পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। তবে সুষ্ঠুভাবে রোজা পালনের জন্য ডায়াবেটিক রোগীদের খাদ্য ও ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে হয়। অন্যথায় নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আসুন দেখে নিই, এ সময় তাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা কেমন হবে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা
রোজার সময় ডায়াবেটিক রোগীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা হতে হবে সমতাপূর্ণ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। রক্তের শর্করার মাত্রা দ্রুত বা অতিরিক্ত বাড়ানো বা কমানো যাবে না।
একটি খেজুর ও সাধারণ পানি দিয়ে রোজা ভাঙতে পারেন।
ইফতারে পানিশূন্যতা রোধ ও বিপাকক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি অথবা শরবত একটি অপরিহার্য পানীয়। তবে শরবতে চিনি বা গুড় ব্যবহার করা যাবে না। পরিবর্তে বিকল্প চিনি দিয়ে ইসবগুল, লেবু, তেঁতুল, কাঁচা আম ইত্যাদির শরবত খাওয়া যেতে পারে। চাইলে ডাবের পানি পান করা যেতে পারে।
অতিরিক্ত তেলে ভাজা, চর্বিযুক্ত ও মিষ্টি খাবার (যেমন–পিঁয়াজু, হালিম, জিলাপি) এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে স্যুপ, সালাদ, ফল (আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি) ও সেদ্ধ শাকসবজি খান। ইফতারে কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদা, টমেটো, পুদিনাপাতা ও অল্প লবণ মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
ডায়াবেটিক রোগীকে ইফতারের পর সন্ধ্যা, রাতের খাবার একেবারে বাদ দেওয়া যাবে না। ইফতার ও সাহরির মধ্যবর্তী সময়ে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এ সময় রুটি, ভাত, মাছ বা মুরগি ও সবজির সমন্বয়ে হালকা খাবার খান। সন্ধ্যা রাতের খাবার হবে অন্যান্য সময়ের রাতের খাবারের সমপরিমাণ।
সাহরিতে খেতে হবে অন্য সময়ের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ। সাহরি একটু দেরিতে খাবেন এবং খাবার হতে হবে সম্পূর্ণ ও পুষ্টিকর। জটিল শর্করা (লাল আটার রুটি, ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত, ওটস), উচ্চ আঁশযুক্ত সবজি, প্রচুর প্রোটিন (মাছ, ডাল, ডিম, মুরগির মাংস) এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখতে হবে।
পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত ২-৩ লিটার পানি পান করুন। চা, কফি ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন।
রোজায় সকাল বেলা বেশি হাঁটাহাঁটি বা ভারী ব্যায়াম করা যাবে না। এতে রক্তের গ্লুকোজ কমে রোগীর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। এজন্য রোজা রেখে সকাল বেলা না হেঁটে ইফতারের ১-২ ঘণ্টা পর আধা ঘণ্টা হালকা হাঁটাচলা করা যেতে পারে।
যদি ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্য সমস্যা যেমন–কিডনি রোগ, রক্তে উচ্চ মাত্রায় ইউরিক অ্যাসিড থাকে, তবে ডালের তৈরি খাবার না খাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে ছোলা, পিঁয়াজু ইত্যাদির পরিবর্তে চালের গুঁড়া অথবা ময়দার তৈরি শিঙাড়া, সমুচা, আলুপুরি বা আলুর চপ ইত্যাদি পরিমাণমতো খাওয়া যাবে।
নিয়মিত রক্তের শর্করা পরীক্ষা: রোজায় প্রয়োজনে ৪-৬ বার রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। ইসলামি স্কলারদের মতে, রোজাকালীন সময়ে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করলে এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
কখন রক্তের সুগার পরীক্ষা করবেন?
♦ সাহরির আগে ♦ সাহরির দুই ঘণ্টা পর ♦দিনের মাঝামাঝি অর্থাৎ বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে ♦ ইফতারির আগে ♦ ইফতারির দুই ঘণ্টা পর ♦ দিনের যেকোনো সময় রোগী অসুস্থ বোধ করলে যেমন–হাইপোগ্লাইসেমিয়া অথবা হাইপারগ্লাইসেমিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের সুগার চেক করতে হবে।
কখন রোজা ভাঙবেন?
রক্তের শর্করা ৭০ mg/L (৩.৯ mmol/L) এর নিচে নামলে
রক্তের শর্করা ৩০০mg/L (১৬.৭ mmol/L) এর বেশি হলে
হাইপোগ্লাইসেমিয়া অথবা হাইপারগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে (প্রচুর ঘাম, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা ইত্যাদি)।
পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে। (অতিরিক্ত পিপাসা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা)।
কোনো তীব্র অসুস্থতা যেমন–জ্বর, সংক্রমণ হলে।
রোজা রেখে সকাল বেলা না হাঁটাই ভালো, কারণ এতে রক্তের সুগার কমে যেতে পারে। তবে ইফতারের দুয়েক ঘণ্টা পরে আধা ঘণ্টা হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। রমজানে তারাবির নামাজকে প্রতিদিনের ব্যায়াম হিসেবে গণ্য করা হয়।
রমজান মাসে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মূল চাবিকাঠি হলো-
প্রাক-রমজান প্রস্তুতি
ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা
নিয়মিত রক্তের সুগার পরীক্ষা
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন
লেখক: ডায়াবেটিস ও হরমোনজনিত রোগ ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, চেম্বার আলোক হেলথ কেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা।


