ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯,৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
Nagad desktop

নতুন অর্থনীতির রূপকার ই-কমার্স

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৫, ০৮:৪৭ এএম
আপডেট: ০৮ মে ২০২৫, ০৯:০৩ এএম
নতুন অর্থনীতির রূপকার ই-কমার্স
ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

ই-কমার্স শুধু একটি কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম নয়- বরং এটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করে, রপ্তানির সম্ভাবনা জাগায়। এ খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে খবরের কাগজ কথা বলেছে ড্যাফোডিল ফ্যামিলির গ্রুপ সিইও ও গ্রীন ডাটা লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের সঙ্গে-

খবরের কাগজ: আপনি একটি নতুন টার্ম ‘ই-কমার্স ইকোনমি’ ব্যবহার করছেন, এটা দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন?

নূরুজ্জামান: ই-কমার্স ইকোনমি বলতে বোঝায় এমন একটি আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি, যা অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট, দ্রুত ডেলিভারি সেবা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। এটি শুধু একটি কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম নয়- বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রাজস্ব বৃদ্ধি করে, রপ্তানি সম্ভাবনা জাগায় এবং দেশের অর্থনীতিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ই-কমার্স ইকোনমি গড়ে উঠলে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। বিশেষ করে: মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। নারী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করবে। প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব প্রবাহ সৃষ্টি হবে, যা সরকারের আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সহজতর হবে, যা রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

অতএব, ই-কমার্সকে কেবল একটি খাত হিসেবে নয়, বরং ‘নতুন অর্থনীতির রূপকার’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং বাণিজ্যিক কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এর সঠিক বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি টেকসই, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশে ই-কমার্স জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন?

নূরুজ্জামান: বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, এটি এখনো জিডিপির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা, যা এই খাতকে পূর্ণমাত্রায় অর্থনীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হতে বাধা দিচ্ছে। প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো: 

অফিশিয়াল স্বীকৃতির অভাব: বাংলাদেশের বেশির ভাগ ই-কমার্স ব্যবসা এখনো ইনফর্মাল বা ফেসবুকভিত্তিক ফরম্যাটে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ট্রেড লাইসেন্স, বিন, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন নেই। ফলে এসব ব্যবসা জাতীয় আয় বা জিডিপির হিসাবভুক্ত হতে পারছে না। নগদ লেনদেনের প্রাধান্য। অধিকাংশ লেনদেন এখনো ক্যাশ-অন-ডেলিভারিভিত্তিক, যা ব্যাংকিং চ্যানেল বা ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে প্রতিফলিত হয় না। ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিসংখ্যানে এর উপস্থিতি দুর্বল থেকে যায়।
ডেটা ঘাটতি: পরিসংখ্যান ব্যুরো, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন (ই-ক্যাব) বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে ই-কমার্স খাতভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় ও নির্ভরযোগ্য ডেটাবেস নেই। ফলে সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। 

নীতিগত অস্পষ্টতা ও প্রণোদনার অভাব : একটি স্পষ্ট নীতিমালা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনার অভাবে অনেক উদ্যোক্তা ফর্মাল ইকোনমির আওতায় আসতে আগ্রহী হন না।

খবরের কাগজ: এর সমাধান ও করণীয় কী ?

নূরুজ্জামান: এই বাস্তবতা পাল্টাতে হলে প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ। এর জন্য স্মার্ট বিডিআইডি চালু করে প্রতিটি ই-কমার্স ব্যবসাকে একটি ইউনিক ডিজিটাল পরিচিতির আওতায় আনতে হবে। ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে এবং এই ব্যবস্থার ব্যবহারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন, ই-ক্যাবের নেতৃত্বে একটি জাতীয় ই-কমার্স ডেটা ড্যাশবোর্ড গঠন করতে হবে, যেখানে রিয়েল-টাইমে ব্যবসার ধরন, আয়, লেনদেন ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সূচক সংরক্ষিত ও বিশ্লেষণযোগ্য থাকবে। সঠিক নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ই-কমার্স খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব, যা জিডিপি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।

খবরের কাগজ: ‘গ্লোবাল বাংলাদেশ’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?

নূরুজ্জামান: ‘গ্লোবাল বাংলাদেশ’ এখন শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি- যেখানে বাংলাদেশি পণ্য ও উদ্যোক্তা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে। এই ভিশন বাস্তবায়নে সবচেয়ে সহজ ও সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে ই-কমার্স। শপিফাই, অ্যামাজন, ইটসি, ইবে-এর মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে এখন সহজেই বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে। জামদানি, হস্তশিল্প, হালাল স্কিন কেয়ার, দেশি ফুড বা কসমেটিকস-এসব পণ্য বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল মার্কেটিং, ক্রস-বর্ডার লজিস্টিকস ও পেমেন্ট গেটওয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা তৈরি করা গেলে এই খাত হতে পারে নতুন রপ্তানি জোন।

খবরের কাগজ: আপনি কেন বলছেন ‘ই-কমার্স ইকোনমি’ একটি আন্দোলন হতে পারে?

নূরুজ্জামান: কারণ ই-কমার্স ইকোনমি কেবল একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়- এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী উপাদান। এই খাত আমাদের চোখের সামনে এমন কিছু পরিবর্তন আনছে, যা অন্য কোনো খাতে এত বিস্তৃত ও বহুমাত্রিকভাবে একসঙ্গে দেখা যায় না। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই আয় করছেন, তরুণরা চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করছেন, এবং গ্রামের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পণ্য শহরের ক্রেতার হাতে পৌঁছাচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। ই-কমার্স শুধুই বিক্রির মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠছে কর্মসংস্থান, স্বনির্ভরতা এবং অন্তর্ভুক্তির এক অনন্য মঞ্চ।

খবরের কাগজ: তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার পরিকল্পনা কি? 

নূরুজ্জামান: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের ওপর। তবে, এই বিশাল সম্ভাবনাময় শক্তিকে ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে প্রয়োজন ব্যবহারিক শিক্ষা ও বাস্তব সহযোগিতা। শুধু তত্ত্বীয় জ্ঞান নয়, তরুণদের হাতে তুলে দিতে হবে কার্যকরী সরঞ্জাম, যাতে তারা নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারবে।

খবরের কাগজ: নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কি করবেন?

নূরুজ্জামান: নারীরা হচ্ছেন ঘরে বসে ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অংশীদার। তারা শুধু পরিবার নয়, দেশকেও সামনে এগিয়ে নিতে পারেন- যদি দেওয়া যায় প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহায়ক কাঠামো। বাংলাদেশে হাজার হাজার নারী ঘরে বসে অনলাইনে পণ্য তৈরি ও বিক্রি করছেন। কিন্তু এখনো তাদের বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে, আমাদের প্রয়োজন একটি লক্ষ্যভিত্তিক, নারীবান্ধব ই-কমার্স নীতি ও কাঠামো। 

খবরের কাগজ: গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে আপনার রোডম্যাপ কি?

নূরুজ্জামান: বর্তমান সময়ের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার। নানা ধরনের প্রতারণা, পণ্য নিয়ে বিভ্রান্তি, এবং অভিযোগের সমাধানে বিলম্ব- সব মিলিয়ে অনেক ভোক্তা অনলাইন কেনাকাটায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অথচ আস্থা ছাড়া কোনো ইকোসিস্টেম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দরকার একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো, যা গ্রাহক, বিক্রেতা ও প্ল্যাটফর্ম- তিন পক্ষকেই সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা দেবে। 

খবরের কাগজ: নির্বাচিত হলে আপনার প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কি হবে?

নূরুজ্জামান: একটি স্বচ্ছ, সুশাসিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ই-কমার্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুরুতেই দরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ। সে লক্ষ্যেই প্রথম ১০০ দিন হবে ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরির সময়। এই সময়ে আমরা সাতটি অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করব। ‘এক ব্যবসা, এক পরিচিতি’ নীতির ভিত্তিতে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, স্বয়ংক্রিয় ও একক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে। গ্রাহকের আস্থা, নিরাপদ লেনদেন ও সঠিক বাণিজ্য আচরণ নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা হবে। সদস্যদের তথ্য, অভিযোগের ধরন ও সমাধানের অগ্রগতি কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি জাতীয় তথ্যভিত্তিক প্যানেল গঠন করা হবে। নিয়মিত মতবিনিময় ও সমস্যা সমাধানের জন্য সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সহায়তা ইউনিট করা হবে, যাতে নারী ও ছোট উদ্যোক্তারা সহজে প্রশিক্ষণ, তথ্য ও সরকারি সহায়তা পান। তার জন্য একটি বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র গঠন করা হবে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চালু করা হবে একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ ক্যালেন্ডার এবং অনলাইন জ্ঞানভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র, যেখানে পণ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিপণন কৌশল পর্যন্ত শেখানো হবে।

খবরের কাগজ: আপনি কি কেবল বড় উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন?

নূরুজ্জামান: না। তবে আমার অবস্থান স্পষ্ট-ই-কমার্সের প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো দেশের ক্ষুদ্র, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা। তারাই ঘরে বসে, সীমিত মূলধনে, নিজ উদ্যোগে একটি নতুন অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলছেন। অথচ এতদিন তাদের কণ্ঠ, চাহিদা ও বাস্তবতা অনেকটা উপেক্ষিত থেকেছে। আমি চাই, যারা আজ ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে, নিজস্ব ওয়েবসাইটে বা স্থানীয় বাজারমুখী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা করছেন- তাদের কথাই আগে শোনা হোক। কারণ তারাই আসল বাংলাদেশের সম্ভাবনা।

খবরের কাগজ: ই-কমার্সে পেমেন্ট সিকিউরিটির বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?

নূরুজ্জামান: বর্তমানে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো গ্রাহকের আস্থার অভাব, যার মূল উৎসই পেমেন্ট নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। পণ্যের টাকা পরিশোধের পর যদি গ্রাহক নিশ্চিত না থাকেন- পণ্য আসবে কি না, টাকা ফেরত পাবেন কি না- তাহলে ই-কমার্সে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে পেমেন্ট ব্যবস্থাকেই হতে হবে আস্থার প্রতীক। আমি বিশ্বাস করি, অনলাইন লেনদেন মানে হওয়া উচিত- “আচরণে বিশ্বাস”।

খবরের কাগজ: আপনি ই-কমার্স খাতকে কীভাবে রপ্তানিমুখী করবেন?

নূরুজ্জামান: বাংলাদেশের হাতে রয়েছে বিশ্বমানের কিছু ঐতিহ্যবাহী ও উদ্ভাবনী পণ্য- যেমন জামদানি, নকশিকাঁথা, চামড়াজাত পণ্য, পাট, অর্গানিক স্কিনকেয়ার ও হালাল খাদ্যসামগ্রী। এসব পণ্যের গুণগত মান, নান্দনিকতা ও বৈশ্বিক চাহিদা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ই-কমার্স রপ্তানিতে বিশাল এক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

আমার লক্ষ্য স্পষ্ট- এই অসাধারণ দেশীয় পণ্যগুলোকে বিশ্বের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বাজারে পৌঁছে দেওয়া, যাতে করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ একটি সম্মানজনক গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। এই লক্ষ্য পূরণে উল্লিখিত কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ: সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, নীতি, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগে সহায়তা প্রদানকারী একটি স্থায়ী সেল গঠন করা হবে। আমাজন, ইটসি, শপিফাই-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য সরবরাহের জন্য আনুষ্ঠানিক সমঝোতা গড়ে তোলা হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশি পণ্য পরিবেশনের জন্য আন্তর্জাতিক গুদাম বা সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে পণ্য প্রস্তুত, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিং নিয়ে প্রশিক্ষণ চালু করা হবে।

খবরের কাগজ: আপনার মতে ই-ক্যাবের সংস্কার প্রয়োজন আছে কি?

নূরুজ্জামান: অবশ্যই আছে। বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত বর্তমানে এক সম্ভাবনাময় অধ্যায় অতিক্রম করছে। কিন্তু আমরা একটি সময় পেরিয়েছি যেখানে এর সংগঠন হিসেবে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) অনেক সদস্যের মধ্যে আস্থাহীনতায় ভুগেছেন। অভিযোগ রয়েছে-সংগঠন কার্যকর সেবা দিতে পারছে না, সিদ্ধান্তে সদস্যদের মতামত প্রতিফলিত হচ্ছে না, এবং কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে, আমি মনে করি ই-ক্যাবকে নতুন করে সাজাতে হবে, সদস্যদের সত্যিকারের অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করে।

খবরের কাগজ: ‘ই-কমার্স ইকোসিস্টেম’ বলতে কী বোঝেন?

নূরুজ্জামান: ই-কমার্স কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবসা নয়- এটি একটি সমন্বিত, টেকসই ও আস্থাভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো। একজন উদ্যোক্তা যেন ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসার প্রতিটি ধাপ- রেজিস্ট্রেশন, পেমেন্ট, ডেলিভারি, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি- নির্বিচারে ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, সেটিই হচ্ছে ই-কমার্স ইকোসিস্টেমের মূল লক্ষ্য।

খবরের কাগজ: ‘ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স’-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি?

নূরুজ্জামান: বাংলাদেশের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে বিক্রি করতে গেলে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো দূর করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও কৌশল। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো পেমেন্ট গ্রহণের সমস্যা। বর্তমানে বাংলাদেশে পেপাল, স্ট্রাইপ বা আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে নেই, যার ফলে বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে পেমেন্ট গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় সমস্যা হলো লজিস্টিকস ও শিপিং কাঠামো দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য প্রেরণের জন্য কোনো স্থায়ী পূর্ণতা কেন্দ্র (ফুলফিলমেন্ট সেন্টার) বা ওয়্যারহাউজ গড়ে উঠেনি, যা শিপিং ব্যবস্থা সুসংহত করতে পারবে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পণ্যের মান ও প্যাকেজিংয়ে ঘাটতি। বিশ্ববাজারে পণ্য বিক্রি করার জন্য গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে পণ্যের মান বজায় রাখা এবং যথাযথ প্যাকেজিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বেশির ভাগ উদ্যোক্তার এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেই। চতুর্থ সমস্যাটি হলো নীতিনির্ধারণের অস্পষ্টতা। ক্রস-বর্ডার পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক এখনো যথাযথভাবে তৈরি হয়নি, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। পঞ্চম চ্যালেঞ্জ হলো উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব। যদিও উদ্যোক্তারা অ্যামাজন, ইটসি, ইবে, শপিফাইয়ে ব্যবসা করতে চায়, তবে অধিকাংশেরই প্রস্তুতি নেই।

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির

দেশের পোলট্রি খাতকে স্থিতিশীল রাখতে মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার (DOC) দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির। তার সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।

খবরের কাগজ: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার উৎপাদন খরচ কত?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এক দিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদনের খরচ সাধারণত ৩০ টাকার বেশি। লেয়ার বাচ্চার ক্ষেত্রে তা ৩৫ টাকার ওপরে। তবে ফিডের দাম, প্যারেন্ট স্টকের মান এবং হ্যাচারির ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে এই খরচ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

খবরের কাগজ: খামারিদের অভিযোগ, দেশের পোলট্রি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ বড় কোম্পানির হাতে চলে গেছে। এর বাস্তবতা কতটুকু?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: খামারিদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমানে ফিডের দাম অনেক বেড়েছে, ভ্যাকসিনের খরচও রয়েছে। অন্যদিকে ডিম উৎপাদনের গড় খরচ এখন প্রায় ১০–১২ টাকার মধ্যে হলেও অনেক ক্ষেত্রে খামারিদের কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা প্রায়ই উৎপাদন খরচের নিচে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

খবরের কাগজ: পোলট্রি খাতের প্রধান সমস্যাগুলো কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এই খাত এখনো অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ডলারের দাম বাড়ায় ভুট্টা, সয়াবিনসহ খাদ্য উপাদান আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাজারে মাঝে মাঝে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বিপণনব্যবস্থা থাকায় তারা সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারে, কিন্তু ছোট খামারিরা সরাসরি বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। এটিই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

খবরের কাগজ: দেশের অর্থনীতিতে পোলট্রিশিল্পের ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: ঈদুল আজহার আগে-পরে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ডিম ও মুরগির চাহিদা কিছুটা কম থাকে, তবে বাকি সময়ে বাজার স্থিতিশীল থাকে। পোলট্রি খাত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় মুরগির মাংস অনেক সস্তা, ফলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রামাঞ্চলে পোলট্রি খামার স্থাপন করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খবরের কাগজ: এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকা জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি গ্রহণযোগ্য মূল্যসীমা নির্ধারণ করা গেলে বাজারে অস্থিরতা কমবে। একই সঙ্গে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী এককভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এতে ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন এবং ভোক্তারাও ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাবেন।

খবরের কাগজ: অনেকেই বলেন, বায়োসিকিউরিটি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে খামারিরা লোকসানে পড়েন–এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: বিদেশি জাতের মুরগি তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল। তাই খামার শুরু করার আগে এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা অর্জনের পর খামার পরিচালনা করলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বড় কোম্পানি, সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং খামারিদের সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে পুরো খাতই উপকৃত হবে।

খবরের কাগজ: মুরগির খাদ্যের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে কী করা যেতে পারে?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টা। দেশে ভুট্টা উৎপাদনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, কারণ এর উৎপাদন খরচ আমদানির তুলনায় কম। তবে বাজার নিশ্চয়তা দিলে আরও বেশি কৃষক এই খাতে আসবেন। এতে করে আমদানি-নির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সাক্ষাৎকারে সুমন হাওলাদার সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১১ এএম
সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার

ঈদ, আশুরা, রমজান মাসসহ বিভিন্ন ইভেন্টকে লক্ষ্য রেখে কোম্পানিগুলো রুটিন করে মুরগির বাচ্চার দাম বাড়ায়। এই সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজ চট্টগ্রামের ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।

খবরের কাগজ: পোলট্রি খাতে খামারিদের অবস্থা কী?
সুমন হাওলাদার: এককথায় বলতে গেলে ভালো নেই। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এখন এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অন্য কর্মে চলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের ২০০৭ সালে খামারির সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার। ২০১২ সালে তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার। বর্তমানে ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার খামারি কোনোভাবে টিকে আছেন। 

খবরের কাগজ: কারণ কী?
সুমন হাওলাদার: খামারিরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও যখন কোনো লাভ পাচ্ছেন না, তাই তারা অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশের একসময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যখন সাধারণ মানুষ আর মুরগি কিনে খেতে পারবেন না। গরু-ছাগলের মাংসের মতো মুরগির মাংসও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ২০২৩ সালে একবার সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা হয়েছিল ব্রয়লার মুরগির দাম। এখন যেভাবে চলছে সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে তাহলে সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে দেরি নেই।

খবরের কাগজ: এই সংকট কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
সুমন হাওলাদার: কোম্পানিগুলো ঈদ, রমজান মাস, শবেবরাত, নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রুটিন তৈরি করে মুরগির বাচ্চার দাম বাড়ায়। এবারের ঈদে ভোক্তারা যে মুরগি কেজি ২০০ টাকার বেশি দামে কিনে খেয়েছেন সেই বাচ্চা দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিদের কিনতে হয়েছে প্রতিটি ৮৫ টাকা থেকে ১০০ টাকায়। কোম্পানিগুলো লাভ আগে নিয়ে নেয়। যখন চাহিদা বাড়বে তার আগেই তারা বাচ্চার দাম বাড়িয়ে ফেলে। 

খবরের কাগজ: এই খাতের ওপর কোম্পানিগুলোর এত শক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেল?
সুমন হাওলাদার: যারা বাচ্চা উৎপাদন করে তারাই ফিড উৎপাদন করে। এ ছাড়া ওষুধ, ভ্যাকসিন সবকিছুই তারা করে। তারা চুক্তিভিত্তিক ফার্ম করে। বাজার নিয়ন্ত্রণও তারা করে। 

খবরের কাগজ: পোলট্রি শিল্পের নীতিমালা নেই? 
সুমন হাওলাদার: নীতিমালা হয়েছে। তবে তা দুর্বল নীতিমালা। সরকারের আমলারা করপোরেট গ্রুপের কাছ থেকে সুবিধা নেয়। করপোরেট গ্রুপের হাতে পুরো খাতটা তুলে দিচ্ছে। এতে বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে। দেশের অর্ধকোটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বেকার করে দিচ্ছে। 

খবরের কাগজ: কোম্পানিগুলোর অভিযোগ হলো অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বাচ্চা বিক্রি করতে হয়।
সুমন হাওলাদার: এটা তাদের লোকদেখানো বক্তব্য। যেকোনো ব্যবসার নিয়ম হলো যখন চাহিদা বাড়ে কিংবা বিক্রি বাড়ে, তখন কম লাভে পণ্য বিক্রি করা। কিন্তু পোলট্রি খাতে তার উল্টো চিত্র। বিক্রি বাড়লে তারা দুই থেকে তিন গুণ দামে বিক্রি করে। খামারিরা যখন লোকসানে পড়ে খামার বন্ধ করে দেন, তখন তারা কম দামে বাচ্চা বিক্রি করেন। ১০ থেকে ১২টা কোম্পানি সিন্ডিকেট করে এই জটিলতা তৈরি করেছে। দেশে প্রতি সপ্তাহে বাচ্চার চাহিদা প্রায় ২ কোটি। বাচ্চার সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। 

খবরের কাগজ: অভিযোগ আছে, বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে না পারার কারণে অনেক সময় মুরগি মারা যায়।
সুমন হাওলাদার: এই রোগের জন্যও কোম্পানিগুলো দায়ী। তারা কম দামে প্যারেন্ট স্টক কেনার জন্য বার্ড ফ্লু হয়েছে এমন দেশ থেকে বাচ্চা কিনে আনে। তাহলে খামারে রোগ তো আসবেই। তারা শুধু নিজেদের লাভের জন্য সেই কাজটি কেন করে।

সাক্ষাৎকারে নাছির উদ্দিন ১৫ দিন অন্তর মুরগির বাচ্চা ও মুরগির দাম নির্ধারণ করা উচিত

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৭ এএম
আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১২ এএম
১৫ দিন অন্তর মুরগির বাচ্চা ও মুরগির দাম নির্ধারণ করা উচিত
প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন

একজন ক্ষুদ্র খামারি তার সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না। ভালোভাবে চলতে পারেন না। সরকারের উচিত অন্তত ১৫ দিন অন্তর মুরগি এবং মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া। তাহলে কেউ রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন, ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়নের প্রান্তিক খামারি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম। 

খবরের কাগজ: খামার করতে এসে অনেকেই টিকতে পারছেন না কেন? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: খামার করতে এসে টিকতে না পারার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে সঠিক সময়ে উৎপাদন করতে না পারা। খামার ব্যবস্থাপনায় অজ্ঞতা, সঠিক পরিচর্যার অভাব। খামার রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ। এখানে বাজারজাত করার একটি ব্যাপারও রয়েছে। বাজারে মূল্য পেতে হলে সঠিক সময়ে বিক্রি করতে হবে।

খবরের কাগজ: খাবারের দাম বেশি, বাচ্চার দাম বেশি কীভাবে সামাল দিচ্ছেন? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বর্তমানে মুরগির পাইকারি দাম কেজি ১৪৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। তবে খাবারের দাম আর একটু কম থাকলে ভালো হতো। পর্যাপ্ত খাবার, টিকা ওষুধ দিয়ে উৎপাদনের দেখা গেল বাজারে মূল্য কম। সরকার যদি বাজার মনিটরিং করে ১৫ দিন অন্তর বাচ্চা এবং মুরগির দাম নির্ধারণ করে দিতে তাহলে সবাই উপকৃত হতো। 

খবরের কাগজ: সরকার আর কী করলে খামারিদের উপকার হবে? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বেসরকারিভাবে খামার তৈরি হচ্ছে। খামারিরা কীভাবে উৎপাদন করছে, সেটিও দেখাশোনার কেউ নেই। এতে মাঝারি ও ক্ষুদ্র খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে যান। খামার টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাচ্চা ক্রয় থেকে লালনপালন ও বিক্রি সব ক্ষেত্রে যদি সরকারি নজরদারি রাখে তাহলে সবার জন্য মঙ্গল। কেউ রাতারাতি যা খুশি তা করতে পারবে না। 

খবরের কাগজ: রোগবালাই নিরসনের ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: আমার খামারে যেকোনো রোগবালাই নিজেই চিকিৎসা করি। একজন খামারি হিসেবে খামার সম্পর্কে রোগবালাই সম্পর্কে জ্ঞান রাখা খুবই দরকার। খামারে সমস্যা দেখা গেলে কেন সৃষ্টি হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। এই যে সমস্যা নির্ণয় করা, সেটি একজন খামারি ছাড়া বেশি কেউ বুঝবে না। তাই বলছি, খামারিকে ট্রেনিং নিতে হবে। রোগ বালাইয়ের লক্ষণ বুঝতে হবে। 

খবরের কাগজ: যারা নতুন খামার করতে আসছে তাদের উদ্দেশে কিছু বলেন। 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: বিভিন্ন স্থানে ট্রেনিং নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। খামার করতে হলে আধুনিকভাবে করতে হবে। অর্থাৎ কাজ জেনে খামারে নামতে হবে। কিছু জানাশোনা থাকলে বাকি কাজটা করতে গিয়ে শিখতে পারবে। 

খবরের কাগজ: একসময় অনেক খামার ছিল, এখন প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে কেন?
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: এই ব্যবসাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। এখানে ঝুঁকি বেশি। অনেকে না বুঝে এসে আটকে যান। সামনেও যেতে পারেন না, পেছনেও যেতে পারেন না। অনেকে ৬ মাস এক বছর খামার করে বন্ধ করে দেন। লাভ করতে না পেরে অনেকেই অন্য ব্যবসায় চলে যান। খামার ব্যবসায় মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি উন্নতি করেন, খামারিরা করতে পারেন না। 

খবরের কাগজ: আপনিতে নিজেই অনেক অভিজ্ঞ, আপনার কতটুকু উন্নতি হয়েছে? 
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন: ঠিক বলেছেন, সেভাবে উন্নতি করতে পারিনি। বিগত ১০ বছর ধরে এ ব্যবসায় রয়েছি। একজন খামারি তার ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না, ভালো কিছু খেতে পারেন না। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি লাভ করছেন। আমরা লাভ করতে পারি না।

সাক্ষাৎকারে মাসাদুল আলম মাসুদ নীতি-সহায়তা বাড়ালে রডের বাজার স্থিতিশীল হবে

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
নীতি-সহায়তা বাড়ালে রডের বাজার স্থিতিশীল হবে
শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লাগে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থমকে যায়। রডের প্রতিটনে দাম কমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অবশেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে দেশে। বিনিয়োগকারীদের মনে আশা জাগে। কিন্তু কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে টালমাটাল হয়ে যায় নির্মাণসামগ্রীর বাজার। বিশেষ করে রডের টনে বেড়েছে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই হতভম্ব হয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখছেন। এ অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব। এসব জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম

খবরের কাগজ: বর্তমানে রডের বেচা-বিক্রি কেমন হচ্ছে? 
এস কে মাসাদুল আলম: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পরে উন্নয়নকাজ থমকে যায়। বেচাবিক্রি খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। অনেক ঠিকাদার পালিয়ে যান। আবার বেসরকারি খাতের নতুন করে কেউ বিনিয়োগও করেননি। এ জন্য দেশে রড ও সিমেন্ট বেচাবিক্রি একেবারে কমে যায়। কিন্তু নির্বাচিত সরকার গঠনের পর আমরা আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু সরকার গঠনের কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তার ধাক্কা লাগে নির্মাণসামগ্রীতে। বিশেষ করে রডের কাঁচামাল স্ক্যাপের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগের কোনো স্টক ছিল না। তাই দাম বেড়ে গেছে। বেচাকেনা মোটামুটি হচ্ছে।

খবরের কাগজ: রডের দাম যাওয়ার কারণ কী? 
এস কে মাসাদুল আলম: গত সরকার ২০২৪ সালে যখন দায়িত্ব নেয় তখন বেচাকেনা কমে যায়। ফলে রডের দামও প্রতিটনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা কমে যায়। লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর আমাদের মৌসুম শুরু হয়। চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধও শুরু হয়েছে। এ জন্য টনে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।   

খবরের কাগজ: যুদ্ধের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেন রডের দাম বাড়ল। উৎপাদন তো সেই এলসি খোলার কাঁচামাল থেকে হয়নি?
এস কে মাসাদুল আলম: এ সময়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও অনেক কমে যায়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। মৌসুমে সব পণ্যের দাম বাড়ে। নির্মাণসামগ্রীর মৌসুমও শীতকাল। তাই জানুয়ারি থেকেই একটু একটু দাম বাড়ে। যুদ্ধের কারণে আরও বেড়ে যায়। স্ক্যাপ ও পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে গেছে। তবে এলসি খোলার পর সেই পণ্য দেশে আসতে ২ থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে যুদ্ধের প্রভাবেই রডের দাম বেড়েছে। শুধু রড না এর সঙ্গে তার, কেবল, ইলেকট্রিক, গ্লাস সব কিছুর দাম বাড়ছে।  

খবরের কাগজ: রডের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে চাহিদা কেমন? 
এস কে মাসাদুল আলম: চাহিদা মোটামুটি আছে। কারণ এখন নির্মাণ খাতের মৌসুম।  ৯০ থেকে ৯৮ হাজার টাকা টন হয়েছে, যা কমে কিছুদিন আগে ৭৭ থেকে ৮৪ হাজার টাকায় নামে। এভাবে দাম কমে যাওয়ায় অনেককেই লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। তবে যারা বড় কোম্পানি লোকশান থেকে রেহাই পেতে স্টক করে রাখেন। অনেকেই টিকতে না পেরে কারখানা বন্ধ রাখেন। ৪০টির মধ্যে প্রায় ১৫টি অটোমেটিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক ছোট কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে।  

খবরের কাগজ: এ অবস্থার কী পরিবর্তন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: দেশে স্থিতিশীলতা দরকার। ভালো সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমরা আশা করলেও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শঙ্কার মধ্যেই ব্যবসা করতে হয়েছে। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবসা-বাণিজ্যের খারাপ অবস্থা। আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। আগে ইউরোপ থেকে কাঁচামাল আসত। বিভিন্ন কারণে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছি তারা ভুক্তভোগী। তাই নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এবারের বাজেটে যেন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আসে। তা হলেই এ অবস্থার পরিবর্তন আসবে। এক সময়ে করোনা গেল। তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তা শেষ না হতেই আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই সরকারকে আমাদের উদারভাবে সমর্থন দিতে হবে। তা না হলে টিকা কঠিন হয়ে যাবে। ব্যাংকের সহায়তা পেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব।

খবরের কাগজ: সরকার কী করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: ডলারের দাম বৃদ্ধি বা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। কারণ ব্যাংকও আগের তুলনায় খারাপ অবস্থায় থাকায় চাহিদামতো আমাদের সুবিধা দিচ্ছে না। কাঁচামালের ওপর শুল্ক বেশি, তা কমাতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কালাকালুন আইন বন্ধ করতে হবে। সরকার ও ব্যাংকের নীতি-সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) বাড়াতে হবে। তবে দেশের বাজার স্থিতিশীল হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। 

খবরের কাগজ: এই শিল্পে বিনিয়োগ কেমন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: প্রথমে কম থাকলেও বর্তমানে ৪০টির মতো অটো স্টিলমিলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ম্যানুয়ালি রডের কারখানা আগে ৩০০ মতো ছিল। বর্তমানে ১৫০টির মতো টিকে আছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে জড়িত ২ কোটি পরিবার। কারণ দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আনাচে-কানাচে ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে বন্দরের পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সবাই এর সঙ্গে পরোভাবে যুক্ত। রডের যেখানে ব্যবহার হয় সেখানে ইট, বালি, সিমেন্ট, থাই, গ্লাসেও ব্যবহার হয়। তারাও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে জড়িত। কাজেই দেশে ব্যবসা ভালো চললে সবাই ভালো থাকবেন।

সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবদুর রহিম যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে সিমেন্ট বিক্রি

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে সিমেন্ট বিক্রি
ডায়মন্ড সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মোহাম্মদ আবদুর রহিম

সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও কমে গেছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম বাজার হলো মধ্যপ্রাচ্য। আর যুদ্ধের প্রভাবে সেখানে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। অপর দিকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। খবরের কাগজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান ডায়মন্ড সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মোহাম্মদ আবদুর রহিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম। 

খবরের কাগজ: কবে থেকে সিমেন্টের দাম বৃদ্ধি শুরু।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরু হয় এর কয়েক দিন পর থেকেই মূলত সিমেন্টের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। 

খবরের কাগজ: যুদ্ধের সঙ্গে সিমেন্টের সম্পর্ক কোথায়?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম প্রতিটনে ১০ থেকে ১৫ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যায়। প্রতিটন মানে ২০ ব্যাগ। অধিকাংশ কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। সৌদি আরবের জেবল আলী বন্দর থেকে এসব কাঁচামাল মূলত জাহাজীকরণ করা হয়। যে কারণে কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়ভাবেও কিছু সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্য থেকে সিমেন্টের কোন কোন কাঁচামাল আনা হয়?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: লাইমস্টোন, জিপসাম, ক্লিংকারসহ প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানি করা হয়।

খবরের কাগজ: স্থানীয় সংকট কীভাবে সৃষ্টি হলো?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে গাড়ির ভাড়া বেড়ে গেছে। সিমেন্ট হচ্ছে ভারী পণ্য। এই পণ্যটি পরিবহন করতে হয় সতর্কভাবে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান কিংবা জলযানে জ্বালানি তেল পেতে কষ্ট হচ্ছে। দূর-দূরান্তে সিমেন্ট পাঠানোর সময় গাড়িচালকরা তাদের গাড়ি কয়েক জায়গায় দাঁড়িয়ে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যে কারণে তারা বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। এই বাড়তি ভাড়া সিমেন্টের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।  

খবরের কাগজ: সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। বলছে সংকটও নেই।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি ঠিক। কিন্তু নানা কারণে সংকট দূর করতে পারেনি। এখানে সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও জ্বালানি তেলের যে সংকট চলছে তা দূর করতে রাষ্ট্রের যেসব যন্ত্র ভূমিকা রাখার কথা তারা যথাযথভাবে রাখতে পারেনি।  

খবরের কাগজ: সিমেন্টের দাম কী হারে বেড়েছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: প্রতি ব্যাগে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমাদের উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, তা সিমেন্টের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। বাস্তবতা হলো যতটুকু খরচ বেড়েছে ততটুকু বাড়ানো যায়নি। 

খবরের কাগজ: যুদ্ধের আগে যেসব পণ্যের লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা হয়েছে সেসব পণ্য এখনো দেশে পৌঁছায়নি।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: না আসেনি। কাঁচামাল রপ্তানিকারী দেশগুলোতে কাঁচামাল উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাদের ক্লিংকারের কারখানা আছে, যা অতি উচ্চমাত্রায় সেদ্ধ করতে হয়। তাদেরও জ্বালানিসংকট এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে। তাই তারা আগের দামে পণ্য রপ্তানি করতে রাজি হচ্ছে না। বাড়তি দাম যোগ করলে পণ্য পাঠাবে। নতুবা পাঠাবে না। এই কথা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে।

খবরের কাগজ: দামের কারণে সিমেন্টের বাজারে কোনো প্রভাব পড়েছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম:  অবশ্যই পড়েছে। তবে শুধু দামের কারণে প্রভাব পড়েছে এ কথা সত্য নয়। যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশ ভালোভাবেই পড়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিক বাসায় বসে কোনো রকমের দিন কাটাচ্ছেন। প্রবাসী ব্যবসায়ীদের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈধ এবং অবৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর। মূলত নির্মাণশিল্প পণ্যের বড় গ্রাহক প্রবাসীরা। তারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান। দেশে নিজের বাড়ি করেন। এমনকি তারা দান দক্ষিণাও বেশি করেন। দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা যেখানে নিজে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। সেখানে নিজের বাড়িতে টাকা পাঠানো তাদের জন্য কঠিন। আর মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের হাতে টাকা থাকলে তা তারা নিজের কাছে জমা রাখেন না, দেশে পাঠিয়ে দেন। 

খবরের কাগজ: বাজারে কী পরিমাণ চাহিদা কমেছে?
মোহাম্মদ আবদুর রহিম: গত মার্চ মাসে দেশে সিমেন্ট বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ টন। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে তার চেয়ে ১৫ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে।