ঘামের এক ফোঁটা থেকেই যদি জানা যায় শরীরে সোডিয়াম আয়নের মাত্রা, আগেভাগেই শনাক্ত করা যায় হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি—তবে কেমন হয়?
এমনই একটি নন-ইনভেসিভ স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ধারণা নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) মঞ্চে হাজির হন একদল তরুণ গবেষক।
শনিবার (১৮ জুলাই) চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাইব্লিটজ ২.০’-এর অন্যতম আকর্ষণ থ্রি মিনিট থিসিস (৩এমটি) প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক ৩এমটি ফরম্যাট অনুসরণে প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করে আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ।
দেশের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭টি দল এতে অংশ নেয়।
শুধু এটিই নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল তথ্যের সমাধান, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ নিয়োগে ব্লকচেইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কিংবা বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণ—এমন নানা উদ্ভাবনী গবেষণার ধারণায় মুখর হয়ে ওঠে চুয়েট ক্যাম্পাস।
তবে প্রতিটি গবেষণার মূল ভাবনা তুলে ধরতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল মাত্র তিন মিনিট। মাত্র তিন মিনিটে একটি গবেষণার মূল ধারণা, সমস্যা, সম্ভাব্য সমাধান এবং সমাজে এর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরাই ছিল প্রতিযোগিতার মূল চ্যালেঞ্জ।
একটি মাত্র স্থির স্লাইডের সহায়তায় অংশগ্রহণকারীদের গবেষণার প্রেক্ষাপট, পদ্ধতি, ফলাফল ও বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা উপস্থাপন করতে হয়। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেও জটিল গবেষণাকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার দক্ষতার ভিত্তিতে বিচারকরা প্রতিযোগীদের মূল্যায়ন করেন।
প্রতিযোগিতার মঞ্চে স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত একটি গবেষণায় নন-ইনভেসিভ পদ্ধতিতে ঘাম থেকে সোডিয়াম আয়নের মাত্রা বিশ্লেষণের একটি প্রযুক্তি উপস্থাপন করা হয়।
গবেষকদের মতে, শরীরে সোডিয়াম আয়নের পরিবর্তন পেশির কার্যক্রম, স্নায়বিক সংকেত পরিবহন এবং পানিশূন্যতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই ঘামের নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হিট স্ট্রোকের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
তাদের দাবি, এ প্রযুক্তি খেলোয়াড়, শিল্পকারখানার কর্মী এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণা উপস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর একটি অভিনব ধারণাও তুলে ধরেন একদল প্রতিযোগী।
তাদের গবেষণায় দেখানো হয়, ভুল বা অস্পষ্ট নির্দেশনার কারণে এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে।
প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখান, আরও উন্নত এআই তৈরির চেয়ে কার্যকর প্রম্পট বা নির্দেশনা ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কম্পিউটার আর্কিটেকচারভিত্তিক আরেকটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে প্রসেসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ানোর একটি পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়। পারসেপট্রনভিত্তিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রসেসরের ভুল ব্রাঞ্চ অনুমান কমিয়ে কর্মক্ষমতা ও গতি বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন গবেষকেরা।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির আরেকটি উদ্ভাবনী প্রয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ। মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিনির্ভর এই প্যাচ স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তি রোগীদের বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে চিকিৎসাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও আরামদায়ক করে তুলতে পারে।
দর্শকদের আগ্রহ কাড়ে স্ব-নিরাময়কারী বা সেলফ-হিলিং মেটেরিয়ালস বিষয়ক একটি গবেষণাও। এতে এমন উপাদানের ধারণা উপস্থাপন করা হয়, যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশেষ রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে নিজেই নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের উপাদান ভবিষ্যতে নির্মাণ, পরিবহন ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে ব্লকচেইনভিত্তিক ‘সেইফপাস’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও উপস্থাপন করা হয়। এতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট, রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দালালনির্ভরতা ও প্রতারণা কমানোর একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়।
গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তি অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরা হয়। ক্লাউডভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন নির্ধারিত স্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে জিপিএসের সহায়তায় দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে। গবেষকদের দাবি, এই ব্যবস্থা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত, অধিক কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব।
আয়োজকেরা জানান, গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ, সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা গড়ে তুলতে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে ‘থ্রি মিনিট থিসিস (৩এমটি)’ প্রতিযোগিতার সূচনা হয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় এ প্রতিযোগিতায় একটি মাত্র স্থির স্লাইড ব্যবহার করে তিন মিনিটের মধ্যে গবেষণার মূল ধারণা, পদ্ধতি ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হয়।
প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ স্পিকার সেশন। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট অবকাঠামো, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কোর অপারেশনস) মো. আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান।
ইবাদ হোসেন/এএফ