তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশের পর জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ থাকা না থাকা নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের ওই এমপির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সংবিধান ও প্রচলিত নির্বাচনি আইনের বিধান বলছে, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে, সংবিধানে বর্ণিত অযোগ্যতা সৃষ্টি হলে অথবা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় স্পিকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রয়োজন হলে আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসেও শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে কোনো এমপির সদস্যপদ হারানোর নজির নেই।
অন্যদিকে আইনজ্ঞ ও নির্বাচন বিশ্লেষক কেউ কেউ বলেছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের এমপি পদে বহাল থাকার আইনি ভিত্তি নেই। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নজরুলকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তটি খুব শিগগিরই তারা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানাবে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক তদন্ত শেষে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে গতকাল জানায় জামায়াতে ইসলামী। এরপর দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কারের পর প্রতিক্রিয়া
তরুণীর সঙ্গে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের প্রকাশিত ভিডিওর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ‘মহান সংসদ’-এর মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তার ভাষায়, অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কলঙ্কমুক্ত হবেন, আর সত্য হলে সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ফেসবুকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘দলটি যেহেতু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাচ্ছে, তাই বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির দিকে যাবে।’ তার মতে, বহিষ্কৃত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ‘পদত্যাগ’-এর কথা বলা হলেও গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে ঘটেছে ‘বহিষ্কার’। শিশির মনির আরও বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে, না।’ তার মতে, এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার সাংবিধানিক ভিত্তি আর অবশিষ্ট থাকে না।
সংবিধান ও নির্বাচনি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টির মূল ভিত্তি নির্বাচন কমিশনের আইন নয়, বরং সংবিধান। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি (ক) দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা (খ) সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এমন কোনো বিধান নেই যে, কোনো রাজনৈতিক দল তার মনোনীত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা শুরু হয় তখনই, যখন কোনো আসন সাংবিধানিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় শূন্য ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ কমিশন নিজে আসন শূন্য ঘোষণা করে না; বরং সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর উপনির্বাচনের ব্যবস্থা নেয়।
কী করবে নির্বাচন কমিশন?
গতকাল এ বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত কী হবে–জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত দলীয় চিঠি পেলে করণীয় বিষয়ে কমিশন সভায় পর্যালোচনা করা হবে। সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগে চিঠি আসুক, তারপর দেখা যাবে।’ তিনি আরও জানান, সংসদ সদস্যের আসনসংক্রান্ত বিষয়ে সংসদ সচিবালয় ও স্পিকারের ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্ত এলেই কমিশন আসন শূন্য ঘোষণা করবে এমন বিধান নেই।
এ বিষয়ে গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে ইসিতে এখনো কোনো নোটিশ আসেনি। বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে রয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কমিশন।
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী অবশ্য নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে তার এমপি পদে বহাল থাকার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘দল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন প্রতিনিধিকে বহিষ্কার করে, তাহলে তিনি আর সেই দলের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না। তবে আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নয়, এটি সংসদের স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের বিষয়। স্পিকার আসন শূন্য ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে, এরপর উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই হতে হবে।
এমন ঘটনার নজির কি আছে?
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর শুধু সেই কারণেই কোনো এমপি সদস্যপদ হারিয়েছেন, এমন প্রতিষ্ঠিত নজির নেই। ২০২১ সালে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে মন্ত্রিত্ব হারালেও সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল।
সংসদ সদস্যপদ থাকা নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক হয় ২০১৫ সালে, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত টাঙ্গাইল-৪ আসনের এমপি লতিফ সিদ্দিকীকে কেন্দ্র করে। হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ ঘটনায় দশম জাতীয় সংসদের স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠান, কমিশন শুনানির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে গিয়ে ১৫ মিনিটের আবেগময় এক বক্তৃতা দিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ফলে তার ক্ষেত্রে সদস্যপদ বহিষ্কারের কারণে নয়, স্বেচ্ছা পদত্যাগের মাধ্যমে সে আসনটি শূন্য হয়।