রোবেন দ্বীপ। দ্বীপটি একসময় সবার অগোচরেই ছিল। মূলত রাজনৈতিক বন্দিদের কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর থেকে দ্বীপটি বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করে। আটলান্টিকের টেবিল উপসাগরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপবৃত্তাকার এই ছোট দ্বীপটি। এটি যেন আটলান্টিকের কূলকিনারহীন জলরাশির বুকে একখণ্ড সবুজ স্থলভাগ।
লম্বায় ৩ কিলোমিটার আর চওড়ায় ২ কিলোমিটারের এই দ্বীপে গ্রীষ্মের সময় দক্ষিণ-পূর্ব ও শীত মৌসুমে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই দ্বীপ খুব একটা উঁচু না হলেও এখানে রয়েছে এক অন্যরকম মায়া। প্রায় জনমানবহীন দ্বীপটির চারদিক সুনসান। কেবল সমুদ্রের ঢেউ আর শনশন শব্দ। জ্যোৎস্না নিশিতে আটলান্টিকের নীল জলরাশি হাতছানি দিয়ে ডাকে!
আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর যেখানে মিলিত হয়েছে তার ঠিক পশ্চিম দিকে কেপটাউন শহর। দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম কেপ প্রদেশ উপকূল থেকে প্রায় ৭ কিমি এবং কেপটাউন পোতাশ্রয় থেকে প্রায় ১২ কিমি দূরে অবস্থিত দ্বীপটি। দ্বীপটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। এটি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ আরও অনেক বর্ণবাদ বিরোধীদের জন্য কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই দ্বীপে আফ্রিকান নেতাদের নির্বাসিত করা হয় ১৯৬০- এর পর থেকে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছর আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এখানে কারাবন্দি থেকেছেন। ম্যান্ডেলা ছাড়াও এখানে অন্তরীণ ছিলেন বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রবার্ট সেবুকে, ম্যাক মহারাজ, কগালেমা মোটলানথে ও জ্যাকব জুমা। কগালেমা মোটলানথে ও জ্যাকব জুমা পরবর্তীতে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এখানে শুধু রাজনৈতিক বন্দিদের নয়, সাধারণ অপরাধীদেরও রাখা হতো। অনেক সময় বিনা বিচারে রাজনৈতিক বন্দিদের তুলে এনে এখানে আটকে রাখা হতো। ১৯৩১ সালের আগ পর্যন্ত এই দ্বীপে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কুষ্ঠরোগীদের রাখা হতো। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিরক্ষা বাহিনী ১৯৩৬ সালে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং নতুন সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বসতি নির্মাণের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নত করে। বন্দিদশা অবস্থায় যাদের মৃত্যু হতো দক্ষিণ আফ্রিকান মুক্তি সংগ্রামের সেসব শহিদকে এখানে কবর দেওয়া হতো।
বর্তমানে দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। এখানে একটি জাদুঘর রয়েছে। ১৪৮৮ সালে বার্থলোমিয়ো ডায়াস নামের পর্তুগিজ নাবিক ছোট্ট এই দ্বীপ আবিষ্কার করেছিলেন। পরে ডাচরা এটার দখল নেয়। রোবেন দ্বীপটির নামকরণ করেন ডাচরা। প্রথম দিকে কৃষিকাজ করা হতো এখানে। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ অপরাধীদের বন্দি করে রাখা হতো এখানে। ১৭ শতকের পর থেকে দ্বীপটিতে অপরাধীদের নির্বাসন করা শুরু হয়। ১৭৯৫ সালে ব্রিটিশরা যখন কেপটাউন নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে তখন তারা দ্বীপটিকে একটি কারাগার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে।
দ্বীপটির এককোণে রয়েছে চুনাপাথরের খনি। নেলসন ম্যান্ডেলাসহ রাজনৈতিক বন্দিদের দিয়ে এই চুনাপাথর ভেঙে টুকরো টুকরো করার কাজ করানো হতো। যার ফলে ম্যান্ডেলার চোখে চুনাপাথরের বালুকণার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। যা তিনি আত্মজীবনী ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’-এ উল্লেখ করেছেন। সামুদ্রিক শৈবাল ঘেরা দ্বীপটিতে নানা রকম উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের বাস। সিল মাছ, কচ্ছপ, পানকৌড়ি ও পেঙ্গুইন রয়েছে দ্বীপটিতে। সামুদ্রিক প্রাণী সিল প্রচুর পরিমাণে থাকার কারণে দ্বীপটিকে ‘সিল আইল্যান্ড’ও বলা হয়। এখানে পেঙ্গুইনের বিশাল একটা বিচরণক্ষেত্র রয়েছে।
দ্বীপটিতে একটি বাতিঘর রয়েছে। এখানের সর্বোচ্চ চূড়া মিন্টো হিল। এটি প্রায় ৩০ মিটার উঁচু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দ্বীপটি আবার আলোচনায় আসে। এ সময় কেপটাউনকে রক্ষার জন্য এখানে দুর্গ বানানো হয়। ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে জাদুঘর হিসেবে স্থাপন করা হয়। রোবেন দ্বীপের বিল্ডিংগুলো এর ভয়ংকর ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। অনেকের মতে, রোবেন দ্বীপ এবং এর কারাগারগুলো নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানব চেতনার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের বিজয়ের প্রতীক। ১৭ শতক থেকে ২০ শতক পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর ধরে দ্বীপটি কারাবাস ও নির্বাসনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই দ্বীপের প্রথম বন্দি ছিলেন অতশুমাতো। ১৭ শতকের মাঝামাঝিতে এই দ্বীপে তাকে দোভাষী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। পরে তিনি দ্বীপটি ছেড়ে পালিয়ে যান।
বর্তমানে এখানে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় না। দ্বীপটিতে এখন আর কোনো বন্দিও থাকে না। শুধু রয়েছে বন্দিদের নির্মম স্মৃতিচিহ্ন। এককথায়, দ্বীপটি এখন অভিশাপমুক্ত। দ্বীপটিতে যারা আছেন তারা কারাগার-জাদুঘরেরই কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্য। পর্যটকদের ঘোরার সুবিধার জন্য দ্বীপে বাসের ব্যবস্থা আছে। পর্যটকরা কেপটাউনের তীর থেকে ফেরিযোগে দ্বীপটিতে যাতায়াত করে থাকে। তবে দ্বীপের পুরোটায় পর্যটকদের ঘোরার অনুমতি নেই। আগে যেটুকু কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো সেটুকুর আশপাশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। অর্ধেকের বেশি অংশ প্রাণ-প্রকৃতি তথা জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষিত। ইতিহাসের ভয়ংকর সাক্ষ্যকে পাশ কাটিয়ে আটলান্টিকের ফেনিল জলরাশি দ্বীপটির শক্ত তীরে যখন আছড়ে পড়ে; সেই আছড়ে পড়া আর মুক্ত বাতাস এখন বেশ উপভোগ করেন দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটকরা।
তারেক
.jpg)
.jpg)