যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপে তৈরি হওয়া সংকট ও এর প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন দেশের স্বনামধন্য পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান ক্লিপটন গ্রুপের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এম ডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার এ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম
খবরের কাগজ: সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ স্থগিত করে ২৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর প্রভাব কি পড়তে শুরু করেছে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: যুক্তরাষ্ট্রে আগে শুল্ক দিতে হতো ১৬ শতাংশ। সেখান থেকে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছিল, পরে তা স্থগিত করে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ২৬ শতাংশ করা হয়েছে। এই ১০ শতাংশ বৃদ্ধি আপাতত তিন মাসের জন্য। কিন্তু তিন মাস পর কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এই শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক খাত হিমশিম খাচ্ছে। অনেক ক্রেতা অর্ডার স্থগিত করে ৫ শতাংশ ডিসকাউন্ট দাবি করছে। অনেকে বাধ্য হয়ে তা মেনে নিচ্ছেন। অনেক চুক্তিতে ক্রেতা ৫ শতাংশ দিচ্ছে, মালিকরা আরও ৫ শতাংশ ছাড় দিচ্ছেন। এর ফলে দেশের প্রায় ১২৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা লাভ হারিয়েছে, আর ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। পরিস্থিতি এখন সংকটজনক। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন দিতে মালিকদের পাশে সরকার ও ব্যাংকগুলোকে দাঁড়াতে হবে।
খবরের কাগজ: আগামীতে আরএমজি খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: পোশাকশিল্প মালিকরা যেসব অর্ডার নেন, তাতে লাভ হয় মাত্র ২ থেকে ২.৫ শতাংশ। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এর বেশি মার্জিন রাখা সম্ভব নয়। এখন ৫ শতাংশ শুল্ক ভাগাভাগি করতে গিয়ে লাভের বদলে আরও ২.৫ শতাংশ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এটা কয়টা কারখানার পক্ষে সম্ভব? অনেকেই ব্যাংক ঋণ ও ধার দেনায় জর্জরিত হয়ে যাবেন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে না পেরে কারখানা বন্ধ করে দিতেও বাধ্য হতে পারে। কারণ চলমান অর্ডারগুলোতে এই অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের হিসাব ছিল না।
খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্র সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধি করেছে, চীনের ওপর আরও বেশি। এর সুফল কি আমরা পাব?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: ১০ শতাংশ শুল্ক সব দেশের ওপর বাড়ানোয় এটা সর্বজনীন একটা বিষয়। এতে এককভাবে কোনো দেশ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে চীনের ওপর বাড়তি শুল্ক বাংলাদেশসহ কিছু দেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে তিন মাস পর বোঝা যাবে বাংলাদেশের কতটা লাভ হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামও এই সুযোগ পাবে। আমরা আশা করছি, দেশের ইপিজেডগুলোতে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে না গিয়ে আমাদের মতো দেশগুলোতে বিনিয়োগ করে পণ্য রপ্তানি করতে পারে।
খবরের কাগজ: সরকারের উদ্যোগে কি আপনারা সন্তুষ্ট?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: হ্যাঁ, সরকার সঠিক পথেই এগোচ্ছে। দ্রুত সময়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, আলোচনা চলছে। সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু সুবিধা দেওয়ার কথাও চিন্তা করতে হবে। সরকার-টু-সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে বলেই আমরা আশা করি। আগের ৩৭ শতাংশ শুল্ক তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে, এটাও বড় অর্জন।
খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বাণিজ্যে তারতম্যের শঙ্কা করছেন?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের আরএমজি খাতে ১০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়। সব মিলিয়ে ১৪ বিলিয়নের মতো বাণিজ্য হয়। এ সংকট শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্পকারখানা স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, ট্রাম্প শুধু বাংলাদেশের নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরেও শুল্ক বসিয়েছেন। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা সফট কর্নার আছে বলেই মনে করি। আমাদের সরকারকে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে বাণিজ্য বাড়াতে হবে।
খবরের কাগজ: এ সমস্যা সমাধানে আর কোন পথ আছে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: আমরা যদি আমেরিকা থেকে গম, এলএনজি, তুলা, সয়াবিন, শস্য ইত্যাদির আমদানি বাড়াই, তাহলে বাণিজ্য ভারসাম্য আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিতে ভারস্যাম্য আনা গেলে সম্পর্ক উন্নত হবে।
খবরের কাগজ: সম্প্রতি কিছু বিদেশি পণ্যের দোকানে হামলার প্রভাব কি রপ্তানি বাণিজ্যে পড়তে পারে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: এসব পণ্যের মালিকও আমাদের দেশের কেউ না কেউ। কেউ না কিনলে ক্ষতি নেই, কিন্তু হামলা বা ধ্বংস কোনো যুক্তিসংগত কাজ না। সরকার যেভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করি।
খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গার্মেন্ট ব্যবসার ১৮ শতাংশ হয়। অন্য দেশের ব্যবসায় প্রভাব পড়বে কী?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: হ্যাঁ, পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি অন্য দেশও একই রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে আমরা সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা করতে চাই।
খবরের কাগজ: এ সংকট সমাধানে আর কী করা যেতে পারে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: আমাদের প্রধান শক্তি হলো আমরা কম দামে ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করি। এতে যুক্তরাষ্ট্রও উপকৃত হয়। এক মার্কিন সিনেটর বলেছেন, বাংলাদেশের ওপর এভাবে শুল্ক বসানো ঠিক হয়নি- এটা আমাদের জন্য আশার কথা।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী: কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক জিরো করে দেওয়া উচিত। এতে প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকারখানা বাড়বে। আরএমজির মতো সব সেক্টরে সুবিধা দিলে দেশে শিল্পায়ন হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, সরকার রাজস্বও পাবে।