পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকে। অপরাধ নির্মূলে প্রতিটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন ‘আধুনিক অস্ত্র ও ডিভাইস’ ব্যবহার করে থাকে। তবে অপরাধ তদন্তে মহিষের ব্যবহার বিরল। তবে এ ব্যবস্থারই প্রচলন রয়েছে ব্রাজিলে।
সাধারণত মহিষ গবাদিপশু হিসেবেই বেশি পরিচিত। তবে এই গৃহপালিত পশুকে ব্যবহার করে অপরাধের তদন্ত করার বিরল কর্মটি করছে ব্রাজিলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাতি রয়েছে ব্রাজিলের। চুরি, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্রাজিলে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর এসব ঘটনা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ব্রাজিলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
ব্রাজিলের সামরিক পুলিশ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে পরিচিত। উত্তর-ব্রাজিলে অ্যামাজন নদীর মোহনায় অবস্থিত মারাজো দ্বীপ। এই অঞ্চলের একটি পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাদের টহলদারিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা টহলের জন্য গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারের পরিবর্তে মহিষের পিঠে চড়ে রাস্তায় টহল দেয়।
এই মহিষগুলো এশিয়ান জলমহিষ। তবে এই মহিষগুলো এশিয়া থেকে কীভাবে মারাজো দ্বীপে পৌঁছালো তা নিয়ে রয়েছে প্রচুর জল্পনা-কল্পনা। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, তারা উপকূলের একটি জাহাজডুবি থেকে এসেছিলেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেন যে, ফরাসি গায়ানা থেকে পালিয়ে আসা বন্দিরা তাদের নিয়ে এসেছিলেন। তবে মারাজোর জলবায়ু এই জল মহিষের জন্য অনুকূল হওয়ায় তাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বিশাল শিংওয়ালা ১ হাজার ৮০০ পাউন্ড ওজনের এই মহিষগুলো কাদামাখা জমি ও ঘন ম্যানগ্রোভ বন পাড়ি দিতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে সাঁতারও কাটতে পারে। বৃষ্টির মৌসুমে এই বিশাল মারাজো দ্বীপের বিভিন্ন অংশে যেমন- বন-জঙ্গল বা যে স্থানে গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না, এরূপ দুর্গম স্থানে অপরাধীদের ধরার জন্য মহিষগুলোই একমাত্র ভরসা পুলিশ সদস্যদের কাছে। এই জলমহিষ আরোহী পুলিশ বাহিনীকে বলা হয় ‘বাফেলো সোলজারস’।
যেসব জায়গায় মোটরসাইকেল বা নৌকাও পৌঁছাতে পারে না, কিন্তু মহিষ দিয়ে সবখানে যাওয়া সম্ভব। সওরি শহরের উত্তরপূর্ব কোণে প্রায় ২৪ হাজার বাসিন্দার শান্ত এই শহরে, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও চামড়ার বুট পরা পুলিশ কর্মকর্তারা দিন শুরু করেন মহিষের পিঠে চড়ে। তাদের কোমরে বাঁধা থাকে পিস্তল আর মহিষের এই অভিজাত দল টহল দিতে দিতে শহরের প্রধান চত্বরে গিয়ে হাজির হয়। ব্রাজিলের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলে অপরাধের হার খুবই কম।

মারাজো দ্বীপে পুলিশের ব্যাটালিয়নে সাতটি জলমহিষ রয়েছে। টহলদারিতে ব্যবহার করা জলমহিষগুলোর মধ্যে মিনোতাউর নামের একটি মহিষ সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মহিষ নিয়ন্ত্রণ করা শেখা সহজ কাজ নয়, এর জন্য অফিসারদের কয়েক মাসের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। এই জলমহিষগুলোর উচ্চতা হয়ে থাকে ২.৫ মিটার বা ৮.২ ফুট এবং ওজন হয় প্রায় ১৮০০ পাউন্ড।
প্রায় তিন দশক আগে যখন মারাজোতে বন্যা হয়, সে সময় প্লাবিত এলাকা পরিদর্শনের জন্য এই জলমহিষদের ব্যবহার করা শুরু হয়। সে সময় কর্দমাক্ত ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ঘোড়া বা অন্যান্য যানবাহন চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং আজও সেই প্রথা বহাল রয়েছে।
মারাজো দ্বীপের বাসিন্দারা জলমহিষদের নিয়ে গর্ববোধ করে। কারণ এই জলমহিষগুলোর কারণেই সামরিক বাহিনী তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে। ফলশ্রুতিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে।
মারাজোতে মহিষকে শক্তি এবং সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। মারাজোর তীরে মিলিটারি পুলিশ ইউনিটের সদর দপ্তরটি বুলেটের খাপ দিয়ে সজ্জিত। এখানে একটি পেশিবহুল মহিষের প্রতিমূর্তি রয়েছে যার হাতে আছে একটি শটগান, যা এই দ্বীপের জলমহিষকে সারা বিশ্বের কাছে ‘আইকনিক’ করে তুলেছে।
যেহেতু মারাজোতেই প্রথম অপরাধীদের ধরতে যানবাহন হিসেবে মহিষ ব্যবহার করা হয়, তাই বিশ্বের কাছে এটি খুবই আকর্ষণীয় বিষয়। বহু পর্যটক মারাজো দ্বীপে জলমহিষের সঙ্গে সময় কাটাতে ভিড় করেন।
স্থানীয় উৎসবে এই জলমহিষদের দৌড় এক অন্যতম বিনোদনের উৎস। এরা মারাজোর কার্নিভ্যাল এবং স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ। স্থানীয় বাসিন্দারা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এই জলমহিষদের সর্বোচ্চ যত্ন নিয়ে থাকেন।
গোটা বিশ্ব যখন টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব অনুশীলনের দিকে নজর দিচ্ছে, তখন মারাজোর মহিষের টহলদারি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলোকে আধুনিক চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
মারাজোর মহিষ, যারা একসময় এই ভূমির সঙ্গে অপরিচিত ছিল, তারাই এখন দ্বীপের পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তারা কেবল সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য নিযুক্ত কর্মকর্তাদেরই নয়, বরং এমন একটি স্থানের ঐতিহ্যকেও বহন করে যেখানে প্রকৃতি এবং সংস্কৃতি সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপায়ে মিশে আছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)