নওগাঁয় মৌসুমে ৩২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল ফুটেছে। এ বছর ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে বাগান পরিচর্যার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয় কৃষককে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
দেশে আম উৎপাদনকারী জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে নওগাঁ। সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় সাপাহার ও পোরশা উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় বাগানের পরিধি প্রায় ২২ হাজার হেক্টর। এছাড়া পাশের পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট, নিয়ামতপুর ও মান্দা উপজেলায় অন্তত ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলায় আম্রপালি আমের জন্য প্রসিদ্ধ। অল্প দিনেই এখানকার মানুষের ভাগ্যের দুয়ার খুলেছে। এঁটেল মাটির কারণে এখানকার আম স্বাদে-ঘ্রাণে অতুলনীয়। বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই ক্রমেই আম বাগানের পরিধি বাড়ছে।
এছাড়া বদলগাছী মহাদেবপুর ও ধামইরহাট উপজেলায় নাক ফজলি আম বেশি উৎপাদন হয়। এই আম নওগাঁ জেলার জিআই পণ্য। বৈশাখ মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে আসে গুটি জাত গোপালভোগ, ক্ষিরসা, ঝিনুক, ল্যাংড়া ও হিমসাগর। পর্যায়ক্রমে নাবিজাত অর্থাৎ আম্রপালি, বারিফোর, গৌড়মতি ও অন্যান্য জাতের আম বাজারে আসে। চলতি মৌসুমে গাছে ব্যাপক মুকুল এসেছে। চাষিরা বাগান ও মুকুলের পরিচর্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন এবং বাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছেন।
চাষিরা বলছেন, চলতি বছর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই গাছে মুকুল দেখা দিয়েছে। বালাই নাশক, তরল খাদ্য প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করছেন তারা। সাপাহার উপজেলার নোনাহার গ্রামের আম বাগানি শরিফ উদ্দীন বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় মুকুলে রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম। মুকুল থেকে ইতোমধ্যেই গুটিআম আসতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে আমের ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাগান ও গাছের পরিচর্যায় অধিক ব্যয় চিন্তায় ফেলেছে। বিশেষ করে বালাইনাশকের চড়া দামে চাষিরা হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকের মূলধনে টান পড়ছে। গত বছরের থেকে প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। মূলধনের অভাবে অনেকে এখনই বাগান বিক্রি করছেন, আবার অনেক চাষি ঋণ নিয়ে আম উৎপাদন করছেন।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন, আবহাওয়ার অনুকূলে থাকায় আমগাছে মুকুল ফুটতে এ বছর সময়ের হেরফের হয়নি। সঠিক সময়ে গাছে মুকুল এসেছে। এখন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে কার্যকর পদক্ষেপ ও সঠিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬২.৫৭ শতাংশ আম্রপালি। গোপালভোগ, ক্ষিরসা, ঝিনুক, ল্যাংড়া ও হিমসাগর মিলিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং নাবি জাতের গৌড়মতি, বারি-ফোর এবং অন্যান্য আম রয়েছে। বিদেশে আম রপ্তানির জন্য ৫০০ জন তরুণ উদ্যোক্তা ও চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
নওগাঁ জেলার মোট কৃষি অর্থনীতির ১৯ ভাগ আসে আম থেকে। আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেলে এ বছর প্রায় পৌনে ৪ হাজার কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করা হচ্ছে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, পাকা আম সংগ্রহের জন্য সরকারিভাবে আগেই জাতভেদে দিন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া আম রপ্তানি, আম থেকে বহুমুখী খাবার তৈরি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চাষি-উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ বছর আবারও আম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হবে। তিনি বলেন, যেকোনো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আম উৎপাদনে চাষিদের সহায়তা করা হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে কাজ করবে জেলা প্রশাসন।