ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। প্রতিটি ঋতুর রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। ভিন্ন ভিন্ন ঋতু ভিন্ন সাজসজ্জা ও বিচিত্র আঙ্গিকে প্রকৃতিতে ধরা দেয়। গ্রীষ্মের তাপদাহে যখন জনজীবন হাঁসফাঁস করে তখন বাড়ির আঙ্গিনায় বা রাস্তার ধারে বেড়ে ওঠা জারুল, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, কাঠগোলাপ, বকুলসহ বিচিত্র সব ফুলের সমাহার মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। চোখজুড়ানো এইসব দৃশ্য মনের খোরাক যোগায়।
বেগুনি রঙের ছোট্ট ফুল জারুল। গাছের ডালের উপরিভাগে অবস্থিত গুচ্ছাকারে থোকায় থোকায় ধরে থাকে এই অপরূপা ফুল। জারুলের ইংরেজি নাম Giant Crape-myrtle এবং বৈজ্ঞানিক নাম Lagerstroemia Speciosa। জারুল বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়।
শীতের রুক্ষতায় পাতাঝরা গাছটি বেশ বেমানান লাগে। তবে গ্রীষ্ম সেই বেমানান গাছটিতে অপরূপ রং ঢেলে দেয়। যার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় প্রকৃতি ও তার সকল জীবকুল।
গ্রীষ্মের দক্ষিণা বাতাসের দোলায় যখন জারুল গাছ দোল খায় তখন তা প্রকৃতির সৌন্দর্যে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। ঝড়ো বাতাসের দোলায় যখন গাছের গোড়া, পিচ ঢালা রাস্তা, মেঠো পথ বা কোন জলাশয়ের উপরে জারুল ফুল ও তার পাপড়ি বিছানা পেতে পরে থাকে অপরূপ সেই দৃশ্য মনে স্বর্গীয় সুখ সঞ্চার করে।
.jpg)
ছোট্ট একটা ফুল, স্নিগ্ধ তার পরশ। জারুলের রূপে বিমোহিত হয়ে কবিরা তাদের লেখায় খুঁজে পেয়েছেন ছন্দ। তাইতো কবি আহসান হাবিব ‘স্বদেশ’ কবিতায় লিখেছেন—
মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
এক পাশে তার জারুল গাছে
দুটি হলুদ পাখি।
জারুল গাছ শুধু রূপ-সৌন্দর্যে প্রশংসনীয় নয়, বরং এর রয়েছে বহুমুখী উপকারী গুণ। এর পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও ঔষধি গুণাবলী একে এক বিশেষ মর্যাদা দেয়। প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে জারুলের পাতা ও শিকড়। যেমন- বাত রোগের ব্যথা দূর করতে জারুল গাছের পাতা বেটে প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। জারুল গাছের শিকড় সিদ্ধ করে সেই পানি মধুর সাথে মিশিয়ে কয়েকদিন খেলে কাশি ভালো হয়ে যায়। জারুল গাছের মূল চূর্ণ করে গরম পানির সাথে রাতের বেলা নিয়মিত খেলে অনিদ্রা কেটে যায় এবং ভালো ঘুম হয়। শুধু কী তাই; জারুল গাছের শিকড় সিদ্ধ করে সেই পানি সকাল ও বিকেলে সেবন করলে জ্বর ভালো হয়ে যায়।
বেগুনি রঙা চমৎকার জারুল ফুলের রূপ ও সৌন্দর্য প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। সেই সঙ্গে এর ভেষজ ও অন্যান্য উপকারিতা মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে।
জারুলকে বলা হয় বাংলার চেরি। চেরি ফুলের দেশ জাপান। প্রতিবছর মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে এপ্রিল মাসের শুরুর কয়েক দিন পর্যন্ত জাপানে নজর কারে চেরি ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য। জাপানে প্রতিবছর চেরি ফুলের উৎসব পালন করা হয়। প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব ‘হানামি’ নামে পরিচিত। চেরি ব্লসমের মতো যদি আমাদের দেশে জারুল ব্লসম হতো, বিষয়টা মন্দ হতো না!
কালের বিবর্তনে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে জারুল ফুল গাছ। এই বহু গুণান্বিত গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
তারেক
.jpg)
.jpg)