ঢাকা ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
দলীয় বহিষ্কারেই পদ হারাচ্ছেন না এমপি গাজী নজরুল, সিদ্ধান্ত নিতে পারবে সংসদ: ইসি দানি ওলমোর সঙ্গে হাতাহাতি নিয়ে ক্ষমা চাইলেন আয়ালা ঠোঁটকাটা-তালুকাটা শিশুদের পুনর্বাসনে জাতীয় কর্মসূচি করার প্রতিশ্রুতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছানিজনিত অন্ধত্ব ৫ বছরে নির্মূল করা হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ইবিতে শিক্ষক নিয়োগে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য কাসেমিরোকে ঘিরে ইন্টার মায়ামির বিরুদ্ধে তদন্তে এমএলএস ‘ফিকি এফডিআই কনফারেন্স-২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধর্ষণ মামলায় এনসিপি নেতা আফতাব মজুমদার জয় গ্রেপ্তার বিশ্বকাপে ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে যা বললো ফিফা ২৫ বছর পর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আহমদ ছফার দেহাবশেষ শীর্ষ ২৭-এর বাইরে থেকেই বিদায়, পুরস্কারবঞ্চিত নেইমার তীব্র গ্যাস সংকটের কারণ জানিয়ে সরকারের দুঃখ প্রকাশ ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট বিল পাস শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর হাতে ৯ ভারতীয় জেলে আটক প্রবাসীদের পাসপোর্ট সংশোধনের সুযোগ বাড়লো ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই গোপন বিয়ে নিয়ে উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসি ও ক্রেডেন্স হাউজিং লিমিটেডের মধ্যে হোম লোন সুবিধা প্রদানে চুক্তি সই কামরাঙ্গীরচরে মারামারি থামাতে গিয়ে প্রাণ গেল শ্রমিকের চাঁদপুরে এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে ৩ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ মেক্সিকোর মেয়র গুলি করে হত্যা করল দুর্বৃত্তরা ফিফার সেরা একাদশে আর্জেন্টিনার ৩ জন, জায়গা পাননি কোনো ব্রাজিলিয়ান মাসাই মারার 'গ্রেট মাইগ্রেশন'-কে বিখ্যাত করে তোলা ৭টি প্রাণী বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘৩৫টি দেশে ভিসা ছাড়া’ ভ্রমণ, বাস্তবতা কতটুকু? প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ফাস্টট্র্যাক আদালত ঘোষণা নরেন্দ্র মোদির আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর রাজশাহীতে ভ্যানচালক হত্যা মামলায় ৪ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনায় আঘাতের হুশিয়ারি ইরানের নতুন নৌপ্রধানকে ভাইস এডমিরাল র‌্যাঙ্ক ব্যাজ পরালেন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কি পদত্যাগ করছেন? তাইওয়ানের গবেষণায় দাম্পত্যে ডিমেনশিয়ার নতুন আতঙ্ক

সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে টিকে থাকার লড়াই

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪০ এএম
আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে টিকে থাকার লড়াই
ছবি: খবরের কাগজ

সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ মানুষ হাওর এলাকায় বসবাস করেন। হাওরে যখন আফাল ওঠে (বড় ঢেউকে স্থানীয় ভাষায় আফাল বলে) তখন এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। এ জন্য প্রতিবছর এখানকার বাসিন্দারা ঘর উঁচু করেন। কিন্তু পাহাড়ি ঢল তার থেকেও বড়। তাই নিরুপায় হয়ে পুরো বর্ষা মৌসুমে আফাল আর ঢল থেকে পরিবার-বসতভিটা রক্ষায় স্থানীয়রা প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কখনো কখনো হাওরে বড় বড় আফাল এসে বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের পরিবারের সদস্যদেরও। এমন অনেক মর্মান্তিক গল্প আছে হাওরজুড়ে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের বাহাদুর গ্রামের খরচার হাওরে দেখা হয় হিমাংশু বর্মণের (৪২)। হাওরে তখন বিশাল আফাল উঠেছে। একই সময় ভারতের মেঘালয় থেকে ঢল নামায় হাওরে তীব্র স্রোত তৈরি হয়। এই আফাল, পাহাড়ি ঢল ও স্রোতের মধ্যেই হিমাংশু বসতভিটা বাঁচাতে কাজ করছিলেন। হিমাংশু বিশ্বাসের মতো ওই গ্রামে আরও ১১০টি পরিবার থাকে। তারাও যার যার কাজ করছিলেন, এ জন্য কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে পারছিলেন না। হিমাংশু ভেসে আসা কচুরিপানা ও খড়কুটো দিয়ে বসতঘরের পাশে স্তুপ করে স্রোত আর আফালের তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করছিলেন। সঙ্গে ছিল বাঁশ দিয়ে স্রোত আটকানোর চেষ্টা।

ঠিক পাশেই খেলা করছিল তার দুই বছরে শিশুসন্তান। ৫০ থেকে ১০০ ফুট প্রস্থের গ্রামটিতে বর্ষাকালে হাঁটার জায়গা থাকে না। গ্রামটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০০ ফুট। মূলত এই চিত্র সুনামগঞ্জের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫৪টি হাওরপাড়ের। বর্ষাকালে হাওরে এভাবেই টিকে থাকতে হয়।

হিমাংশু বর্মণ বলেন, ‘এভাবেই বেঁচে থাকতে হয়। আমার বাপ-দাদারাও এভাবে জীবনযাপন করে গেছেন। আমরাও এভাবেই আছি। আমাদের সন্তানদেরও এভাবেই বাঁচতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবারের বোরো ফসলও হাওরে নষ্ট হয়ে গেছে। তার পরও কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানি বেড়ে গেছে। বসতঘরের ওপর আফাল আছড়ে পড়ছে। বাড়ির পাশের মাটি সব ভেঙে যাচ্ছে। তাই মেরামতের চেষ্টা করছি। খেয়ে না খেয়ে হলেও একটু আশ্রয় তো নিতে হবে। রাতে বাচ্চাদের ঘুমানোর জায়গা করে দিতে হবে। হাওরে আমাদের টিকে থাকতে হলে এই লড়াই করতে হবে। আমরা যদি হাতগুটিয়ে বসে থাকি তাহলে পানির স্রোত সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

একই গ্রামের গৃহিণী অলোক বর্মণ (৩৬) বলেন, ‘ছোট টিনের ঘরে বাচ্চা থাকে। যখন হাওরে বড় বড় আফাল ওঠে, ঢল নামে তখন ভয় পাই। রাতের আঁধারে কখন না জানি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কখন বন্যায় সব ডুবে যায়, অনেক কষ্টে তিলে তিলে গড়া সংসার পানির নিচে তলিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ভয় পেয়েও কোনো লাভ নেই। আমাদের জীবন এমনই, এখানে ভয় পেলে চলবে না, ঝড়, স্রোত থেমে গেলে আমরা আবার নতুন করে শুরু করি। কারণ আমাদের সন্তানদের খাওয়াতে হবে, মানুষ বানাতে হবে। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই। আমরা বাঁচলে আমাদের বাচ্চারাও বাঁচবে।

সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ওই গ্রামের বাসিন্দা রিপন বর্মণ (২২)। তিনি বলেন, ‘ডর-ভয় আছে। তবে এভাবেই টিকে থাকতে হবে। এখানে আমরা কোনোমতে জীবন বাঁচাই। সত্যি কথা বলতে, হাওর এলাকায় কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। চাইলেই অনেক কিছু পাওয়া যায় না। বেশি সমস্যা হয় কেউ অসুস্থ হলে। তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া যায় না। তার পরও কষ্ট করে কোনোমতে উপজেলায় নিয়ে গেলেও কোনো সেবা পাওয়া যায় না। উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার থাকেন না। তাই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিতে হয়। তখন ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে পড়ালেখা করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। হাওরে ঢেউ উঠলে নৌকা নিয়ে স্কুলে যাওয়া যায় না। নিজের ঘরের চারপাশে পানি রেখে পড়াশোনাও করা যায় না। এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই করুণ। এই মৌসুমে নৌকা ছাড়া এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাওয়া যায় না। তবে এখন সময় এসেছে হাওর নিয়ে, হাওরের মানুষ নিয়ে একটু চিন্তা করার। কারণ আমরাও ভোট দেই, তারা আমাদেরও এমপি, মন্ত্রী।

সুনামগঞ্জের হাওর নেতা অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, ‘হাওর এলাকার মানুষ খুবই মানবেতর জীবনযাপন করেন। এখন ২০২৬ সাল। বিশ্বে যেখানে মানুষ চাঁদে আসা-যাওয়া করছে, সেখানে আমাদের হাওরপাড়ের মানুষ স্কুলে যেতে, ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানোর জন্য, এক মুঠো খাবারের জন্য সংগ্রাম করছেন। সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। এ জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে এ অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারের রেখে দেশে আলো আসবে না। দেশের উন্নতি, অগ্রগতির কথা চিন্তা করলে সবাইকে নিয়েই করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হাওর এলাকার মানুষের কথা মাথায় রেখে দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনা করতে হবে। জেলার একমাত্র ফসল, তাও প্রতিবছর নানা কারণে ডুবে যায়। বর্ষা, বন্যায়, পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি ভেঙে এখানকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যান। কৃষকরা বাড়িঘর ফেলে বড় শহরে চলে যান। তাই সরকারকে হাওর এলাকার দিকে সুনজর দিতে হবে। তবেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।

এমপি পদ থাকছে না গাজী নজরুল ইসলামের!

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:০০ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
এমপি পদ থাকছে না গাজী নজরুল ইসলামের!
ছবি: সংগৃহীত

তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশের পর জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ থাকা না থাকা নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের ওই এমপির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সংবিধান ও প্রচলিত নির্বাচনি আইনের বিধান বলছে, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে, সংবিধানে বর্ণিত অযোগ্যতা সৃষ্টি হলে অথবা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় স্পিকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রয়োজন হলে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসেও শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো এমপির সদস্যপদ হারানোর নজির নেই।

অন্যদিকে আইনজ্ঞ ও নির্বাচন বিশ্লেষক কেউ কেউ বলেছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের এমপি পদে বহাল থাকার আইনি ভিত্তি নেই। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নজরুলকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তটি খুব শিগগিরই তারা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানাবে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক তদন্ত শেষে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে গতকাল জানায় জামায়াতে ইসলামী। এরপর দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। 

বহিষ্কারের পর প্রতিক্রিয়া

তরুণীর সঙ্গে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের প্রকাশিত ভিডিওর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ‘মহান সংসদ’-এর মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তার ভাষায়, অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কলঙ্কমুক্ত হবেন, আর সত্য হলে সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ফেসবুকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘দলটি যেহেতু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাচ্ছে, তাই বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির দিকে যাবে।’ তার মতে, বহিষ্কৃত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা বলা হলেও গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে ঘটেছে ‘বহিষ্কার’।  শিশির মনির আরও বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে, না।’ তার মতে, এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার সাংবিধানিক ভিত্তি আর অবশিষ্ট থাকে না।

সংবিধান ও নির্বাচনি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টির মূল ভিত্তি নির্বাচন কমিশনের আইন নয়, বরং সংবিধান। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি (ক) দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা (খ) সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এমন কোনো বিধান নেই যে, কোনো রাজনৈতিক দল তার মনোনীত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা শুরু হয় তখনই, যখন কোনো আসন সাংবিধানিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় শূন্য ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ কমিশন নিজে আসন শূন্য ঘোষণা করে না; বরং সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর উপনির্বাচনের ব্যবস্থা নেয়।

কী করবে নির্বাচন কমিশন?

গতকাল এ বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত কী হবে–জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত দলীয় চিঠি পেলে করণীয় বিষয়ে কমিশন সভায় পর্যালোচনা করা হবে। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগে চিঠি আসুক, তারপর দেখা যাবে।’ তিনি আরও জানান, সংসদ সদস্যের আসনসংক্রান্ত বিষয়ে সংসদ সচিবালয় ও স্পিকারের ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্ত এলেই কমিশন আসন শূন্য ঘোষণা করবে এমন বিধান নেই।

এ বিষয়ে গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে ইসিতে এখনো কোনো নোটিশ আসেনি। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে রয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কমিশন।

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী অবশ্য নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে তার এমপি পদে বহাল থাকার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে, তাহলে তিনি আর সেই দলের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না। তবে আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নয়, এটি সংসদের স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের বিষয়। স্পিকার আসন শূন্য ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে, এরপর উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই হতে হবে।

এমন ঘটনার নজির কি আছে?

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর শুধু সেই কারণেই কোনো এমপি সদস্যপদ হারিয়েছেন, এমন প্রতিষ্ঠিত নজির নেই। ২০২১ সালে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে মন্ত্রিত্ব হারালেও সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল। 

সংসদ সদস্যপদ থাকা নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক হয় ২০১৫ সালে, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত টাঙ্গাইল-৪ আসনের এমপি লতিফ সিদ্দিকীকে কেন্দ্র করে। হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। 

এ ঘটনায় দশম জাতীয় সংসদের স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠান, কমিশন শুনানির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে গিয়ে ১৫ মিনিটের আবেগময় এক বক্তৃতা দিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ফলে তার ক্ষেত্রে সদস্যপদ বহিষ্কারের কারণে নয়, স্বেচ্ছা পদত্যাগের মাধ্যমে সে আসনটি শূন্য হয়। 

পদোন্নতি-পদায়নে টানাপোড়েন: আগে বঞ্চিত এখন অবহেলিত

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম
পদোন্নতি-পদায়নে টানাপোড়েন: আগে বঞ্চিত এখন অবহেলিত
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে এখনো বেশ টানাপোড়েন চলছে সরকারের প্রশাসন বিভাগে। বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের একাধিক স্তরে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে বঞ্চিত অনেক কর্মকর্তা এখনো অবহেলা-অবজ্ঞার শিকার হচ্ছেন বলে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। 

ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা ও প্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের প্রশাসন বিভাগে প্রথম বড় সংখ্যক পদোন্নতিও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়, যাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিতরাও রয়েছেন। মূলত, এই পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের পর থেকেই নতুন করে প্রশাসনে অসন্তোষ ও এক ধরনের ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) প্রায় আট মাস যাচাই-বাছাই করার পর এই পদোন্নতির পর্যায়ে আসে। কিন্তু এতকিছুর পরও এমন ত্রুটি কীভাবে হলো, তা তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির সুপারিশের দায়িত্ব এই বোর্ডের ওপরই ন্যস্ত থাকে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, অবহেলিত ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের উদাহরণ হিসেবে সচিবালয়ে প্রশাসনের ১৫ ও ১৮তম ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম আলোচনায় রয়েছে। আলোচনায় থাকা এই কর্মকর্তাদের অধিকাংশই ছাত্রজীবনে ছাত্রদল বা বিএনপির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় টানা তিন-চার ধাপ পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে বেশকিছু কর্মকর্তাকে দ্রুত পদোন্নতি, এমনকি একসঙ্গে একাধিক পদন্নোতি দেয়। কিন্তু তখনো কিছু বঞ্চিত কর্মকর্তা গুরুত্ব পাননি। বর্তমান সরকারের সময়েও সেসব কর্মকর্তার অনেকেই এখনো সংযুক্ত (ওএসডি) অবস্থায় রয়েছেন বা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বলে অনেকে অভিযোগ করেন। 

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কর্মকর্তারা প্রশাসনে পদোন্নতি-পদায়ন-সংক্রান্ত বৈষম্য দূর হওয়ার আশা করলেও বর্তমানে ‘অবমূল্যায়ন’ বা অবহেলার মাঝেই অনেককে দিন পার করতে হচ্ছে। ফলে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে একশ্রেণির কর্মকর্তার মাঝে, যার প্রভাব পড়ছে প্রশাসনের নিয়মিত কাজকর্মেও।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় ধীর হয়ে গেছে। আগে যেসব ফাইল নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হতো, এখন সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। এতে একটি ফাইল নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং প্রশাসনের গতি কমে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তাই পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনা করেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সমর্থক হলেই ভালো পদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই। এতে সরকারি চাকরিতে পদন্নোতি-পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য যাদের রয়েছে—তাদের মূল্যায়ন করা উচিত।

গতকাল জনপ্রশাসনের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া গেছে নানা হতাশার গল্প। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত করা হয়েছে অনেক কর্মকর্তাকে। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেসব কর্মকর্তার যথাযথ মূল্যায়ন করছে না। 

কর্মকর্তাদের দাবি–একটি প্রভাবশালী ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলে সচিবালয়ের সর্বত্র গুঞ্জন রয়েছে। এই সিন্ডিকেট প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে এবং তুলনামূলক কম যোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে প্রশাসনের ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। মূলত, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবেই সম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিতে গিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ঘিরে একটি প্রভাবশালী মহল পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ বা গুঞ্জন রয়েছে সচিবালয়ে।

সংশ্লিষ্টদের মতে–মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনে কাজের গতি বাড়বে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুপ্রেরণা বাড়বে, আস্থা ফিরবে এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও আরও দ্রুত হবে। তাদের মতে, অতীতের রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে সরকারের জন্য কল্যাণকর।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, যারা দীর্ঘদিন বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়নে সরকারের পরিকল্পনা কী, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি প্রতিমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০ এএম
আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী

স্বাস্থ্য বিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি সরকারি টেন্ডারে কারসাজি, চিকিৎসক বদলি ও পদোন্নতি-বাণিজ্যসহ বেপরোয়াভাবে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত আছেন। 

এ ব্যাপারে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানান, অভিযোগটি দুদক চেয়ারম্যানের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে কমিশন না থাকায় সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। তবে কমিশন পুনর্গঠন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাস্থ্য সেক্টরের অন্যতম বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এইচটিএমএসের মালিক আফতাব আহমেদ ও তার সিন্ডিকেটের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই সচিব কামরুজ্জামানের সখ্য রয়েছে। বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। ফরিদপুরের বাসিন্দা আফতাব আহমেদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জামাতার ঘনিষ্ঠ ও ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে পরিচিত। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক, মোহাম্মদ নাসিম ও জাহিদ মালেকদের সময়ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করতেন এই আফতাব আহমেদ। কামরুজ্জামান স্বাস্থ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই আফতাব আহমেদের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা সমমূল্যের ইউরো উপহার হিসেবে নিয়েছেন। 

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সচিব কামরুজ্জামান মাঝে মাঝেই আবাহনী মাঠের পাশে আফতাব আহমেদের অফিসে যাতায়াত করেন। আফতাব আহমেদ সিন্ডিকেটের প্রভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ইউনিভার্সিটি প্রকল্পের প্যাকেজ-২-এর কাজ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওই প্রকল্পে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন, দ্বিতীয় এনডিই এবং তৃতীয় স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং বাদ পড়ার পর, চতুর্থ অবস্থানে থাকা ‘মজিদ অ্যান্ড সন্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিকভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন সচিব কামরুজ্জামান। মজিদ অ্যান্ড সন্সের জমা দেওয়া নথিপত্রে চীনা কোম্পানির মালিকের যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে তা ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিধি (ডেলিগেশন অব ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার) অনুযায়ী, কেনাকাটা ও অর্থ পরিশোধের নথি মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে অনুমোদনের কথা থাকলেও সচিব কামরুজ্জামান নিজেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তা অনুমোদন দিচ্ছেন। বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের বিল ও সিএমএসডির বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরাসরি ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা ‘পিসি’ নেওয়া হচ্ছে, যা এখন স্বাস্থ্য বিভাগে ওপেন সিক্রেট।

বদলি ও পদোন্নতি-বাণিজ্য

দুদকে জমা অভিযোগ থেকে জানা যায়, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বদলি এবং পদোন্নতি এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসকদের বদলি বা পদোন্নতির জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা বনিবনা না হলে চিকিৎসকদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়।

নেপথ্যে মূল সহযোগী পিএস সাকিব

দুদকে জমা দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট ধরে রাখা ও কমিশন-বাণিজ্যের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সচিবের পিএস নাজমুস সাকিব। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নাজমুস সাকিব বর্তমানে স্বাস্থ্য সচিবের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দেখভাল করছেন।

সিলেটের কানাইঘাটে ২ কলেজ স্থাপন করতে জালিয়াতির অভিযোগ

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫০ এএম
আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫১ এএম
সিলেটের কানাইঘাটে ২ কলেজ স্থাপন করতে জালিয়াতির অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মফস্বল বা গ্রাম এলাকায় কোনো এমপিওভুক্ত কলেজের চার কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কলেজ স্থাপনের নিয়ম নেই। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

সম্প্রতি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় দুটি ভুয়া কলেজ স্থাপনে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির নাম সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজ ও সড়কের বাজার মহিলা কলেজ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ও পরিসংখ্যান কার্যালয়ের সরকারি নথি জালিয়াতি করে দুটি কলেজের পক্ষে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করা হয়।

বোর্ডের অনুমোদন না মিললেও এই দুই কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। সড়কের বাজার মহিলা কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলমের (যিনি মূলত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী পদে কর্মরত) প্রভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চলতি মাসেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশে নতুন বেসরকারি কলেজ স্থাপন ও পাঠদানের অনুমতি পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী একাধিক শর্ত পূরণ করতে হয়। জমির পরিমাণ ও অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সংখ্যা, এলাকার চাহিদা, আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষক আছেন কি না, তা দেখা হয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র ও উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের জনসংখ্যার সনদপত্র। এর ভিত্তিতে ওই উপজেলায় আরও কলেজের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। সড়কের বাজার মহিলা কলেজের প্রত্যয়ন ও সনদপত্র দুটিই ভুয়া ছিল। 

জানা যায়, সড়কের বাজার মহিলা কলেজের প্রত্যয়নের জন্য আবেদন করেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। আবেদনে তিনি নিজেকে কলেজটির বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আবেদনে কানাইঘাট উপজেলাকে জনবহুল ও শিক্ষাবঞ্চিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র সিলেট শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন।

কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ইউএনও স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র যেটি জাহাঙ্গীর আলম জমা দিয়েছেন সেটি ছিল ভুয়া। তার জমা দেওয়া আবেদনপত্রের স্মারক নম্বরের শেষ চার সংখ্যা ১৪৯৪, যা মূলত একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনের জন্য কৃষি কর্মকর্তাকে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার স্মারক নম্বর। অথচ একই নম্বরের স্মারকে মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজের মতো করে প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে শিক্ষা বোর্ডে জমা দেন। 

একইভাবে জালিয়াতি করেছেন উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের জনসংখ্যা সনদপত্রেও। বোর্ডে যে সনদপত্র জমা দেওয়া হয়েছে তাতে স্বাক্ষর করেন উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আতিকুল কবীর। তারিখ উল্লেখ ছিল ২০২৫ সালের ১৬ জুন। অথচ এই কর্মকর্তা ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত এ অফিসে কর্মরত ছিলেন, অর্থাৎ এই নথিটিও ভুয়া।

অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রভাবের কিছু নেই। স্থানীয়রা চেয়েছেন, আমি আবেদন করেছি। জালিয়াতির বিষয়টি অন্য বিষয়। এটি বোর্ডের অভ্যন্তরের ঘটনা। আমরা মন্ত্রণালয়ে ফের আবেদন করেছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছে কলেজটির অনুমোদন দেওয়া হবে।’

মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।’ তবে কলেজে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ ভর্তি নীতিমালায় অনুমতি ও স্বীকৃতিবিহীন কলেজ ও সমমান প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নীতিমালার ৮.১ ধারায় বলা হয়েছে, স্থাপনের অনুমতি আছে কিন্তু পাঠদানের অনুমতি নেই এমন কলেজ শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না।

কিন্তু কলেজ দুটির ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশনের গল্প আরও ভিন্ন। স্থানীয় শাহবাগ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ বশির আহমদ। তিনি স্কুল শাখার শিক্ষক। কিন্তু তিনি সরকারি বিধির ধার ধারেন না। তিনি সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি ও ডিরেক্টর। এই কলেজে শিক্ষকসহ জনবল নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেন। এই শিক্ষক বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থী ম্যানেজ করে অনুমোদনহীন কলেজটিতে ভর্তি করান।

মানবিক বিভাগে কলেজটিতে ভর্তি হয়েছেন এমন অন্তত ১৮ শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন ও রোল নম্বর খবরের কাগজের হাতে রয়েছে। ওই কলেজের সরকারি নিবন্ধন না থাকায় অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করেছেন শাহবাগ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে। জানতে চাইলে বশির আহমদ নিজেকে স্কুল শাখার শিক্ষক বলে নিশ্চিত করেন। তিনি সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত সভাপতি ডিরেক্টর কি না, এমন প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে যান, যা ইচ্ছা তার ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জোর গলায় বলেন।

অনুমোদনবিহীন ওই কলেজটিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির দায়িত্বে আরও একজন আছেন। তিনি কানাইঘাট সরকারি কলেজের প্রভাষক শিহাব উদ্দিন। একই সঙ্গে সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজের স্বঘোষিত ডেপুটি ডিরেক্টর। তিনি এই কলেজে ২১ শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান বিভাগে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সড়কের বাজার মহিলা কলেজে ছাত্রী ভর্তির দায়িত্বে আছেন গাছবাড়ী আইডিয়াল কলেজের প্রভাষক (আইসিটি) রুমেন আহমেদ। তিনি বিজ্ঞান বিভাগের আট ছাত্রীকে অর্থের বিনিময়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তবে মহিলা কলেজটির মানবিক বিভাগের দায়িত্বে আছেন সানুর মিয়া। তিনি চরিপাড়া উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের প্রধান। মহিলা কলেজটিতে ভর্তি হওয়া মানবিক বিভাগের ২৩ জন শিক্ষার্থীকে তিনি নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে রুমেন আহমেদ বলেন, ‘আমি কলেজের সাধারণ শিক্ষক, আমি প্রিন্সিপাল নই। অনলাইনে কোনো রেজিস্ট্রেশন আমি করিনি। অর্থ নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। আমরা শুধু আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করেছি।’ 

সিলেট শিক্ষা বোর্ড  বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সড়কের বাজার ইউনাইটেড কলেজ ও সড়কের বাজার মহিলা কলেজ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না–এমন আদেশ দেয়। শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম যেন পরিচালনা করতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি।

জানতে চাইলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা অব। তারা জালিয়াতি করে বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের ফোন আসছে। কিন্তু আমরা অনুমোদন দিইনি। এই দুই অনুমোদন না পাওয়া কলেজে ভর্তি না করার বিষয়ে বোর্ডের পক্ষে আদেশ জারি করা হয়েছে।’

শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে তিনি বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ভুয়া কলেজও শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে। অন্য কলেজের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা যায়। এমন নিয়মে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না,

এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই নিয়ম বাদ দিতে আমরা আন্তশিক্ষা বোর্ডে আবেদন করেছি। নিয়ম পরিবর্তন না হলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়বে। ইআইআইএন (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর) ছাড়া প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সন্তান ভর্তি করা উচিত নয়।’

আন্তশিক্ষা বোর্ড কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, যারা নিয়মের সুযোগ নিচ্ছে, এটি তাদের বিষয়। নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হতেই এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম ঘটলে আইন প্রয়োগ করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, চলতি বছরের ১৫ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখা-৬-এ জাল সনদ দাখিলকারী সড়কের বাজার মহিলা কলেজ নামীয় অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের স্বঘোষিত সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। ১০০ গজের ব্যবধানে দুটি অনুমোদনহীন কলেজের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সিলেট শিক্ষা বোর্ড ও মাউশিকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

মানবপাচারের ভয়াবহ রুট ক্যাম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ এএম
আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
মানবপাচারের ভয়াবহ রুট ক্যাম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড
ছবি: সংগৃহীত

মানবপাচারের ভয়াবহ ও অপ্রতিরোধ্য রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ক্যাম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এই দুটি দেশের ভিসা পাওয়া তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এই রুটকে নিরাপদ হিসেবে বেছে নিচ্ছে মানবপাচারকারী চক্রগুলো। 

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মাত্র কয়েকদিনে ভিসা করিয়ে উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্বোডিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের। পরে জোরপূর্বক সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও অমানবিক শ্রমে বাধ্য করার ঘটনা ঘটছে অহরহ। থাইল্যান্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া এবং লাওসসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাচারের ঘটনা ঘটছে উদ্বেগজনকভাবে। 

চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত মার্চে ১৬ জন বাংলাদেশিকে ইয়াই ও সংখলা থেকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করে থাই পুলিশ। উদ্ধারের পর জানা যায়, তাদের তিন দিন কোনো খাবার ও পানি না দিয়ে আটকে রাখে পাচারকারীরা। উন্নত জীবনের আশায় এই পথে পা বাড়িয়ে কত বাংলাদেশির যে মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে, তার হিসাব নেই সরকারের কাছেও। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচারকারীরা স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ তরুণদের পর্যটক ভিসায় প্রথমে থাইল্যান্ড বা ক্যাম্বোডিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে। পরে এই দুই দেশের দুর্গম সীমান্ত ও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াসহ অন্য দেশে পাচার করা হচ্ছে। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত বাংলাদেশি তরুণ থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আটক হয়ে এখন কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 

থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার মতো বিশাল দুটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গম এলাকায় কত নিরীহ বাংলাদেশি আটক আছে, তার খোঁজখবর নিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাস। এই দুটি দেশের কারাগারে এখনো আটকে আছে কয়েক হাজার বাংলাদেশি। তাদের নিরাপদে দেশে পাঠানোর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান, কারাগার পরিদর্শন এবং সেখান থেকে মুক্তি, ট্রাভেল পাস ইস্যু করা, সবকিছুই করতে হচ্ছে সীমিত লোকবল দিয়ে। এ ছাড়া ব্যাংকক থেকে ক্যাম্বোডিয়ায় গিয়ে একইভাবে কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠিপত্র আদান-প্রদান, কারাগার পরিদর্শন এবং ট্রাভেল পাস ইস্যু করে সেখান থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানোর কাজটি অত্যন্ত দুরূহ বটে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব রুটে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের খবর না পাচ্ছে তাদের পরিবার, না পাচ্ছে এসব দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাবেক কর্মকর্তা আসিফ মুনীর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার ভিসা পাওয়া তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এবং এর সঙ্গে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারীরা। সস্তা অভিবাসন ব্যয়ের কথা বলে ও উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এই রুটে সহজেই বাংলাদেশি তরুণদের নিয়ে যাচ্ছে পাচারকারীরা। পরে তাদের দিয়ে নানা অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এদের নেটওয়ার্ক এত শক্তিশালী যে, তাদের বেশির ভাগই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নির্বিঘ্নে কাজ করে থাকে। এ ছাড়া ক্যাম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ক্যাম্বোডিয়ায় বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সেবা দেওয়া কঠিন কাজ। এ বিষয়ে সরকারের প্রতি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
 
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নানা ধরনের প্রতারণা এবং জাল ভিসায়ও থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ায় নিরীহ বাংলাদেশিদের নিয়ে যাচ্ছে পাচারকারীরা। তাদের সাইবার অপরাধসহ নানা অপকর্মে বাধ্য করা হয়েছে। পরে তাদের অনেকেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আটক হয়েছে। তাদের ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। এমন প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশিকে ক্যাম্বোডিয়ায় গিয়ে ট্রাভেল পাস দিয়ে দেশে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। সূত্র জানায়, ক্যাম্বোডিয়ায় যেসব স্ক্যাম সেন্টার ও ক্যাসিনো ছিল সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে দেশটির সরকার। এসব জায়গায় বহু বাংলাদেশি ভ্রমণভিসায় গিয়ে চাকরি করত। এখন এসব বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশিরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে সেখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ পাচারচক্র। তারা এসব বাংলাদেশিকে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে পাচার করছে। 
   
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) গত সপ্তাহে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ক্যাম্বোডিয়ায় মানবপাচার চক্রের মূল হোতা মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকীকে (৪০) গ্রেপ্তার করে। বনশ্রী-সংলগ্ন আফতাবনগর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মাহাফুজ উল্লাহ সিদ্দিকী বিমানবন্দর থানার মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশে দায়েরকৃত মামলার এজাহারনামীয় আসামি। মাহাফুজ উল্লাহ ক্যাম্বোডিয়ায় মানবপাচার চক্রের অন্যতম মূল হোতা বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব পাচার এখন আন্তদেশীয় অপরাধ। এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এটি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত ছাড়া বড় চক্র প্রতিরোধ করা কঠিন। মানব পাচারকারীরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত। তারা ভুয়া ভিসা, প্রতারণামূলক চাকরির অফার এবং দীর্ঘ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। একই চক্র ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। তবে অনলাইনে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে হবে।