দেশের বিমা খাতে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে আস্থাহীনতাসহ নানা ধরনের সমস্যায় জর্জড়িত। বিমা খাতের সার্বিক বিষয়সহ এসব সমস্যা সমাধানে করণীয় বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কথা বলেছেন- জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-এর সিইও এস এম নুরুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহা।
খবরের কাগজ: উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে বিমা খাত পিছিয়ে থাকার কারণ কী?
এস এম নুরুজ্জামান: আমাদের দেশে বিমা খাত পিছিয়ে থাকার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব ও বিমা সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি বড় কারণ। অনেক মানুষ বিমাকে সঞ্চয় বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম হিসেবে না দেখে বাড়তি খরচ মনে করেন। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, জবাবদিহির অভাব ও কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম খাতটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। তৃতীয়ত, ডিজিটালাইজেশন ও আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার বিমা সেবাকে ধীর ও জটিল করেছে। এ ছাড়া আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপকতা এবং আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়াও খাতটির বিকাশে প্রতিবন্ধক।
খবরের কাগজ: বিমা খাতে গ্রাহকের আস্থাহীনতা বড় সমস্যা। এটি কমাতে কী ধরনের উদ্যোগ দরকার?
এস এম নুরুজ্জামান: গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রথম ও প্রধান উদ্যোগ হওয়া উচিত স্বচ্ছতা ও সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। দাবি পরিশোধে বিলম্ব বা হয়রানি আস্থাহীনতা বাড়ায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকবান্ধব পলিসি ভাষা, সহজ শর্তাবলি, ডিজিটাল ক্লেইম ট্র্যাকিং এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। বিমা এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মান উন্নয়নও আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
খবরের কাগজ: বিমা খাতে পণ্য বৈচিত্র্য কম বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি কীভাবে বাড়ানো যায়?
এস এম নুরুজ্জামান: পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে বাজার ও গ্রাহকের চাহিদাভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। কৃষি, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, প্রবাসী আয়, জলবায়ু ঝুঁকি এবং মাইক্রোইনস্যুরেন্সের মতো খাতে নতুন পণ্য চালু করা যেতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প প্রিমিয়ামের, স্বল্পমেয়াদি ও কাস্টমাইজড পলিসি তৈরি করা সম্ভব। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে উদ্ভাবনী পণ্যের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও সময়োপযোগী করতে হবে, যাতে কোম্পানিগুলো নতুন পণ্য আনতে উৎসাহ পায়।
খবরের কাগজ: ব্যাংকাসুরেন্স কতটুকু কার্যকর পদ্ধতি বলে মনে করেন?
এস এম নুরুজ্জামান: ব্যাংকাসুরেন্স একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় পদ্ধতি বলে আমি মনে করি। ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যবহার করে সহজেই বিমা পণ্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়। এতে বিমা কোম্পানির বিতরণ ব্যয় কমে এবং গ্রাহক এক জায়গা থেকেই একাধিক আর্থিক সেবা গ্রহণের সুযোগ পায়। তবে এটি কার্যকর রাখতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, গ্রাহকের চাহিদাভিত্তিক পণ্য নির্বাচন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এতে বিমা কোম্পানির বিতরণ খরচ কমে এবং গ্রাহকও এক জায়গা থেকে একাধিক আর্থিক সেবা পায়। নীতিনৈতিকতা বজায় না থাকলে ব্যাংকাসুরেন্স উল্টো আস্থাহীনতা বাড়াতে পারে।
খবরের কাগজ: প্রিমিয়াম ও সম্পদ বাড়ার পরেও কেন বিমা দাবি পরিশোধ করা হয় না?
এস এম নুরুজ্জামান: প্রিমিয়াম আয় ও সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও বিমা দাবি সময়মতো পরিশোধ না হওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত, ব্যবস্থাপনাগত ও নীতিগত কারণ রয়েছে। এই সমস্যাটি কেবল আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি থেকে নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা থেকেই বেশি তৈরি হয়।
প্রথমত, অনেক বিমা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। প্রিমিয়াম থেকে অর্জিত অর্থ সবসময় যথাযথভাবে বিনিয়োগ বা সংরক্ষণ করা হয় না। কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় কিংবা অপ্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যবহারের ফলে দাবি পরিশোধের সময় তারল্যসংকট দেখা দেয়। ফলে সম্পদ কাগজে-কলমে বাড়লেও বাস্তবে তা সহজে নগদায়নযোগ্য থাকে না।
দ্বিতীয়ত, পলিসির শর্তাবলি অনেক সময় জটিল ও অস্পষ্ট হয়। গ্রাহক পলিসি গ্রহণের সময় শর্তগুলো পুরোপুরি বুঝতে না পারায় দাবি দাখিলের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা শর্তপূরণে ব্যর্থ হন। এ সুযোগে কিছু কোম্পানি দাবি প্রত্যাখ্যান বা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে, যা গ্রাহকের কাছে ইচ্ছাকৃত হয়রানি বলে প্রতীয়মান হয়।
তৃতীয়ত, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের অভাবও বড় কারণ। কিছু প্রতিষ্ঠানে দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এখনো ম্যানুয়াল, দীর্ঘ ও আমলাতান্ত্রিক। এতে স্বচ্ছতা কমে যায় এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ অডিট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা না থাকায় দাবি পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না।
চতুর্থত, নিয়ন্ত্রক তদারকির সীমাবদ্ধতাও এ সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। দাবি নিষ্পত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বাস্তবায়নে কঠোরতা না থাকলে কোম্পানিগুলো দায় এড়িয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থা না থাকায় ভুক্তভোগীরা ন্যায্য প্রতিকার পান না। সবশেষে কিছু ক্ষেত্রে নৈতিকতার ঘাটতি ও অসৎ উদ্দেশ্যও দায়ী। দাবি পরিশোধে বিলম্ব করে প্রিমিয়ামের অর্থ দীর্ঘদিন ব্যবহার করার মানসিকতা খাতটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এই সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় দাবি ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী তদারকি এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
খবরের কাগজ: খাতটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার পরামর্শ কী?
এস এম নুরুজ্জামান: বিমা খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রথমেই সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি আরও শক্তিশালী করে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে খাতটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। একই সঙ্গে সময়মতো ও ঝামেলাহীন দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এখানেই গ্রাহকের আস্থার মূল ভিত্তি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর বিমা সেবার বিস্তার ঘটাতে হবে। ডিজিটাল পলিসি ইস্যু, অনলাইন প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং স্বয়ংক্রিয় ক্লেইম ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, গ্রাহকের চাহিদাভিত্তিক নতুন ও বৈচিত্র্যময় পণ্য চালু করতে হবে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও জলবায়ু ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট বিমায় জোর দিতে হবে।
এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও পেশাদারত্ব বাড়ানো, বিমা এজেন্টদের নৈতিক মান উন্নয়ন এবং গণসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিমা কোম্পানির সমন্বিত উদ্যোগই খাতটির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।