চুয়াল জগতের দাসত্ব থেকে আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে এনে পারিবারিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন আর মায়া-মমতার এক সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলি। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের ভবিষ্যৎ, সুগঠিত হবে একটি আদর্শ, স্বাবলম্বী ও নৈতিকতাসম্পন্ন অপরাজেয় প্রজন্ম। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক ও সুন্দর বিবেচনাবোধ দান করুন।
লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল, জামিয়া ইমাম বুখারী উত্তরা ঢাকা